logo
news image

টাকার ডেগ ও ইয়াবাইদের অপতৎপরতা

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।।
আমার এক বন্ধু খুব আশাবাদী স্বভাবের মানুষ। তার চাল-চলন, বেশভূষায় সবসময় মার্জিত ভাব। কথাবার্তায় তার স্মার্টনেস আমার সহপাঠিদেরকে ক্যাম্পাস জীবনের সময়টাকে বিমোহিত করে রাখতো। এখনো তার কথা আমাদের আশা জাগায়।
হঠাৎ সেদিন লক্ষ্য করলাম, সে লিখেছে- “কোন এক বিচিত্র কারণে চোর, বাটপার, লম্পট, চরিত্রহীন, বেঈমানরা এই পৃথিবীতে ভালো থাকে, আর একদল মূর্খ বলে সৃষ্টিকর্তা নাকি এদের বিচার করবে।” সামাজিক যোগাযোগের কল্যাণে বন্ধুদের সংগে প্রায়ই যোগাযোগ হয়ে যায়। তাই গত ছয় মাসের মতামতের সাথে আজ তার বচন শুনে কিছুটা খারাপ লাগলো। ভাবলাম করোনার সময়টাতে আর পেরে উঠতে না পেরে এবার সে ধৈর্য্যহারা হয়ে যাচ্ছে। আমি কিছু বলার আগে কেউ একজন বলেছে, ‘ধৈর্য্য ধর বন্ধু। আল্লাহ তোমাকে পরীক্ষা করছেন।’ সে বলেছে- ‘সৃষ্টিকর্তার নামে প্রবোধ ও সান্তনা কি শুধু দুর্বলদের জন্য প্রযোজ্য হবে? বিচার কি কখনো হবে?’
ভাবলাম, সর্বনাশ! সে তো এমন ছিল না। এখন তার ঈমান নড়বড়ে অবস্থায় চলে এসেছে। চারদিকের হীন সামাজিক ও মানসিক অস্থিরতা তাকে গ্রাস করতে যাচ্ছে। আর তা যাবেই না বা কেন?
আজকেই তো দেশের  সর্বোচ্চ বিচারালয়ে পুলিশের তল্লাশি চালানো হয়েছে। কেউ একজন সেখানে সাধারণ পদে অধিষ্ঠিত থেকে নিজেকে একবার ব্যারিষ্টার, একবার জজ হিসেবে পরিচয় দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করতো। প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে বহুতল বাড়ি, দামী দামী গাড়ি  হয়েছে। ঈদুল আযহার ক’দিন পূর্বে নাকি পঁচানব্বই লক্ষ টাকা দামের আরেকটি গাড়ি কিনেছে যা তার অতীত-বর্তমান আয়ের সাথে যায় না। নিজের স্টাটাস ও আর্থিক উৎসের সাথে বেমানান জীবন যাপন তকে বেপরয়োয়া করে তুলেছে। বিষয়টি সামনে এলা তখনি, যখন জানা গেল ১০০টি ইয়াবা বড়ি বিক্রির মূল উৎস তার আবাসের ঠিকানা। আরো জানা গেছে সে ইয়াবা ব্যবসায়ী! অর্থ্যাৎ, সে একজন মাদক ব্যবসায়ী, যে দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয়ে বসে দিব্যি আইনের শাসন সমুন্নত রাখার চাকুরী করে নীতির সেবাদান করছে! অর্থাৎ, এখানেও প্রদীপের নিচে ঘোর অন্ধকার!
