logo
news image

আমার জীবনের প্রথম ধাক্কা ১৯৭১

এসএম মনজুর-উল-হাসান।।
ইংরেজী তারিখটা আমার মনে নেই। তবে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের বাংলা মাসের সাল হিসাবে সে দিনটা ছিল ১লা বৈশাখ। আমার ১৬ বছর বয়সের জীবনে একটা ভয়াল দিন। জীবনের প্রথম ধাক্কা ছিল প্রলয়ংকারী। মনে পড়ে ওই বয়সেও রাতে বাথরুমে গেলে বাসার কাজের মানুষ বা ভাই বোন অথবা মা কাওকে না কাওকে আমার পিছনে দাড়িয়ে থাকতেই হত। কারন আমি প্রচন্ড ভূতের ভয় পেতাম। আজো আছে তবে কম। তৎকালীন নাটোর মহকুমার লালপুর থানায় পিতার সরকারী কর্মস্থল। থানা কোয়ার্টারে আমরা পরিবারের সবাই বসবাস করতাম। ছোট থেকেই অভিনয়ের প্রতি ঝোক ছিল। বলতে পারেন একটা হিরো হিরো ভাব। তাই শরীর গঠনের জন্য আমার ব্যায়ামের অভ্যাস ছিল। বিকাল ৪টা নাগাদ ভাবলাম আজ ১লা বৈশাখ দিনটি হেলায় নষ্ট করা উচিৎ হবেনা।
বাংলা নতুন বর্ষের প্রথম দিন। তাহলে অন্যান্য দিনটিতে অবহেলা কম হবে। বাসার সবাই (মা, ভাই-বোন) দুপুরের আয়েশি ঘুমে মগ্ন। এই সুযোগে উঠোনে বারবেল, ডাম্বেল (ভার উত্তোলন সামগ্রী) নিয়ে একমনে ব্যায়ামে ব্যস্ত। ঠিক এসময় দূরে কোথাও চিৎকার চেচামেচির আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম এবং ক্রমেই ওই আওয়াজ দ্রুত নিকটবর্তি হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত কৌতুহলবসতঃ বাসার প্রাচীরের উপর দিয়ে যা দেখলাম তাতে আমার চোখ ছানাবড়া। অসংখ্য নারী পুরুষ বাচ্চারা রাস্তা দিয়ে দৌড়াচ্ছে আর চিৎকার করে বলছে, পালাও পালাও। এ সময় কোন কোন নারীর ১২ হাত শাড়ীর ৮ হাত খুলে মাটিতে লুটাচ্ছে। সে দিকে কারো লক্ষ নেই। সবাই ঝড়ো বেগে দৌড়াচ্ছেন। কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানলাম, ট্রাক বোঝাই পাক সেনারা এদিকেই আসছে। ব্যাস্, আর কিসের ১লা বৈশাখের ব্যয়াম। চিৎকার করে পরিবারের সবাইকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুললাম।
আমাদের একটা সুবিধা ছিল ২৬ মার্চের পর থেকেই আমার মা এরকম একটা আসংখ্যা করছিলেন তাই, তিনি (মরহুম) সব সময় একটি কাপড়ে গহনা ও টাকা পয়সা বেধে পোটলা করে রাখতেন। ছোট ভাইয়ের জন্য দুধ ফ্লাক্সে রেখে দিতেন। মুহূর্তের মধ্যে আমরা ওই পোটলা আর দুধ নিয়ে বাসায় সব ফেলে, দরজা-জানালা খোলা রেখে নিরুদ্দ্যেশে বেড়িয়ে পড়লাম। বাসার পিছনে ছিল বিশাল ঈদগাঁহ মাঠ (যেখানে এখন লালপুর স্বাস্থ্য কমেপ্লেক্স) তার খুব নিকটেই ইউনিয়ন কাউন্সিল অফিসের (তখন সবাই বোর্ড অফিস বলতো) সচিব সাহেবের বাড়ীতে আশ্রয় নিলাম। সেখানে গিয়ে দেখলাম সচিব সাহেবের পরিবারও