logo
news image

লালপুরে অবাধে চলছে অবৈধভাবে পুকুর খনন

ইমাম হাসান মুক্তি, লালপুর (নাটোর) প্রতিনিধি।।
উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞাকে উপেক্ষা করে নাটোরের লালপুরে অবৈধভাবে তিন ফসলি জমিতে চলছে পুুকুর খনন। অবাধে পুকুর খনন বন্ধ না হলে স্থায়ীজলাবদ্ধতাসহ কৃষি জমির ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট কৃষকরা। এতে শুধু কৃষি জমিই নষ্টসহ বিরুপ প্রভাব পড়ছে পরিবেশের ওপর।
মঙ্গলবার (২৩ মার্চ ২০২১) সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, উপজেলার প্রতিটি এলাকায় ফসলি জমিতে চলছে পুকুর খনন। অর্জুনপুর-বরমহাটি, দুুয়ারিয়া, কদিমচিলন, চংধুপইল, দুড়দুড়িয়া, ঈশ্বরদী, ওয়ালিয়া, লালপুর, বিলমাড়িয়া ও আড়বাব ইউনিয়নের জয়কৃষ্টপুর, উধনপাড়া, গখুরাবাদ, বোয়ালিয়াপাড়া, বালিতিতা, লক্ষ্মীপুর, চামটিয়া, রাকশা, পানঘাটা, বাহাদিপুর, বসন্তপুর গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় পুকুর খনন করা হচ্ছে। এই সব এলাকাতে প্রায় ১৫টি স্থানে এক্সকেভেটর (ভেকু মেশিন) দিয়ে দুই তিন ফসিল জমিতে চলছে পুকুর খনন। দুয়ারিয়া ইউনিয়নের আহম্মেদপুর গ্রামের বিলে প্রায় ৬ বিঘা জমিতে লালন নামের এক ব্যক্তি পুকুর খনন করছেন। কথা বলতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা সবাইকে ম্যানেজ করেই পুকুর খনন করছি। সবাই বিষয়টি জানেন। সাংবাদিকরাও জানে। সবার সঙ্গে কথা হয়েছে।’
নাম প্রাকাশ না করা শর্তে এক্সকেভেটর চালকরা বলেন, ‘পুকুর খননের জন্য কৃষকদের সঙ্গে চুক্তি করে সকলকে ম্যানেজ করেই পুকুর খনন করছেন তারা। আর এই সব মাটি প্রতি গাড়ি সর্বনিম্ন পাঁচ’শ থেকে আট’শ টাকায় বিক্রয় করছেন।’
উপজেলার কদমচিলান, সেকচিলান, পানঘাটা এলাকায় অবাধে কাটা হচ্ছে পুকুর। পুকুরপাড় চিলান এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, কৃষিজমিতে পুকুর খনন করছেন স্থানীয় এক কৃষক। পুকুরপাড় চিলান গ্রামের সিরাজ উদ্দিনের ছেলে ইয়াকুব আলী প্রায় ১৫ বিঘা জমিতে পুকুর খনন করছেন। এই পুকুরের মাটি তিনি বিক্রি করছেন বড়াইগ্রাম উপজেলার বিভিন্ন ইটভাটায়।
ওই এলাকার কৃষকরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অনেকেই এখন ভিটেমাটিতে করা আম, লিচু, কাঁঠাল, বাগান কেটে সাময়িক লাভের আশায় পুকুর খনন করছেন। মাঝেমধ্যে প্রশাসনের লোকজন দু-একটা অভিযান চালান। তাতে কোনোভাবেই বন্ধ হচ্ছে না কৃষিজমির এই ধ্বংসযজ্ঞ।
কদিমচিলান ইউনিয়নের পরিষদের সদস্য শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ইটভাটায় মাটি দেওয়ার কথা বলে এসব ফসলি জমির মাটি উপজেলার বিভিন্ন ব্যক্তি পর্যায়েও বিক্রি করা হচ্ছে। মাটিবাহি ট্রাক্টরের মোটা ও ভারী চাকায় নষ্ট হচ্ছে গ্রামীণ সড়ক। ফলে মাঝে মধ্যেই ঘটছে দুর্ঘটনা। বিভিন্ন সময় অভিযানে ভ্রাম্যমাণ আদালত অর্থদন্ড করলেও তা কোন কাজে আসছে না। তারা এলাকা থেকে চলে আসার পর পরই শুরু হয় আবার খনন।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুকুর খননকরীরা জানায়, ‘লিখিত অনুমতি না থাকলেও স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে তাদের মৌখিক অনুমতিতে পুকুর খনন করছেন তারা।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বসন্তপুর বিল এলাকার কয়েকজন শ্রমিক ও মাঝারি কৃষক বলেন, উধনপাড়া, জয়কৃষ্টপুর, গখুরাবাদ, বোয়ালিয়াপাড়া, বসন্তপুর বিলে অবৈধ পুকুর খনন করে বিলের পানি নিষ্কাশনের সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। জলাবদ্ধতায় আমরা দিশেহারা হয়ে পড়েছি। এক সময় সবুজের বুক চিরে সোনা ফলতো বিলের আনাচে কানাচে। এ এলাকার খাদ্য চাহিদা মিটিয়ে উৎপাদিত পন্য বিক্রি করে সংসারের খরচ মেটাতো খুদ্র ও মাঝারি চাষিরা। শ্রমিকদের কাজ থাকতো বারো মাস। ফলে এলাকায় বিরাজ করতো অনাবিল শান্তি। কিন্তু পরিবেশ বিপর্যয়ে হারাতে বসেছে বিলের সবুজ সৌন্দর্য, কাজ হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে এ এলাকার খেটে খাওয়া শ্রমিকরা। অনেকদিন ধরে বিলে জলাবদ্ধতা হয়ে থাকায় আমার জমিতে ফসল আবাদ করতে পারছি না।
বিল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিলের মধ্যে ও ধারঘেঁষে ভেকু দিয়ে অবাধে চলছে পুকুর খনন।  গোটা বিল ও এলাকার মাটিকে কাপিয়ে ভূগর্ভে কম্পন তুলে চলছে ভুঁ-ভুঁ শব্দ।
লালপুর উপজেলা কৃষি অফিসার রফিকুল ইসলাম জানান, ‘কৃষি জমিতে পুকুর খননের ফলে ফসলি জমি নষ্ট হচ্ছে। এতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় খাদ্য উৎপাদন ব্যহত হচ্ছে। উর্বর মাটির উপরিভাগ ইটভাটাতে চলে যাওয়ায় পরিবেশের ওপর বিরুপ প্রভাব পড়ছে।’
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাম্মী আক্তার বলেন, ‘পুকুর খনন বন্ধে তারা অব্যাহত অভিযান চালাচ্ছেন। জেলা প্রশাসকের নির্দেশে আমরা উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় কৃষিজমিতে পুকুর খনন করতে দেখে ইটভাটা মালিক, পুকুরের মালিকসহ গাড়ির চালককে বিভিন্ন মেয়াদে জেল ও জরিমানা করেছি। এক্সকেভেটর মেশিনের ব্যাটারি জব্দ করেছি। অবৈধ খনন বন্ধে প্রশাসনের পাশাপশি জনপ্রতিনিধিসহ সকলের সার্বিক সহযোগিতা প্রয়োজন।’

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top