logo
news image

গাড়ি কিনে ঈদে বাড়ি যাব

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।।
মানবতার এই কঠিন দু:সময়ে এবার ঈদে গ্রামের বাড়ি যাবার চিন্তা বাদ দেয়া হয়েছিল। একদিকে হু হু করে করোনা সংক্রমণের হার ও মৃত্যুহার বেড়েই চলেছে অন্যদিকে আম্পানের আস্ফালন দেখে মনে হয়েছিল বর্তমান বাস্তবতায় শুধু বেঁচে থাকাটাই ঈদ। জীবন রক্ষা করাটাই এবারের ঈদের চেয়ে বড় কিছু আনন্দের বিষয়।
এবারের মত এত করুন সময়ে আর করো জীবনে কখনও ঈদ আসেনি বলে মনে হচ্ছে। পরিবারের বাবা-মা, ভাই বোন, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী সবার সাথে দেখা হয়, মনের ভাব বিনিময় হয় এই ঈদের সময়টাতেই। কিন্তু এবার বাধ সেজেছে করোনার ভয়াবহতা। এজন্য নিশেধাজ্ঞা আছে গণ-চলাচল না করা, গণপরিবহনে না চড়া, ইত্যাদি। হঠাৎ ঘোষণা  এসেছে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করে ঈদে বাড়ি যাওয়া যাবে। কিন্তু আমাদের দেশে ক’জনেরই বা সেই সুযোগ আছে?
আবার নতুন গাড়ি কিনলেই তাতে সাথে সাথেই চড়া যায় না। রেজিষ্ট্রেশন করাতে হয, ট্যাক্স পরেশোধ, ফিটনেস পারমিট ইত্যাদি নিতে হয়। ড্রাইভিং লাইসেন্স তো থাকতেই হবে। তবু আমার এক বন্ধুবর টিভিতে ব্যক্তিগত গাড়ি চালিয়ে ঈদে বাড়ি যাবার ঘোষণা শুনে জেদ ধরলেন- গাড়ি কিনেই তবে বাড়ি যেতে হবে। এত তাড়াতাড়ি কোথায় কিনতে পাওয়া যাবে ঈদের গাড়ি? আপাতত: ওর ফোনালাপের বিষয়টি আমার কাছে কৌতুক মনে হলেও এর সাথে মিশে আছে আমাদের সমাজ বাস্তবতার অনেক কঠিন দিক।
ছাত্রজীবনে কোন এক ঈদে ঢাকা থেকে এক আত্মীয়ের ব্যক্তিগত গাড়িতে চড়ে বাড়িতে ঈদ করতে যাবার সুযোগ হয়েছিল। তিনি তখন নতুন গাড়ি কিনেছিলেন। নিজে চালাবেন, তাই দূরপথের সংগী হয়েছিলাম। একদিকে বিনে পয়সায় বাড়ি ফেরা অন্যদিকে নতুন টয়োটা কোরসা কারে চড়ার আনন্দ। তখন ঢাকায় সবার এত গাড়ি-বাড়ি ছিল না। তাই ব্যক্তিগত গাড়িতে চড়ে বাড়ি যাওয়াটা বিরাট ব্যাপার। ঢাবি হলের আমার রুমমেট, আমার বিনে পয়সায় বাড়ি ফেরার কথা শুনে আকাশ থেকে পড়েছিল। বলেছিল- তুইতো একটা কপালি রে! আমাকে কেউ কোনদিন এমন অফার দিল না। যাক্ সেসব কথা।
বন্ধুবর বলতেই থাকলো- বহুদিন ধরে ইচ্ছে ছিল কোন এক ঈদে গাড়ি কিনে নিজে চালিয়ে বাড়ি ফিরব। এবার সেই ইচ্ছেটা পুরণ করার বেশী সুযোগ থাকলেও করোনা পরিস্থিতি সব কিছু পাল্টিয়ে দিয়েছে। তবে গাড়ি কেনার ইচ্ছেটা মনের মধ্যে বুদ্বুদ্বের মত জেগে ছিল। সুপার সাইক্লোন আম্পানের আস্ফালণ দেখে সেটা আবারো কিছুটা দমে গেছে।
কথাগুলো ইথারে নয়। বাতাসে ভেসে কানে আসছে। এসব শুনতে শুনতেই টিভিতে ফেরীঘাটে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে ঈদে ঘরমুখী একদল সুবিধাপ্র্প্তা মানুষের জ্যামে পড়া গাড়ির বহর দেখে মনে হলো বাস বন্ধের এই সময়েও রাস্তা জ্যাম? একজন যাত্রীর ক্ষেদোক্তি- চলমান করোনার কষ্টের মধ্যেই এলো আম্পান। তার ওপর নাকাল হয়ে ব্যক্তিগত বাড়ি ফেরার ঘ্ষোণা না এলেই এই ভয়ংকর যাত্রা থেকে রক্ষা পেতাম। আসলেই এই যাত্রা আনন্দের নয়- ভয়ংকর পথের।