বাড়ী ছেড়ে পালিয়েছে। যাই হোক এ জায়গাটা আমাদের বাসা থেকে মাত্র দুশো গজ দুরে। তারপরও নিরাপদ বোধ করলাম। বাড়ী থেকেতো পালিয়েছি। সে সময় এরকম প্রায় সবার হয়েছে। সে বাড়ীতে গিয়েছি দেখতাম তারাও অন্য বাড়ীতে আশ্রয় নিয়েছেন। যুদ্ধের সময় যখন যে গ্রামে পালিয়েছি। গিয়ে দেখি তারাও অন্য গ্রামে পালিয়ে নিরাপদ বোধ করেছেন। শুধু দু’একজন মুরুব্বী দুর থেকে বাড়ীর মালামাল পাহারা দিচ্ছেন। সত্য হল পাক আর্মীরা সব গ্রামেই ছৌঁ মেরেছে দিনের পর দিন রাতের পর রাত। কি ভয়ংকর! কি বিভৎস। কেও মরেছে কেও বেচেছে। যারা বেচে গেছে তারা আবার অন্যগ্রামে পালিয়েছে। বাসা থেকে পালানোর পর গোপনে খোজ নিয়ে জানলাম ১৭ নং পাঞ্জাব রেজিমেন্টের ৫৮টি লরি সহ তারা লালপুর থানায় অবস্থান নিয়েছে। ১৭ নং পাঞ্জাব রেজিমেন্টের প্রধান ছিলেন একজন বেলুচ অফিসার। ওই সময় তিনি লালপুরে কোন হত্যাকান্ড চালাননি। তার সামনে দিয়ে বাঙ্গালী দলে দলে পালিয়েছে। কিন্তু কাউকে কিছু বলেননি। তিনি জানতে চাচ্ছিলেন কিভাবে পদ্মা নদী পার হয়ে কুষ্টিয়া যাওয়া যায়। সেখানে (কুষ্টিয়া) অবস্থানরত প্রতিরোধ বাহিনীর (দেশের পুলিশ, বিডিআর, আনসারসহ সাধারণ জনগন নিয়ে গঠিত) পিছন থেকে আক্রমন করা যায়। তারা ম্যাপে লালপুর পদ্মা নদীর তীরে যাবার রাস্তা খুজে পাচ্ছিলেন না। কিন্তু, সাধারণ মানুষ জানায়, ওদিকে বিলাঞ্চল, রাস্তা নেই। মানুষ পায়ে হাটার জন্য মাটির রাস্তা ব্যবহার করে। তাও বৃষ্টিতে কর্দমাক্ত হয়ে গেছে। সেনা অফিসার ম্যাপ অনুযায়ী রাস্তা না পেয়ে পাবনা, ঈশ^রদীর দিকে ফিরে যায়। যাবার সময় একটি লরি থেকে টপ টপ করে রক্তের ফোটা পড়ছিল। অবশ্য সে লরিটি ত্রিপল দিয়ে ঢাকা ছিল, কেও কিছু দেখতে পায়নি।
৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষনের পর থেকে কেন জানি লালপুর জনশূণ্য হতে থাকে। প্রয়োজন ছাড়া কেও বাড়ী থেকে বের হতে চায়না। চারিদিকে প্রখর রৌদ্রতাপ, খা খা করে। একলা বের হতেও ভয় লাগে। মাঝে মাঝে কোকিলের ডাক শোনা যায়। দেশের প্রথম স্বাধীনতার ডাক ছিল ২৩শে মার্চ। আওয়ামী লীগে’র রাজনৈতিক কর্মসূচী ছিল ২৩ মার্চ  দেশব্যাপী  প্রথম স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন। সারা দেশের মত  সেদিন তৎকালীন লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আফতাব উদ্দিন এলাকার গণ্যমান্য ব্যাক্তিবর্গ,রাজনৈতিক নেতৃবর্গ, ছাত্র ও সাধারন জনগণকে নিয়ে থানায় উড্ডয়মান পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের ম্যাপসহ লাল-সবুজের পতাকা আনুষ্ঠানিক ভাবে উত্তোলন করে সেখানেই দোয়া ও