logo
news image

ব্যাপক দায় তবু তার কী আর পর আছে?

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।।
ডিজিটাল যুগে বিজলির গতিকে হার মানায় মানুষের সাথে মানুষের নেটওয়ার্কভিত্তিক যোগাযোগ। এখন আর কেউ দ্রুতযানে পার হবার অপেক্ষায় স্টেশনে বসে পত্রিকার পাতা উল্টায় না বা বাদাম চিবুতে চিবুতে রেল লাইনের দিকে বার বার তাকায় না। ট্রেন আসার জন্য অযথা প্রহর গুনে টেনশন করার দিন শেষ হয়েছে। এখন সব খবর মানুষ আগাম জানতে পেরে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করে সামনে চলার প্রয়াস নেয়।
তিস্তা নদী নিয়ে ভারতের সাথে বৈঠকের ব্যাপারে তিস্তা পাড়ের মানুষ কেন-বাংলাদেশের কোন মানুষের বিশেষ কোন কৌতুহল নেই, কোন আগ্রহ জন্মায় না। যুগ যুগ ধরে চুক্তি করা নিয়ে টালবাহানার বিষয়টিতে ভুক্তভোগিরাতো বটে, সাধারণ মানুষও বুঝে ফেলেছে সবকিছুর মধ্যে একটা ধৈয্যর বাঁধ থাকে। যে বাঁধটা ভারতের একগুঁয়েমির কাছে নস্যাৎ হয়ে হাস্যকর ছেলেখেলায় পরিণত হয়েছে। সেটা সরকারের উচ্চমহলও বুঝেছে। সেজন্য চায়নাকে দেয়া হয়েছে তিস্তা সমস্যার দায়ভার লাঘবের।
অথচ এ ক্ষেত্রে অতি নিকটতম প্রতিবেশী হিসেবে দু’দেশের পারস্পরিক সুসম্পর্কের জন্য আপাতত: ভারতের দায়ভার ব্যাপক। সেটা তাদের উপলব্ধিতে রয়েছে। তবুও তিস্তা চুক্তি নিয়ে ভারতের ক্রমাগত উদাসীনতা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে চরম হতাশা সৃষ্টি করেছে।
তিস্তা পাড়ের মানুষ সকালে ঘুম ভাঙ্গলেই তিস্তা নদীর ধু-ধু বালুচর দেখে চোখ কচলাতে কচলাতে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ভিন্ন কাজে মনোযোগী হয়। কেউবা ইতোমধ্যে জিিবকার সন্ধানে বাড়িঘর ছেড়ে বড় শহরে পাড়ি জমিয়েছে।
নভেম্বরের শুরুতেই নদীতে পানি নেই, স্্েরাত নেই, মাছ নেই। পায়ে হেঁটে পার হওয়া যায় এপার ওপার। তাই কোষা ও ‘মারের’ খেয়া বন্ধ। নৌকা বালুচরে আটকিয়ে রেখে জীবন-জীবিকার তাগিদে অনেকে ভিনজেলায় গেছে কর্মদ্দোশ্যে। বাঁচতে তো হবে। ভিনজেলায় কেন চলে যাচ্ছেন বলতেই একজন বলে উঠলো-‘ দিবার চায়া দেন নাই; হামার দিন কী চলে নাই’। অর্থ্যাৎ, বহু যুগ ধরে তিস্তায় পানি আসবে বলে শুনতে শুনতে বেচারার করুণ আক্ষেপ। এটা যেন কিছুটা প্রিয় সাথীর সাথে সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়া অভিমানী ভাটিয়ালী গানের সুরের মত।
কত বছর ধরে কত চুক্তির আশ্বাস হলো কত শত জায়গায়। সেসব আশ্বাস কত বিশ্বাসের জন্ম দিল। কত গবেষণা, কত ভরসা তৈরৗ করলো। শেষে সবকিছুই গুঁড়েবালির মত মিইয়ে গেল। সেটা বার বার মিইয়ে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই।
