logo
news image

নাটোরে রবীন্দ্র স্মৃতি রোমন্থন

ইমাম হাসান মুক্তি, প্রতিনিধি, নাটোর (লালপুর)
জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেনের নাটোর, রাণী ভবানীর নাটোর, উত্তরা গণভবনের নাটোর, কাঁচা গোল্লার নাটোর শুধু নয় গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত এই নাটোর।
নাটোরে তাঁর ‘সোনার বাংলা’ গানটা প্রথম গাওয়া হয়েছিল। নাটোরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস সভায় প্রথম বাংলা ভাষার প্রচলন করেন তিনি।
২৫ বৈশাখ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬০তম জন্মদিন। কবিগুরুর প্রতি জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (জন্ম: ২৫ বৈশাখ ১২৬৮, মৃত্যু: ২২ শ্রাবণ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ)। তিনি ছিলেন অগ্রণী বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, সংগীতস্রষ্টা, নাট্যকার, চিত্রকর, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক, অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পী ও দার্শনিক। তাকে বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক মনে করা হয়। রবীন্দ্রনাথকে ‘গুরুদেব’, ‘কবিগুরু’ ও ‘বিশ্বকবি’ অভিধায় ভূষিত করা হয়। রবীন্দ্রনাথের ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৩টি উপন্যাস ও ৩৬টি প্রবন্ধ ও অন্যান্য গদ্যসংকলন তার জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর অব্যবহিত পরে প্রকাশিত হয়। তার সর্বমোট ৯৫টি ছোটগল্প ও ১৯১৫টি গান যথাক্রমে গল্পগুচ্ছ ও গীতবিতান সংকলনের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় প্রকাশিত ও গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত রচনা ৩২ খণ্ডে রবীন্দ্র রচনাবলী নামে প্রকাশিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় পত্রসাহিত্য উনিশ খণ্ডে চিঠিপত্র ও চারটি পৃথক গ্রন্থে প্রকাশিত। এছাড়া তিনি প্রায় দুই হাজার ছবি এঁকেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের রচনা বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
নাটোরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর:
কলকাতার বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ থেকে ১৩৪৮ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত  অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ঘরোয়া গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ১৮৯৭ খৃষ্টাব্দের এপ্রিল মাসের ১০, ১১, ১২ তারিখ নাটোরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস সভা অনুষ্ঠিত হয়।
‘ভূমিকম্পের বছর সেটা। প্রোভিন্সিয়াল কন্ফারেস হবে নাটোরে। নাটোর মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ ছিলেন রিসেপশন কমিটির প্রেসিডেন্ট। আমরা তাকে শুধু ‘নাটোর’ বলেই সসম্ভাষন করতুম। নাটোর নেমন্তন্ন করলেন আমাদের বাড়ির সবাইকে। আমাদের বাড়ির সঙ্গে তার ছিল বিশেষ ঘনিষ্ঠতা, আমাদের কাউকে ছাড়বেন না-দীপুদা (দ্বিজেন্দ্রনাথের পুত্র দ্বিপেন্দ্রনাথ), আমার বাড়ির অন্য সব ছেলেরা, সবাই তৈরি হলুম, রবিকা (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) তো ছিলেনই। আরো অনেক নেতারা, ন্যাশনাল কংগ্রেসের চাঁইরাও গিয়েছিলেন। ন-পিসেমশায় (জানকীনাথ ঘোষাল), ডব্লিউ সি বোনার্জি, মেজো জ্যাঠামশায় (সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর), লালমোহন ঘোষ, সুরেন্দ্র ঝাড়ুজ্জে, আরো অনেকে।
স্পেশাল ট্রেন ছাড়বে আমাদের জন্য। রওনা হলুম সবাই মিলে হৈ-হৈ করতে করতে। চোপা-চাপকান পরেই তৈরি হলুম, তখনো বাইরে ধুতি পরে চলাফেরা অভ্যেস হয় নি। ধুতি-পাঞ্জাবি সঙ্গে নিয়েছি, নাটোরে পৌঁছেই এ-সব খুলে ধুতি পরব।
