logo
news image

শিক্ষার ফটক খোলা ও পরীক্ষা নেয়ার চ্যালেঞ্জ

-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।
করোনাকালে বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ খাত হলো শিক্ষা। অন্য সকল খাতে মানুষ দৌড়াদৌড়ি করে কিছুটা সামঞ্জস্য বিধান করে চলতে পারলেও শিক্ষা খাতের অবস্থা ভীষণ নাজুক। আমাদের দেশে গত ২১ মাস যাবত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দরজা বন্ধ। এমতাবস্থায় ইন্টারনেটভিত্তিক অনলাইন বিদ্যাশিক্ষা চালু করা হলেও সব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সেসব শিক্ষা বা ক্লাসের যথার্থ মূল্যায়ণ করা সম্ভব হচ্ছে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বৈশিষ্ট্যের ভিন্নতা, বিষয়ভিত্তিক ভিন্নতা, ফিল্ডওয়ার্ক, ল্যাবওয়ার্ক ইত্যাদিতে আলাদা নিয়মের কারণে একটি কমন মূল্যায়ণ সফট্ওয়্যারের ফ্রেমওয়ার্ক তৈরীর কাজটি গত ২১ মাসেও আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে গেছে। যার কারণে পরীক্ষা, ফলাফল, প্রমোশন সবকিছু ঝুলে আছে। স্কুলে অটো প্রমোশন দেয়া হলেও কলেজ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে তা দেয়া সম্ভব নয়।
শিক্ষা ব্যবস্থাপনার এই স্থবিরতা জাতিকে একটি অসাড় প্রক্রিয়ার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। করোনাকালে ঘরবন্দী স্কুলগামী শিশুরা অস্থির হয়ে অসামাজিক হয়ে পড়ছে। কলেজ, বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সবাই অনলাইন পাঠের সুযোগ না পাওয়ায় শহর ও গ্রামের মধ্যে একটি বিস্তর ফারাক সৃষ্টি হয়েছে। নিম্নআয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীরা কেউ শ্রম বিক্রি করছে, কেউ হতাশ হয়ে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। সম্প্রতি শহরের বিত্তশালী ঘরের একদল শিক্ষার্থীকে অনলাইনে দামী মাদকদ্রব্য ক্রয়-বিক্রয় ও সেবনের দায়ে প্রেপ্তারও করা হয়েছে। যারা ফাইন্যাল ইয়ারের শিক্ষার্থী ছিল তাদের সরকারী চাকুরী লাভের বয়সসীমা অতিক্রম হয়ে গেছে। ফলে এক ভয়ানক মানসিক অস্থিরতা তৈরী হয়েছে তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে।
আগষ্ট ১২, ২০২১ তারিখে শোনা গেল এসএসসি পরীক্ষা আগামী নভেম্বরের ১৫ তারিখে এবং এইচএসসি পরীক্ষা ডিসেম্বরে শুরু হবে। যদি করোনা পরিস্থিতি অনুকুলে থাকে তাহেলে! আবারো দোদুল্যমান সিদ্ধান্ত জাতিকে হতাশায় নিমজ্জিত করে তুলছে।
সরকারী ঘোষণায় দীর্ঘদিন ধরে বলা হচ্ছে, সকল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদেরকে দ্রুত টিকা প্রদান করে শীঘ্র নিজ নিজ বিদ্যালয়ে ফেরানো হবে। কিন্তু নানা জটিলতায় এখনও টিকা প্রদান করা খুব সীমিত পর্যায়ে রয়ে গেছে। শিক্ষার্থীদেরকে টিকা প্রদান নিশ্চিত না করে গ্রাম-গঞ্জে প্রয়োজনের তুলনায় যৎসামান্য টিকা নিয়ে কার্যক্রম শুরু করায় বিপত্তি শুরু হয়েছে। ৩০০ জনের টিকা সরবরাহ করা হলেও মানুষ হাজির হচ্ছে তিন হাজার বা তারও অধিক। ফলে টিকা কেন্দ্রে হাতাহাতির ঘটনা জাতিকে বিব্রত করছে। আগষ্ট ১২, ২০২১ তারিখে ঢাকার একটি টিকা প্রদান কেন্দ্রে টিকা প্রত্যাশীদের সাথে আইন শৃংখলা রক্ষাকারী কর্মীদের মারামারি হয়েছে। অপ্রতুল টিকা ও তা প্রদানে অব্যবস্থাপনার ফলে শিক্ষার্থীরা সময়মত টিকা দিয়ে শ্রেণিকক্ষে যেতে পারবে কি-না তা বোধগম্য নয়।