মোনাজাত পরিচালনা করেন। এরপর ওসি সাহেব  আওয়ামী লীগসহ উপস্থিত প্রতিরোধ বাহিনীকে থানার মালখানা খুলে সমস্ত অস্ত্র (খুব সম্ভবত ৭/৮টি থ্রী নট থ্রী রাইফেল ছিল) বিতরন করে দেন,যাতে শত্রুর মোকাবিলা করা যায়। সেই ৭/৮টি রাইফেলকে সম্বল করেই লালপুরে প্রতিরোধ বা মুক্তিযুদ্ধের সূচনা। এখানে বলে রাখা ভাল,সে সময় লালপুর থানায় ওসি সাহেবের সাথে কর্মরত ছিলেন,একজন সেকেন্ড অফিসার (নন বেঙ্গলী, নাম মনে নেই), একজন জামাদার (এএসআই), একজন নন বেঙ্গলী কনষ্টবল ও একজন বাঙ্গালী কনষ্টবল। বাকি অন্যান্য নন বেঙ্গলী কনষ্টবলরা থানা থেকে পালিয়েছিল। জানা যায়, পথের মধ্যে বিক্ষুদ্ধ জনতা তাদের পিটিয়ে মেরে ছিল। এদের একজন মাথায় গুরুতর আঘাত নিয়ে থানায় ফিরে আসে। অনুরুপ থানার সেকেন্ড অফিসার (এস আই, নন বেঙ্গলী) ছুটি নিয়ে রেল পথে বাই সাইকেলে দিনাজপুর যাবার পথে তিনি বাগাতিপাড়ায় বিক্ষুদ্ধ বাঙ্গালীদের হাতে ধরা পড়ে নিহত হন। ঠিক এসময় পাকিস্তান বাহিনীদের প্রতিরোধ, এলাকার শান্তি শৃংখলা তদারকি ও নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল চালু রাখার জন্য মিলের প্রশাসক (জিএম) লেফটেনেন্ট আনোয়ারুল আজিম সাহেব লালপুর থানার ওসি’কে সার্বক্ষনিক ড্রাইভারসহ একটি জিপ প্রদান করেন। সেই থেকে লালপুর থানা হয়ে উঠে মুক্তিযুদ্ধ বা প্রতিরোধ যুদ্ধের কেন্দ্রস্থল।
ওই সময় স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ নিরাপত্তার জন্য ভারতে পাড়ি জমিয়েছিলেন। নাটোর মহকুমার প্রশাসক জনাব কামাল উদ্দিন ও পুলিশ ইন্সপেক্টর( নাম অজ্ঞাত, ছোট  মহকুমা হবার কারনে এ মহকুমায় দায়িত্ব পালন করতেন একজন ইন্সপেক্টর)। লালপুর থানার ওসি তাদের ভারতে যাবার ব্যবস্থা করেছিলেন। এদিকে জনগণ নিরাপত্তা ও নেতৃত্বের অভাব বোধ করতে থাকেন। লালপুর ছিল হিন্দু প্রধান এলাকা ফলে, নিরাপত্তা আরো প্রকট হয়ে উঠে। এমতাবস্থায়, মিল প্রশাসক আনোয়ারুল আজিম সাহেব নিয়োমিত লালপুর থানায় আসতেন এবং প্রতিরোধযোদ্ধাসহ ওসি সাহেবের সাথে পরামর্শ করে এলাকায় লুটপাট ঠেকানোসহ পাকসেনাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে রাতে পাহারা এবং প্রতিরোধ বাহিনীর পরের দিনের কার্যক্রমের দিক নির্দেশনা দিতেন। আনোয়ারুল আজিম সাহেব মনে করতেন এলাকায় নেতৃত্ব শূন্য ও আইন শৃংখলার চরম অবনতি এ অবস্থায় এলাকা নিরাপদ রাখার জন্য তিনি অব্যাহত ভাবে থানার ওসি’কে সহযোগিতা করে যাচ্ছিলেন। এটাও ঠিক যে ওই সময় একজন ওসি’র সামনে দাড়িয়ে কথা বলার মানুষ খুব কম ছিল। ৫ মে, মিল প্রশাসক (জিএম) আনোয়ারুল আজিম সাহেব নিহত হবার পরেও  মে মাস