একবার লিখেছিলাম- স্কুলের বাংলা পড়ানোর প্রিয় শিক্ষক অনিল স্যারের শেখানো ভাব সম্প্রসারণটির কথা। ‘সময় ও নদী স্রোত কাহারো জন্যে অপেক্ষা করে না।’ এখন দেখছি সেটা ঝুটা, মিথ্যে। সময় ও নদীর স্রোত নতজানু নীতি ও টালবাহানার কাছে যুগ যুগ ধরে অপেক্ষা করতে দ্বিধা করে না। এজন্য কারা কোন আক্ষেপের তেমন কোন উদ্রেক হতে দেখা যায়না। বরং এখন এটা একট ব্লেম গেম।
বলা হয়- যে নদী হারায়ে স্রোত চলিতে না পারে, সহস্র শৈবাল দাম বাধেঁ আসি তারে। বিশেষ ব্যতিক্রম ছাড়া এ যুগে কোন নদী এমনি এমনি স্রোত হারায় না। মানুষ এখন পাহাড়, বন, নদী, সমুদ্র দখল করে। এজন্য যুদ্ধ করে, মামলা করে। আইনী প্রক্রিয়ার দীর্ঘ সূত্রিতায় কেউ সেসব বিষয় নিয়ে মাথা ঘামায় না। সেই আইনী ভেজালের সুযোগে জঞ্জাল, শৈবাল এসে ঘিরে ধরে। যেমন- থানায় পড়ে থেকে নষ্ট হয় মালিক বিহিীন কোটি টাকার অবৈধ জাগুয়ার, মার্সিডিজ, ল্রঅন্ড রোভার আরো কত কী! কিছুদিন পর কেউ সেগুলো গাড়ির চাকা, কেই টায়ার কেউবা ইঞ্জিন খুলে বিক্রি করে দেয়। দেশের নদী-নালার ক্ষেত্রেও তাই ঘটছে। স্রোত বন্ধ হওয়া নদীতে চাষাবাদ করতে করতে জমি দখল করে সুরম্য বহুতল বিল্ডিং বাড়ি উঠে যাচ্ছে।
ডিসেম্বরের ১৯ তারিখে ভার্চুয়াল বৈঠকে নানা এজেন্ডার চাপে তিস্তার পানি বন্টনের চুক্তি ব্যাপারে কি হলো সেটা সংবাদ মাধ্যমে তেমন ফলাও করে আসেনি। তবে আবারো চুক্তির ব্যাপারে আশ্বাসের কথা জানা গেছে। বার বার প্রতারিত হবার ফলে এই আশ^াসের ব্যাপারে বিশ্বাসের মাত্রা ক্ষীণ বলে জানিয়েছেন কেউ কেউ।
চায়নার প্রস্তাবিত ‘তিস্তা রেস্টোরেশন প্রজেক্ট’ কিছুটা আশার আলো ছড়াতেই বেঁেক বসেছে আমাদের প্রতিবেশী। তাদের পত্রিকা, টিভিতে উস্কানীমূলক সংবাদ আমাদেরকে বেশ আহত করছে। টালবাহানার পর এগুলো কী? খোলাসা করে জানান দিক আসলে আন্তর্জতিক নদী তিস্তারপানির ন্যায্য বন্টন নিয়ে তাদের আর কি কি অভিসন্ধি আছে।
সবচে বিপন্ন প্রাণি এখন মানুষ। একদিকে করোনার করাল গ্রাস, অন্যদিনে কিছু স্বার্থান্ষেী মানুষের একাই পাব, একাই খাব নীতির পক্ষে অনড় অবস্থান। করোনায় যে হারে সংক্রমণ ও মৃত্যু হচ্ছে এবং যে হারে মানুষের মধ্যে স্বার্থপরতা ও কুটিলতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে তাতে সারা পৃথিবীর মানুষ চরম হুমকির মুখে রয়েছে। সংবাদে জানা গেছে (প্রথম আলো ২১.১২.