logo
news image

লালপুরের প্রকৌশলী হাবিবুর রহমানের অর্জিত ট্রফি হস্তান্তর

ইমাম হাসান মুক্তি, প্রতিনিধি, নাটোর (লালপুর)
নাটোরের লালপুরের প্রকৌশলী মরহুম হাবিবুর রহমানের বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অর্জিত ট্রফি স্মৃতি রক্ষার্থে হস্তান্তর করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১০ জুন ২০২১) তাঁর স্ত্রী রিজিয়া রহমান লালপুর শ্রী সুন্দরী পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খাজা শামীম মো. ইলিয়াছ হোসেনের হাতে তুলে ট্রফি তুলে দেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন, সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম মুকুল ও লালপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. হারুনর রশিদ পাপ্পু।
লালপুর শ্রী সুন্দরী পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খাজা শামীম মো. ইলিয়াছ হোসেন বলেন, তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে প্রতিষ্ঠানের সংগ্রহ শালায় স্মারক ট্রফিগুলো সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।
সংক্ষিপ্ত জীবনী: নাটোরের লালপুরের পদ্মা নদীগর্ভে বিলীন নিমতলী গ্রামে ১৯৩৬ সালের ৩০ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন আন্তর্জাতিক মানের প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান। পিতা হাজী দিদার হোসেন মণ্ডল ও মাতা হাজী মফিজুন্নেসা। স্ত্রী রিজিয়া রহমান। তাঁদের সন্তান মেয়ে মরহুম ড. শিরিন রহমান ও ছেলে রেজানুর রহমান।
তিনি নিমতলী প্রাথমিক স্কুল থেকে পঞ্চম শ্রেণি, লালপুর শ্রী সুন্দরী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন, রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি, ঢাকা আহসান উল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (বর্তমানে বুয়েট) থেকে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি অর্জন করেন।  
তিনি ১৯৬০ সালে কিছু দিনের জন্য গোপালপুর নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে চাকুরী করেন। ওই বছরের শেষের দিকে তৎকালীন ওয়াপদা-তে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেন। নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে চট্টগ্রামে বদলি হন। তিনি চট্টগ্রাম বিভাগে অসংখ্য সাব স্টেশন তৈরি করেন। হাইটেনশন পাওয়ার স্টেশন ও গ্রিড লাইনের ছিল তাঁর অসামান্য দক্ষতা। ১৯৬৫ সালের দিকে সিলেটের শাহজি বাজারে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম গ্যাস টারবাইনের কাজ শুরুর প্রাক্কালে একজন দক্ষ ও কর্মঠ ইঞ্জিনিয়ারের বাছাই পর্বে তৎকালীন পাকিস্তান ওয়াপদার চেয়ারম্যান জি এ মাদানি আসেন পূর্ব পাকিস্তানে। তিনি সব কিছু বিবেচনা করে হাবিবুর রহমানকে ওই প্রজেক্টের দায়িত্ব দেন। দক্ষতার সাথে ওই প্রজেক্ট শেষ করায় ডেপুটি ডাইরেক্টর হিসেবে পদন্নোতি দিয়ে তাকে ঢাকায় বদলি করা হয়। শাহজি বাজার প্রজেক্ট চলাকালীন সময়ে লালপুর ও কুষ্টিয়ার (নদীর ওপারের) অনেক লোককে বিভিন্ন চাকুরীতে নিয়োগ দিয়ে ছিলেন।
ইতোমধ্যে আবুধাবি থেকে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে একটি দল আসেন একজন অভিজ্ঞ হাইটেনশন পাওয়ার প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ারের খোঁজে। হাবিবুর রহমানের অভিজ্ঞতা ও মেধার কারণে নির্বাচিত করা হয়। সে সময় বাংলাদেশ থেকে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ারদের বিদেশ যাওয়া নিষিদ্ধ ছিল। আবুধাবী টিমের সুপারিশক্রমে ও বঙ্গবন্ধুর নির্দেশক্রমে ছাড়পত্র পেয়ে কনসালটেন্ট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে দুবাই পাওয়ার প্রজেক্টে যোগদান করেন। ওখানেও তিনি বাংলাদেশী অনেক নামিদামী ইঞ্জিনিয়ারদের নিয়ে গিয়ে কাজে লাগান।
