logo
news image

তিস্তা পুনরুজ্জীবন প্রকল্পে চীন-নড়েচড়ে উঠছে ভারত

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।।
আন্তর্জাতিক নদী তিস্তা বাংলাদেশ মৃতপ্রায়। বহু বছর ধরে খরা ও বন্যা উভয় মওশুমে তিস্তা নিয়ে দুর্গতির শেষ নেই। তিস্তানদী সৃষ্ট সমস্যা সমাধানের জন্য কয়েক দশক ধরে চলমান উদ্যোগের ঘাটতি নেই, কিন্তু সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য জন্য প্রতিপক্ষের দীর্ঘসূত্রিতা ও অবহেলারও শেষ নেই। বাংলাদেশের তিস্তাতীরের ভুক্তভোগী মানুষের অপেক্ষা ও কষ্টের দীর্ঘশ্বাসকে কেউ পাত্তা দেয় বলে মনে হয় না।
সম্প্রতি জানা গেছে পিকিং ‘তিস্তা রিভার কমপ্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট এন্ড রেস্টোরেশন’ নামে একটি প্রকল্প হাতে নেয়ার পরিকল্পনা করেছে। তিস্তা নদীর বাংলাদেশ অংশে নদীটির বিস্তৃত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুজ্জীবন দান করা এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায় ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ অনুযায়ী, দেশের অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্পগুলোর মধ্যে ‘ক্লাইমেট অ্যাডাপটেশন সেন্টার’ প্রতিষ্ঠা এবং ‘তিস্তা রিভার কমপ্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট এন্ড রেস্টোরেশন প্রজেক্ট’ অন্যতম। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে তিস্তার পারে থাকা শত শত একর ভূমি পুনরুদ্ধার হবে যা ভূমিহীন মানুষ কিংবা শিল্পায়নের কাজে লাগানো হবে। সেই সাথে ড্রেজিং করে নদীর গভীরতা বাড়ানো হবে। গভীরতা বাড়িয়ে এবং বিস্তৃতি কমিয়ে যদি একই পরিমাণ পানির প্রবাহ ঠিক রাখা যায় তাহলে নদীর পাড়ের জমি উদ্ধার করা সম্ভব হবে। এছাড়া তিস্তা নদীতে যাতে ভাঙন রোধ করা যায় সে বিষয়েও পরিকল্পনা রয়েছে।
এরই মধ্যে চীন তিস্তা নদীতে কি ধরনের প্রকল্প হতে পারে সে বিষয়ে প্রাথমিকভাবে ধারণা নেয়ার জন্য জরিপ পরিচালনা করেছে বলে জানা যায়। এই প্রাথমিক জরিপের খরচ চীন নিজেই বহন করেছে।
এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে আনুমানিক আট হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে পরিকল্পনাটি ইআরডির আওতায় রয়েছে। চীনা কর্তৃপক্ষ ইআরডির সাথে যোগাযোগ করে আগ্রহ প্রকাশ করলে প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখতে পারে।  এই অর্থ যোগান দেয়ার জন্য বিদেশী সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে বলে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে। পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জানান, “ছয় মাস আগে এ ধরনের কয়েকটি প্রকল্প দাতা দেশগুলোর সামনে তুলে ধরা হয়েছিল। সেখানে তিস্তার প্রকল্পটির বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছিল চীন।” এখন অর্থায়নের বিষয়টি পুরোপুরি নির্ধারণ করবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। তবে কার্যত: প্রকল্পটি চীনের ঋণ সহায়তায় পরিচালিত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। এখনও বিষয়গুলো প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। পানিসম্পদ উপমন্ত্রী বলেছেন, “এই পরিকল্পনাটি এখনো খুবই প্রাথমিক অবস্থায় রয়েছে। এটি নিয়ে মন্তব্য করার সময় আসেনি।”
আ্পাতত: এতটুকু। তাতেই দেশে বিদেশে এই প্রকল্প নিয়ে নানা গণমাধ্যমে বেশ সরব অবস্থা শোনা যাচ্ছে। হবেই না বা কেন? কত খরা, কত বর্ষা গেল। সমানেই নভেম্বর ২০২০ এলে আবার তিস্তার শীর্ণকায়, শুষ্ক-মরা চেহারা দেখে এর পাড়ের বাসিন্দাদের উৎকন্ঠা বেড়ে যাবে। সাথে দেশে আবার রাজনৈতিক টানাপোড়েন শুরু হবে। দিল্লীর উপর ভরসা করে আর কতদিন অপেক্ষা করা যায়?