এদিকে অনেক শিক্ষার্থীর এনআইডি কার্ড তৈরী হয়নি। এনআইডি কার্ড ছাড়া টিকা প্রািিপ্তর জন্য আবেদন করা বা রেজিস্ট্রেশন করা যায় না। এনআইডি কার্ডবিহীন শিক্ষার্থীরা ও তাদের অবিভাবকগণ বেশ ঝামেলায় পড়ে গেছেন। আমরা তাঁদের এসব প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিতে হিমশিম খাচ্ছি প্রতিনিয়ত।
করোনার দোহাই দিয়ে ২০২০ সালেও সবকিছু খুলে দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছিল। ২০২১ সারের আগষ্ট মাসেও তা খোলা হয়নি। অথচ, বিভিন্ন দেশের স্কুল-কলেজে পড়ুয়াদের উপর পরিচালিত গবেষণা রিপোর্ট থেকে জানা যায়, কমবয়সীদের মধ্যে করোনা সংক্রমণের হার খুম সামান্য এবং মৃত্যুহার অতি নগন্য। বাংলাদেশেও করোনায় মৃতদের মধ্যে ৯০% এর বয়সের সীমা ৫০-৮০ বছরের মধ্যে। সুতরাং করোনার ভয়ে শিক্ষার্থীদেরকে এতদিন ঘরবন্দী করে রাখা যৌক্তিক ছিল না।
এনআইডি কার্ড না থাকলেও শিক্ষার্থীদেরকে স্টুডেন্ট আইডি দেখিয়ে তাদের সবার টিকা প্রদানের ব্যবস্থা করা উচিত। বয়স ১৮ না হবার কারণে স্কুল-কলেজে তো কারোই এনআইডি কার্ড না থাকার কথা। তাই ওদের জন্য শুধু স্টুডেন্ট আইডি দেখিয়ে টিকা প্রদানের নতুন ঘোষণা দেয়া উচিত।
এখন বড় সমস্যা হলো ডেঙ্গি। ডেঙ্গি ছোটদের বেশী হচ্ছে। তাই ডেঙ্গির কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা আরো দীর্ঘায়িত হতে পারে। সেক্ষেত্রে নভেম্বরের ১৫ তারিখে এসএসসি এবং ডিসেম্বরের এইচএসসি পরীক্ষা শুরু করা যাবে কি-না তাও এখুনি বলা যাবে না।
সেশন জ্যাম এখন বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে।  তাদের ও চাকুরীরর বয়সসীমা হারানোদের জন্য জন্য বিশেষ কারণ দেখিয়ে করোনাকালের উছিলায় বছর ‘মাফ’ নীতি ঘোষণা করা যেতে পারে।
বর্তমানে যে টিকা প্রদান করা হচ্ছে তার মেয়াদ কতদিন? আসলে কোন কোম্পানীর টিকার কার্যকারীতা কতদিন? এন্টিবডি আমাদের দেহে কতদিন কার্যকর থাকবে তার সময়সীমা ঘোষণা করা উচিত। এজন্য গবেষণা দ্রুত করা উচিত। তা না হলে নতুন করে সংক্রমণ এসে গণহারে প্রাণসংহার করতে পারে। সে  বিষয়টাও বেশী জরুরী। কারণ, দুই ডোজ টিকা নেবার পরও অনেকের পুনরায় করোনা সংক্রমণ হয়েছে। তাই জার্মানী সহ ইউরোপের অনেকে দেশ বুষ্টার ডোজ প্রদানের কথা ভাবছে। যদিও বিশ^স্বাস্থ্য সংস্থা এখনও তাতে অনুমতি দেয়নি।
শিক্ষার্থীদের ফলাফল মূল্যায়নের জন্য অনেকে এ্যাসাইনমেন্টের কথা জোর দিয়ে বললেও এই পদ্ধতির দুর্বলতা অনেক বেশী। এখন হাতে কেউ এসাইনমেন্ট লিখে না। কম্পিউটারে কম্পোজ করে থাকে। এসাইনমেন্ট বাবা-মা-ভাই বন্ধু, গৃহশিক্ষক লিখে বা কম্পোজ করে দেন কি-না সেটা কে যাচাই করবে?
