logo
news image

শখের ছাদবাগানে দু:খের লার্ভা-উপায় কী?

-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।
ফুল-ফল ও প্রকৃতিপ্রিয় মানুষের কাছে বাগান করা খুব শখের জিনিষ। শহুরে মানুষের বাগানের জমি না থাকায় অনেকে নিজ বাড়ির ছাদকে বেছে নিয়েছেন এই শখ মেটানোর উপায় হিসেবে। অনেকে ভাড়া বাড়ি বা সরকারী বাড়িতে থেকেও ছাদ বাগান করছেন। ছাদ বাগানের উপকার অনেক। ইট-পাথর, চুন-সুরকির দালান কোঠার কৃত্রিমতার মধ্যে একটু সবুজের সমারোহ কে না চায়? শহরে বাতাসে নির্মল অক্সিজেনের সরবরাহ বাড়াতে ছাদ ব্যতিরেকে আর কোথায় জায়গা আছে যে গাছ রোপন করবেন? ফুল-ফল, শাক-সব্জির সাথে ঔষধি গাছের চারাও কেউ কেউ রোপন করে থাকেন। জনপ্রিয় টিভি উপস্থাপক কৃষিবিদ জনাব শাইখ সিরাজের অনুপ্রেরণায় আমাদের দেশে ছাদবাগান তৈরী করা একটি বিশেষ আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। রাজধানী পেরিয়ে সারা দেশের দালান কোঠা সম্বলিত এলাকায় ছাদ বাগানের সৌরভ ছড়িয়ে পড়েছে।
আমার নিজের বাগান করার খুব শখ ছাত্রাবস্থায় স্কাউটিং করতে গিয়ে এর হাতে খড়ি হয়। শৈশবে গ্রামে কাটানো এবং বাবা কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা হবার সুবাদে প্রায় সব ধরনের গাছের নাম জানা হয়েছিল সেই স্কুলবেলাতেই। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় রোভারদের নিয়ে মহসীন হল ও অন্যান্য হলে পেঁপের বাগান করেছিলাম। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ে প্রভাষক থাকাকালীণ রোভারদের সাথে নিয়ে নবনির্মিত ভবনগুলোর সামনে অনেক গাছের চারা রোপন করেছিলাম সেগুলো এখন অনেক বড় হয়েছে। বর্তমান কর্মস্থলের বসতবাড়ির বাগানে প্রতিদিন কিছু না কিছু কাজ করে আনন্দ খুঁজে ফিরি। তবে এখানে জমিতে বাগান করার ব্যাপক সুবিধা থাকায় ছাদে যেতে হয়নি।
বাগান করা খুব ভাল শখ বা ‘হবি’। বাগান করলে সময় কাটে, পুষ্টি চাহিদা মেটায়, স্বাস্থ্য ও দেহ-মন ভাল থাকে। আমি চাই সুযোগ থাকলে সবাই অবসর সময়ে বাগান করতে উৎসাহী হয়ে উঠুক।
করোনাকালীণ সময়টা অতি দীর্ঘায়িত হতে হতে মানুষকে আরো বেশী ঘরের কোণায় ঠেলে দিচ্ছে। তাই পড়াশুনা ও সংসারের কাজের পাশাপাশি মিডিয়ায় তাকিয়ে সময় পার করতে  হচ্ছে। অনেকের মত আমাকেও প্রতিদিন টিভি, ইন্টারনেটে করোনার ভয়ংকর প্রাণসংহারী সংবাদ নিয়ে কৌতুহলী সময় ব্যয় করতে হচ্ছে। করোনার সাথে আরেকটি মারাত্মক রোগর প্রাদুর্ভাব ঘটেছে-বিশেষত: এখনও সেটা রাজধানী কেন্দ্রিক। এক দুই করে ডেঙ্গু নামক ভয়ংকর রোগটি এখন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। টিভি সেটের সামনে বসে জানা গেল এ পর্যন্ত দেশের সর্বোচ্চ সংক্রমণ হয়েছে জুলাই এর ২৬ তারিখে এবং ২৭ তারিখে রেকর্ড মৃত্যু হয়েছে করোনায় ২৫৮ জনের। পরপরই আরেকটি খারাপ সংবাদ গত এক মাসে দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ১৬০০ জন। জুলাই ২৭ তারিখে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৪৩ জন রোগী। করোনার ভয়াবহ সংক্রমণের এ অবস্থা খুবই বিপজ্জনক। এ যেন ‘মড়ার উপর খাড়ার ঘা’।
সিটি কর্পোরেশনের এত সতর্কতা অবলম্বনের পরেও এই ভয়ানক অবস্থা কেন হলো তা বোধগম্য নয়। আজ টিভি খবরে দেখা গেল (এনটিভি জুলাই ২৭, ২০২১) ডেঙ্গু সংক্রমণ ছড়ানোর চিরাচরিত কারণগুলোর মধ্যে ছাদ ছাদ বাগান একটি। ছাদ বাগানের টব ও সব্জী বেডের মধ্যে এডিস মশার লার্ভা কিলবিল করছে। বিষয়টি বেশ ভাবিয়ে তুলেছে দর্শকদেরকে।
