logo
news image

অবাধ নেটের অশ্লীলতায় বুঁদ ঘরবন্দী কোটি শিক্ষার্থী

-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।
বাংলাদেশে মোবাইল ফোনের ব্যবহারের হার দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। করোনায় অনলাইন শিক্ষার সুবাদে মোবাইল ফোনের পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের হাতে নানা ধরনের আধুনিক ডিভাইস প্রতিনিয়ত ছড়িয়ে পড়ছে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের হাতে নিত্য-নতুন মডেলের ডিভাইস। হাইস্পীড এন্তারজালে অধিগ্রহণের সুযোগে সারা পৃথিবীর নানা তথ্য তাদের আঙ্গুলের ছোঁয়ায় চোখের সামনে ভেসে উঠছে। স্কুলের বাচ্চাদের হাতে দামী মোবাইল ফোনসেট কিনে দিচ্ছেন অভিাবকরা। সাথে ল্যাপটপ, আইপ্যাড, ট্যাব, নোটবুক, নেটবুক, আইফোন, স্মার্টফোন দিয়ে শিশু কিশোরদেরকে শিক্ষা নামক সোনার হরিণের পিছনে ছুটতে বলা হচ্ছে।
দেশের প্রায় চার কোটি ঘরবন্দী শিক্ষার্থীর সিংহভাগ অনলাইন ক্লাসের পরে দিবা-রাত্রির বাকী সময়টা বাবা-মাকে লুকিয়ে সেগুলো দিয়ে তারা গঠণমূলক কিছু কি করে? অনলাইনে সংযুক্ত হয়ে বন্ধু বা সহপাঠীদেরকে তারা কী দেখায়, কী শেখায়? অভিভাবকরা একবারও তা ভেবে দেখেছেন কি? এতদিন ভেবে না দেখে থাকলে আজই দেখুন, আজই সতর্ক হোন!
বাংলাদেশ থেকে ইন্টারনেটে ঢুকলেই অনেককে লজ্জার মুখোমখি হতে হয়। কারণ, কোথাও পর্যাপ্ত ফায়ারওয়াল নেই। নানা ছবি, ভিডিও এডাল্ট কনটেন্ট সম্বলিত নানা অশ্লীলতায় ভরা। সরকার একদিকে মুছে দেয়ার চেষ্টা করে অন্যদিকে হ্যকাররা রাতারাতি নিত্যনতুন কৌশলে আরো বেশী এডাল্ট কনটেন্ট আপলোড করে ছড়িয়ে দেয়।
এগুলো কি শুধু বিজ্ঞাপন? তবে কি ভাইরাস? না মোটেই নয়! তাহলে কি চরিত্র হননের মাধ্যমে আমাদের জাতীয় উন্নতি ও বিকশিত হবার পথ রুদ্ধ করার হীন ষড়যন্ত্রের প্রক্রিয়া? হয়তো বা তাই! কারণ শিশুরাই যদি আমাদের ভবিষ্যৎ হয়, বর্তমানে কিশোর-যুবরাই যদি ভবিষ্যতের শক্তি হয় তবে আমাদের এ শক্তি অবাধ ইন্টারনেটের অশ্লীলতার নিকট আজ পরাজিত হতে চলেছে!
ধরুন একটি অনলাইন পত্রিকায় ঢুকেছি। তার ডানে বাঁয়ে শত শত বিজ্ঞাপন। অশালীণ, অরুচিকর অঙ্গভঙ্গি করে নানা বয়সের নারী পুরুষের ছবি। হঠাৎ বিব্রতকর ক্যাপশন, আবেদনময়ী কোন উলঙ্গ মডেলের ব্লিককরা বিজ্ঞাপন। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সামনে এই আবেদন করলে দোষটি কার? এগুলো নিয়ন্ত্রণ করার কেউ কি নেই? কুড়ি-বাইশ বছর পূর্বে একটি উন্নত দেশে পড়াশুনা করার সময় অনেক পত্রিকা ঘেঁটেছি, অনেক ওয়েব পেজ সার্চ করেছি, এখনও সেসব দেশে গেলে সার্চ করি। কই বর্তমানেও বিব্রত হবার মত কোন কিছু তো চোখে পড়ে না! কারণ তাদের দেশের কর্তৃপক্ষ সেগুলো ভালভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন। গেটওয়েতে ফায়ারওয়াল দিয়ে সার্ভারগুলো ল্জ্জাকর জিনিষমুক্ত করে রাখেন। ক্যাম্পাস, হল সব যায়গায় শিক্ষামূলক ওয়েবপেজগুলো দেখা যায়, পড়া যায়। আপত্তিকর, উলঙ্গছবি, নীল মুভিগুলো ছেঁকে বাদ দিয়ে দেয়া হয়। শিক্ষার্থীরা সেগুলোর ধার কাছে যেতে পারে না। সুতরাং শিক্ষার্থীদের সময় নষ্ট বা চরিত্র ধ্বংস হবার ফুরসৎ নেই!
