logo
news image

লাফারঘোনা কেওড়াবনে ইয়াবাচোরের পলায়ন

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।।
করোনার প্রভাব সবার নিয়মিত কাজকে কম-বেশী এলোমেলো করে দিয়েছে। তছনছ হয়ে যাওয়া দিনপঞ্জির সময়-সূচি রক্ষা করা এখন বেশ জটিল। এর মধ্যে সারা দেশে মাদক দ্রব্যে ঢুকে সয়লাব হয়ে পড়েছে। মাদক ব্যবসায়ী, চোরাচালানিচক্র এটাকে মোক্ষম সময় ধরে নিয়ে বেশ তৎপর হয়ে উঠেছে চারদিকে।
টেকনাফের সাবরাং লাফারঘোনা পয়েন্টে সেদিন ধরা পড়েছে এক লক্ষ বিশহাজার পিস ইয়াবা বড়ি। যার দাম তিন কোটি ষাট লক্ষ টাকা। তার পরদিন কোষ্টগার্ডের নিকট সাবরাং খুরেরঘাট এলাকায় মোটরসাইকেল আরোহীর ব্যাগ থেকে ধরা পড়লো আরো ছাপ্পান্ন হাজার। প্রতিবেশী মিয়ানমার এসব ইয়াবার উৎসস্থল। নাফ নদীর তীরে তো ইট-কাঠের বেড়া নেই। আছে মানববেড়া। সীমান্তরক্ষীগণের সতর্ক দৃষ্টিতে এবার ইয়াবাভর্তি নৌকা ফেলে লাফারঘোনা পয়েন্টের কেওড়াবনের দিকে লাফিয়ে ভোঁ দৌড় দিয়ে পালিয়ে গেছে চোরাচালানিক্রের সদস্যরা।
হঠাৎ করে বেড়ে গেছে মাদকের চোরাচালান। দেশের ৩২ জেলার ৪২টি সীমান্ত পয়েন্টের ফুটো দিয়ে ঢুকছে মাদক ফেন্সিডিল। টেকনাফের ৩০টি পয়ন্টে দিয়ে আসছে ইয়াবা। এই উপজেলার ২৫ কিলোমিটার সীমান্তপথ অরক্ষিত। এই পথে চারটি পয়েন্টে বেশ জমজমাট মাদক ব্যবসা। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃংখলা বাহিনীর সহায়তায় একশ্রেণির ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে মাদকদ্রব্য (দৈনিক ইত্তেফাক ০৮.০৯. ২০২০)।
এক শ্রেণির ব্যবসায়ী নামের লোভী পিশাচ নতুন বিত্তশালী ব্যক্তির সহায়তায় ঘৃণ্য এই মাদকব্যবসা এখন বেশ জমজমাট। তারা নিজেরা মাদক বেচা-কেনা ও সেবন করে। ভয়ংকর সংবাদ হলো- এখন দেশের প্রতিটি গ্রামে মাদক পাওয়া যাচ্ছে বলে সংবাদ এসেছে। তাহলে কি পুরো দেশটা মাদকের আখড়া হয়ে গেছে? এমনটি হলে আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ কী?
