logo
news image

শিথীল বিধিনিষেধ ও কান্নাভেজা কোরবানীর ঈদ

-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম:
করোনা ও বন্যার করাল থাবা শুরু হয় গত ২০২০ সালে। সে অবস্থাতেই কান্নাভেজা কোরবানীর ঈদ পালন করতে হয়েছে। এবছর ২০২১ সালে আরো ভয়ংকর রূপে আবির্ভূত হয়েছে করোনার নতুন ভেরিয়েন্ট ডেল্টার করাল ছোবল। সারা বিশ্ব এখন ডেল্টা ভেরিয়েন্ট ও বন্যার আগ্রাসী গ্রাসের আওতায়। জার্মানীসহ উত্তর ইউরোপে হঠাৎ বন্যায় ১৮২ জন মারা গেছেন, ভেসে গেছেন ২৩০ জন। ইন্দোনেশিয়ার ঘরে ঘরে মৃতদেহ পড়ে আছে। আফগানিস্তান, হাইতি ও দক্ষিণ আফ্র্রিকায় ভয়ংকর যুদ্ধ চলছে। দেশে দেশে আরো যুক্ত হয়েছে জীবন রক্ষার জন্য সংগ্রাম ও করোনার ভয়ংকর সংক্রমণ ঠেকাতে কঠোর লকডাউন।
তবুও ঈদকে তো আর অগ্রাহ্য করা যাবে না। ধর্মীয় রীতি-নীতি পালনের অংশ হিসেবে প্রতিবছর আসে কোরবানীর ঈদ। আর এর সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের অর্থনীতির এক বড় অংশ। কৃষি অর্থনীতির বড় লাভজনক অনুষঙ্গ হলো পশুপালন। বিশেষ করে গ্রাম বাংলার মানুষের স্বপ্নের সাথে মিশে আছে সারা বছরের পশুপালন ও ঈদের সময় বিক্রি করে সেই অর্থ দিয়ে অনেকের পরিবারের নানা সাদ-আহল্বাদ মেটানো।
করোনা ও বন্যার মাঝে এসেছে পবিত্র ঈদুল আযহা। মুসলিম মিল্লাতের আদি পিতা হযরত ইব্রাহীম (আ:)-এর স্মৃতি বিজড়িত এই ধর্মীয় উৎসবে পশু কোরবানীর রেওয়াজ। এর মূল উদ্দেশ্য হলো মহান আল্লাহ্র নৈকট্য লাভের জন্য আর্থিকভাবে সামর্থ্যবানদের ত্যাগ স্বীকার করা। খোদাভীরুতাকে ত্যাগের মাধ্যমে প্রকাশ করে মহান আল্লাহ্র সান্নিধ্য লাভ করতে সারা মুসলিম বিশ্বে লক্ষ লক্ষ পশুকে উৎসর্গ করা হয়ে থাকে মহান আল্লাহ্র নামে।
পবিত্র কোরআনের সূরা হাজ্জের ৩৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে, “আল্লাহ্র কাছে গোশত, রক্ত পৌঁছে না, পৌঁছে তোমাদের আল্লাহ ভীতি।” সুরা মায়েদার ২৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে, “নিশ্চই আল্লাহ্ খোদাভীরুদের কোরবানী কবুল করেন।”
আগেকার দিনে আমাদের দেশে কোরবানীর গরুর একটা বড় অংশ ভারত থেকে বিভিন্নভাবে আনা হতো। ভারতে মোদী শাসনামল শুরু হবার পর গরু আসা কমতে শুরু করেছে। ২০২০ সালে করোনার জন্য গরু আমদানী বন্ধ হয়েছিল। ২০২১ সালে ভারতে ভয়ংকর ডেল্টা ভেরিয়েন্টের আক্রমণে অসংখ্য প্রাণহানির পর বাংলাদেশেও সংক্রমণ শুরু হলে ভারতের সংগে স্থল সীমান্ত সিল করে দেয়া হয়েছে। তাই গরু আমদানী শুণ্যের কোঠায় চলে এসেছে। এটা আমাদের দেশে কৃষকদের জন্য শাপেবর হয়েছে। গড়ে উঠেছে পশু খামার ও মোটা-তাজাকরণ প্রকল্প।
খামারীরা ফিজিয়ান, ব্রাহামা ইত্যাতি জাতের বৃহৎ ষাঁড়ের বীর্য সংকরায়নের মাধ্যমে উন্নত বড় গরু আবাদে সক্ষমতা দেখিয়েছেন। তাই এবারের ঈদে দেশে পালিত পর্যাপ্ত গরু বাজারে আসছে। দেশী গরু তো রয়েছেই। পশুসম্পদ মন্ত্রনালয়ের উপ-পরিচালক জনাব জিনাত হুদা বিবিসি-কে তথ্য দিয়েছেন, “এবারের ঈদের কোরবানীর জন্য ১৯ লক্ষ গবাদি পশু প্রস্তুত রয়েছে। ঈদের হাটে ৫০ থেকে ৫৫ হাজার কোটি টাকার অর্থনীতি জড়িত।”পশু বিক্রি না হলে খামারীদের কপাল পুড়তে পারে। বিশেষ করে গ্রামীণ প্রান্তিক খামারীদের যত্ন করে বড় করা পশু হাটে তুলতে না পারলে তারা পুঁজি হারিয়ে আরো দরিদ্র হয়ে যাবে। তারা অনলাইন বুঝে না। কিছু বাটপার অনলাইনার ব্যবসায়ী বাকিতে তাদের গরু কিনে পরে টাকা দিতে চায়। সেজন্য উঠতি ডিজিটাল ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্যের কাছে গ্রামীণ প্রান্তিক খামারীরা চরম অসহায়।