অনেকে ক্লাসে বেশী সংখ্যাক শিক্ষার্থীর জন্য অনলাইনে মূল্যায়নে অসুবিধার কথা বলেছেন। একই ক্লাসে বেশী শিক্ষার্থী হলে ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ করে দিতে হবে। সিলেবাস ও প্রশ্ন সংক্ষিপ্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়। হাজার নম্বর বাদ দিয়ে ২০০ বা ৩০০ নম্বরের পরীক্ষা নিয়ে মূল্যায়ণ করা উচিত।
অনলাইনে টেক্সট বুক রিডিং একটা ভাল পদ্ধতি যা আমরা বিদেশে করোনার বহু পূর্বে করতাম ও বিশ্লেষণ করে শিক্ষক ও সহপাঠীদের সরাসরি শোনাতাম। গ্রুপ বিশ্লেষণের পার্ফমেন্সেই  কাকে কত নম্বর দেয়া যেতে পারে তা সবার উপস্থিতিতে মূল্যায়ণ হয়ে যেত। সাপ্তাহিক রিপোর্ট ই-মেইলে চলে আসতো।
তবে অনলাইন ক্লাসে লগইন করে নাম বা ছবি সেট করে অনেকে ফাঁকি দিয়ে অন্য কাজে মগ্ন হতো। কেউ ভিডিও বন্ধ করে জরুররী কাজে অন্যত্র যেতে হলে জুম মেসেজে লিখে যেতে হতো। কেউ অনলাইন ক্লাস থেকে অযথা পালাতে পারতো না। এটা অত্যন্ত কার্যকরী পদ্ধতি-বিশেষ করে যারা অনলাইনে লগইন করে ফেসবুক ঘাঁটে বা পালিয়ে বেড়ায় তাদের জন্য মাস্তি নয় এটা বড় শাস্তি হতে পারে। সেজন্য নম্বর বা ক্রেডিট কাটা যেতে পারে।
বাকীটা হলো মৌখিক পরীক্ষা। অর্থাৎ, ১০০ নম্বরের মধ্যে ২৫ এসাইনমেন্ট, ২৫ টেক্সট্বুক রিডিং, ২৫ আলোচনা ও বিতর্ক, ২৫ ভাইভা বা মৌখিক দিয়ে আমরা অনলাইনে খুব সহজে সকল শিক্ষার্থীদেরকে মূল্যায়ন করতে পারি। সাধারণ প্রোগামের মাধ্যমে দ্রুত ফলাফল প্রকাশ করতে পারে।
এছাড়া বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক ভিন্নতা, ফিল্ডওয়ার্ক, ল্যাবওয়ার্ক ইত্যাদিতে আলাদা নিয়মের কারণে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন, ভাইভা, থিসিসের সফট কপি জমাদান, ভিডিও ক্লিপ জমাদান ইত্যাদির মাধ্যমে দ্রুত মূল্যায়ণ করে পরীক্ষার ফলাফল প্রদান করা যেতে পারে। এতে  অটোপাশের দুর্ণাম থাকবে না-কেউ আর অটোপাশ বলে টিট্কারী করতে পারবে না।
করোনাকাল আরো দীর্ঘায়িত হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দিন দিন সংক্রমণ ও মৃত্যু বেড়েই চলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনা সংক্রমণের হার যতদিন ৫% এর নিচে আসে না ততদিন পর্যন্ত সেটাকে অস্বাভাবিক অবস্থা বলা হয়। আমরা চরম অস্বাভাবিক অবস্থার মধ্যে অবস্থান করছি। সংগে আরেক মরণব্যাধি ডেঙ্গি, যা বাচ্চা ও বয়স্কদের জন্য খুব মারাত্মক। লকডাউন খুলে দিয়ে মারাত্মক ভুল করলেও এই কদর্য সময়ে ঘরে বসে অনলাইন পড়াশুনা ও পরীক্ষা নেয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনা এক-দুই বছর নয়, এক-দুই যুগও অবস্থান করতে পারে। সেজন্য অনলাইনে জীবন-জীবিকা, পড়াশুনা সবকিছুর বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে একট অনির্দিষ্টকালের জন্য টেকসই প্রস্তুতি জোরদার করতে হবে।

* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান। E-mail: fakrul@ru.ac.bd

সাম্প্রতিক মন্তব্য