logo
news image

চামড়া বিপণন বিড়ম্বনায় বঞ্চিত দুস্থ:-এতিম

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।।
এবারের কোরবানি ঈদের নামাজের পর সকাল নয়টায় পশু কোরবানি দিয়েছি। উঠোনের লিচু গাছের ছায়ায় সকাল থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত পশুর চামড়া রাখা ছিল। ক্রেতা আসেনি, বিক্রি হয়নি।
অর্ধশতাব্দী ধরে দেখে আসছি কোরবানীর পশুর চামড়ার কদর। এর আগে প্রতিবছর দেখেছি ঈদের দিন কোরবানী শুরু হবার পূর্বেই ফড়িয়া ক্রেতারা বাড়ি বাড়ি ঘুড়ে চামড়ার দরদাম ঠিকঠাক করে কেনার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হ’তো। গরীব মিসকিনদেরকে বেশী দান করতে পারবেন এই আশায় যিনি বেশী দাম দিতেন তার কাছেই চামড়া বিক্রি করে দিতেন। গতবারের পর এবারও ব্যতিক্রম ঘটেছে। এবারও চামড়া কিনতে কেউ আসেনি। শেষে এক এতিমখানায় ফোন করে চামড়াগুলো নিয়ে যাবার অনুরোধ করেছি, তারা নিয়ে গেছে। তারা কোথাও সেগুলো বিক্রি করতে পেরেছে কি না জানি না!
আজকের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইন পত্রিকায় চোখ বুলাতেই কোরবানীর পশুর চামড়া নিয়ে ট্যানারী মালিকদের কারসাজি ও কোরবানিকারীদের দুরাবস্থার সংবাদগুলো খুব ব্যথিত করলো। নওগাাঁর এক গ্রামে কোরবানির চামড়াগুলো বিক্রি না হলে নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে। যেটা পরিবেশ দূষণের জন্য মারাত্মক প্রভাব ফেরতে পারে। তবে কোথাও কোথাও সংরক্ষণের অভাবে ও পরিবেশ দূষণের ভয়ে মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়েছে।
করোনা মহামারী যেমন আমাদের চেতনাকে মানবিক পর্যায়ে নাড়া দিয়েছে ঠিক তেমনি কোরবানীর পশুর চামড়া নিয়ে কারসাজি ও দুরাবস্থার সাম্প্রতিক চিত্রগুলো আমাদের অর্থনীতি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিকে নাড়া দিয়েছে। একটি পত্রিকা উল্লেখ করেছে- ‘এতিম গরীবদের হক মেরে দিল ট্যানারী মালিকদের সিন্ডিকেট’। ঢাকার মহাখালীর এক মাদ্রাসা শিক্ষক জানিয়েছেন, সে এলাকার মানুষ কোরবানীর চামড়া মাদ্রাসার ফান্ডে দেন। চামড়া বিক্রির এই টাকা এতিম ও দরিদ্র শিশুদের পড়াশুনা ও খাবারের খাতে খরচ করা হয়। দেশে নওগাঁ, সুনামগঞ্জ ও মহাখালীতেই শুধু নয়-এ ধরণের হাজার হাজার বেসরকারী সাধারন ও ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এতিম, অসহায়, অবহেলিত শিশু শিক্ষার্থীরা কোরবানীর পশুর চামড়া বিক্রির অর্থ দিয়ে পড়াশুনা ও খাবারের খরচ মিটিয়ে থাকে।
একটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে উদ্যাপিত হয়েছে এবারের কোরবানি ঈদ। প্রথমদিকে করোনার ভয়ে শহরের বিত্তশালী মানুষ কোরবানি না করার মনোভাব নিলে বাজারে পশুর দাম কমে যায়। ফলে পশু ব্যবসায়ীরা পানির দামে পশু বিক্রি করে বাড়ির পথে রওয়ানা দিলে ঠিক ঈদের একদিন পূর্বে রাজধানীসহ দেশের সব বড় শহরের ঈদের হাট শুন্য হয়ে পড়ে। মিডিয়ায় পশুর  দাম সস্তা শুনে শহরের মানুষ পশু কিনতে হাটে ছুটে যায়। তখন ক্রেতা বেশী হওয়ায় পশু নিয়ে সংকটে কাড়কাড়ি শুরু হয় এবং ৪০ হাজার টাকার গরুর দাম বেড়ে একলক্ষ টাকা হয়ে যায়। দাম আকাশচুম্বি শুনে রাজধানীর আশেপাশের খামারী ও গৃহস্থেরা তাদের ছোট-বড় সকল পোষা পশু নিয়ে হাটে হাজির হলে পশুসংকট কিছুটা কেটে যায় এবং মানুষ কোন না কোনভাবে কোরবানির পশু সংগ্রহ করে। এভাবে করোনাভীতি উপেক্ষা করে মানুষ এবারে কোরবানি দিতে সমর্থ হয়েছে।
কিন্তু চামড়া বিক্রি নিয়ে গভীর সংকটে পড়েছে তারা। ফড়িয়া চামড়া ক্রেতারা বাড়িতে চামড়া কিনতে আসেনি এবার। ফলে অনেকে ব্যাক্তিগত গাড়ি ও ভ্যান ভাড়া করে নিকটস্থ গোলায় চামড়া নিয়ে গেছে বিক্রির জন্য। পোস্তা এলাকায় চামড়া কিনতে বসা একজন ব্যবসায়ী বলেছেন, খুব স্তায় তিনি চামড়া কিনেছেন। ১০০-২০০ টাকায় গরুর চাড়া এবং চার পিস ছাগলের চামড়া মাত্র দশ টাকায় কিনেছেন! দূর-দূরান্ত থেকে চামড়া বিক্রি করতে এসে অনেকের ভ্যান ও ভট্ভটি ভাড়া উঠেনি।
উত্তরবঙ্গের নওগাঁ, দিনাজপুরের রামনগর বাজার, রাজশাহীর বানেশ^র প্রভৃতিতে মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ীরা ধার দেনা করে চামড়া ক্রয় করে নি:শেষ হয়েছে। করোনার ভয়ে সারা দেশে মাদ্রসা বন্ধ থাকায় এবং সংক্রমণের ভয়ে  ক্রেতারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে চামড়া কিনেনি। ঢাকার পোস্তায় ৪০ ভাগ চামড়া পচে নষ্ট হয়ে গেছে। চট্টগ্রামে মাদ্রাসা ও এতিমখানায় দিয়ে আসা দানকৃত চামড়া বিক্রি করতে পারায় এবং সংরক্ষণের অভাবে পচে গেছে। সেগুলো সিটি কর্পোরেশনের লোকেরা বুলডোজার দিয়ে ডাম্পিং করার ছবি টিভিতে প্রচারিত হয়েছে। এভাবে মূল্যবান জাতীয় সম্পদ চামড়ার ক্রয় শৈথিল্যে এবং পচন, ডাম্পিংয়ে বঞ্চিত হয়েছে লক্ষ লক্ষ দুস্থ:-এতিম শিক্ষার্থী।
অনেকে মন্তব্য করেছেন- পানির দামে চামড়া বিক্রি ও ট্যানারী মালিকদের কারসাজিমূলক চামড়া ব্যবসা যেন শায়েস্তা খাঁর আমলকে হার মানিয়েছে। তারা বলেন- কেন সব পন্যের দাম এমন হয় না? জুতো, কাপড়, মাংস, ব্যাংক, বীমা, বিমান- সবাই চামড়ার দামের মত শায়েস্তা খাঁর আমালের অবস্থানে চলে গেলে ভাল হয়।
চামড়া আমাদের জাতীয় সম্পদ। এই খাতে ব্যবসার বিপর্যয়ের অর্থ হলো হাজার হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা নিয়ে টানাটানি শুরু হওয়া।