তাই পিকিং-এর এই উদ্যোগকে অনেকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। খবরটি প্রকাশিত হতেই তিস্তাপাড়ের মানুষ কিছুটা স্বস্থিতে নি:শ্বাস ছেড়েছেন। অনেকগুলো দৈনিক পত্রিকা প্রথমপৃষ্ঠায় গুরুত্ব দিয়ে ফলাও করে সংবাদটি ছেপেছে। টিভি ছাড়াও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘তিস্তা রিভার কমপ্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট এন্ড রেস্টোরেশন’ প্রকল্প নিয়ে খুশির ফোয়ারা বইছে। এখন অপেক্ষার পালা শুরু।
কিন্তু এ নিয়ে রাজনৈতিক সুতোয় টান পড়তে দেখা যাচ্ছে। ভারত-চীনের মধ্যে লাদাখের যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে উত্তেজনা, বিশ্বে করোনার ভয়াবহ সংক্রমণ ও ক্রমাগত মৃত্যু, টিকার বিশ্বায়ন নিয়ে এলোমেলো সিদ্ধান্ত বর্তমানে এক বিশৃংখল, জটিল ও খুব নাজুক বিশ্বস্বাস্থ্য পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। এখন হুমকির মুখে মানুষের জীবন ও বিশ্ব মানবতা। তবুও কেউ আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ ছাড়তে এতটুকু রাজি নয়।
বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান এবং কৌশলগত সুবিধার কারণে প্রতিবেশী দেশগুলো সুসম্পর্ক রাখতে চায়। আবার বেশী শান্তিতে থাকুক বা বেশী ক্ষমতাধর হোক সেটা প্রতিবেশী দেশগুলোর কেউ চায় বলে মনে হয় না। তাইতো মাদকদব্য ঢুকিয়ে দিয়ে, সীমান্তে হত্যা করে, আন্তর্জাতিক নদীর পানি উজানে বন্ধ করে দিয়ে, রোহিঙ্গা পুশইন করিয়ে, সমুদ্রের মাছ চুরি করে, অশ্লীলতা ও পর্ণো পাঠিয়ে, সাইবার এট্যাক করে, চারিদিকে আমাদের নাস্তানাবুদ করার প্রচেষ্টা চালানো হয় প্রতিনিয়ত। তবুও আমাদের অগ্রগতি দমে যাবার নয়। আমাদের শক্তি আমাদের উর্বর মাটি, কর্মঠ মানুষ ও দেশে-বিদেশে তাদের কাজের সুনাম ও অর্জিত আয়। নদীর পানি আটকিয়ে,  বা মাদক পাচার করিয়ে অথবা অন্য কোন চক্রান্ত করেও তাদেরকে দমানো যাবে না।
গত মাসে বাংলাদেশে ঝটিকা সফর করেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিস্তাসমস্যা সেই সফরের এজেন্ডায় ছিল না কিন্তু সেটি বেশী গুরুত্ব পায় বলে সংবাদে জানা গেছে। কারণ, বন্ধুপ্রতীম দু’দেশের অনেক সমস্যা উত্তরণে ব্যবস্থা নেয়া হলেও যুগের পর যুগ ঝুলে থাকা তিস্তাচুক্তি উভয় দেশের মধ্যে সবচে অবহেলিত, উপেক্ষিত ও অমীমাংসিত সমস্যা। এজন্য আমাদের দেশে ঘাসমূল পর্যায় থেকে উচ্চমহলেও অশান্তি রয়েছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক নানা বিষয়ে আমাদের দীর্ঘকালীণ সিদ্ধান্তহীনতা ও নড়বড়ে অবস্থান নিয়ে অনেকে সন্দেহ পোষণ করার ফুরসৎ পেয়ে যায়। চীনও কম যায় না। আমাদের দেশে তাদের উদ্ভাবিত টিকার ট্রায়াল নিয়ে আমাদের নড়বড়ে অবস্থান দেখে তারা সতর্ক হয়েছে। বাংলাদেশ আলাদাভাবে তাইওয়ান প্রদত্ত করোনা শনাক্ত সামগ্রী উপহার হিসেবে গ্রহণ করায় চীন অখুশি হয়ে হতাশা জানিয়েছে (দি এশিয়ান এজ ৩.৯.২০২০)।
