logo
news image

পানিবন্দী শিক্ষালয়ে দুশ্চিন্তার ভাঁজ কপালে

-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।
শহরের বা উঁচু এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার প্রথম দিনে বসন্তের আমেজ বইছে। বাচ্চারা মাঠে নেমে লাফালাফি করছে, খেলছে, গল্প করছে। ওদের দীর্ঘদিনের সরারসরি বলার মত আলপন জমে ছিল প্রিয় সাথীদের জন্য। শিক্ষার্থীদের এই আনন্দ করার বিষয়টি খুব ভাল লাগছে। গণমাধ্যমে সেগুলোর ছবি খুব দ্রুত প্রচারের ব্যবস্থাও হয়ে যাচ্ছে।
বিপাকে পড়েছে বন্যাকবলিত নদীপড়ের বা গ্রামাঞ্চলের শিক্ষালয়ের শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী ও অবিভাবকর্।া তাদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ স্পষ্ট। সেপ্টেম্বর ১২ তারিখে প্রতিষ্ঠান খোলার দিনে একটি পত্রিকায় প্রধান শিরোনাম হয়েছে এক উপজেলার কলেজ মাঠে থে থৈ পানি। বড় বিল্ডিং-এর নিচতলার প্রতিটি কক্ষে পানি। পাশের টিনের তেরী ঘরের সব শ্রেণিকক্ষে হাটু সমান পানি। চেয়ার, চেবিল বেঞ্চ সবকিছুই পানিতে ভাসমান। টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের পৌর এলাকাসহ ৮টি ইউনিয়নের মানুষ পানিবন্দী। স্বভাবতই: সেখানকার ১০৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রথমদিনে খোলেনি। রাস্তা-ঘাটে পানি থাকায় যোগাযোগ বন্ধ (দৈনিক ইত্তেফাক ১২.০৯.২০২১)।
উজানের নদীগুলো দিয়ে দিন দিন পানি নামতে থাকায় এসব প্রতিষ্ঠান খোলা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলায় দু’দিন আগে নদী তীরবর্তী সকল প্রতিষ্ঠানের ভেতর বন্যার পানি জমে ছিল। স্কুলের মাঠে কোমর সমান পানি। কিছু শিশু কলাগাছের তৈরী ভেলায় চড়ে স্কুলের মাঠে গিয়ে নিজের প্রিয় স্কুল ঘরের দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভাবছিল পানিতে বসার বেঞ্চ পচে নষ্ট হয়ে যাবে না-তো?  সেদিন সংবাদে বলা হয়েছিল. সেসব জেলায় ১৫৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পানির নিচে। গেল সপ্তাহে দেশের প্রায় ৪০টি জেলায় বন্যার পানি ঢুকেছে। বন্যার পানি উজানের বা উত্তরের বাড়িঘর- শিক্ষালয়, আবাদ, লন্ডভন্ড করে এখন দক্ষিণের পানে ধেয়ে চলছে। নদীভাঙ্গন এখনও উজানে থামেনি। তার পূর্বেই ভাটিতে ভাসাচ্ছে বন্যা ও ভাঙ্গছে নদীপাড়।
তার উপর ঘন ঘন বৃষ্টি হচ্ছে। বড় বড় নদীর উচ্চতা বেড়েছে। প্রবল স্রোতের কারণে নদীতে ঘূর্ণিপাক হওয়ায় নদী পারাপার করে এক তীরের শিক্ষার্থী বাচ্চারা অপর তীরের শিক্ষালয়ে যেতে ভয় পাচ্ছে। কোথাও কোথাও বাশেঁর সাকো ও কালভার্ট ধ্বসে গিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
এখন দক্ষিণের বরিশালেরর হিজলা, মেন্দেীগঞ্জ, আমতলী প্রভৃতি এলাকায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দী। চার উপজেলার অর্ধশত বসতবাড়ি পানির নিচে। রোপা আমন ধান বীজতলাসহ শাক-সব্জি পচে গেছে। পনির নিচে থাকা গ্রামের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ।
মজার ব্যাপার হলো শহরের শিক্ষালয় নিয়ে উচ্ছাস প্রকাশ করা হলেও গণমাধ্যমে গ্রামের বন্যা কবলিত বিপর্যস্ত শিক্ষালয়ের করুণ দশা খুব সামান্যই প্রচারিত হচ্ছে। নদীভাঙ্গনে দিশেহারা বাঁধে বা রাস্তায় আশ্রয় নেয়া মানুষগুলো এখনও নিজ ডেরায় ফিরতে পারেনি। কারণ ওদের চরম দুর্ভাগ্য হলো- অনেকের বসতভিট এখন মাঝ নদীতে অথৈ দরিয়ার মধ্যে নিপতিত হয়ে গেছে। তারা ফিরবে কোথায়? তাদের পোষ্যরা বিপর্যস্ত, সর্বশান্ত। ওরা পোশাক, পুস্তক কিছুই সংগে আনেনি। তারা শিক্ষালয়ে যাবে কীভাবে?
