logo
news image

চক্ষু অন্ধ হয় না ওদের অন্তর অন্ধ

-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম
মিয়ানমারে জান্তাবিরোধী বিক্ষোভে মার্চ ২৭ সকালে দেশটির সসশ্র বাহিনী দিবস পালন করার সময় সকালে জানা গিয়েছিল ৯৩ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। রাতে জানা গেল সেদিন ১৪১ জনকে মেরে ফেলা হয়েছে। এনিয়ে এ পর্যন্ত দেশটিতে অন্তত ৫০০ জনের অধিক সামরিক জান্তাদের গুলিতে নিহত হয়েছেন। জান্তাদের সবার চোখ আছে, কেউ অন্ধ নন। মনে হলো তাদের অন্তরগুলো অন্ধ হয়ে গেছে ক্ষমতার লোভে।
মিয়ানমারে সেদিন সশস্র বাহিনী দিবস পালন করা হচ্ছিল। জান্তাদের সেই জমকালো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সহ আটটি দেশের রাষ্ট্রদূতগণ অংশ নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছেন। একদিকে বিউগলের মূর্চ্ছণায় করুণ সুরের আড়ালে অতিথিদের গরম পাণীয় দিয়ে আপ্যায়ন চলছিল। অন্যদিকে কারেন বিদ্রোহী অধ্যুষিতদের জেলাগুলোতে চলছিল বোমারু বিমানের আক্রমণের গর্জন। কারেনদের গ্রামে আগুন জ¦লছিল। তারা প্রাণভয়ে বসতি ছেড়ে থাই সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে জীবন রক্ষা করার চেষ্টা করছিল। নিজের দেশের মানুষের ওপর নিজেদের যুদ্ধবিমান দিয়ে আক্রমণ করার ঘটনায় অনেকে বিস্মিত হয়েছেন।
কারেন শরনার্থীদেরকে থাইল্যান্ডের জনগন তাঁদের দেশে ঢুকতে বাধা দিয়েছে বলে সংবাদ প্রকাশিত হবার পরদিন থাই প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমার থেকে আগত শরনার্থীদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন- আপনাদের ভয় নেই। আমরা এতগুলো নিরীহ মানুষকে তো আর যুদ্ধের ভয়াবহতার মাঝে পুনরায় ঠেলে দিতে পারি না। থাই প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যে মনে হয়েছে- ওনার চোখ অথবা অন্তর কোনটাই অন্ধ হয়নি। কিছু ভাল মানুষ এখনও নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়াতে দ্বিধা করেন না।
মোদ্দাকথা হলো- ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে যাওয়া মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। এজন্য অনেক সাদা মানুষের মনটা কালো হয়ে যায়। তাদের অন্তরগুলো বিষের ছোবল দেয়ার জন্য নিশপিশ করে সবসময় বিচলিত থাকে। আর তখনই শুরু করে নির্মম আচরণের আদেশ দিতে। এভাবেই তো যুদ্ধ শুরু হয়- বেজে উঠে হঠকারীতার মূহর্মুহ আদেশে চরম নিষ্ঠুরতার হুঙ্কার। সূচিত হয় টুটি চেপে ধরা ভয়ংকর পঙ্কিল পথে নিরীহ মানুষকে হয়রানি করার কালো অধ্যায়।
অনেক মানুষের দেহের চামড়ার রঙ সাদা। কিন্তু অন্তরটা কালিমালিপ্ত। এটা তাদের কোন হৃদরোগ বা মনোরোগ নয় যা চিকিৎসকের নিকট গেলে ভাল হয়ে যাবে। বরং এটা অন্তরের অন্ধতা। যে অন্ধতা তৈরী হয় অসীম লোভ থেকে। সাীমাহীন পাপ, দৃনীতি, অন্যায় কাজের ধারক-বাহক হয়ে কেউ যখন চরম ক্ষমতাশীল হয়ে ন্যায়-অন্যায় ভুলে যায় তখন ঘটতে থাকে এই অন্ধত্বের আধাঁর ছড়ানোর প্রক্রিয়া। দুনিয়াব্যাপী এভাবে পাষাণ, কপট, মিথ্যুকরা দখলদারিত্বের রাজত্ব কায়েম করে ফেলে। চালু হয়ে যায় তার পাশে চাটুকার তেলবাজদের আড্ডাখানা। তারা সেই পাষাাণ নেতাকে যাবতীয় অন্ধকার থেকে আড়াল করে শুধু পাশে ঘুরঘুর করে গুনগান গায় ও চার দেয়ালের মাঝে বাহবা দিয়ে মশগুল রাখে। এভাবে চালু হয়ে যায় মানবাধিকার হরণ করার অন্ধকার যুগ। তখন ঠেকায় কে?
কিন্তু সময় কাউকে ক্ষমা করে না। আত্মান্ধ নেতারও এক সময় দুর্দিন আসে। এক সময় চাটুকাররা তার কাছ থেকে সট্কে পড়ে। কারণ তারা দুধের মাছি।