এতো গেল একটি নির্দিষ্ট জায়গায় ইন্টানেটের তথ্য নিয়ন্ত্রণের কথা। কিন্তু বাংলাদেশে কোথাও কোথাও মোটেও ফায়ারওয়াল নেই, ওপেন অ্যাকসেস! তার কী ব্যবস্থা হবে? আমরা বর্তমানে ভয়ংকর সময়ে এমন এক পৃথিবীতে বাস করছি যেখানে সবাই ঘরের জেলখানায় স্বেচ্ছাবন্দী। এ্ই আবদ্ধ সময়ে হাতের মুঠোফোন দিয়েই যেকোন ওয়েবসাইট থেকে যে কোন সময় যেকোন ভিডিও চালানো যায়। আজকাল আগের মত অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাউজিং সোসাইটি, সুপার মার্কেটের প্রাঙ্গনে না গিয়েও প্রতিবেশী বা এলাকার মানুষের ভুলে বা এসব চালানোর অজ্ঞতার সুযোগে বিনা খরচে হাতের মুঠোফোন বা ডিভাইসে ওয়াই-ফাই সংযোগ পাওয়া যায়।
মোবাইল ফোনের যথেচ্ছ ব্যবহারের সুবাদে বহু কোম্পানী ফোন কল ছাড়াও আজ ভিন্ন ব্যবসায় নেমে পড়েছে। সেটা হলো মিনিট কিনলে ফ্রি মেগাবাইট সেবা প্রদান। শিক্ষার্থী ছাড়াও কর্মজীবি শিশু কিাশোররা এটা লুফে নিচ্ছে। কারণ, সংযুক্ত হলেই অবাধ ইন্টারনেটের মাধ্যমে অশ্লীল ছবি, ভিডিও পেয়ে যাচ্ছে তারা। অভিভাবক তথা বাবা-মাকে ফাঁকি দিয়ে তারা দামী মোবাইল ফোনসেট ব্যবহার করে মূহুর্তেই নিষিদ্ধ জগতে ঢুকে পড়ছে! আর এটা ওপেন সিক্রেট! এটা মারাত্নক, লজ্জাকর ও ভয়ংকর ক্ষতিকারক পর্নোগ্রাফী। বলা হয়-“পর্ণোগ্রাফী ইন্ডাস্ট্রি বর্তমানে একটি মাল্টি-ট্রিলিয়ন ডলারের ইন্ডাস্ট্রি! যার উদ্দেশ্য এবং কাজই হল আপনাদের প্রত্যেকেই যেন, কোন না কোনভাবে এসব নোংরামীর ভোক্তা হন, সেটা নিশ্চিত করা। ..তারা আশা করে আপনিও দেখবেন, আসক্ত হবেন এবং পরিণত হবেন আরও একজন ভোক্তায়! এটাই হল আমাদের সমাজকে দেয়া পর্নোগ্রাফীর উপহার। এটা মানুষকে পরিণত করছে যৌনবিকারগ্রস্ত পশুতে, ...আপনাদের মধ্যেই দূর্ভাগ্যক্রমে কারও কারও এই আসক্তি রয়েছে এবং আপনারা এসব জঞ্জাল অনলাইনে দেখছেন।” সম্প্রতি বাড়তি আয়ের লোভ দেখিয়ে মাদক কেনা-বেচা, নারীপাচার ইত্যাদি কাজে টিকটক সহ নানা অপরাধী চক্র গজিয়ে উঠেছে অবাধ এন্তারজালের সুবাদে।
ছোট বাচ্চারাও স্মার্টফোন সাথে নিয়ে ঘুমাতে পছন্দ করে! অনলাইন ক্লাশ করার জন্য বাবা মা আদর করে তাদের বাচ্চাদের বিভিন্ন দামী ডিভাইস কিনে দিয়ে বাসায় ওয়াই-ফাই সিস্টেম চালু করে দিয়েছেন। কোমলমতি বাচ্চারা সেগুলো দিয়ে গেম খেলে, চ্যাট করে, ভিডিও দেখে। ইন্টারনেট সার্চ করতে করতে অজানা-অন্ধকার জগতে ঢুকে পড়ে। ব্যস্ত বাবা-মা তা জানতে পারে না। একজন আক্ষেপ করে ক’দিন আগে একটি পত্রিকায় লিখেছেন, “ক’দিন আগেই একটা ই-মেইল পেলাম, একজন টিনেজ বালক এর থেকে, যে কি-না পর্নোগ্রাফীতে আসক্ত। সে লিখেছে, “আমি নিজেকে মেরে ফেলতে চাই, আমি পারছি না বন্ধ করতে। আমি ১১ বছর বয়স থেকে এগুলো দেখছি। আমার বাবা-মা কিছু জানেন না।”