প্রকল্পটির বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের একজন শিক্ষক মন্তব্য করেন- “চীনই আসলে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ থেকেই তিস্তা প্রকল্পের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছে। প্রকল্পটি চীনের সহায়তায় হচ্ছে। কিন্তু প্রকল্পের অর্থায়নের এক বিলিয়ন ডলার বাংলাদেশকে সহায়তা হিসেবে নয় বরং ঋণ হিসেবে দেয়ার কথা রয়েছে। যা বাণিজ্যিক সুদের হার মিলিয়ে ফেরত দিতে হবে। এই অর্থ ফেরত দিতে না পারলে কী ধরনের পরিণতি হতে পারে সে বিষয়টিও ভেবে দেখার অবকাশ রয়েছে।” বিভিন্ন কারণে চীনের এই সহায়তার বিষয়টি ভারত খুব ভালভাবে নেবে না বলে অনেকে মনে করেন।
অপরদিকে চীনকে তিস্তার জরিপ কাজে সম্মতি দেয়ার সংবাদে কলকাতা টিভিতে (২৮.৮.২০২০) প্রতিবেদন প্রচারিত হয়েছে-“বাংলাদেশ দখলে চীন।” কলকাতা টিভির এই সংবাদ ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। দর্শকদের কিছু মন্তব্য তুলে ধরা হলো- “তিস্তা পানি চুক্তিতে বাংলাদেশকে অবহেলা ছাড়া কিছুই দিতে পারেনি ভারত। আর ঠিক সেই সময় চীন যখন বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নের জন্য অর্থ ঋণ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, তখনই মাথায় যেন বাজ ভেঙ্গে পড়লো। এখন নানারকম উস্কানি দিয়ে যাচ্ছে অনবরত; আর বাংলাদেশকে এভাবে ছোট করে উপস্থাপন খুবই অপমানজনক।” “ভারত তো বন্ধু রাষ্ট্র তাহলে এখন ওদের জ্বলে কেন.. বহুত খেলেছে এখন আমরা খেলবো ওরা দেখবে।”
তারা খরায় পানি দিতে চায় না। অন্যদিকে, আমরা বর্ষার পানি কারো সহায়তায় জমিয়ে রেখে কৃষিকাজ করি তাতেও বাগড়া দিতে চায়। উভয় দেশের সার্বিক অবস্থাদৃষ্টে দেখে মনে হয়- ‘বাংলাদেশ তুমি কার পক্ষে যাবে?’ তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমাদের স্বকীয়তা নিশ্চিত করা দরকার।
করোনা দেখিয়ে দিয়েছে যাদের কৃষিজমি আছে তারা বিশ্ববাণিজ্য বন্ধ হয়ে গেলেও বেঁচে থাকতে পারবে। বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল মেরুদন্ড হল কৃষি। বর্ষায় বন্যা ও ‘ফøাশ-ফ্লাড’, খরায় প্রয়োজনীয় পানি না থাকা আমাদের কৃষি নির্ভর এ এলাকার অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছে। বন্যাকে শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে ভাবলে চলবে না। এর সব কারণ খতিয়ে দেখে কৃষি ও কৃষককে বাঁচাতে তৎপর থাকতে হবে। করোনার আক্রমণে দিশেহারা মানুষ পুনরায় তাদের আদি পেশা কৃষিকে আঁকড়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা করছে।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল যেহেতু অনেকটা নিরাপদ কৃষিভূমি দ্বারা আবৃত, এটাকে সযত্নে লালন করার জন্য তিস্তা ক্যাচমেন্ট এলাকাকে নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। করোনাকাল ও এর বিদায় পরবর্তী দেশের আর্থ-সামাজিক নীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নে ডেল্টা পরিকল্পনায় তিস্তা-ধরলা-ব্রহ্মপুত্র বেসিনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ভারতের সাথে তিস্তাচুক্তি দ্রুত সম্পন্ন করা না গেলে দেশের কৃষি-অর্থনীতির উন্নয়নে চীনের ‘তিস্তা রিভার কমপ্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট এন্ড রেস্টোরেশন’ প্রকল্পের মাধ্যম তিস্তা নদী তথা ডালিয়া ব্যরাজকে পুনরুজ্জীবন দেয়ার বিকল্প নেই।

* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top