সীমান্তে মাদক প্রতিরোধের জন্য নিয়োজিত দায়িত্বরত পাহারাদারগণের এত তৎপরতার মধ্যেও দেশের ভেতর ইয়াবা, ফেন্সিডিল ইত্যাদির জমজমাট ব্যবসা চলতে থাকা খুবই ন্যাক্কারজনক ঘটনা। ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকা এসব ঘটনা আমাদের ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে ঘৃণ্য অপরাধমূলক অধ্যায়ের ক্ষেত্র তৈরী করে ফেলেছে। তাইতো ঐসকল সেবাদানকারীদের ভুমিকা থাকা- না থাকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরী হয়ে জনমনে সন্দেহ তৈরী হয়েছে। অবৈধ মাদকব্যবসা যদি স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় ক্রমাগতভাবে চলতেই থাকে তবে সেই সাইনবোর্ডসর্বস্ব উর্দিপরা পাহারা বসানোর আদৌ কি কোন প্রয়োজন আছে? দেশের প্রতিটি গ্রামে যদি মাদকের প্রাপ্তি ঘটে, সব জায়গায় যদি মাদক ব্যবসায়ী ও এর মদদদাতা খুঁজে পাওয়া যায়, তাহলে এই বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবার দিন ঘনিয়ে এসেছে।
করোনার সময় ঘরে বসে নিত্যপণ্য হাতে পতে নিরাপদ ই-ব্যবসা চালু হয়েছে শহরগুেেলাতে। তৈরী খাবার, কাঁচাবাজার, ইলেকট্রনিক্স, ওষুধ, বিলাসদ্রব্য সবকিছু মোড়কে ভরে বাড়িতে সরবরাহ হতে থাকার সুবাদে মাদকব্যবসায়ীরা বড় সুযোগের হাতছানির সন্ধান পেয়ে যায়। মাদক সেবীদের হাতে হোম ডেলিভারীর মাধ্যমে মাদকদ্রব্য ঘরে ঢোকার পথ খুঁজে পায়।
এরপর কুরিয়ার সার্ভিসে জেলা-উপজেলা-ইউনিয়ন পরিষদ ও গ্রামের হাট-বাজারে নিত্যপণ্যের মাধ্যমে দ্রুত মাদক সরবরাহ হতে থাকে। পথে চেকআপ করার নিয়ম থাকলেও করোনার ভয়ে নিয়মিত চেক করা হয়নি, এই কারণ দেখিয়ে বিনা চেকিং-এ নিষিদ্ধ পণ্য চলে যেতে থাকে দেশের এক প্রান্ত হতে আরেক প্রান্তে। কোন কোন পথে স্বয়ংক্রিয় স্ক্যানার বসিয়ে একটু কড়াকড়ির বিষয় ঘটলে অবৈধ লেন-দেনের মাধ্যমে তা ছেড়ে দেয়ার অলিখিত নিয়ম তো পূর্ব থেকে চালু করাই ছিল। এ ছাড়া নিয়ন্ত্রণ বেড়া ও বেপরোয়া ঘোড়াদের অবৈধ আয়ের পথ নিষ্কন্টক করতে বিভিন্ন উপায় খুঁজে বের করার জন্য আরো নিত্য-নতুন কৌশল তৈরী করা হয়। এভাবে লোভনীয় এই ব্যবসা চলতেই থাকে।
এজন্য কেউ ধরা পড়ে কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হলে উপরওয়ালা গড-ফাদারদের ফোন শুরু হয়ে যায়। আমাদের দেশে নৈতিক চরিত্রহীন কিছু মানুষের ছত্রছায়ায় ঘুষ ও পেশীশক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত এই ন্যাক্কারজনক ব্যবসা চালু রয়েছে-যা সবাই জানে। আইন শৃংখলা বাহিনীর অনেক চৌকষ ও নীতিবান সদস্যের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে তদন্ত কাজে কোন ঘাটতি নেই। কিন্তু অনেক সময় উপর মহলের অযাচিত হস্তক্ষেপে তাঁরা ভালভাবে তদন্ত করেও এর সাথে আইনের কঠোরতার প্রয়োগ বা কোন ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে না পেরে নতজানু হয়ে যান। ফলে মাদক ব্যবসা করে ও ব্যবসায় সহায়তা করে সহজে বেঁচে যাবার এই ঘৃণ্য পদ্ধতি চালু থেকেই যায়। এভাবে দিনের পর দিন চলতে থাকে মাদক পাচার ও ব্যবসা। সংশ্লিষ্ট সবাই বেপরোয়াভাবে এই ব্যবসা নিয়ে মাতামাতি করার সুযোগ পায়।