প্রায় দু’বছর শিক্ষাবিচ্ছিন্ন থাকার সাথে সাথে অনেকে বিদ্যালয়ে যাবার কথা ভুলে গেছে। অনেকে ইতোমধ্যে কর্মজীবি শিশুদের খাতায় নাম লিখিয়েছে। পুরনো ঢাকার একটি অবৈধ নকল জুস তৈরীর কারখানায় কর্মরত ৮০ জন শিশু ও একটি পোষাক তৈরীর কারখানায় অসংখ্য শিশুকে সেদিন একটি টিভি চ্যানেলে দেখানো হলো। তারা নদীভাঙ্গনের শিকার হয়ে পেটের দায়ে গ্রাম থেকে সেখানে এসে কাজ নিয়েছে। শিশুদের এসব কাজ করা অবৈধ কি-না তা তারা মোটেও জানে না। আর জানলেই বা কী হবে? তাদের ক্ষুধার অন্ন কে দেবে? এমন আক্ষেপ ও ক্ষোভ শোনা গেল কারো কারো মুখে। এসব কর্মজীবি শিশুরা কি আর ফিরতে পারবে নিজ নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে?
করোনা, বন্যা ও ডেঙ্গির কারণে কত সংখ্যাক শিক্ষার্থীর আর কখনও শিক্ষালয়ে যাওয়া হয়ে উঠবে না তা আর কিছুদিন পর মেগা জরিপ করা জরুরী হয়ে পড়েছে।
পাশাপাশি কিন্ডারগার্টেন, বেসরকারী রেজিস্টার্ড বিদ্যালয়, মক্তব, হাফেজখানা, এতিমখানা, মাদ্রাসা ইত্যাদি থেকে শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ার সাথে সাথে শিক্ষকগণও বিদায় নিয়েছেন। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগণ জীবনের প্রয়োজনে, সংসারের দায়ে পেশা বদল করে ভিন্ শহরে চলে গেছেন পরিবার ছেড়ে। জীবন-জীবিকার তাগিদে এই ধরণের মাইগ্রেশন দেশের গণশিক্ষা ব্যবস্থাকে ভারসাম্যহীন করতে খুব ক্ষতিকারক বলে চিহ্নিত করতে হবে। গ্রামের একজন অভিজ্ঞ শিক্ষক পেটের দায়ে পেশা বদল করে অন্যত্র চলে গেলে আমাদের গ্রামের আধুনিকায়ন করার নীতি কাগুজে বাঘ হিসেবে পড়ে থাকবে। গ্রামের সেই অজ্ঞানতার অন্ধকারের কালিমা ঘুঁচাবে কে, কীভাবে?
করোনা অতিমারী ও বর্তমান বন্যায় নতুন করে সৃষ্ট লক্ষ লক্ষ কর্মজীবি শিশুদের কথা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। এটা নিয়ে বিষোদগারের ব্রিফিং দিয়ে অযথা সময় নষ্ট করলে আমাদের শিক্ষার হার নিম্নমূখী হয়ে পড়বে। সেটা সামাল দেয়া কঠিন হতে পারে।
আরেকটি জরুরী বিষয় হলো- খুলে দেয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হঠাৎ করে শিশু মনস্তত্ত্ব উপেক্ষা করে পড়ার বোঝা চাপিয়ে দেয়া যাবে না। বাবা-মা বেশী পড়ার জন্য চাপ দিবে শিশুদের। অপরদিকে শিক্ষকরা অল্প সময়ে বেশী শেখাতে চাইবেন। এজন্য হয়তো প্রাইভেট টিউশনি আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে, বেশী করে জ্ঞান গিলিয়ে এতদিনের পড়ার ক্ষতি পুষিয়ে নেবার নাম করে। এ বিষয়টিতে শিক্ষক, অবিভাবক ও সরকারী নীতি-নির্ধারকগণকে বেশী সতর্ক থাকতে হবে।
আরো একটি জরুরী বিষয় হলো- করোনা ও ডেঙ্গি আবার বেড়ে গেলে পুনরায় শিক্ষালয় বন্ধ করে দেয়া হবে বলে ঘোষণঅ দেয়া হয়েছে। এই ভীতিতে মিশুদেরকে বোঝা বোঝা হোমওয়ার্কের লোড যেন দেয়া না হয়। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্কতার সাথে বাচ্চাদের ভার বইবার ক্ষমতা ও সহনশীলতা মেনে এগুতে হবে।
যে প্রসঙ্গ দিয়ে শুরু করেছিলাম- বন্যা ও নদীভাঙ্গনের কারণে শিক্ষালয় খোলা ও বন্ধ রাখা বা থাকা নিয়ে গ্রাম ও শহরের মধ্যে যেন ব্যাপক বৈষম্য সৃষ্টি না হয় সেদিকে নজর রাখতে হবে। এমনিতেই বন্যায় পানিবন্দি শিক্ষালয়ে শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী ও অবিভাবকরা সংকটে দিনাতিপাত করছেন। তাদের কপালের দুশ্চিন্তার ভাঁজ যেন মনের মধ্যে বৈষম্য ও বঞ্চনার গভীর ক্ষত সৃষ্টি না করে সেজন্য বিকল্প উপায়ে তাদেরকে এসব ক্ষয়-ক্ষতির সাথে উপযোজন লাভ (এডাপ্টেশন) করার উৎসাহ ও প্রণোদনামূলক আর্থ-সামাজিক কর্মসূচি খুব দ্রুত হাত নিয়ে নৈতিকতার সাথে বাস্তবায়ন করা জরুরী।

* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান। E-mail: fakrul@ru.ac.bd

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top