logo
news image

রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের ভৌত সুরক্ষা চুক্তি সম্পাদন

স্বপন কুমার কুন্ডু, ঈশ্বরদীঃ
রাশিয়ার জেএসসি কোম্পানি এলরনের সাথে ঈশ্বরদীর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের ভৌত সুরক্ষা ব্যবস্থা (পিপিএস) নির্মাণ চুক্তি শুক্রবার বিকেলে সম্পাদিত হয়েছে। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রাশিয়ার এই কোম্পানির সাথে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পাবনার রূপপুর প্রকল্পের ‘পারমাণবিক নিরাপত্তা ও ভৌত সুরক্ষা ব্যবস্থা সেল এর (এনএসপিসি) মধ্যে এই চুক্তিটি হয়। ২,৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে রাশিয়ার কোম্পানি জেএসসি এলরন কোম্পানি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের ভৌত সুরক্ষা ব্যবস্থা নির্মাণ করে দেবে। রূপপুর প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. শৌকত আকবর শনিবার সকালে ইত্তেফাককে চুক্তি সম্পাদনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
২০১৯ সালের ৫ নভেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) ৩ হাজার ৪৪৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভৌত সুরক্ষা ব্যবস্থা (পিপিএস) নির্মাণ’ প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়। পিপিএস প্রকল্পটি রূপপুর পারমাণিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের নকশা ভিত্তিক ও বাহ্যিক হুমকি মোকাবিলা করবে। নিরাপদ ও সুরক্ষিত পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টির পাশাপাশি তেজস্ক্রিয় পদার্থের ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, সাইবার নিরাপত্তা এবং সংবেদনশীল তথ্য ব্যবস্থাপনা এ প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য।
জানা যায়, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করার ক্ষেত্রে যে সকল পারমাণবিক অবকাঠামো প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন, তারমধ্যে ভৌত সুরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পারমাণবিক বিদ্যুৎ স্থাপনার ভৌত সুরক্ষার ব্যবস্থাকে রাষ্ট্রিয় সুরক্ষার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশ সরকার আর্ন্তজাতিক কনভেনশন অনুযায়ী সকল সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে অঙ্গিকারাবদ্ধ।   আর্ন্তজাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের আইন অনুযায়ী পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে উপযুক্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত না থাকলে প্রয়োজনীয় জ্বালানী সরবরাহ করা যাবে না। তাই এই ভৌত সুরক্ষার চুক্তি সম্পাদন রূপপুর প্রকল্পের জন্য অত্যাবশীয় ছিল।
আর্ন্তজাতিক পরমাণু বিদ্যুতের গাইড লাইন অনুযায়ী সাধারণত: পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে জ্বালানী কমিশনিং এর এক বছর আগে ভৌত সুরক্ষার ইনফ্রাকচার প্রতিষ্ঠার নিয়ম রয়েছে। এই সুরক্ষা ব্যবস্থা যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কিনা, তা আর্ন্তজাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করবে। পর্যবেক্ষণের পর তাদের সম্মতি স্বাপেক্ষে রূপপুরে জ্বালানী সরবরাহের বিষয়টি নিশ্চিত হবে।      
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, সরকার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের ভৌত সুরক্ষা ব্যবস্থার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব প্রদান করেছে। দুই দেশের সরকারের চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়ার কোম্পানি এলরন এই নিরাপত্তা প্রকল্প নির্মাণের ঠিকাদার হিসেবে কাজ করবে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, এসএসপিসি ও রাশিয়ার এলরনের মধ্যে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে শুক্রবার এই চুক্তি সম্পাদন হয়। চুক্তিতে ২০২৪ সালের মার্চ মাসের মধ্যে পিপিএস নির্মাণকাজ শেষ করার কথা বলা হযেছে। চুক্তি সম্পাদনের সময় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আনোয়ার হোসেন, এনএসপির প্রধান সমন্বয়ক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আখতার শহীদ, রাশিয়ার রোসাটমের মহাপরিচালক, কনস্টানটিন দেনিসভ, এলরনের মহাপরিচালক অ্যান্দ্রে মুরাভিয়েভ, রূপপুর প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. শৌকত আকবরসহ প্রকল্পের কর্মকর্তারা এসময় উপস্থিত ছিলেন।
প্রকল্প পরিচালক ড. শৌকত আকবর জানান, সুরক্ষা ব্যবস্থা বলতে মনিটরিং পদ্ধতি, টেকনিক্যাল বিষয়াদি, যন্ত্রপাতি এবং প্রশিক্ষিত জনবল এর অর্ন্তভূক্ত। তিনি বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার জন্য সেফটি ও সিকিউরিটিকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁরই নির্দেশক্রমে এই প্রকল্পে নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। আগামী ১০০ বছরের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ভৌত সুরক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাস্তবায়নে রাশিয়ার সরকারি সংস্থা রাশিয়ান স্টেট অ্যাটমিক এনার্জি করপোরেশনের (রোসাটম) সাথে বাংলাদেশ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। রোসাটমের সহযোগী প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্টকে বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণে রাশিয়া ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। অপরদিকে ২০১৭ সালের ৮ এপ্রিল বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পরমাণু সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ চুক্তির উপর ভিত্তি করে গত বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ, রাশিয়া ও ভারতের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
২০১৬ সাল থেকে থার্ড জেনারেশনের ভিভিইআর প্রযুক্তির ১,২০০ মেগাওয়াট মতা সম্পন্ন দু’টি ইউনিটে ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রকল্পের নির্মাণ কাজ পূর্ণোদ্যমে চলছে। কাজ শেষ করে ২০২৪ সালে এই কেন্দ্র হতে জাতীয় গ্রীডে বিদ্যুৎ সরবরাহ হওয়ার কথা রয়েছে।

সাম্প্রতিক মন্তব্য