তাইতো ওপেন সিক্রেট এই ঘৃণ্য ব্যবসার অবসান তো হয়-ই না বরং একটু সুযোগ পেলে এর লাফিয়ে লাফিয়ে মাদকের ব্যাপ্তি লক্ষ্য করার বিষয় হয়ে দেখা দেয়। মাদক নিয়ন্ত্রণের কাজে সজাগ দৃষ্টি রেখে সঠিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য সনাতনী ব্যবস্থার প্রচলন আছে। এই আমলাতান্ত্রিক সনাতনী ব্যবস্থায় অশিক্ষিত, জেল থেকে ছাড়াপাওয়া অপরাধীদের সোর্স হিসেবে কাজে লাগানো হয়। নৈতিক চরিত্রহীন কিছু সোর্স এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আরো ভয়ংকর হয়ে উঠে। সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরের এক থানায় পুলিশি হেফাজতে নির্যাতনে এক ব্যক্তির মৃত্যুর পিছনে সোর্সের বাড়াবাড়ির কথা মুখ্য হয়ে উঠেছে।
আধুনিক যুগে এসব সেকেলে সোর্সের উপর নির্ভরশীলতা চলে না। তবুও অবহেলা করে চোখ বুঁজে নিজ দায়িত্বে ফাঁকি দিয়ে এসব নীতিহীন সোর্সের উপর ভরসা করে বড় বড় কর্মকান্ড চালানো হয়ে থাকে। ফলে বিরাট বাজেট ব্যয় করেও ইতিবাচক ফলের পরিবর্তে একটি ন্যায়ানূগ ছোট ঘটনাকে জটিল করে তোলার নজির তৈরী হয়ে যায়। এজন্য আইন-শৃংখলা বাহিনীর সোর্সদেরকে কাজে লাগানো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য সোর্সদের ভূমিকা আরো বেশী প্রশ্নবিদ্ধ।
জানা গেছে, প্রতিদিন নৌপথে মাদকের যে বড় বড় চালান আসছে, তার শতকরা ২ ভাগও ধরা পড়ছে না। “আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেক সোর্স আছে, যারা মাদকের বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য দিয়ে সহায়তা করে থাকেন। কিন্তু সোর্সদের কোনো টাকা দেওয়া হয় না। প্রচলিত আছে, ১ হাজার বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার হলে সোর্সকে দিতে হয় ৩০০ বোতল। পরবর্তী সময়ে সোর্সরা ঐ সব মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দেন।” অথচ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয় সোর্সমানি হিসেবে। এসব টাকার কোনো হিসাব দেওয়া হয় না।
সবকিছু মিলে মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রচলিত পদ্ধতি ও কৌশল আধুনিক যুগের সাথে যায় না। চোর প্রতিদিন চুরি করে আর ভাবে তার কিছুই হবে না! মাদক ব্যবসায়ী ভাবে, তার বড়ভাই আছেন, ধরা পড়লে তিনিই তাকে ছাড়িয়ে আনবেন। এসব চোর-ডাকাতদের শাস্তিদাতাকে তাদের উপরওয়ালারা শাসায় ও বড় অঙ্কের লোভ দেখিয়ে নিবৃত্ত করে। এই হলো মাদকের অতি দুষ্ট চক্রের চালবাজি। যার ফলে টেকনাফের সাবরাং লাফারঘোনা মেরিণড্রাইভের নিকট কেওড়াবনে লাফিয়ে লাফিয়ে ইয়াবাচোরের পলায়ন করার মত পরিস্থিতি দেশের সব সীমান্ত, সব পয়েন্ট, সব বড়মাথা ও কথাওয়ালাদের আশেপাশে প্রতিদিন ঘটে। আমরা টিভি, পত্রিকা, ইন্টারনেটে সেসব পড়ি, ছবি দেখি আর হা-হুতাশ করে সময় কাটাই! দেশের নাগরিকদের সৎকাজের প্রতি আগ্রহ ও অন্যায়-অসৎ কাজের প্রতি ঘৃণা সষ্টির জন্য মোটিভেশনাল তেমন কিছুই গণমাধ্যমে বা সমাজে চোখে পড়ে না। চারদিকে অসম প্রতিযোগিতা ও হতাশা বেড়ে যাওয়ায় ভাল হবার জন্য তেমন কিছুই মানুষকে উৎসাহ যোগায় না। শুধু মনে হয়- আমাদের দেশে কবে সেই সুদিন হবে, যেদিন দিকে দিকে মানুষের মানবতা জেগে উঠে ছোট-বড় সকল চোরের উপযুক্ত শাস্তি দেয়া হবে। সেদিন লাফারঘোনার নিকট সমুদ্রপাড়ের কেওড়াবনে ইয়াবাচোরের মত আর কোথাও কোন চোর পালাতে সুযোগ পাবে না।

* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top