 আপাদমস্তক দুর্নীতিতে অভ্যস্ত চাটুকার জনগোষ্ঠীকে নিয়ে দেশে দেশে এভাবে ভোগবাদী চরিত্রের সমাজ ও মানবশ্রেণি গড়ে উঠে। তারা নিজেরে ছাড়া কাউকে অন্তর দিয়ে বিশ^াস করতে চায় না। তারা সবসময় ভীতু স্বভাবের হয়ে থাকে এবং কারণ-অকারণে চমকে উঠে। এমনকি পরিবারের সদস্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন হতে দেখা যায় অনেককে।
এদের অনেকে হাতে নিয়ন্ত্রিত হয় অবৈধ মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা। তার প্রভাবে একটি ভাল শান্ত সমাজ হয়ে উঠে ভঙ্গুর। সে সমাজের মানুষগুলো হয় অসহিষ্ণু ও হিংস্র স্বভাবের। নিজেদের অবৈধ সম্পদ রক্ষা করার জন্য হন্যে হয়ে অপরাধ জগতের লালন শুরু করে তারা। তাদের ছত্রছায়ায় পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে যায় অবৈধ পেশীশক্তি এবং গড়ে উঠে আন্তর্জাতিক মাফিয়াদের সাথে সখ্য। এভাবে ক্রমান্বয়ে আরা পতন দেখতে পাই তাদের। তবুও কোন ইতিবাচক বোধগম্য লক্ষ্যনীয় হয়ে উঠে না তাদের মধ্যে।
অন্যদিকে কোন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে আন্তর্জাতিকভাবে বলীয়ান হয়ে তাদের কেউ কেউ হয়ে উঠে বড় বেপরোয়া।
পৃথিবীর প্রতিটি দিন রাতের মধ্যে বিলীন হয়ে যায় আবার প্রতিটি রাত দিনের মধ্যে বিলীন হয়ে উষার আলোকবর্তিকা নিয়ে হাজির হয়। এটাই অদ্যাবধি এক চিরন্ত সত্য। এটাকে মাথায় রেখে এক শ্রেণির মুক্তিকামী মানুষ হাল ছাড়ে না। তারা নিজেরে অধিকার প্রতিষ্ঠাকল্পে জীবন বাজি রেখে লড়াই করে। নিজেকে উৎসর্গ করে দেয় অপরের কল্যাণ আনয়নের জন্য।
এজন্য তারা মরিয়া হয়ে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে। এরকম একটি প্রচেষ্টায় শপথ নিয়ে মিয়ানমারে সামরিক জান্তাদের বিরুদ্ধে নির্ভয়ে লড়াই করে যাচ্ছে এক শ্রেণির আত্মত্যাগী অকুতোভয় লড়াকু মানুষ। তারা সংগঠিত হয়ে নানা সামাজিক আন্দোলনের ডাক দিয়েছে। জান্তা পরিবারের ও দোসরদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে সামাজিক শাস্তির ব্যবস্থা করেছে। এমনকি ডাস্টবিনের আবর্জনা তুলে এনে রাস্তা-ঘাট, অফিস-আদালতের সামনে ছিটিয়ে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে দিয়ে সামরিক জান্তাদের গুলি করে নিরীহ মানুষ হত্যা করার প্রতিবাদে লিপ্ত হয়েছে।
ময়লা আবর্জনা দিয়ে অন্যায় প্রতিরোধ করার নজির অনেক আছে। আমাদের দেশে কোন এক স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা (স্কাভেঞ্জার) তাদের অফিসের বসের সীমাহীন অন্যায় কাজের প্রতিবাদ জানিয়েছিল তার বসতবাড়ির সদর দরজা ও রাস্তার পাশের্^ মানুষের মল ছিটিয়ে রেখে। সেটা দিয়ে তারা তাদের বসের অন্যায় কাজের বিরুদ্ধে সফলকাম হয়েছিল বলে পরবর্তীতে জানা যায়।
মিয়ানমারের মুক্তিকামী মানুষকে হয়তো আরো বেশী আত্মত্যাগের মুখোমুখি হতে হবে। কারণ, অধিকার হরণকারী এসব কাজে পটু মানুষেরা দ্বিগ্বিদ্বিগ জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। বন্দুকের নল তাদের পাষাণ করে তোলে। দুই চক্ষু দিয়ে চারপাশের সবকিছুকে তারা দেখতে পেলেও অন্তরের চক্ষু দিয়ে অবলোকন করার ফুরসৎ পায় না। ফলে মানবতা হয় নিষ্পেষিত, লজ্জিত।
দৃশ্য ও অদৃশ্যের জ্ঞানীতে দ্বিধাবিভক্ত এই দুনিয়ায় এই নির্দয় খেলা হয়তো রোজ কেয়ামত পর্যন্ত চলতেই থাকবে। সকল আন্দোলনে নির্যাতিতরাই শেষমেষ বিজয়ী হবার উদাহরণ রয়েছে। তবুও, লোভী, শঠ, অন্যায়কারী ও নিরীহ মানুষকে হত্যাকারীরা যুগে যুগে এমন নির্দয় ঘটনা ঘটিয়ে ইতিহাসের ঘৃণ্য কাহিনীতে পরিণত হয়েছে মাত্র।

* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top