logo
news image

পেঁয়াজ প্রধান খাদ্য নাকি প্রাণ ভোমরা?

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।।
ক’দিন ধরে হঠাৎ একটি মশলা জাতীয় খাদ্যের উপাদান কিনে মজুত করার জন্য বাজারে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে করোনায় দিকভ্রান্ত মানুষ। সেটাকে পেট ভরে কখনও কেউ খায় না। আবার অল্প খেলে বা না খেলেও মানুষের বেঁচে থাকতে কোন অসুবিধে হয় না। কিন্তু সেটার ‘প্যানিক বায়িং’ অনেকের নিকট হাসির খোরাক হয়ে দেখা দিয়েছে। যার এক কেজি কিনলেই চলে তিনি দুই পাল্লা বা দশ কেজি কিনে নিয়ে বাসায় মজুত করছেন। গণমাধ্যমে পেঁয়াজ কেনাকাটার লম্বা সারি দেখানো হচ্ছে। রাতারাতি নয়, ঘন্টায় ঘন্টায় দাম বাড়িয়ে দিয়ে কিছু লোভী, অসাধু ব্যবসায়ী আড়ালে বসে মটিমিটি হাসছে। দেখাদেখি যিনি কখনো পেঁয়াজ কিনতেন না বা কেনার দরকার ছিল না, তিনিও গিন্নির চাপে ব্যাগ হাতে দৌড়াচ্ছেন বাজারে অথবা টিসিবির ট্রাকের সারিতে দাঁড়িয়ে পণ্যটি কিনতে।
করোনা সংক্রমণের প্রথম দিকে বিচলিত মানুষ মৃত্যুভয়ে সাবান, সেনিটাইজার, মাস্ক, পিপি, গ্লাভস, মাথার আবরণ ইত্যাদি কেনার জন্য ব্যস্ত ছিল। এরপর দু’একজন করোনা রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ছড়িয়ে পড়লে হাসপাতালে ভর্তির সিট খালি নেই বলে হাহাকার শুরু করে। অক্সিজেন পাওয়া যাচ্ছে না বলে সিলিন্ডার কিনে বাড়িতে মজুদ করার হিড়িক পড়ে যায়। তারপর করোনা রোগীকে ডাক্তারগণ যে ব্যবস্থাপত্র দিয়েছেন অথবা আসন্ন বিপদ মোকাবেলায় ওষুধ সংগ্রহের জন্য শুভাকাঙ্খীরা যে যেটা পরামর্শ দিয়েছে সেটার ওপর ভিত্তি করে একগাদা দামী ওষুধের বড়ি কিনে বাসায় মজুত করা শুরু করে।
তারপর চারদিকে শুরু হয় খাদ্যসংকট হবার ভয়। বিশেষ করে নিজ এলাকা হঠাৎ লকডাউন হয়ে যাবার আতঙ্কে বাজারের নিত্যপণ্য কিনে বাড়িতে মজুদ করার হিড়িকের কথা দুর্ভিক্ষ তৈরীর অশনি সংকেত দিয়ে ফেলে। চাল, ডাল, আটা-ময়দা, তেল, চিনি, চা-বিস্কুট, পেঁয়াজ-রসুন মজুদ করার জন্য সংগ্রহ করার প্রচেষ্টা এক ধরণের জীবন-সংগ্রামে রূপ নিয়ে ফেলে। অহেতুক অতিরিক্ত পরিমাণে নিত্যপণ্য কিনে বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলা হয়। দ্রব্যমুল্য বেড়ে গিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে রূপ ধারণ করে।
 তখন মনে হয়েছিল মানুষ করোনায় মরবে না, ভাতে মরতে পারে। তখন যদি মানুষের বাড়িতে অভিযান চালানো হতো তাহলে ছয়মাস বা একবছরের খাদ্যসামগ্রী মজুদ রাখার প্রমাণ পাওয়া যেত। এখন সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে, অনেকের ঘরে করোনার প্রাথমিক সময়ে কিনে রাখা মজুদকৃত চাল, আটা, ডাল ইত্যাদি বর্ষার কারণে বস্তার মধ্যেই পঁচে নষ্ট হয়ে গেছে। এসব পণ্য দীর্ঘদিন ঘরে সংরক্ষণ করার জ্ঞান, অভিজ্ঞতা না থাকায় শুধু শুধু দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরী করে ফেলেছে সৃষ্টির সেরা মানুষগুলো। তারা খাদ্যের উপর ভর করে বেঁচে থাকার ঈমানে বলীয়ান হয়েছিল বলে এই সংকট সৃষ্টি হয়েছে।