আমরা যুবকরা ছিলুম একদল, মহাফুর্তিতে ট্রেনে চড়েছি। নাটোরের ব্যবস্থা রাস্তায় খাওয়া-দাওয়ার কী আয়োজন! কিছুটি ভাবতে হচ্ছে না, স্টেশনে স্টেশনে খোঁজখবর নেওয়া, তদারক করা, কিছুই বাদ যাচ্ছে না- মহা আরামে যাচ্ছি। সারাঘাট তো গোছানো গেল। সেখানেও নাটোরের চমৎকার ব্যবস্থা। কিছু ভাববারও নেই, কিছু করবারও নেই, সোজা স্টীমারে উঠে যাওয়া।
নাটোরে তো পৌছানো গেল। এলাহি ব্যাপার সব। কী সুন্দর সাজিয়েছে বাড়ি, বৈঠকখানা। ঝাড়লণ্ঠন, তাকিয়া, ভালো ভালো দামি ফুলদানি, কার্পেট, সে-সবের তুলনা নেই-যেন ইন্দপুরী। কী আন্তরিক আদরযত্ন, কী সমারোহ, কী তার সব ব্যবস্থা। একেই বলে রাজসমাদর। সবকিছু তৈরি হাতের কাছে। চাকর-বাকরকে সব শিখিয়ে-পড়িয়ে ঠিক করে রাখা হয়েছিল, না চাইতেই সব জিনিস কাছে এনে দেয়। ধুতি চাদরও দেখি আমাদের অন্য পাট করা সব তৈরি, বাক্স আর খুলতেই হল না।
খাওয়া-দাওয়া, ধুমধাম, গল্পগুজব-রবিকাকা ছিলেন-গানবাজনাও জমত খুব। নাটোরও ছিলেন গানবাজনায় বিশেষ উৎসাহী। তিনিই ছিলেন রিসেপশন কমিটির প্রেসিডেন্ট। কাজেই তিনি সব ক্যাম্পে ঘুরে ঘুরে খবরাখবর করতেন। মজার কিছু ঘটনা থাকলে আমাদের ক্যাম্পে এসে খবরটাও দিয়ে যেতেন। খুব জমেছিল আমাদের। রাজসুখে আছি। ভোরবেলা বিছানায় শুয়ে, তখনো চোখ খুলি নি, চাকর এসে হাতে গড়গড়ার নল গুজে দিলে। কে কখন তামাক খায়, কে দুপুরে এক বোতল সোডা, কে বিকেলে একটু ডাবের জল, সব-কিছু নিখুত ভাবে জেনে নিয়েছিল-কোথাও বিন্দুমাত্র ক্রটি হবার জো নেই। খাওয়া-দাওয়ার তো কথাই নেই। ভিতর থেকে রানী মা নিজের হাতে পিঠে-পায়েস করে পাঠাচ্ছেন। তার উপরে নাটোরের ব্যবস্থায় মাছ মাংস ডিম কিছুই বাদ যায় নি, হালুইকর বসে গেছে বাড়িতেই, নানা রকমের মিষ্টি করে দিচ্ছে এবেলা ওবেলা।
রাউণ্ড টেবিল ফারেন্স বসল। গোল হয়ে সবাই বসেছি। মেজ্যোঠামশায় প্রিসাইড করবেন। ন-পিসেমশায় জানকীনাথ ঘোষাল রিপোর্ট লিখছেন আর কলম ঝাড়ছেন; তার পাশে বসেছিলেন নাটোরের ছোটে তরফের রাজা, মাথায় জরির তাজ, ঢাকাই মসলিনের চাপকান পরে। ন-পিসেমশায় কালি ছিটিয়ে ছিটিয়ে তার সেই সাজ কালো বুটিদার করে দিলেন।
আগে থেকেই ঠিক ছিল, রবিকাকা প্রস্তাব করলেন প্রোভিন্সিয়াল কনফারেন্স বাংলা ভাষায় হবে। আমরা ছোকরারা সবাই রবিকাকার দলে; আমরা বললুম, নিশ্চয়ই, প্রোভিন্সিয়াল কনফারেন্সে বাংলা ভাষার স্থান হওয়া চাই। রবিকাকাকে বললুম, ছেড়ো না, আমরা শেষ পর্যন্ত লড়ব এজন্য। সেই নিয়ে আমাদের বাধল চাঁইদের সঙ্গে। তাঁরা আর ঘাড় পাতেন না, ছোকরার দলের কথায় আমলই দেন না। তারা বললেন, যেমন কংগ্রেসে হয় তেমনি এখানেও হবে সব-কিছু ইংরেজিতে। অনেক তক্কাতক্তির পর দুটো দল হয়ে গেল। একদল বলবে বাংলাতে, একদল বলবে ইংরেজিতে। সবাই মিলে গেলুম প্যাণ্ডেলে। বসেছি সব, কনফারেন্স আরম্ভ হবে। রবিকাকার গাল ছিল, গানতো আর ইংরেজিতে হতে পারে না, বাংলা গানই হল। ‘সোনার বাংলা’ গানটা বোধ হয় সেই সময়ে গাওয়া হয়েছিল।
এখন, প্রেসিডেন্ট উঠেছেন স্পীচ দিতে ; ইংরেজিতে যেই-না মুখ খোলা আমরা ছোকরারা যারা ছিলুম বাংলা ভাষার দলে সবাই একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠলুম-বাংলা, বাংলা। মুখ আর খুলতেই দিই না কাউকে। ইংরেজিতে কথা আরম্ভ করলেই আমরা চেঁচাতে থাকি বাংলা, বাংলা। মহা মুশকিল, কেউ আর কিছু বলতে পারেন না। তবুও ঐ চেঁচামেচির মধ্যেই একজন দু-একটা কথা বলতে চেষ্টা করেছিলেন। লালমোহন ঘোষ ছিলেন ঘোরতর ইংরেজিদুরস্ত, তাঁর মতো ইংরেজিতে কেউ বলতে পারত না, তিনি ছিলেন পার্লামেন্টারি বক্তা-তিনি শেষটায় উঠে বাংলায় করলেন বক্তৃতা। কী সুন্দর তিনি বলেছিলেন। যেমন পারতেন তিনি ইংরেজিতে বলতে তেমনি চমৎকার তিনি বাংলাতেও বক্তৃতা করলেন। আমাদের উল্লাস দেখে কে, আমাদের তো জয়জয়কার। কনফারেন্সে বাংলা ভাষা চলিত হল। সেই প্রথম আমরা পাবলিকলি বাংলা ভাষার জন্য লড়লুম। (সূত্র: পৃষ্ঠা-৬৮, ৬৯, ৭০, ৭১, ৭২, ৭৩)

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top