শেষ পর্যন্ত ওসি সাহেব দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পাক বাহিনী লালপুরের নিয়ন্ত্রণ নিতে থাকলে শেষ পর্যন্ত তিনি লালপুর থেকে আত্বগোপন করার আগে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়কে আত্মরক্ষার জন্য পালানোর পরামর্শ দেন। এর সাক্ষি ছিলেন বুধপাড়া নিবাসী শ্রীহরি বাবু ও আরো একজন (নাম মনে করতে পারছিনা,মদন বাবু হতে পারেন (কাশাঁ পিতলের ব্যবসা ছিল)। এভাবেই এলো ৩০মার্চ।
পাকিস্তান সেনা বাহিনীর একটি দলছুট জিপে কিছু সেনা সদস্য প্রতিরোধ যোদ্ধাদের ধাওয়া খেয়ে লালপুর ময়না গ্রামে আজাহার মাষ্টার সাহেবের বাড়ীতে আশ্রয় নিয়ে বাড়ীর সবাইকে বের করে দেয়। খবরটি চাউর হবার সাথে সাথে জেলার বিভিন্ন থানা থেকে সেখানে দলে দলে গণজমায়েত হতে থাকে। কৌতুহলি জনতার চাপে সেনা সদস্যরা অন্যত্র পালাতে পারেনি। ইতোমধ্যে, লালপুর থানার ওসি সাহেবের নিকট খবরটি পৌছে যায়। খবর পেয়ে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের প্রশাসক আনোয়ারুল আজিম সাহেবও দ্রুত লালপুর থানায় চলে আসেন। শলা পরামর্শের পর ওসি জানান,আমার থানায় পর্যাপ্ত পুলিশ নেই, অস্ত্র-সস্ত্র সব বিতরন করে দেয়া হয়েছে। এ অবস্থায় খালি হাতে একটি সশস্ত্র ও চৌকস বাহিনীর মোকাবিলা খুব কঠিন হবে। তিনি তখন থানার সাবেকি আমলের আড়াইপাক, তিনপাক ঘোরানো টেলিফোনে সারদা পিটিসি (চারাঘাট) ইপিআর ক্যাম্পে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন। তিনি ঘটনা জানিয়ে পাকসেনাদের আটকের জন্য সাহায্য চান। সারদা পিটিসি থেকে একজন ইপিআরের অফিসার সাহায্যের আশ্বাস জানিয়ে দ্রুত একদল ইপিআর প্রেরনের সিদ্ধান্ত জানান। ইতোমধ্যে সাধারন  মানুষসহ শত শত উপজাতি তীর,ধনুক,ফালা ইত্যাদি নিয়ে থানায় উপস্থিত হন। ইপিআর সদস্য আসার অপেক্ষা করার সময় হটাৎ একটি বোমারু বিমান লালপুর থানার উপর দিয়ে চক্কর দিতে থাকে। তখন কারন বোঝা যায়নি। পরে বোঝা গেছে, দলছুট ওই সেনা সদস্যের মধ্যে একজন ছিলেন জেনারেল টিক্কা খানের ভাগিনা। যে টিক্কা খান বাঙ্গালীদের সাইজ করার জন্য পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান মাত্র কয়েকদিন আগে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর করে পাঠিয়েছিলেন। টিক্কা খান ঢাকা তেজগাঁ এয়ারপোর্টে নেমে উপস্থিত সামরিক কর্মকর্তাদের বলেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানের জমিন চাই,বাঙ্গালী নয়। কী ধৃষ্টতা। কিন্তু, বিধি বাম। যুদ্ধের শুরুতেই ধরা পড়ে গেল তারই ভাগিনা মেজর আসলাম হোসেন খান(আসলাম রাজা)সহ অরো দুজন। বিক্ষুদ্ধ জনতা তাদের নির্মম ভাবে হত্যা করে।