তাই কঠোর লকডাউন শুরু হওয়ায় সেসব গরু-ছাগল বিক্রি করা নিয়ে দুশ্চিন্তা শুরু হয়ে যায়। অনলাইনে পশু বিক্রির জন্য প্রচার শুরু করা হলেও প্রান্তিক চাষীদের তো সে সুযোগ নেই। ছোট খামারে দরিদ্র চাষীরা কষ্ট করে পশু মোটা-তাজাকরণের করে উপাধি পেয়েছে ‘গরুর ব্যাপারী’। আর শহরাঞ্চলে বড় বড় খামার গড়ে বিত্তশালীরা পশু মোটা-তাজাকরণের করে উপাধি পেয়েছে ‘এগ্রো ফার্মার’। তাদের দাপটে গ্রামীণ ছোট ব্যবসায়ীরা ধরাশায়ী হয়ে পড়েছে। কারণ, তাদের প্রত্যন্ত এলাকায় নেই বড় ক্রেতা, নেই পরিবহন -যাতে দ্রুত বড় শহরে পশু বিক্রির জন্য আনা যায়। এছাড়া পথে পথে চাঁদাবাজের ভয়। অর্থ্যাৎ, ব্যবসায় হাত দিয়েও প্রান্তিক চাষীর ক্ষতি, গরীবের পুঁজি হারানোর ভয়। পথে পথে, পদে পদে তাদের কান্নাভেজা কন্ঠস্বর শুনতে হচ্ছে।
এরপরও মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে এত বড় উৎসব পালনের জন্য জন্যই মূলত: শিথীল করা হয়েছে কঠোর লকডাউন। শেষ সময়ে চারদিকে বসেছে পশুর হাট, চলছে ঈদের কেনাকাটা, উপেক্ষিত হয়েছে স্বাস্থ্যবিধি। ময়লা, কাদা-গোবরে দাঁড়ানো পশু, ক্রেতা-বিক্রেতা। আছে নকল টাকার সমাগম, ঠগ্-বাটপারদেরদের সাথে পকেটমার, মোবাইলচোর। সবার আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, হাটের গিজ্ গিজ্ পরিবেশে করোনা ঢুকতে না পেরে লজ্জা পেয়ে ভিনদেশে পালিয়ে গেছে!
অপরদিকে করোনায় দীর্ঘমেয়াদী লকডাউন যেভাবে সকল মানুষকে নাকাল করে চলেছে তাতে কোথাও স্বাভাবিক অবস্থা নেই। সাধারণ মানুষের কোরবানী দেয়ার সামর্থ্য কমে গেছে। ঢাকার পশুর হাটে বড় গরু কেউ কিনতে চাচ্ছেন না। সবার নজর ছোট-মাঝারী গরুর দিকে। সেজন্য ছোট-মাঝারী গরুর দাম বেড়েছে, বেড়েছে সংকট।
ডেল্টা সংক্রমণের ভয়ে গরীব-মিসকিনদের নিকট কোরবানীর মাংস বন্টন করা নিয়ে সংকট আরো গভীর। বাড়ি বাড়ি মেইন গেটে তালা দেয়া। বাড়ি বাড়ি ঘুরে মাংস সংগ্রহ করাতেও নানা বিপত্তি। আছে নানা ভয়।
কোরবানীর পশুর চামড়া গতবছর বিক্রি করা যায়নি। মাটিতে পুঁতে, নদীতে ভাসিয়ে দেবার সংবাদ জানা গেছে। এবারে কোরবানীর পশুর চামড়ার কি অনুরুপ বেহাল দশা অপেক্ষা করছে?
ধনী-গরীব অনেকের বাড়িতে অথবা কারো না কারো স্বজনেরা করোনাক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন অথবা কেউ কেউ অতি কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। এসব কান্না চারদিকে বাতাস ভারী করে রেখেছে। প্রতিদিন মসজিদের মাইকে অসময়ে ঘোষণা শুনলেই প্রাণটা আঁৎকে উঠে। এই বুঝি শোকের সংবাদ শোনা যাবে। এভাবে আমরা দিন দিন অভ্যস্ত হয়ে উঠতে থাকলেও সেটা মহাকষ্টের, মহা কান্নার কলরব মাত্র।
চারদিকে এই মহাকান্নার পরিবেশে এবারের ঈদে কোরবানী কার কাছে কেমনভাবে অনুভূত হবে আমার জানা নেই। শুধু ভাবছি সারি সারি লাশের গন্ধে ভারী পরিবেশের মধ্যে জীবন ও অর্থনীতির এই বিতর্কে না গিয়ে সবাই আরো সতর্ক থাকি। করোনাক্রান্ত দু:খী পরিবারগুলোর দিকে খেয়াল রেখে ত্যাগের মহিমাকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দেবার চেষ্টা করে কোরবানীর উদ্দেশ্যকে মহীয়ান করে তুলি। মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীন সবাইকে বিপদে ধৈর্য্য ধারণ করার ক্ষমতা দান করুন।

* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান। E-mail: fakrul@ru.ac.bd

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top