বর্তমানে ভাতে বা পানিতে নয়, পেঁয়াজের ওপর ভর করেছে এই সংকট। অবশ্য এই সংকটের জন্য আমাদের প্রতিবেশী দেশের অবহেলা, উদাসীনতা ও অভ্যন্তরীন রাজনীতি কম দায়ী নয়। গত ১৪ সেপ্টেম্বর ভারত পেঁয়াজ রপ্তানী বন্ধ করে দিয়েছে। গত বছর দেশটি পেয়াজ রপ্তানী বন্ধ করে দিয়ে বাংলাদেশের বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছিল। এবছর একই পথে হেঁটেছে। এভাবে হঠাৎ করে পেঁয়াজ রপ্তানী বন্ধের সিদ্ধান্ত কেন? বিবিসি বাংলা বলেছে ভারতের পেঁয়াজ উৎপাদনকারী রাষ্ট্র কর্ণাটক ও মহারাষ্ট্রে অতিবৃষ্টি ও বন্যার ফলে পেঁয়াজ আবাদে ক্ষতির কথা। বিহার ও পশ্চিমবঙ্গে তারা পেঁয়াজ সরবরাহ করে। এবছর এই দুই রাজ্যে নির্বাচন  হবে। এই দুই রাজ্যে যারা ক্ষমতায় আছেন তাদের জন্য এটা একটা কৌশলগত ব্যাপার। তবে আমাদের দেশ থেকে এলসি খুলে পেঁয়াজ আমদানী চলার সময় পথে আসতে থাকা আমদানীকৃত পেঁয়াজের ট্রাক সীমান্তে হঠাৎ আটকে দেয়ার মধ্যে কী কূট-কৌশল বা বাহাদুরী আছে তা বোধগম্য নয়।
অফসিজনে আমাদের দেশে পাঁচমাসের পেঁয়াজের মোট চাহিদা ১০ লক্ষ মেট্রিক টন। আমাদের মোট মজুত রয়েছে ছয়লক্ষ মেট্রিক টন। ঘাটতি রয়েছে মাত্র চারলক্ষ মেট্রিক টন। এটুকু বিদেশ থেকে আমদানী করতে হয়। গতবছরের খারাপ অভিজ্ঞতাকে স্মরণে রেখে এবছর আগাম আমদানী করারা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবেশী দেশের হঠাৎ রপ্তানী বন্ধের হঠকারী সিদ্ধান্ত আমাদের দেশের অসাধু ব্যবসায়ীদেরকে উস্কে দিয়েছে। তারা এই খবর শোনার সাথে সাথে পেঁয়াজের দাম কয়েক ঘন্টায় তিন-চারগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ত্রিশ-চল্লিশ টাকার দেশী পেঁয়াজ সেঞ্চুরী হাঁকিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্দাম নৃত্য শুরু করে দিয়েছে। আমাদের পেঁয়াজের বাজারের এই দশা দেখে প্রতিবেশী দেশের ওরা হয়তো মুচকি হাসছেন।
গত বছর ইলিশ পাঠনোর পর নদীতে পানি আসেনি। ঈদে কোরবানির পশুও আসেনি। এবছর ইলিশের প্রাচুর্য্য থাকায় বেশী পরিমাণে অর্থাৎ ১৫৪০ মেট্রিক টন ইলিশ রপ্তানীর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে এবং পাঠানো হয়েছে। পদ্মা, মেঘনার বড় বড় ইলিশ মাছ দিয়ে ইতোমধ্যে হাওড়ায় উৎসব করা হচ্ছে বলে সুখবর বেরিয়েছে। বিষয়টি সুখকর। কিন্তু হঠাৎ করে চুক্তিবদ্ধ সিদ্ধান্ত বাতিল ঘোষণা করে পেঁয়াজ আমদানী-রপ্তানীর হঠকারী সিদ্ধান্ত গোটা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