শুধু টিক্কা খানের ভাগিনা জন্যই সেদিন তাদের রক্ষা করতে বিমান ও হেলিকপ্টার হামলার পায়তারা করেছিল। কিন্তু, সঠিক তথ্য বা তাদের অবস্থান জানতে না পারার কারনে উদ্ধার তৎপরতা চালাতে পারেনি। এদিকে দুপুর ২টা নাগাদ ৬/৭ জনের একটি ইপিআর দল পিকআপ ভ্যানে লালপুর থানায় প্রবেশ করে। সামান্য পরামর্শের পরে তারা ওসি সাহেবকে বলেন স্যার, সময় খুব কম এমনই রেরুতে হবে। তারা পানি খেতে চান এ সময় ওসি সাহেব তার ছেলেদের পানি আনতে বলেন। জগে পানি দেখে তারা বলেন কলস ভর্তি নিয়ে আসো। গাড়ী ধীরে ধীরে চলতে শুরু করে সে অবস্থাতেই তাদের পানি খাওয়ানো হয়। তাদের একটি পিকআপে ৬/৭ জন ইপিআর সদস্য, ওসি সাহেবের জিপে (মিল কর্তৃক পাওয়া) ৩/৪ জন। সেদিন ওসি সাহেবের পরনে ছিল একটি কালো প্যান্ট ও সবুজ হাফ সার্ট ও রিভালবার। তিনি সুগার মিলের প্রশাসক আনোয়ারুল আজিম সাহেবের নিকট থেকে বিদায় নিলেন। বাসার দরজায় তার পরিবার, সন্তান দাড়িয়ে থাকলেও বিদায় নেবার সময় পাননি।
যুদ্ধের ময়দান ময়না:
বিলের মধ্যে আজাহার মাষ্টার সাহেবের বাড়িতে অবস্থান নিয়েছে পাক হানাদার বাহিনী। সেখান থেকে ভারি অস্ত্রের গুলি চালাচ্ছে। এর প্রতিপক্ষ হল লালপুর থানা থেকে বিতরন করা মান্ধাত্তা আমলের ওই থ্রী নট থ্রী রাইফেল আর অদক্ষ কিন্তু সাহসে বলিয়ান বীর বাঙ্গালী। পাশাপাশি উপজাতিরা তীর ধনুক চালাচ্ছে। ঠিক ওই সময় ঘটলো একটি মজার ঘটনা। ওসি আকতার উদ্দিন সাহেবের ঠিক পাশেই উপুর হয়ে শুয়ে জনৈক ব্যক্তি পাক সেনাদের উদ্দেশ্যে ফায়ার করতে করতে এক সময় ওসি সাহেবকে বললো স্যার, আমাকে চিনতে পারছেন। ওসি সাহেব বল্লো না। তখন তিনি বল্লেন কেন স্যার আমি যে সেই আকবর ডাকাত। আপনি থানায় যোগ দেবার পর থেকেই আমাকে ধরার চেষ্টা করছেন। যুদ্ধে এর থেকে বড় রসিকতা আর কি হতে পারে। চাকুরী জীবনে ওসি ছিলেন একজন সৎ, সাহসী ও জাদরেল পুলিশ কর্মকর্তা। অপরাধী কমানো ছাড়া পেতনা। কিন্তু, আজ থানার ওসি আর ডাকাত পাশাপাশি উপুর হয়ে শুয়ে যুদ্ধ করছেন দেশ মাতৃকাকে স্বাধীন করার জন্য। এটাই দেশপ্রেম। যাই হোক বিকাল থেকে পাক সেনাদের গুলি বন্ধ হয়ে গেল। কেন ? কেও বুঝতে পারছেনা। দুই পক্ষই চুপচাপ। এদিকে গ্রামের মাহিলারা অনবরত রুটি অন্যান্য শুকনা খাবার, পানি সরবরাহ করতে থাকে। ইতোমধ্যে কেন পাক সেনারা থেমে গেলে জানার জন্য ওই এলাকার মঙ্গল ঠাকুর (২২) পুরো নাম শৈলেন কুমার চক্রবর্ত্তী একটি খেজুর গাছের উপরে উঠে পাকসেনাদের অবস্থান দেখার চেষ্টা করে। ঠিক ওই সময়ই তাদের ছোড়া একটি গুলি শ্রী মঙ্গল ঠাকুরের মাথা ভেদ করে  বেরিয়ে