অনেক বাচ্চারা একা একা ঘুমাতে পছন্দ করে ! বড়দের দেখলে মুখ লুকায়! ঘুম নষ্ট করে স্বাস্থ্যহানি ঘটায়। সকালে নিজে নিজে বিছানা ছেড়ে উঠতে চায়না, উঠতে পারেও না। বাসায় অনেক বাচ্চাদের খাবার সময় পেরিয়ে গেলেও খেতে আসে না, ডাকাডাকি করলে চরম বিরক্তি প্রকাশ করে ! গবেষণায় দেখা গেছে- কেউ কেউ বাথরুমে মোবাইল ফোনসেট সাথে নিয়ে পানির ট্যাপ ছেড়ে দিয়ে লজ্জাকর পর্নোগ্রাফী দেখে। মোবাইল ফোনের খারাপ মেসেজিং বাচ্চাদের নোংরা থেকে নোংরামি করতে শেখায়।
ইউটিউবে পৃথিবীর প্রায় সব প্রাণীর যৌনকর্ম করার ভিডিও কে বা কারা দৈনিক আপলোড করে থাকে। এগুলো নিশ্চয়ই ভিনদেশের। কারণ বহুলাংশে ব্যবহৃত এ প্রাণীগুলোর জন্ম বা বসবাস বাংলাদেশে নয়। এটা কি এক ধরনের প্রাণীঅধিকার সংরক্ষণ আইন বিরোধী জঘন্য অপরাধ নয়? এগুলো নিশ্চয়ই আমাদের দেশের শিশুদের তথা সব ঈমানদার মানুষের ঈমান হরণ করার জন্য। ইউরোপ-আমেরিকার সাদা মানুষ, এশিয়ার বাদামী মানুষ বা আফ্রিকার কালো মানুষগুলোর নির্লজ্জ যৌনকর্ম করার ভিডিও কে বা কারা সেঁটে দিচ্ছে-তারা নিজেরা হয়তো এ বিষয়ে জানেনও না। হয়তো গোপন ক্যামেরায় তোলা হয়েছিল। এটা হয়তো কোন কোন মানুষের অবৈধ আয়ের পথ, ব্যবসা- ইন্ডাস্ট্রি! কিন্তু এটাও কি এক ধরণের মানবতা ও নৈতিকতা বিরোধী জঘণ্য অপরাধ নয়?
করোনার ডেল্টা প্রকরণের মরণ কামড়ের ভয়ে আমরা এখন কোণঠাসা কুঠুরিতে তালাবদ্ধ হয়ে পড়েছি। আজ চরম বিপদের মধ্যেও খারাপ কাজে বেহুঁশ হচ্ছি। সভ্য সমাজের সদস্য হবার দাবী করেও এক কুৎসিত ও নির্লজ্জতার চর্চ্চায় অবতীর্ণ হয়েছি। নৈতিকতার যুদ্ধে ইন্টারনেট প্রোভাইডার ও হ্যাকারদের নিকট লজ্জা যেমন পরাজিত তেমনি পরাজিত সুস্থ মানসিকতা এবং মানবতা। ইন্টারনেট নিজে আপরাধী নয় বরং ইন্টারনেটের অপব্যবহার করে প্রাণীকুল, মানুষ ও মানবতাকে চরম অপমান ও অবমাননা করার জন্য এক শ্রেণির লোভী মানুষ উঠে পড়ে লেগেছে।
এই লাগামহীন নির্লজ্জতা ছড়ানো কু-চক্রীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা ছাড়া গত্যন্তর নেই। অশ্লীলতা, অনৈতিকতা ও শয়তানির বিরুদ্ধে এ যুদ্ধে জয়লাভ করা খুবই জরুরী।
কারণ, করোনাকালীণ এই মহা বিপদের সময়ে ধৈর্য্যহারা হয়ে ঈমান হারানো যাবে না। চরিত্র মানুষের অমূল্য সম্পদ। বলা হয়-কারো টাকা হারানো গেলে সেটা তেমন ক্ষতিকর কিছু নয়, স্বাস্থ্য  হারানো গেলে সেটা কিছুটা ক্ষতি, কিন্তু চরিত্র হারিয়ে ফেললে সেটা সার্বিক ক্ষতি, মারাত্নক ক্ষতি। করোনার অতি সংক্রমণ ঠেকাতে অতি কঠোর লকডাউনের সময়ে শিক্ষা লাভের উপায় খুঁজতে গিয়ে দেশে প্রায় চারকোটি শিক্ষার্থী অবাধ ইন্টারনেটের অশ্লীলতায় বুঁদ হয়ে পড়েছি। যেটা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মারাত্নক, লজ্জাকর ক্ষতি। এই মূহুর্তে কর্তৃপক্ষ এ অবাধ ক্ষতিকে সামলাতে না পারলেও ঘরে ঘরে সচেতনতা বাড়িয়ে এবং সামাজিক ফায়ারওয়াল দিয়ে সবার এই লাগামহীন অশ্লীলতা ঠেকাতে এগিয়ে আসা ছাড়া উপায় নেই।

* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান। E-mail: fakrul@ru.ac.bd

সাম্প্রতিক মন্তব্য