logo
news image

অবৈধভাবে পদ্মার বালু উত্তোলন

লালপুর (নাটোর) প্রতিনিধি
নাটোরের লালপুর উপজেলায় চারটি ইউনিয়নের তীরবর্তী পদ্মা নদীতে প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকে রাতভর চলছে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও সরবরাহ। সরকারী অনুমতি ছাড়া ও নিয়মনিতি তোয়াক্কা না করে পদ্মার পানি কমে যাওয়ার প্রায় মাস খানেক পর থেকে অবাধে চলছে বালু উত্তোলন ও বিক্রির মহোৎসব।
বৃহস্পতিবার (১৭ মার্চ ২০২২) সরেজমিন দেখা যায়, উপজেলার ঈশ্বরদী, লালপুর, বিলমাড়িয়া ও দুড়দুড়িয়া ইউনিয়নের ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা নদীর উত্তর তীর প্রবাহিত। তীরবর্তী চরজাজিরা, রামকৃষ্ণপুর, বাকনাই, মোহরকয়া ও নওসারা-সুলতানপুর এলাকায় পদ্মা নদী থেকে এস্কেবেটর (ভেকু) মেশিন দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। প্রশাসনকে এ বিষয়ে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেডের বালু উত্তোলনে নির্ধারিত স্থানের ব্যানার ঝুলিয়ে প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক জোন এলাকার পাশে পানি শূন্য পদ্মা থেকে ভেকু দিয়ে ভরাট বালু উত্তোলন করতে দেখা গেছে। বালু-ভরাট ভর্তি ও খালি ট্রাক ফসলি জমির পাশ দিয়ে ও গ্রামের মধ্যের রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে দেখা গেছে। এতে গ্রামের রাস্তা ভেঙে যাচ্ছে। নিয়ন্ত্রণহীন এসব ট্রাক চলাচল করায় অনেকেই সড়ক দুর্ঘটনায় পড়ছে। ছোট শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সের মানুষ আতংকের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা চলাচলের সময় বালুর ট্রাকে যে কোন সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনায় পড়তে পারে বলে জানান স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের দাবি, প্রতি রাতে ১০ চাকার ট্রাকে বড়াইগ্রামে নির্মাণাধীন বনপাড়া পল্লী বিদ্যুতের ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ১৫০ থেকে ২০০ গাড়ি বালু। উপজেলা পরিষদের সামনে দিয়ে প্রায় সারা রাত বিকট শব্দ করে বালুবাহী ট্রাক চলাচল করে। বালু বোঝাই গাড়ি চলাচলে উপজেলার প্রায় ৩০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এছাড়াও ইটভাটা, সরকারি বিভিন্ন নির্মাণ কাজ ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে নির্মাণ কাজে এই বালু ব্যবহার করা হচ্ছে। ট্রাক, টলি, পাওয়ারটিলারসহ নানা রকম যানবাহনে বালু পরিবহন হচ্ছে।
গোপালপুর বাজারের আলিফ ডেকরেটরের মালিক আমিনুল ইসলাম বলেন, লালপুর উপজেলা পরিষদ মোড় এলাকায় বালু ভর্তি বড় ট্রাকের চাকার নিচে পৃষ্ঠ হয়ে তার হাত জখম হয়ে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, লালপুর সিনেমা হল মোড় থেকে মাত্র তিন-চার কিলোমিটার দক্ষিণে প্রস্তাবিত নাটোর অর্থনৈতিক জোন এলাকা। এরপাশে পানিশূন্য পদ্মা নদী থেকে এস্কেবেটর দিয়ে বালু উত্তোলন হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন গৃহিণী বলেন, রান্না ও খাওয়ার সময় বাতাসে উড়ে এসে ট্রাকের বালু পড়ে। এছাড়া বাড়িঘরে বালু এসে নোংরা করে দেয়। শিশুদের নিয়ে আতংকের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
বিলমাড়িয়া ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডের সদস্য মহারাজপুর গ্রামের রবিউল ইসলাম বলেন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে একটি সেতুসহ বাড়িঘর হুমকির মুখে পড়েছে।  
স্থানীয়দের অভিযোগ, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে ভূমিদস্যু ও বালু ব্যাবসায়ীরা। অথচ হুমকির মধ্যে পড়ছে পদ্মা নদী, স্থানীয় রাস্তা-ঘাট, বাড়িঘরসহ অধিবাসীরা। এছাড়া বালু উত্তোলনের ফলে অর্থনৈতিক জোন এলাকার জমি, লালপুর কলনীতে প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্ধশতাধিক বাড়ি, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, লালপুর থানা, লালপুর সদর বাজার, নদী রক্ষা বাঁধসহ প্রায় ৩০টি গ্রামের নদী গর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে নদীতে পানি প্রবাহিত হলে নদীর ভাঙ্গনের কবলে পড়ার ওই সব স্থাপনা সহ গ্রাম গুলো নদীর ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশংকা করছেন স্থানীয়রা। এমতাবস্থায় দীর্ঘ মেয়াদি ক্ষতি রোধে বালু উত্তোলন বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান তারা।
এ বিষয়ে বালু ব্যবসায়ী আব্দুল্লাহ আল মামুন দাবি করেন, বালু উত্তোলনে প্রশাসনের অনুমতি আছে। সার্ভেয়ার গিয়ে নকশা অনুযায়ী জায়গায় নির্ধারিত করে দিয়েছে।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাম্মী আক্তার বলেন, কাউকে নদী থেকে বালু উত্তোলনের অনুমতি ও জায়গা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি। ইতিমধ্যে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করায় কয়েকটি ভ্রাম্যমাণ আদালতে জরিমানা করা হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামীমা সুলতানা বলেন, পদ্মার দুটি বালু মহালের একটিকে উত্তোলন অযোগ্য ঘোষনা করা হয়েছে। অপরটি মামলার কারণে ইজারা বন্ধ রয়েছে। তবে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top