logo
news image

হাফিজ-নাজনীন ফাউন্ডেশন বৃত্তিপ্রাপ্তদের অনুভূতি

ইমাম হাসান মুক্তি, প্রতিনিধি, লালপুর (নাটোর)
আকাশে ছিলো রোদ-বৃষ্টির খেলা। তার মাঝেই অন্যরকম একটা দিন ছিলো, শোকের মাসের শেষ শুক্রবার।
নাটোরের লালপুরের মুরদহ গ্রামে শোকের মাসের শেষ শুক্রবারেই সেখানে বিনম্র শ্রদ্ধায় ভিন্নরকম আয়োজনে পালন করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদত বার্ষিকী। অসচ্ছল, দরিদ্র ও অদম্য মেধাবী শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয় বৃত্তির টাকা ও ক্রেষ্ট। তাই তারা সমবেত হয়েছিলেন এক ছাদের নিচে।
বৃত্তির টাকা পেয়ে যেন আকাশের চাঁদ হাতে পাবার মত অনুভূতি ছিল লালপুরের শোভ গ্রামের রাবেয়া সুলতানা শম্পার (২১)। বাবা শহিদুল ইসলাম পেশায় রাজমিস্ত্রী। শম্পা পড়েন রংপুর ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি ইনস্টিটিউটে প্যারামেডিক্স ডিপ্লোমা কোর্সে। তিনি বলেন, জাতীয় শোক দিবস ঘিরে অনেক সংগঠন হরেক রকমের আয়োজন করে। দিন শেষে সবাই সেটা ভুলেও যায়। আমাদের মতো শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে এমন ভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে শোক দিবসে বঙ্গবন্ধুকে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করা-সত্যিই অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
মেয়ের বৃত্তির অর্থ হাতে পেয়ে আবেগে বাকরুদ্ধ ছিলেন দরিদ্র ও অসহায় বাবা শহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, শোক দিবস উপলক্ষে হাফিজ নাজনিন ফাউন্ডেশন যেভাবে আমার সন্তানের শিক্ষার ক্ষেত্রে পাশে দাঁড়িয়েছে তা সত্যিই মনে রাখার মতো।
বাগাতিপাড়া দয়ারামপুর গ্রামের পল্লী চিকিৎসক আনন্দ কুমার দাসের ছেলে রাহুল কুমার দাস (২১) পাবনা মেডিকেল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে লেখাপড়ার সময় হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি, কত অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে বাবা-মা আমাদের লেখাপড়ার খরচ চালাচ্ছিলেন। হাফিজ নাজনীন ফাউন্ডেশন পাশে ছিল বলে আজ আমরা স্বস্তির সাথে উচ্চ শিক্ষা নিতে পারছি। সবচাইতে বড় কথা আমাদের মত মেধাবী এবং অসহায় শিক্ষার্থীদের পাশে থেকে কেবল উচ্চ শিক্ষাই নয়, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং চেতনার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে হাফিজ নাজনিন ফাউন্ডেশন।
নাটোরের লালপুরের নিভৃতপল্লি মুরদহ গ্রাম যেন একখন্ড বঙ্গবন্ধু হাতছানি দিচ্ছেন। গ্রামের ঘরের দেয়ালে দেয়ালে ফুটিয়ে তোলা হয় বঙ্গবন্ধুর অমর সব কর্মযজ্ঞ। সন্ধ্যার আলোয় ফুটে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস।
শুক্রবার (২৭ আগস্ট ২০২১) বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের আত্মার শান্তি কামনায় ‘মৃত্যুঞ্জয়ী মুজিব এবং সংগ্রামী আদর্শিক নেতা’ শীর্ষক আলোচনা সভা, মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান ও মিলাদ-মাহফিলের আয়োজন করে হাফিজ-নাজনিন ফাউন্ডেশন। অনুষ্ঠানে ৩০ জন মেধাবী শিক্ষার্থীকে ৫ হাজার টাকা, সনদপত্র ও ক্রেষ্ট প্রদান করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চুয়ালি যোগদান করেন, সাবেক সচিব, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘরের সদস্য সচিব ও কিউরেটর মো. নজরুল ইসলাম খান। ফাউন্ডেশনের সহসভাপতি আলহাজ্ব মো. আনিছুর রহমানের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন, রংপুর রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি শাহ মিজান শাফিউর রহমান, ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা মো. হাবিবুর রহমান প্রমুখ।
ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা যায়, আপন পাঁচ ভাই মিলে পিতা-মাতার নামে ‘হাফিজ-নাজনিন ফাউন্ডেশন’ ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন রংপুর রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি শাহ মিজান শাফিউর রহমান। শুধু বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি নয়, মুরদহ গ্রামের উন্নয়নে প্রতিষ্ঠানটি রাখছে ব্যাপক অবদান।
জনকল্যাণমুখী এই প্রতিষ্ঠানটি উপজেলায় কুয়েতি ট্রাস্টের সহায়তায় নির্মাণ করেছে ২১টি মসজিদ। মোট ১০০ টি মসজিদ নির্মিত হবে। ৩০০টি গ্রামের মানুষদের সুপেয় পানির জন্য স্থাপন করেছে ৬ শতাধিক নলকূপ। পর্যায়ক্রমে ৩ হাজার নলকূপ স্থাপন করবে। এ ছাড়া দোতলা মাদরাসা, স্কুল সংস্কার এবং বিদ্যালয়ে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন করেছে এই ফাউন্ডেশন। গ্রামের মানুষদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে এই ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
হাফিজ-নাজনিন ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে মুরদহ গ্রামে ১০টি সেলাই মেশিন বসিয়ে আউটলেট তৈরি করা হয়েছে। শীঘ্রই আরো ১৫টি সেলাই মেশিন বসানো হবে। উৎপাদিত কাপড় বিদেশে রপ্তানি হবে। মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য এই ফাউন্ডেশন নানা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে। প্রতি বছর গ্রামের অতি দরিদ্র ও অনগ্রসর ৩০ জন শিক্ষার্থীকে প্রয়োজনীয় আর্থিক ও সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে আসছে। এলাকার রাস্তাঘাটের উন্নয়নসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে ফাউন্ডেশনটি।
২০২১ সালে স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে সুবর্ণজয়ন্তী তাঁর প্রতিষ্ঠিত অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ‘হাফিজ-নাজনিন ফাউন্ডেশন’ ব্যাপক প্রচারণার উদ্যোগ নেয়। লালপুরের মুরদহ গ্রামে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার ছবিসহ ইতিহাস তুলে ধরেন। প্রত্যন্ত গ্রামটিতে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ, চর্চা, সাহসীকতা ও শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরা হয় আলোকচিত্রের মাধ্যমে।
মুরদহ গ্রামের ঘরের দেয়ালে দেয়ালে ফুটিয়ে তোলা হয় বঙ্গবন্ধুর অমর সব কর্মযজ্ঞ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের নানান ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত বিবরণী। আর এসব অমর কাহিনী দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন লোকজন। সন্ধ্যার পর লাইটের আলোয় ফুটে ওঠা এসব ছবিতে চোখ বুলিয়ে দর্শনার্থীরা জেনে নেন মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস। হাফিজ-নাজনিন ফাউন্ডেশনের এমন উদ্যোগ সবখানে প্রশংসা কুড়ায়।
করোনাকালীন সময়ে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা ব্যয়ে ১০টি অক্সিজেন সিলিন্ডার প্রদান করে মানব সেবায় অবদান রাখে ফাউন্ডেশন।
রংপুর রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি শাহ মিজান শাফিউর রহমান বলেন, সততা, নিষ্ঠা আর স্বদেশ প্রেমে উজ্জীবিত হয়ে দেশের জন্যে আমাদের যে অনেক কিছু করার আছে। আমাদের কাজে কর্মে প্রেরণা ও দেশের জন্য অবদান রাখতে হবে।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top