আমার সেই বন্ধুটি করোনার ভয়ে গত ক’মাস যাবত তার নিজ গ্রামের বাড়িতে যায়নি। ঈদের একদিন পরে বাড়ি থেকে ফোন পেল, তার বাড়িতে সন্ত্রসীদের হামলা হয়েছে। হঠাৎ এমন সংবাদে বিচলিত হয়ে পড়ল সে।
প্রতিবেশী কিছু যুবক সন্ত্রাসী হয়েছে। তাদের কারো কারো নামে আদালতে মাদক চোরাচালানের মামলাও চলছে। আকাশ থেকে পড়লো সে। ওদের কেউ কলেজে পড়তো। এর আগে কেউ মাদ্রাসায় পড়েছে। মাদকদ্রব্য সেবনের কারণে তারা বিগড়ে গিয়ে সন্ত্রাসী কাজে অবতীর্ণ হয়ে পড়েছে। তারা গ্রামের উঠতি কিশোরদের দিয়ে নানা অপরাধ করাচ্ছে এবং কাঁচা পয়সা হাতে পেয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করে মানুষের উপর মহা উৎপাত শুরু করেছে। অবৈধ অর্থ সব অপরাধের মূল।
এক রিপোর্টে জানা গেল, করোনা শুরুর প্রথম দু’এক মাস মাদক ইয়াবার চালান ছিল না। গডফদাররা বিদেশে লুকিয়ে ছিল। এখন সারা পৃথিবীতে করোনার কালো থাবায় আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি কিছুটা শিথিল হয়ে পড়ায় মাদক ব্যবসায়ী ও সন্ত্রসাীরা আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে। আমাদের দেশে বিভিন্ন রুটে এত বেশী মাদকের চালান ঢুকে পড়ছে, যে তা বলাই বাহুল্য। করোনার কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শহর থেকে গ্রামে ফেরত গ্রাম-গঞ্জের উঠতি কিশোর যুবকরা ইয়াবা বিক্রির টার্গেটে পরিণত হয়েছে। ওদেরকে ইয়াবা সেবন ও ব্যবসা উভয় কাজে লাগানো হচ্ছে। কাঁচা পয়সার লোভে অনেকে ঝুঁকে পড়েছে এই অনৈতিক কাজে। লোভী ‘ইয়াবাই’-রা কৌশলে সারা দেশে ইয়াবা ব্যবসা ছড়িয়ে দিয়ে দেশটাকে মাদকে সেবনের আখড়া বানিয়ে ফেলেছে। আমার পূর্বের কয়েকটি লেখায় উল্লেখ করেছি- ‘‘ইয়াবাই’ কথাটি জাপানী গালি জাতীয় নেতিবাচক শব্দ। আর ‘ইয়াবাই’ অর্থ মন্দ, বাজেকিছু বা ‘বিপদ ভয়ঙ্কর’। এই শব্দটি হাল্কা মন্দ থেকে চরম নেতিবাচক সব পরিস্থিতিতে ব্যবহৃত হয়। যেমন, বাংলায়- চুপ কর! বেয়াদব কোথাকার। বাক্যটিকে এককথায় ‘ইয়াবাই’ শব্দ দিয়ে বোঝানো যায়। আবার- অন্যায়, অবিচার, কঠিনকাজ, ভয়ঙ্কর, সামনে মহাবিপদ, ইত্যাদিও ক্ষেত্রেও ‘ইয়াবাই’ শব্দ দিয়ে বুঝানো হয়।”
এদের ভয়ংকর প্রভাবে কিশোর গ্যাং মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। ইয়াবা ব্যবসা করে রাতারাতি অবৈধ টাকা উপার্জন করে মনে হয় তারা ‘টাকার ডেগ’ বা হাঁড়ি পেয়ে গেছে।
আগেকার দিনে হঠাৎ টাকার ডেগ নামক গুপ্তধন হাতে পেলে মানুষ এমন আচরণ করতো। কেউ বাড়ি বানাতো, কেউ সরাইখানা বানাতো, কেউ মসজিদ, ইঁদারা ইত্যাদি বানাতো। কেউ নেতা হবার জন্য নির্বাচন করতো।
প্রাচীন কাল থেকে চোর-ডাকাতের ভয়ে নিরাপত্তার জন্য ধনীরা নিজ ঘরের মেঝের মাটিতে টাকা পুঁতে রাখতো। তখন ব্যাংকের ব্যবস্থা ছিল না। আর কোন বিকল্পও ছিল না। টাকা বলতে স্বর্ণ, রৌপ্য ও ব্রোঞ্জের মুদ্রা মাটি অথবা পিতলের হাঁড়িতে ভরিয়ে লাক্ষা দিয়ে মুখ বন্ধ করে লালশালু কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে শয়ন ঘরের মেঝেতে কোন এক জায়গার পুঁতে রাখতো। এরপর তার উপরে মাটি দিয়ে লেপে দিত। অনেক ধনী কৃপণ মানুষরা এই কাজ বেশী করতো বলে গল্প শোনা যায়। টাকার মালিক গোপনে এই কাজটি করতো। ফলে তিনি মারা গেলে ঐ মুদ্রার খবর আর কারো জানা না থাকায় সেটা উদ্ধার করা যেত না। কালের পরিক্রমায় সে সকল জায়গা ইঁদুর বা সাপ বাসা বাঁধতো। বহুযুগ পরে কোন পুকুর কাটতে গিয়ে অথবা নতুন বাড়ির ভিত্তি দিতে গিয়ে এ ধরনের টাকার ডেগ আবিষ্কৃত হতে দেখা গেছে। সেসব জায়গায় হাঁড়ির সাথে বড় সাপকে গলা পেঁচিয়ে থাকতে দেখে অনেকে এক কালনাগিণীর ধন বা যক্ষের ধন বলে ধারণা করতেন। আজকাল সেগুলো উপাখ্যান মাত্র।
