logo
news image

করোনা নিয়ে ২১ দিন

মুক্তার হোসেন।।
টর্নেডোর ছোবলে সবচেয়ে লম্বা গাছটির মাথা বেঁকে গিয়ে যখন নিজের গোড়া ছুঁই ছুঁই করে তখন গাছটির বাঁচা-মরা সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। ঝড় থেমে যাওয়ার পর বেঁচে যাওয়া গাছটিকে সেই অভিজ্ঞতা বলতে বলা হলে কি বলবে তা বলাই বাহুল্য।
কোভিড নিয়ে ২০২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সন্ধায় বাসায় ঢুকে সহধর্মিণী শিলাকে বললাম, এখনই সদর হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। আমার মুখ চোখের দিকে তাকিয়ে ও কোনো প্রশ্ন না করে আমার সাথে বেরিয়ে পড়লো। বের হওয়ার সময় দুই ছেলে ও শশুর-শাশুড়ির দিকে শুধু একবার তাকালাম। বুকটা শূন্য হয়ে আসছিল। রওনা দিলাম হাসপাতালে।
সদর হাসপাতালের শ্রদ্ধাভাজন সহকারি পরিচালক জনাব আনছারুল হক, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আনিসুজ্জামান পিয়াস ও আরএমও মঞ্জুরুল ভাই সবকিছু ঠিক করেই রেখেছিলেন। নির্ধারিত রুমে আমাদের চিকিৎসা শুরু হলো। সেবিকাদের আন্তরিকতা দেখে মনে হলো তাঁরা করোনাকালে আরও বেশি মানবিক হয়েছেন। স্যালুট স্বাস্থ্যকর্মীদের।
পরের দুইদিনে শরীরটা এলোমেলো হয়ে যেতে লাগলো। লাঞ্চের সিটিস্ক্যান রিপোর্টে নিউমোনয়ার লক্ষণ ধরা পড়লো। এ সময় জানলাম, স্নেহাসপদ সহকর্মী আইনজীবী এমরানের মৃত্যু করোনায় হয়েছে। তার অক্সিজেন লেবেল ৩২ শতাংশে নেমে এসেছিল। আলাদা হাসপাতালে তবে একইদিন আমরা নমুনা দিয়েছিলাম। ঢাকায় নেয়ার পথে ওর মৃত্যু হয়। আল্লাহ ওকে শান্তি দান করুন।
এই ঘটনা থেকে আমার পরিবার সিদ্ধান্ত নেয়, আমাকে এখনই ঢাকায় নেওয়া হবে। সিদ্ধান্ত জানার পর আমি আপত্তি করলাম না। ৩ অক্টোবর দুপুরে আম্বুলেন্সে রওনা হলাম। রাতে সেন্ট্রাল পুলিশ হাসপাতালের গেটে এসে বুঝলাম, এডিশনাল ডিআইজি আঙ্কেল আগে থেকে সব পাকা ব্যবস্থা করে রেখেছেন। উনার প্রতি কৃতঙ্গতার শেষ নাই। ওই রাত থেকে একই কেবিনে আমাদের চিকিৎসা শুরু হলো। এখানেও স্বাস্থ্যকর্মীদের অসাধারণ আন্তরিকতা অনুভব করলাম। আবার সিটিস্ক্যান করা হলো। সাতদিন পর জ্বর কমতে শুরু করলো। কাশি ছাড়া অন্যান্য কষ্ট কমতে থাকে। ১৫ তারিখ দুপুরে ফলোআপ নমুনা দিলাম। রাতে জানলাম আলহামদুলীল্লাহ আমাদের রিপোর্ট 'নেগেটিভ'। শনিবার সকালে বাসায় ফেরার প্রস্তূতি।
অভিজ্ঞতা থেকে পরামর্শ :
১. করোনা নিয়ে বেশি জানার দরকার নাই। এতে চিন্তা বাড়বে। তবে কয়েকটি বিষয় অবশ্য অবশ্যই জানতে হবে।
(ক) করোনার লক্ষণ
(খ) নমুনা দেওয়ার পাশাপাশি সিটিস্ক্যানসহ অন্যান্য পরীক্ষা আগেই দ্রুত করিয়ে নেয়া।
(গ) লক্ষণ নিশ্চিত হলে রিপোর্ট আসার আগেই মেডিসিন বিশেষজ্ঞকে দিয়ে চিকিৎসা শুরু করা
(ঘ) লক্ষণ নিশ্চিত হলেই একটা পাল্স অক্সিমিটার কিনে নিয়ে মাঝে মধ্যে চেক করতে হবে। লেবেল ৯২ এর নিচে নামলে দ্রুত অক্সিজেন সাপোর্ট নিতে হবে। অন্যান্য সমস্যা থাকলে ঢাকায় ভর্তি হওয়া ভালো।
(ঙ) উচ্চ প্রটিনযুক্ত খাবার বেশি বেশি খাওয়া।
(চ) করোনা শেষে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ রাখা।
ভালোবাসা :