যায়। সে গাছ পড়ে যায় এবং সাথে সাথে মৃত্যু বরণ করে। ময়না যুদ্ধে একমাত্র মঙ্গল ঠাকুরই নিহত হয়েছিল। কোন কোন লেখক ওই যুদ্ধে শত শত নিহত হয়েছিল বললেও,সেটা ঠিক নয়। লেখককে যারা তথ্য দিয়েছিল,মিথ্যা দিয়েছিল। প্রতিরোধ বাহিনীর এক সময় ধৈর্য্যরে পরীক্ষা শেষ হলে পাকসেনাদের অবস্থান জানার জন্য খুব শতর্কভাবে একদল প্রতিরোধ যোদ্ধা ওই বাড়ীর দিকে অগ্রসর হয়। সেখানে গিয়ে বোঝা গেল তাদের যুদ্ধের রসদ ফুরিয়ে গেছে। তারা মোট তিন জন ছিল। তাদের সামরিক পোষাক খুলে একজন পড়েছেন শাড়ী(শরীরে প্যাচ দেয়া)অন্য দু’জন মশাড়ি পড়েছেন। এ অবস্থায় তাদের পিঠমোড়া বেধে নিয়ে আসা হয়। সবাই ওসি সাহেবের কাছে হস্তান্তর করতে চাইলে তিনি জানান, থানায় নিরাপত্তার জন্য কোন পুলিশ বা অস্ত্র নেই। তাদের ব্যাপারে যে কোন সিদ্ধান্ত নেবার আগে প্রতিরোধ যোদ্ধাদের হাতেই তাদের তুলে দেন। এ সময় সুগার মিলের কর্মচারী হামিদুল হক চৌধুরী (পোড়া বাবু) সহ অনেকে ছিলেন। ওই দিন খান সেনাদের সুগার মিলে আটকিয়ে রাখা হয়।
পরের দিন লালপুর শ্রী সুন্দরী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের উত্তর দিকে ক্লাস রুমের সামনে শত শত উৎসুক জনতার (সেদিন হাট বার ছিল) সামনে তিনজনকে পোড়াবাবু  থ্রী নট থ্রী রাইফেল দিয়ে গুলি করে হত্যা করে। এর আগে তাদের পেটে ড্যাগারের আঘাৎ করা হয়েছিল। উৎসুক জনতার ধৈর্য্যরে বাধ ভেঙ্গে গেলে তারা ধারালো দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলে পরে এবং দ্রুত মৃত্যু নিশ্চিত করে। পরে এদের লাশকে সুগার মিলের গোবিন্দপুর ফার্মের ভাগাড়ে ফেলে দেয়া হয়। এরা ছিল মেজর আসলাম হোসেন খান ওরফে রাজা খান (ওই সময় পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল টিক্কা খানের ভাগিনা),ক্যাপ্টেন হায়দার আলী খান ও তাদের জিপ গাড়ীর ড্রাইভার (সেনা সদস্য, নাম অজ্ঞাত)। তাদের মৃত্যুর আগে ক্যাপ্টেন হায়দার আলী খান ও সেনা সদস্য অনেক কানাকাটি করছিলেন।তিনি জানান, তার মা বাঙ্গালী বাবা পাকিস্তানী। সে দেখতেও ছিল বাঙ্গালীর মত। ক্যাপ্টেন হায়দারই জানান মেজর আসলাম খান জেনারেল টিক্কা খানের ভাগিনা। এ জন্যই তাকে উদ্ধারের জন্য হেলিকপ্টার ও যুদ্ধ বিমান পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু,তারা আমাদের অবস্থান নিশ্চিত হতে পারেনি।
নর্থ বেঙ্গল সুগারমিল হত্যাকান্ড:
