logo
news image

আর শোনা যাবে না রেজাউলের কণ্ঠে মানবেন্দ্র

ইমাম হাসান মুক্তি, লালপুর (নাটোর।
আজকের পত্রিকার ফেসবুক ও ইউটিউব পেজে সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া রেজাউল করিমের (৫৪) কণ্ঠে আর শোনা যাবে না মানবেন্দ্র। চরম দারিদ্র কখনো তাঁর কণ্ঠ রুদ্ধ করতে না পারলেও অভিমান তা থামিয়ে দিল। গত শনিবার সেই কণ্ঠ থেমে গেল চিরতরে।
শনিবার (১৪ আগস্ট ২০২১) বেলা ৩টার দিকে নাটোরের লালপুরের কৃষ্ণরামপুর গ্রামের একটি বাগানের আম গাছে ঝুলন্ত অবস্থায় তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
রোববার বেলা তিনটার দিকে মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে বাড়িতে পৌঁছে। বাদ আসর (বিকেল সাড়ে ৫টা) দীঘা কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়।
নিহত রেজাউল করিমের বাড়ি রাজশাহীর বাঘা উপজেলার দিঘা গ্রামে। বাবা বাদল প্রামনিক ও মা বেগম বেওয়া। স্ত্রী ছাফিয়া বেগম। তাঁদের সন্তান সাগর আহমেদ ও রুখসানা খাতুন।
তাঁকে নিয়ে গত রোববার (৮ আগস্ট) ‘আজকের পত্রিকা’র শেষ পাতায় ‘কণ্ঠে মানবেন্দ্র, জীবন মানবেতর’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। দেশের মানুষের কাছে তিনি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একজন সংগীত শিল্পী। তাঁর কণ্ঠে নজরুলের গান, আধুনিক গান বাঙ্ময় হয়ে উঠত।
দিঘা গ্রামের বাদক দলনেতা রমেন চন্দ্র দাস বলেন, শুক্রবার (১৩ আগস্ট) দুপুরে লালপুর উপজেলার হাসেমপুর গ্রামে গুরুপদ’র ছেলে বিফল পদ’র বিয়েতে বাদ্যযন্ত্র ও গানের দল নিয়ে যান। তিনিসহ দলে ছিলেন, দিঘা গ্রামের রেজাউল করিম, রতন চন্দ্র দাস, বৈদ্যনাথ দাস, সুলতানপুর গ্রামের মহেন্ত ও কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের ওমরপুর গ্রামের সঞ্জয়।
সন্ধ্যায় তাঁরা পৌঁছেন কনে কৃষ্ণরামপুর গ্রামের নিখিল কুমার সরকারের মেয়ে চৈতালী রানী সরকারের বাড়িতে। শনিবার দুপুর সাড়ে ১২ টার দিকে বাসি বিয়ের অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার এক পর্যায়ে তিনি ঘামতে থাকেন। হাত-মুখ ধুয়ে ধুয়ে আরো দুটি গান করেন। তারপর শরীর খারাপ লাগার কথা বললে তিনি পাশের একটি ঘরে ফ্যানের নিচে শুইয়ে দিয়ে আসেন। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে খাবার সময় তাঁকে (রেজাউল) খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বেলা ৩ টার দিকে বিয়ে বাড়ির পেছনের আমবাগানে একটি আমগাছের ডালের সাথে ঝুলানো অবস্থায় তাঁর মরদেহ দেখতে পাওয়া যায়। কাঁচা পাটের দড়িতে ঝুলানো মরদেহ দেখতে পেয়ে স্থানীয় লোকজন পুলিশে খবর দেয়। তিনি আরো বলেন, তিনি কোলে-পিছে করে মানুষ করেছেন। এভাবে চলে যাওয়ায় অভিভাব হারা হলেন।
বাদক দলের সদস্য রতন চন্দ্র দাস বলেন, রেজাউল করিমের গাওয়া জীবনের শেষ গান ছিল:
'একটা চিঠি দিলাম লিখে
মনের কথায় আজ তোমাকে
দেখো যেন কেউ দ্যাখে না .....
এ চিঠি আর তো পাবে না কখনো'।
রেজাউল সকালে মাঠের ঘাস কাটেন। একটু বেলা হলেই নিজের রিকশাভ্যান নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। মেঠো পথে ভ্যান চালানোর সময় গলা ছেড়ে গান শোনান, মানবেন্দ্রর গান-‘কেন কাঁদে পরান কী বেদনায় কারে কহি’। সবাই মুগ্ধ হয়ে গান শোনেন। নীরবে চোখের জল ফেলেন।