যদিও আমি সৃষ্টিকর্তার হুকুম সঠিকভাবে পালন করতে পারি না তবুও অতি ক্ষুদ্র প্রয়োজনেও সীমাহীন দয়াবান আল্লাহকে স্মরণ করি। সেই মহান আল্লাহ ভালোবেসে আমাকে এ যাত্রা রক্ষা করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ।
আমার অসুস্থতার খবর শুনে পরের দিন নাটোরসহ বিভিন্ন স্থানের অন্তত ৯টি মসজিদে দোয়া হয়েছে বলে পরে শুনেছি। ভালোবাসার দোয়ায় অংশ নেয়া সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা। কৃতজ্ঞতা তাঁদের প্রতি যাঁরা আমাকে ভালোবেসে আমার রোগমুক্তির জন্য নামাজ, রোজা, মিলাদ ও সিন্নী মানত করেছেন, মহান রাব্বুল আল আমীনের কাছে দোয়া করেছেন, ফোন করে সহমর্মিতা জানিয়েছেন, সরাসরি যোগাযোগ করেছেন, ঝুঁকি নিয়ে হাসপাতাল পর্যন্ত ছুটে এসেছেন (ছোটমামা আবুল কালাম আজাদ, বন্ধন মামা, বন্ধুসভার সভাপতি-সম্পাদক, সহকর্মী নজরুল, রুবেল), সিপিএইসের কেবিনে এসে (শালা বাবু টনি, ছোট ভাই মাজদার, বোন আইরিন, কুলসুম ও ভাতিজা রাসেল) সাহস যুগিয়েছেন। আমাদেরকে নিয়ে আইরিন-মাজদারের ব্যাস্ততার শেষ ছিল না। তাঁদের অফুরন্ত ভালোবাসার ব্যাপ্তি ছিল সর্বত্র।
যাইহোক অনেকের মূল্যবান ফোনকল শারীরিক অক্ষমতার কারণে ধরতে পারিনি, তাঁরা আমাকে ক্ষমা করবেন।
চরম বিপদে মাথা ঠান্ডা রেখে আমার সন্তানদের আগলে রেখেছেন (সব সময়ই) তাদের নানা-নানু। প্রতিটি মুহুর্ত তাঁদের নিয়ে চিন্তা করেছি। আমাদের সবকিছু দিয়েও তাঁদের ঋণ শোধ করা সম্ভব না। আমার সন্তানদের পুলিশ নানাভাই যিনি কথার চেয়ে আমাদের সবার জন্য অনেক বেশি কিছু করেন। ধন্যবাদ জানিয়ে তাঁর ভালোবাসাকে ছোট করবো না।
খাদ্য যেখানে ঔষধ :
পুষ্টিকর খাদ্য করোনা রোগীর ঔষধ হিসাবে কাজ করে। এক্ষেত্রে আমরা নিজেদেরকে সৌভাগ্যবান মনে করি। কারণ আমাদের শুভাকাংখিরা চরম উদার ভূমিকা রেখেছেন। সবার আগে সফি ভাই ও ভাবির কথা না বললেই না। সম্প্রতি ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ভাবি একটা হাত হারিয়েছেন। তবুও চারদিন নানা পদের খাবার পাঠিয়েছেন। খাবার সামনে আসলে চোখে পানি চলে আসতো। বিনম্র শ্রদ্ধা তাঁদের প্রতি।
এ কদিনে অন্তত ৪২ বার খাবার (যা যা আমি ও শিলা পছন্দ করি) পাঠিয়েছে আইরিন। ছোটভাই মাজদার নিজে তা পৌঁছে দিয়ে গেছে। আমাদের কাছে 'এসব' খাবারের চেয়ে অনেক বেশি কিছু। একই কথা বলতে হয়-রুকু আন্টি, কুলসুম, খালাম্মা ও ছোটবোন এ্যনির পাঠানো খাবারের ব্যাপারে। তাঁদের খাবার ছিল মমতায় ভরা। পরম শ্রদ্ধা-ভালোবাসা তাঁদের প্রতি।
সিপিএইস (সেন্ট্রাল পুলিশ হসপিটাল) :
নামটি আমারমত অনেকের কাছে আতংকের। সেখানে ১৪দিন অতিথি রোগী হিসাবে থাকার পর সেই আতংক আর নাই। ডাক্তার, নার্স, পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের নিয়মানুবর্তীতা, আন্তরিকতা ও সম্বোধন অসাধারণ। দায়িত্বরত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জনাব শান্তকে কি বলে অভিবাদন জানাবো ভেবে পাচ্ছি না। প্রতিদিন প্রত্যেক রোগীর কাছে গিয়ে খোঁজ নেন তিনি। তাঁদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। (অনিচ্ছাকৃত ত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থী)

* মুক্তার হোসেন: আইনজীবী ও নাটোর প্রতিনিধি, প্রথম আলো।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top