লালপুরের সব চাইতে দু:খজনক ঘটনা ছিল সুগার মিলের হত্যাকান্ড। ওইদিন (৫,মে) ইশ্বরর্দী থেকে একটি জিপে ৭/৮জন পাকসেনা ও বিহারী লালপুর বাজার হয়ে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলে প্রবেশ করে। ওই সময় এর কারন হিসাবে জানা গিয়েছিল মিলের বিহারী শ্রমিকদের সাথে বাঙ্গালী শ্রমিকদের সাথে দীর্ঘদিন থেকে দ›দ্ধ ছিল। তাদের শাস্তি অথবা ভয় দেখাবার জন্য বিহারীরা সামান্য ৪/৫জন পাকসেনাকে ম্যানেজ করে নিয়ে আসে। এখানে বলে রাখা ভাল ঐসময় সুগার মিলে প্রচুর বিহারী চাকুরী করতো। তারা প্রথমে কিছু লুটপাট করে। পরে মিলের চীফ একাউন্টেন্ড ও ক্যাশিয়ারকে জিম্মি করে মিলে রক্ষিত সমস্ত টাকা নিয়ে নেয়। সেদিন সবার বেতন দেবার তারিখ ছিল। সুগার মিলের হত্যাকান্ডের বিষয়টি ওসি (লালপুর) সাহেবের নিকট থেকে জানা গিয়েছিল, ৭ মার্চের পর থেকে প্রতিরোধ যুদ্ধে জয় বাংলার পতাকা, যোদ্ধাদের সম্ভবমত বিভিন্ন খরচ দেয়া,গাড়ীর তেল খরচ ইত্যাদি  লে: আনোয়ারুল আজিম সাহেব ডাইরিতে হিসাব রাখতেন। এব্যাপারে ওসি সাহেব তাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন,কাগজপত্রে হিসাব না রাখতে। কিন্তু, তিনি জানিয়েছিলেন, সরকারী সম্পদ ব্যয় করে হিসাব না রাখলে পরবর্তী সময়ে কি ভাবে হিসাব দিবন। অত্যন্ত দু:খজনক ৫ মে, ঘটনার দিন ওই ডাইরীটিই  তার অফিস টেবিলের উপর রক্ষিত ছিল।
মিলের অভ্যন্তরে থাকা পাকসেনা ও বিহারীরা বিনা অনুমতিতে আজিম সাহেবের অফিসে প্রবেশ করে। কথাবার্তার এক পর্যায়ে ওই ডাইরী একজন সেনা হাতে তুলে নেয়। পড়তে পড়তে সে এক সময় উত্তেজিত হয়ে উঠে এবং চিৎকার করে বলে,তুমি জয় বাংলার লোক, তুমি মুক্তিযোদ্ধাদের টাকা দাও। এর পরেই তাকে জোর করে জামা ধরে টেনে অফিস থেকে বের করে নিয়ে আসে। এ সময় আজিম সাহেবের সাথে পাকসেনাদের তর্কবিতর্ক হয়। তাকে ধরে নিয়ে যাবার সময় আশে পাশে যাকেই পেয়েছে তাদেরই ধরে নিয়ে গেছে। পুকুরপাড়ে নিয়ে মোট ৪২জন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করে। এ সময় সাথে থাকা বিহারীরা পাক সেনাদের সাহায্য করে। পুকুর পাড়ে এই হত্যাকান্ড পর্যালোচনা করলে দেখা যায় খুবই অল্প সংখ্যক পাকসেনা ও বিহারী ছিল। তারা যদি মিলে হত্যাকান্ডের পরিকল্পনা নিয়ে আসতো তাহলে বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে এসে শত শত মানুষকে হত্যা করতে পারতো। কারন তখন মিল চালু ছিল এবং ওই দিন বেতন দেবার কথা ছিল। পরিস্থিতি এমন ভিতিকর ছিল যে, মাত্র কয়েকজন সেনা সদস্যকে  মিল শ্রমিকরা  আটকিয়ে হত্যা করতে পারেনি। যা খুবই সম্ভব ছিল। নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের ইতিহাসে এটি একটি দু:খজনক অধ্যায়। আজো এলাকাবাসী দিনটিকে স্মরন করে। এর শেষ পরিনতি ছিল এমন,একদিন ঢাকা থেকে একটি কার লালপুর থানায় আসে। জানা যায়, তিনি মরহুম