সম্পদ বলতে শুধু বাড়ির ভিটে আর গানের গলা। দারিদ্র্য তাঁকে লেখাপড়া শিখতে দেয়নি। যা শিখেছেন নিজের চেষ্টায়। ১৩ বছর বয়সে তিনি সংসারের হাল ধরেন। বাবা মৃত বাদল প্রামানিক গ্রামে যাত্রাপালা করতেন। সেই সুবাদে তিনিও একআনির (শিশুশিল্পী) চরিত্রে অভিনয় করতেন। গলা মিলিয়ে যাত্রাপালার গান ধরতেন। বাবার মৃত্যুর পর সেই গাওয়ার নেশাটাকে পেশা করে পরিবারকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ছোটবেলায় যেসব যাত্রাপালায় গানের সুযোগ পেতেন না, সেখানে যন্ত্র সংগত-হারমোনিয়াম।
কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ বেতার রাজশাহী কেন্দ্রে নজরুলসংগীতের শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। টেলিভিশনসহ বড় বড় মঞ্চে নজরুলসংগীত গেয়ে প্রশংসায় ভেসেছেন।
তাঁর স্ত্রী ছাফিয়া বেগম বলেন, অভাবের সংসার, নুন আনতে পান্তা ফুরায়। স্বপ্ন দেখেতেন স্বামী একদিন বড় গায়ক হয়ে নাম কুড়াবেন। সারা দিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর সন্ধ্যায় যখন ঘরে ফেরেন ক্লান্ত পরিশ্রান্ত শরীর নিয়ে। তার পরও হারমোনিয়াম নিয়ে বসে পড়েন ঘরের কোণে। হারমোনিয়ামটাকে পরম যত্নে পরিষ্কার করতেন। মন চাইলে একটু গলাও সাধতেন। অনকে সময় হারমোনিয়ামে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়তেন।
মেয়ে রুখসানা খাতুন বলেন, তার বাবা বড়ই অভিমানী। একটুতেই রাগ করলেও তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হতো না। শনিবার সকালে ফোন করলেও তিনি ধরেননি। রমেন দা’কে দিয়ে ফোন ধরান। বাবার সাথে শেষ কথাও হলো না।
দিঘা বাজারের মেঘলা কফি হাউজের মালিক আব্দুল মান্নান বলেন, প্রতিদিন সকালে চা খেতে আসতেন রেজাউল। খুব ভাল মানুষ ছিলেন। শুনেছি, রাজশাহীতে শিমুল সরকার তাঁকে দিয়ে গান রেকর্ডিং ও ভিডিও শ্যুটিং করার কথা ছিল। তা আর হলো না।
আব্দুলপুর তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ পরিদর্শক হিরেন্দ্র নাথ বলেন, মরদেহ উদ্ধারের পর পেটের ওপর হালকা আঁচড় দেখা যায়। হয়তো গাছে উঠতে গিয়ে এটা হতে পারে। রোববার (১৫ আগস্ট) ভোরে মরদেহ ময়না তদন্তের জন্য নাটোর সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।
লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফজলুর রহমান বলেন, তিনি ও সহকারী পুলিশ সুপার (বড়াইগ্রাম সার্কেল) খায়রুল আলম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, তিনি আত্মহত্যা করেছেন। তারপরও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া সাপেক্ষে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, 'আমরা নিয়মিত সহযোগীতা করতাম চেয়ারম্যান শফিকের মাধ্যমে। সংসারে মোটামুটি স্বচ্ছলতা ফিরে এসেছিলো। কেন যেন গত পরশু রেডিও বড়ালকে বলেছিলাম খোঁজ নিতে! তারা জানালো তিনি দীঘার বাসায় নেই লালপুর গেছেন গান করতে, ১৪ তারিখে ফিরবেন। আফসোসটা আমার থেকে যাবে।'

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top