আজকাল অনেক মানুষ আয়ের বৈধ উৎস ছাড়াই হঠাৎ করে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যায়। এখন তো আর যক্ষে ধন যোগায় না। কিছু মানুষ নাগ-নাগিণীর ভূমিকায় থেকে অবৈধ উপায়ে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে। মাদকদ্রব্যের ব্যবহার চালু করার জন্য তারা সমাজের স্পর্শকাতর শ্রেণিকে বেছে নেয়। বিশেষ করে উঠতি শিক্ষার্থী ও যুবক শ্রেণিকে। মাদক জীবাণু অস্ত্রের চেয়ে বেশী ভয়ংকর। কারণ, মাদক মানুষ জেনে শুনে গ্রহণ করে। কেউ একবার আসক্ত হলে সে ছাড়তে চাইলেও মাদক তাকে ছাড়ে না। এভাবে কোন পরিবার, সমাজ বা দেশের ধ্বংস ডেকে আনতে চাইলে মাদক ছড়িয়ে দেয়াটা হচ্ছে বড় অস্ত্র।
বিশেষ করে আমাদের মত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে যেখনে বিয়ার, মদ বা সব ধরনের মাদক সেবন করা হারাম বলে গণ্য করা হয় সেখানে ঐ ধরনের মাদকের পরিবর্তে যেগুলো গোপনে লুকিয়ে ব্যবহার করা যায়, যেমন হেরোইন, ইয়াবা, গাঁজা অথবা কাশির সিরাপ হিসেবে ফেন্সিডিল ইত্যাদিকে সুকৌশলে সমাজে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এজন্য প্রতিবেশী দু’টি দেশ ভারত ও মিয়ানমার সবচে’ বেশী দায়ী। বিশেষ করে ইয়াবা উৎপাদন, পাচার, চোরাচালান ও অবৈধভাবে বিপণনের জন্য প্রতিবেশী দেশের অপরাধীদের সাথে আমাদের দেশের সর্বস্তরের অপরাধীরা নির্বিঘ্নে  প্রতিদিন এই ঘৃণ্য কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশের কিছু লোভী, পিশাচ শ্রেণির মানুষ মাদক ব্যবসায় সহযোগিতা করে যাচ্ছে। বিশেষ করে ইয়াবা বিক্রি করে তারা ‘টাকার ডেগের’ সন্ধান পেয়েছে। এই অবৈধ অর্থ দিয়ে তারা বিলাসী জীবন যাপন করে মজা লুটছে।
শুরুতে বন্ধুবরের আক্ষেপ দেখে মনে হলো চোর, বেঈমানরা খুব ভাল আছে। আসলে এখন তারা মোটেও ভাল নেই। কথায় বলে না- ‘চোরে চোরে মাসতুত ভাই’। তারা ভাল নেই, তাদের দোসররাও সুখে নেই। মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতা ও আমাদের দেশটা মাদক ব্যবহারের স্বর্গরাজ্য বনে যাবার কারণে ইয়াবা, ফেন্সিডিল ইত্যাদির রমরমা ব্যবসা করে কাঁচা পয়সা আয়ের কাহিনী সবাই জানে। এই অবৈধ আয়ের সুযোগ আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ভয়ংকর অপরাধ ও জটিল মনো-সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি করে যাচ্ছে। এটা এখন ওপেন সিক্রেট। আমরা লিখি, বলি। কেউ পড়ে, কেউ শোনে, কেউ ভ্রু কুঁচকায়। মাদকের ছোবলে ভুক্তভোগী কেউ বা ধ্বংস হয়ে যাওয়া কোন পরিবারের সদস্যরা হয়তো আফসোস করে। যারা পাহারা দেবার দায়িত্ব অবহেলা করে মাদককে সীমান্তে ঢুকতে দিচ্ছে, যারা পাচার করেছে, যারা গাড়ি-বাড়ি কিনে বিলাসী জীবনকে বেছে নিচ্ছে তাদের কেউ কি করোনার জ¦ালায় সুখে আছে? গড-ফাদার ও মাসতুতো ভাইয়েরা পৃথিবীর শেষ কোণায় লুকিয়ে থাকলেও কোন লাভ হবে না। কথায় বলে- ‘পাপ বাপকেও ছাড়ে না।’
এটা তো গেল ছোট্ট অদৃশ্য অনুজীবের সামান্য কাহিনী। তাতেই মানুষ নাজেহাল। আর বিশ্বাসীদের জন্য বড় বিচারের দিনে সুখবর তো আছেই। বন্ধুকে বলছি, ঐ ভন্ড, বাটপারদেরকে আবার ঘৃণ্য কর্মকান্ড থেকে নিবৃত্ত থাকতে বলিও- যদি তাদের ভ্রম ভাঙ্গে। তাহলে সামাজিক বৈষম্য কমে যাবে, আমাদের প্রিয় দেশটা সহ পৃথিবীটা আরো শান্তির জায়গা হবে।

* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top