২০২০)  যুক্তরাজ্যে করোনাভাইরাসের (কোভিড ১৯) নতুন ধরন (স্ট্রেইন) ছড়িয়ে পড়ার পর আতঙ্কে পুরো ইউরোপ। এর আগেই করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কড়া লকডাউন জারি করা হয়। যারা এখনো লকডাউনের ঘোষণা দেয়নি, তারাও খুব শিগগির লকডাউনের পথে হাঁটবে। ইউরোপের বেশির ভাগ দেশ যুক্তরাজ্যের সঙ্গে আকাশপথ, রেলপথসহ সব সীমান্ত বন্ধ ঘোষণা করেছে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্য কার্যত ইউরোপ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। যুক্তরাজ্য সরকারের একজন মুখপাত্র উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, রূপান্তরিত করোনাভাইরাসটি আগের ভাইরাসের তুলনায় ৭০ শতাংশ বেশি সংক্রামক এবং তা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত দুরূহ।
এদিকে দেশে দেশে পানির অভাবে বড় বড় কৃষি প্রজক্টগুলো বন্ধ হতে থাকলে এবং নদী শুকিয়ে পরিবেশ বিপন্ন হতে থাকলে অচিরেই গাছপালা, আবাদ ধ্বংস হয়ে মানব সভ্যতা মাটিতে মিশে যেতে থাকবে। একটি অপরিনামদর্শী গোষ্ঠী সেটাই চায়।
কিন্তু সেটা হতে দেয়া উচিত হবে না। যার যেখানে দায় আছে, তার সেখানে ব্যাপক কর্তব্যও রয়েছে। সেটা ভুলে গেলে চলবে না। কেউ রোগে মরবে, কেউ ক্ষুধায় মরবে তা হতে দেয়া যাবে না। কারণ, যে কোন বড় মহামারীর পরে আসে দুর্ভিক্ষ। এজন্য কৃষি উৎপাদন বাড়াতে বড় বড় প্রজেক্টগুলোতে বেশী নজর দিয়ে ফসল ফলাতে হবে।
কাগজের ডলার, টাকা, ইত্যাদি তো আর চিবিয়ে খাওয়া যায় না। তাই টাকা থাকলেও মানুষ না খেয়ে মরে সাবাড় হয়ে যেতে পারে। ডব্লিউএইচ-এর ড. টেড্রোস বলেছেন “ সকলকে নিরাপদ না করা পর্যন্ত আমরা কেউ নিরাপদ নই”।
ধনীরা আগেভাগে টিকা নিয়ে বেঁচে যাবে আর দরিদ্ররা টিকার নাগাল না পেয়ে অথবা দামী টিকা কিনতে না পেরে অনেক পরে ভেজাল টিকা নিয়ে সাবাড় হয়ে যাবে তা হতে পারে না। গরীব দেশগুলো টিকা কেনার সামর্থ্য নেই, কিনলেও অতি ঠান্ডা সংরক্ষণাগার নেই। এ অবস্থা যেন দাওয়াৎ খাওয়ানোর পর ‘ফকিরের জন্য দৈ কেন’? এমন বিব্রতকর প্রশ্নের মত যেন না হয়।
এ নাজুক সময়ে সামর্থ্যবান মানুষ যেন অসহায় ও দুর্বল মানুষের জন্য হাত বাড়াতে এগিয়ে আসে তাহলে এই কঠিন সময়ে সামাজিক বিভাজন কমিয়ে এনে অকাল মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হতে পারে। কেউ কঠিন হাতে অন্যায়ভাবে কারো হক দখল করে থাকলে তা আজই ছেড় দিন। সেটা হোক না কোন দখলীকৃত সম্পদ, হোক না জমি, টাকা-পয়সা, পুকুর-খাল, বন-বনানী, নদীর পানি।
আগেই বলেছি বড়দের দায় বেশী। তাই বড়দের মধ্যে, ক্ষমতাধরদের মধ্যে যার যেখানে দায় আছে, তার সেখানে কর্তব্যও রয়েছে। বড় দায়বানদের করণীয় কাজের গন্ডীও ব্যাপক। তারপর আর ভাল কী? গানের কথায় বলে, তার আর পর নেই। তার পরেও যদি কিছু থেকে থাকে সেটাকে ইতিবাচকভাবে ভাবতে না পারলে একদিকে মানুষের চরম স্বার্থপরতা অন্যদিকে করোনার নতুন স্ট্রেইনের প্রভাবে বিশ^মানবতার হিমশীতল মৃত্যু ছাড়া কারো কোন গত্যন্তর নেই।

* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top