ভারতের এই হঠকারী সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ বিকল্প উপায়ে দ্রুত মিশর, নেদারল্যন্ডস, মিয়ানমার, ও তুরস্ক থেকে পেঁয়াজ আমদানীর প্রচেষ্টা শুরু করে দিয়েছে। দূরবর্তী দেশ থেকে আমদানী খরচ বেড়ে গেলেও আমাদের পেঁয়াজের চাহিদা মেটানোর জন্য এছাড়া ভাল কোন উপায় নেই বলে জানানো হয়েছে। কারণ, ভারত জানিয়েছে তাদের নিজেদের পেঁয়াজ সংকটের কথা।
আমাদের স্থানীয় বাজারে পেঁয়াজের আপাতত: কোন সংকট নেই বলে জানানো হচ্ছে। তবে কৃত্রিম সংকট তৈরী করার আতঙ্কটাই বড় সমস্যা হিসেবে মনে করা হচ্ছে। কিছু লোভী, অতি মুনাফাখোর ব্যবসায়ী সাধারণ ভোক্তা, অদূরদর্শী ও ভোগবাদী মানুষের মধ্যে ধৈর্য্যহীনতা তৈরী করে অস্থিতিশীল অবস্থা তৈরী করতে বেশ পটু। এর সাথে যুক্ত রয়েছে হীন রাজনীতির কূট-কৌশল। নানা ঘৃণ্য প্রক্রিয়ায় অর্জিত অবৈধ অর্থের লাভের ভাগ তাদের নিকট যথাসময়ে পৌঁেছ যাবার পথ খোলা থাকে। আঞ্চলিক শান্তি বিনষ্ট করার জন্য একটি দেশী-বিদেশী চক্রান্ত এজন্য সবসময় তৎপরতা অব্যাহত রাখে। সময় ও সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের লাভের জন্য তাইতো বার বার তাদের মধ্যে এই ধরনের তৎপরতা সৃষ্টি করতে দেখা যায়।
সেজন্য সবাইকে ভাবতে হবে একটি মশলা জাতীয় পণ্যের জন্য হা-হুতাশ করে মূল্য বাড়িয়ে দেয়ার কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। কোরীয়া, চীন, জাপানসহ অনেক দেশে বড় বড় আকৃতির পেঁয়াজ (তামানেগী ও নাগানেগী) সব্জীর মত রান্না করে খায়।
তবে বিশ্বের কোথাও পেঁয়াজ মানুষের প্রধান খাদ্য নয়, এটি কোন প্রাণ ভোমরাও নয়। ভারতসহ অনেক দেশে ধর্মীয় কারণে অনেক মানুষ পেঁয়াজ খান না। বিশেষ সপ্তাহ, মাস ও বছরের বিশেষ দিনে তাঁরা পেঁয়াজ গ্রহণ এড়িয়ে চলেন। এ পণ্যটি কম খেয়ে বা না খেয়েও বেঁচে থাকা যায়।
অতিরিক্ত মুনাফা লাভের আশায় অনেক অসাধু ব্যবসায়ীর নামে গুদামে মজুদ খাদ্য, ভোগ্যপণ্য যেমন মেয়াদউত্তীর্ণ হয়ে পঁচে নষ্ট হবার খবর শোনা যায়, তেমনি করোনার সময়ে কিনে মজুদ করা অতিরিক্ত খাদ্যশস্য, নিত্যপণ্য, ওষুধ ইত্যাদি এখনও শহুরে অনেক সামর্থ্যবান মানুষের ঘরে পঁচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাই অহেতুক আতঙ্কের বশবর্তী হয়ে পেঁয়াজ-আদার মত অধিক পচনশীল দ্রব্য কিনে দ্রব্যমূল্য না বাড়ানোই ভাল। খাদ্যশস্য, মশলা, ওষুধ, ভ্যাকসিন ইত্যাদি মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণের নিমিত্তে নিবেদিত সামগ্রীর সাথে কোন ধরনের অবৈধ বা অতিমুনাফা করার হীন প্রচেষ্টা ও দুষ্ট রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা না থাকাটাই মানবতার জন্য মঙ্গলজনক।

* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top