শহরাঞ্চলে বাড়িগুলোতে ব্যাঙের ছাতার মত অপরিকল্পিত উপায়ে তৈরী হচ্ছে ছাদবাগান। বিল্ডিং-এর স্ট্রাকচারাল লোড বা ডেড লোড (কলাম, বিম,ওয়াল রুফ, লিফট্, পানির ট্যাংক ইত্যাদি) না হয় মানা গেল কিন্তু লাইভ লোড (মানুষ, আসবাব, টব, ড্রাম, অটোমোবাইল, মাটি ইত্যাদি) এবং পরিবেশগত লোড (তুষারপাত, বৃষ্টি, ধূলিঝড়ের বালু, ভূমিকম্পন সহ্য ক্ষমতা ইত্যাদি) পরিমাপের নিয়ম-কানুন কি সবাই মেনে ছাদ বাগান তৈরী করেছেন?
সাধারনত: একটি বিল্ডিং তার নিজের ডেডলোডের ১০%-১৫% লাইভ লোড সহ্য করতে পারে। তবে অতি আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরী ভবনের ক্ষেত্রে এই ক্ষমতার কিছুটা ব্যতিক্রম রয়েছে। ছাদের মধ্যে যদি ১০ টন মাটি, মাছ চাষের চৌবাচ্চা, টব, ড্রাম ইত্যাদিতে পূর্ণ হয়ে যায় তাহলে অতিবৃষ্টির ফলে সেগুলো ওজন কত টন বেড়ে গেছে তাসহ কি মোট লাইভ লোডের আগাম পরিমাপ কেউ কখনও করিয়েছেন কোন বিশেষজ্ঞ দিয়ে?
চায়না, জাপান, হংকং সিঙ্গাপুরে ছাদ বাগানে বড় বড় ড্রামে টন টন মাটি ভরিয়ে বিশাল বৃক্ষ (আমগাছ, কাঁঠালগাছ) লাগায় না। আমরা লাগাচ্ছি। যদিও কালবৈশাখী ঝড়ের ভয় আমাদেরই বেশী। বেড তৈরী করে সব্জী আবাদ করলেও পুরো ছাদ জুড়ে বেড তৈরী করার নিয়ম নেই। তাদের ছাদবাগানের অতিরিক্ত পানি, বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য আলাদা ব্যবস্থা তৈরী করে বিল্ডিং বানানো হয়ে থাকে এবং শুধু সেসব বিল্ডিং ছাদ বাগান করার অনুমতি পায়। সেভাবে তাদের দেশে রুফটপকে রক্ষা করা হয়। ছাদে জমাকৃত অতিরিক্ত পানি সময়মত নিষ্কাশিত না হলে সেটা রুফটপের আয়ু ৮০ বছর থেকে ৪০ বছরে নামিয়ে দিতে পারে বলে জানালেন একজন অভিজ্ঞ আর্কিটেক্ট। উন্নত বিশ্বে সেগুলো মানা হলেও আমাদের দেশে সেরূপ কিছু কি মানা হচ্ছে?
অনেকে ছাদবাগানে কীটনাশক ছিটানোর সময় প্রতিবেশীকে তথ্য দেন না। প্রতিবেশীর জানালা দিয়ে বিষের গন্ধ ঢুকে গেলে অনুসন্ধান শুরু হয়ে যায়। এজন্য অনেকে ঝগড়া করে, ভাড়াটিয়া হলে অনেকে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। এজন্য সুস্পষ্ট আইন থাকা দরকার।
এমনিতে রাজধানীতে পানিসংকট। খরার সময় ছাদবাগানে প্রচুর পানির প্রয়োজন। ছাদবাগানে কেউ অতিরিক্ত পানি দিলে ট্যাংকে পানি ফুরিয়ে যায় ও অনেকের শাওয়ারে গোসল করার পানি থাকে না। এছাড়া বর্ষাকালে অতিবৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য আলাদা সুব্যবস্থা কি পুরাতন ভবনগুলোতে আছে? এ জন্য দ্রুত জরিপ হওয়া প্রয়োজন।
এ বছর বৃষ্টি বেশী হচ্ছে। তাই ছাদের টবে, ড্রামে, মাছ চাষের পানির চৌবাচ্চায় বা সব্জীর বেডে পানি জমে যেতে পারে দীর্ঘসময়ব্যাপী। সেখানেই এডিস মশা সুযোগ পাচ্ছে ডিম পাড়ার।
এছাড়া অনেকে বাগান করে খালাস। বাগানের নিয়মিত পরিচর্যা করেন না। ফলে পচা পাতা, ঝোপ-ঝাড়, অন্ধকার ঘুপচি তৈরী হয়ে সেখানে মশারা লুকিয়ে থাকছে। ছাদবাগানের কৃষিবর্জ্য নিয়মিত ও যথাযথ স্থানে ডাম্পিং করার আইন থাকা উচিত।
যাই হোক না কেন, ডেঙ্গু রোগের অনেক কারণ থাকতে পারে। তবে আজ নতুন কথা উঠেছিল ছাদবাগানের টবে, বেডে, মাছের চৌবাচ্চায়, ড্রামের জমে থাকা পানিতে এডিসের লার্ভা প্রাপ্তি নিয়ে। এটা এই মুহূর্তে ভয়ানক সংকট। এই বিষয়টিতে উদাসীন থাকায় হয়তো বা এবছর বেশী ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে যাচ্ছেন। তাই শখের ছাদবাগানে এডিসের বংশ বিস্তার যেন করোনাকলীণ মহাদু:খের সময় আমাদের কষ্টকে আরো সীমাহীন করে না তোলে। তাই সব ছাদবাগান মালিকরা আজই সচেতন হই ও এডিস মশার লার্ভা ধ্বংস করতে তৎপর হই, জীবন বাঁচাই।

* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান। E-mail: fakrul@ru.ac.bd

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top