আনোয়ারুল আজিম সাহেবের শ্বশুর। তিনি তার মেয়েকে নিয়ে যেতে এসেছেন। কিন্তু, আজিম সাহেবের স্ত্রী পালিয়ে কোথায় অবস্থান করছেন কেও জানেনা। ওসি সাহেব বিভিন্ন জায়গায় খোজ করে মিসেস আজিম সাহেবকে তার বাসায় নিয়ে আসেন এবং তার বাসায় খাওয়া দাওয়া সেরে পিতার সাথে ঢাকা চলে যান। এদিকে ওসি সাহেব নিরাপত্তার জন্য থানা কোয়ার্টারে থাকতেননা। হিন্দু সম্প্রদায় তাদের নিরাপত্তার কথা ভেবে ওসি সাহেবের পরিবারসহ তাদের সাথে বসবাস করতে অনুরোধ জানান। সেই থেকে তিনি হিন্দু অধ্যুষিত বুধপাড়া’র শ্রীহরি বাবুর বাড়ীতে পাক আর্মীর হাতে এরেষ্ট হবার আগ পর্যন্ত বসবাস করতেন। এদিকে দেশের পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হয়ে গেলে তিনি তার দু’যুবক সন্তানকে মে মাসে ভারতে পাঠিয়ে দেন। এরপর তার স্ত্রীসহ অন্যান্য সন্তানকে সুগার মিলের ট্রাকে খালি হাতে পাবনা গোপন স্থানে পাঠিয়ে দেন। খালি বাসা পেয়ে আসবাবপত্রসহ তার সমস্ত কিছু লুট হয়ে যায় এবং দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত ওসি সাহেব সন্তাদের নিয়ে মেঝেতে শুয়েই দোর্দন্ড প্রতাবে থানা শাসন করেছেন।
পরিবারের সবাই বেঁচে ছিল বলে লুট হওয়া মালামালে তার আফসোস ছিলনা। এর কিছুদিন পরেই প্রাথমিক ভাবে গড়ে উঠা পাকিস্থানী কিছু দালাল এবং সেই নন বেঙ্গলী কনষ্টবল যে মাথায় গুরুতর আঘাৎ পেয়ে থানায় ফিরে এসেছিলেন যার চিকিৎসা,খাওয়ার ব্যবস্থা ওসি সাহেব করেছিলেন সেই বেইমানরাই পাক সেনাদের কাছে ধরিয়ে দেন। এর পরেই লালপুরবাসী এক নিকটজন ও সৎ পরামর্শদাতাকে হারিয়ে ফেলেন(সময়টা ছিল ১৯৭১ সালের মে মাস পর্যন্ত)। এ খবর পাবনা তার স্ত্রীর কাছে পৌছলে তিনি কৌশলে তার স্বামীর পক্ষে মার্শাল ল্ কোর্টে মামলা দায়ের করেন। কেস চলতে থাকায় পাকসেনারা তাকে হত্যা করতে পারেনি।
তাকে রাজশাহী জেল থেকে নাটোর জেলে স্থানান্তর করা হয়। ১৪ ডিসেম্বর,১৯৭১ তিনিসহ নাটোর জেলখানা ভেঙ্গে বেরিয়ে আসে সমস্ত কয়েদি। এ সময় তার সাথে ছিল বরিশালের একজন ডিসি (নাম অজ্ঞাত), নওগাঁ বদলগাছী থানার ওসি খাদেমুল ইসলাম খান (তিনি পরে নাটোরের এ এস পি হয়ে এসেছিলেন)। ওসি আফতাব উদ্দিন সাহেব জেল থেকে বেরিয়েই পাবনায় স্ত্রী, সন্তানদের সাথে সাক্ষাৎ করে ১৭ অথবা ১৮ ডিসেম্বরে রাজশাহীর এসপি আবু তালেবুর রহমান সাহেবের সাথে সাক্ষাৎ করলে তিনি রাজশাহী বোয়ালিয়া থানার ওসি হিসাবে তাকে বদলি করেন। ভারতে প্রেরীত তার বড় দুই ছেলে জানুয়ারী মাসে দেশে ফিরে আসেন।  

* এসএম মনজুর-উল-হাসান: সাংবাদিক

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top