এছাড়া কওমী মাদ্রাসা, এতিমখানা ও লিল্লাহ্ বোর্ডিংগুলোর বার্ষিক আয়ের বড় উৎস হলো কোরবানির চামড়া। কোরবানির চামড়া বিক্রির অর্থ কোরবানিদাতারা নিজে ভোগ করেন না। এই অর্থের পুরোটাই গরীব-দু:খীদেরকে দান করা হয়। এত সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষের অভাব কিছুটা দূর হয়ে শান্তি ফিরে  এত সামাজিক ভাঙ্গন দূর হয়, অপরাধ কমে। এতে সামাজিক স্থিতিশীলতা তৈরী হয়। তাই বৃহত্তর সামাজিক শান্তি ও প্রগতির লক্ষ্যে কোরবানির চাড়া বিক্রির অর্থের দাবীদার তারাই।
শুধু নিজেদের অতি মুনাফার কথা চিন্তা না করে ট্যানারী মালিকদের এ দিকটি নিয়ে ভাবা উচিত। এটাও আমাদের সমাজ ও অর্থনীতির ওপর কালো থাবা। করোনার জন্য দেশের জনস্বাস্থ্যের বর্তমানে ক্রান্তিকাল চলছে। তার ওপর পরিবেশের বিরূপ প্রতিক্রিয়া বিদ্যমান। এমতাবস্থায় দেশের এককালের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানী আয়ের উৎস চামড়া শিল্পকে সিন্ডিকেটের কালো থাবা থেকে বাঁচানো জরুরী এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট অসহায়, এতিম শিশু শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা এবং গরীব, দুস্থ: দুখী মানুষগুলোর মুখে হাসি ফুটানোর জন্য সবাইকে এগিয়ে আসা জরুরী। দেশের বিত্তশালী মানুষগুলোকে মানবিক না হলে চলবে কীভাবে?
বাণিজ্য মন্ত্রনালয়ের চামড়া সংক্রান্ত কন্ট্রোল সেলের পরামর্শের কথা আগেভাগে প্রচারিত না হওয়ায় দেশের মানুষ সে সম্পর্কে অবগত হতে পারেননি। এছাড়া বন্যা ও করোনার ভয়ে সেই পরামর্শ মেনে মানুষ আদৌ চামড়ায় লবন দিয়ে সংরক্ষণ করতে উৎসাহী হবে কি-না তা ব্যাখ্যা ও পর্যালোচনা করা হয়নি। এর চেয়ে সিন্ডিকেটের কারসাজি ভাঙ্গা নিয়ে মন্ত্রনালয়ের হস্তক্ষেপ বেশী প্রয়োজন ছিল।
যেখানে বড় বড় মহারথীদের মাধ্যমে দুর্নীতিকে একটা শিল্প হিসেবে বিকশিত হবার সুযোগ সৃষ্টি করার পথ খোলা থাকে সেখানে চামড়া শিল্পে সিন্ডিকেটের গভীর কারসাজি কীভাবে খর্বিত হবে তা বলাই বাহুল্য। প্রতিবছর শুধু ঈদ সমাগত হলে চামড়া নিয়ে হুলস্থুল না করে আমাদের জাতীয় সম্পদ চামড়া শিল্পকে বাঁচাতে আগামী বছরগুলোর জন্য সুদূরপ্রসারী ভাবনার মাধ্যমে প্রেক্ষিত পরিকল্পনা নেয়া উচিত।
সীমাহীন দুর্নীতি, লোভ, প্রতারণার সিন্ডিকেট বানিয়ে কারসাজি করে যারা মানুষকে কষ্ট দেন, জাতীয় সম্পদ বিদেশে পাচার করার কাজে লিপ্ত থাকেন তাদের ব্যাপারে সরকারকে সচেষ্ট থাকতে হবে। এজন্য ঈদুল আযহা পরবর্তী বিরাজমান আর্থ-সামাজিক ও পরিবেশগত অবস্থা সংরক্ষণ ও সুবিধাবঞ্চিত দুস্থ:-এতিম শিক্ষার্থীদের দুরাবস্থা নিরসনকল্পে চামড়া শিল্পের বিপর্যয় রোধে সবাইকে এগিয়ে আসা উচিত।

* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top