logo
news image

একটি আলোকিত গ্রাম

ইমাম হাসান মুক্তি, লালপুর (নাটোর) প্রতিনিধি
প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই ভারতে চাষকৃত নীল রোম-ইউরোপে রপ্তানি করা হতো। লর্ড কর্ণ ওয়ালিস ১৭৯৩ সালের ২২ মার্চ চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ঘোষনা করায় জমিদারি প্রতিষ্ঠিত হয়।  ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী লাভজনক পণ্যের তালিকায় নীল চাষ শুরু করে। ১৮৭১ বাংলাদেশে মেদিনীপুর জমিদার (এম জেড কোম্পানী) পদ্মা নদীর তীরবর্তী লালপুর ও বিলমাড়িয়ায় নীলকুঠি স্থাপন করে নীল চাষে বাধ্য করতে প্রজাদের ওপর জুলুম-নির্যাতন শুরু করে।
১৮৬০ সালের নীলকর আইন পাশ হলেও এ অত্যাচার অব্যহত থাকে। তাদের অত্যাচারের ধরণ ছিল- রেকাব দল, শ্যামচাঁদ, বেগারের জন্য জুলুম, রাস্তামেরামত, পুকুর কাটা, ফসল কাটা ও কুঠিজাত করা বেগার, জমি পাশ, ঢিলি পাশ, যৌতুক আদায়, গুদীমারা, ফল-মৎস্যের আদায়, শিক্ষার ব্যবস্থা ধ্বংস, অদ্ভুত চেক ব্যবস্থা, স্বেচ্ছাচারী বিচার ইত্যাদি।
নীল কুঠি স্থাপনের ফলে বিলমাড়িয়াতে দুটি ফুটবল মাঠে প্রতিযোগিতার আয়োজন, গান ঘরে ১৫ দিন ধরে বৈশাখী মেলা ও যাত্রাপালা, অগ্রহায়ণে সপ্তাহ জুড়ে পালাগান, নিয়মিত লাঠি খেলার আয়োজন হতো। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর ইংরেজরা এই কুঠি ত্যাগ করেন।
নাটোরের লালপুরের বিলমাড়িয়ার মোহরকয়া গ্রামে গড়ে তোলা হয় নীলকুঠির মূল স্থাপনা। সেই ধারাবাহিকতায় শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আদর্শ গ্রাম মোহরকয়ায় গড়ে ওঠে অসংখ্যা প্রতিষ্ঠান।
মোহরকয়া গ্রামের ২৩টি পাড়ার লোক সংখ্যা ১১ হাজার ৮১০ জন (পুরুষ-৬ হাজার ৭১ জন ও নারী ৫ হাজার ৭৩৯ জন)। এই গ্রামে বিলমাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স ভবন অবস্থিত। গ্রামের পাড়াগুলো হলো- মোহরকয়া পশ্চিমপাড়া, মন্ডলপাড়া, হাটপাড়া, মধ্যপাড়া, সরদারপাড়া, খাঁপাড়া, হিন্দুপাড়া, নতুনপাড়া, কয়লারডহরপাড়া, আদর্শগ্রামপাড়া, পূর্বপাড়া, ভাঙ্গাপাড়া, হাইস্কুলপাড়া, গুচ্ছগ্রামপাড়া, হাউজপাড়া, মিয়াপাড়া, হাজিপাড়া, মধ্যপাড়া-২, পিয়াদাপাড়া, গোরস্থানপাড়া, মেম্বারপাড়া, কলেজপাড়া ও পশ্চিমপাড়া-২।
এই গ্রামে ১৯২৯ সালে মোহরকয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে বাথানবাড়ি ও পশ্চিমপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়, বিলমাড়িয়া উচ্চ বিদ্যালয়, মোহরকয়া ডিগ্রি পাশ ও অনার্স কলেজ, মোহরকয়া উচ্চ বিদ্যালয়, মোহরকয়া নতুনপাড়া ভোকেশনাল ইন্সটিটিউট এবং উপজেলার একমাত্র ছায়া প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়া মোহরকয়া দাখিল মাদ্রাসা, বিলমাড়িয়া দাখিল মাদ্রাসা, মোহরকয়া আজিজিয়া দারুল উলুম কওমী মাদ্রাসা, দারুল আমান হাফিজিয়া মাদ্রাসা, মোহরকয়া হযরত হালিমাতুস সাদিয়া (রা.) বালিকা মাদ্রাসা এই গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