জার্মানির বিশ্ববিখ্যাত সিমেন্স কোম্পানির সহযোগী প্রতিষ্ঠান লাহ মেয়ার ইন্টারন্যাশনাল সৌদি আরবে কয়েকটি বৃহৎ হাইটেনশন পাওয়ার প্রজেক্ট-এর কন্ট্রাক্ট পায়। তখন সিমেন্স কোম্পানীর পক্ষ থেকে ইঞ্জিনিয়ার হাবিবুর রহমানকে নির্বাচিত করে মক্কা শরীফে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। সেখানে তিনি ৩৮০, ১১০ ও ৩৩ কেভির প্রজেক্টগুলির কাজ সম্পন্ন করেন। ওই সময়ে সৌদি ইলেক্ট্রিসিটি কোম্পানীর দায়িত্বে থাকা সৌদি যুবরাজ নাইফ বিন আব্দুল আজিজের নির্দেশে হাবিবুর রহমানকে মদিনা শরিফ ও তাইয়েফে একই ধরণের প্রজেক্ট বাস্তবায়নে পাঠানো হয়। মদিনা শরিফের কাজের প্রায়ই শেষের দিকে তাকে ইন্দোনেশিয়াতে পাঠানো হয়। ওখানেও কাজ শেষ করার পর তাকে ফিলিপাইনে পাঠানো হয়। ফিলিপাইনের কাজ শেষ করে শারীরিক ও মানসিক কারণে ইস্তফা দিয়ে নাড়ির টানে দেশে ফিরে বিভিন্ন সামাজিক কাজের সাথে জড়িয়ে পড়েন।
চট্টগ্রামে থাকাকালীন তিনি সেখানকার রাইফেল ক্লাবের সদস্য হন। ওখান থেকেই তিনি পর পর দুইবার ‘অল পাকিস্তান রাইফেল শুটিং’ চ্যাম্পিয়ন হন। হংকং-এ ‘ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন শুটিং’ এ তৃতীয় হন। তিনি ঢাকাতে ডেপুটি ডিরেক্টর হিসেবে চাকুরীতে থাকা অবস্থায় ওয়াপদা ফুটবল ক্লাব তৈরিতে বিশেষ অবদান রাখেন এবং কিছু দিন কোচের দায়িত্বও পালন করেন। ওই সময় লালপুরের গণেশ, গৌরীপুরের মরহুম আব্দুর রাজ্জাক ও মন্টুকে নিয়ে যান ঢাকাতে দলে খেলার জন্য নিয়ে গিয়ে বিকেএসপিতে ভর্তিতে সহায়তা করেন। সিলেটের শাহজি বাজার প্রজেক্টের দায়িত্ব পালনকালেও হবিগঞ্জে ফুটবল খেলেন। তিনি ঢাকা টেনিস কমপ্লেক্সে খেলতেন নিয়মিত। মক্কা-মদিনাতে থাকাকালীন জেদ্দাহ শহরে বিদেশিদের সাথে খেলেন। আমেরিকাতে থাকাকালীন ও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই খেলাকেই বেছে নিয়েছিলেন। তিনি মাঝ বয়সে লালপুরে আসলে ফুটবল খেলতেন।
হাবিবুর রহমানের কাছে বিভিন্ন ধরণের ৮টি রাইফেল ছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে এক বিহারী ইঞ্জিনিয়ার ঢাকাস্থ আর্মি হেডকোয়ার্টারে রাইফেলগুলির বিষয়ে জানিয়ে দেয়। ইতোমধ্যে হাবিবুর রহমান ৬টি রাইফেল মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়ে দেন। তার ব্যাক্তিগত একটা ও রাইফেল ক্লাবের একটা রেখে দেন। আর্মিরা ওই দুটি রাইফেল নিয়ে নেয়। কিন্তু ওই দিন থেকেই ঘরে-বাইরে চলে তার উপর ভীষণ নজরদারি। যেন পালিয়ে মুক্তিযোদ্ধারের সাথে যোগ দিতে না পারেন।
এ সময় বিদ্যুতের খুঁটি টানা, রাস্তার ড্রাম টানা, বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঠিক করানো থেকে সব কাজ তাকে দিয়ে করানো হয়। এমনকি বাবা-মায়ের খোঁজ খবর পর্যন্ত নিতে দেয়নি।
ফিলিপাইন থেকে ফিরে লালপুর বাজার মসজিদ সংস্কারের কাজ শুরু করেন। স্কুলে তাঁর নামে একটা বৃত্তি চালু করেন। লালপুর বালিকা বিদ্যালয়ে স্থাপন করেন হাবিবুর রহমান হল ও ছাত্রী নিবাসের উন্নয়ন কাজ। তিনি অনেক মেধাবী ছাত্রকে বিদেশে উচ্চতর শিক্ষা নিতে সাহায্য করেন। গরীব মানুষদের রিক্সা-ভ্যানও কিনে দেন। আশে পাশের মাদ্রাসা ও মসজিদ নির্মাণে তার সহযোগিতা অনস্বীকার্য। তাঁর মৃত্যুর পর একমাত্র মেয়ে ড. শিরিন রহমান বাড়ির সাথে শুধুমাত্র মহিলাদের কোরআন শিক্ষার জন্য একটা মদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন।
তিনি মরণ ব্যাধি ক্যান্সার রোগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০১২ সালের ১৪ জানুয়ারি আমেরিকাতে ইন্তেকাল করেন।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top