মোহরকয়া গ্রামে ১৮৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় পূর্বপাড়া জামে মসজিদ। এছাড়া কেন্দ্রীয়, পশ্চিমপাড়া, মধ্যপাড়া, খাঁপাড়া, নতুনপাড়া, বাইতুল মামুর, ডিগ্রি কলেজ, কয়লারডহর জান্নাতুল মাওয়া, বাইতুল মোকাররম, পশ্চিমপাড়া জান্নাতুল মাওয়া এবং দারুল কারার হযরত আয়েশা (রা.) মহিলা জামে মসজিদ রয়েছে। মোহরকয়া হিন্দুপাড়া কালি মন্দির রয়েছে।
মোহরকয়া কেন্দ্রীয় ঈদগাহ, মধ্যপাড়া, খাঁপাড়া, পূর্বপাড়া, কয়লারডহর, পশ্চিমপাড়া, জান্নাতুল ফেরদাউস ঈদগাহ ময়দানে পবিত্র ঈদের জামাত হয়ে থাকে।
সামাজিক প্রতিষ্ঠান মোহরকয়া তরুণ সংঘ, মোহরকয়া পাবলিক লাইব্রেরি, মোহরকয়া-মোমিনপুর পাবলিক লাইব্রেরি, দারুল খুলদ পাবলিক লাইব্রেরি, মোহরকয়া ফোকলোর চর্চা কেন্দ্র ও মোহরকয়া ভিলেজ ফাউন্ডেশন মানব উন্নয়নে কাজ করছে। স্বাস্থ্যসেবায় মোহরকয়া কমিউনিটি ক্লিনিক মানুষের সেবা দিচ্ছে। পপুলার লাইফ ইন্সুরেন্স, প্রত্যাশা বহুমুখী সমবায় সমিতি ও যুব উন্নয়ন সমিতি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
এই গ্রামের ৯০ ভাগ মানুষ কৃষিজীবী। প্রায় ৯৫ ভাগ শিক্ষিত। পুলিশ, সেনাবাহিনী, চিকিৎসা, প্রকৌশলী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উচ্চ পদে অনেক গুনীজন রয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন অনেক।
মোহরকয়া ভিলেজ ফাউন্ডেশন ও ফোকলোর চর্চা কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক অধ্যক্ষ ড. মো. ইসমত হোসেন বলেন, এই গ্রামের যাত্রাপালা দল, মাদারের গান, শব্দপালা দল, লাঠিখেলা দল, ঢুলিদল আমাদের লোকসাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। ভিলেজ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে স্বেচ্ছায় রাস্তা নির্মাণ, রাস্তার মোড়ে পাবলিক টয়লেট, টিউবওয়েল, যাত্রী ছাউনী ও করোনাকালীল সময়ে অক্সিজেন সিলিন্ডারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এই গ্রামের ১০ কিলো মিটার রাস্তায় ১০ হাজার গাছ লাগিয়ে সামাজিক বনায়ন করা হয়েছে। বনায়নের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৬ সালে জাতীয় পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক বনায়নে মোহরকয়া গোরস্থান দ্বিতীয় এবং মোহরকয়া গ্রাম বনায়নে তৃতীয় হয়ে প্রধানমন্ত্রী পুরস্কার লাভ করে।
এই গ্রামের প্রধান অর্থকরী ফসল আখ। আখের গুড়, খেজুরের গুড়, খয়ের তৈরি এই গ্রামের প্রাচীন ঐতিহ্য। কামার ও জেলে পেশায় রয়েছেন অনেকে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষনা ‘প্রতিটি গ্রাম হবে শহর’ শ্লোগান বাস্তবায়নে এই গ্রামের প্রতিটি মানুষ নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। একদিন মোহরকয়া গ্রামে হবে দেশের একটি অনন্য মডেল।

সাম্প্রতিক মন্তব্য