করোনার হটস্পট ঢাকা শহর থেকে দামী দামী ব্যক্তিগত গাড়ি চড়ে হোমরা চোমড়া মানুষগুলোর ঈদের বাজার ভর্তি মোটা মোটা ব্যাগেজ নিয়ে ছুটে চলেছে গ্রামের বাড়ির দিকে। ধনীদের বিলাসী ঈদ যাত্রা। করোনা তো আর ধনী গরীব বুঝে না। এর মথ্যেই বড় ছেলেটি বলে উঠলো- গ্রামে করোনার তেমন প্রাদুর্ভাব নেই, তদুপোরি বহুদিন যাবত ঢাকায় গ্রাম থেকে আসা নিরীহ লোকদেরকে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। করোনার হটস্পট ঢাকা শহর থেকে যারা গ্রামে যাচ্ছে ঈদ করতে তাদের যদি গ্রামের লোকেরা তাদের গ্রামে ঢুকতে না দেয় তাহলে ওরা কোথায় থাকবে? কারণ, সব করোনা রোগীর তো লক্ষণ দেখা যায় না। করোনা টেষ্ট করা ছাড়া ঢাকা ফেরত মানুষকে গ্রামে ঢুকতে দিলে গ্রামের সুস্থ-তাজা মানুষগুলো তো আক্রান্ত হবে।
খুব যৌক্তিক চিন্তা ওইটুকু ছেলের মধ্যে। কিন্তু আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের মাথায় তো সেই চিন্তা আসেনি। আজও টিভিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঘোষণা দেয়া হচ্ছে- ঘরে থাকুন নিরাপদে থাকুন। সেটা কি তাহলে শুধু দরিদ্র মানুষের জন্যে? তাহলে খুলে বললেই তো হয়-গরীবেরা ঘরে থাকুন। ধনীরা গাড়ি চড়ে বাড়ি যান। ওর কথায় যুক্তি আছে। তাই মনটা খারাপ হয়ে গেল।
গাড়ি ব্যক্তিগত হলেও সবাই তো নিজে গাড়ি চালাবেন না। লম্বা পথে ড্রাইভারকে সংগে নিতে হবে। একটি কারের মধ্যে সিটের দূরত্ব কি তিন থেকে ছয় ফুট দূরে দূরে বসানো? তাহলে সেই গাড়িতে দৈহিক দূরত্ব বজায় রাখার স্বাস্থ্যবিধি কীভাবে মানা হবে? তবে কি এক গাড়িতে একজন নিজে চালিয়ে যাবে? পরিবারের পাঁচ সদস্য হলে ওদের কি পাচঁটি গাড়ি আছে?
মাইক্রোবাস ভাড়া করে কেউ বাড়ি যেতে চাইলে স্বাস্থ্যবিধির দৈহিক দূরত্ব বজায় রাখতে ৮ সিটের গাড়িতে দু’জন ও ১৬ সিটের গাড়িতে বড়জোর ৪ জন বসতে পারবে বলে মনে হয়। হিসেবটা সে কষেই ফেললো। আমি ওর বর্ণনা শুনে অবাক হলাম। এই সুযোগে গাড়ি ভাড়া কতগুণ বাড়িয়ে ফেলা হবে কে জানে।
ব্যক্তিগত গাড়িওয়ালারা ঈদে বাড়ি যাবার অনুমতি পেয়েছে। আমাকে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। কিন্তু আবার কালকে যদি বাজারে গাড়ির দাম বাড়িয়ে ফেলা হয় তবে কী হবে? আমার তো অনেক টাকা নেই। আমার তো অফিসিয়াল ড্রাইভারও নেই। গাড়ি কিনে ফেললেও একজন অপরিচিত ড্রাইভারকে ভাড়া করতে হবে। সে আবার আনাড়ি নয়তো? পথের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করতে করতে কিছুটা হতাশ হবার জোগাড় হলো। সেই ড্রাইভার সুস্থ হবে তো? ড্রাইভারের করোনা টেষ্ট করিয়ে নেয়া ভাল হবে। টেষ্ট করালে ক’দিন পর রেজাল্ট হাতে আসবে কে জানে? ছেলের ভাবনার মতো আমরা সবাই একটি গাড়িতে করে গাদাগাদি করে বাড়িতে গেলে সবাই আমাদেরকে একসেপ্ট করবে তো? সবাই জানে ঢাকা ফেরত মানুষগুলোকে কোয়ারেন্টাইনে থাকা উচিত। কারণ, আমাদের দেশে ঢাকাই এখন করোনার হটস্পট। বাড়িতে গেলে গ্রামের মাঠে এবারের ঈদের নামাজ হবে না, কোলাকুলি হবে না। এতদিন পর বাড়িতে যাব, আনন্দে জড়িয়ে না ধরলে তো গ্রামের বন্ধুরা মাইন্ড করবে, পায়ে ছুঁয়ে কদমবুছি না করলে তো মুরুব্বীরা বদদোয়া করতে পারে।
মনের মধ্যে নানা ভাবনা এস ভীড় করতে লাগলো। ঘুম এলা না। সেহরী খাবার ডাক পড়লো। তবুও আশা আগামীকাল নতুন গাড়ি কেনা হবে। কাল গাড়ি কিনে পরশু ঈদ করতে গ্রামের বাড়ি যাব। ঘোষণা এসেছে-ব্যক্তিগত গাড়িওয়ালারা বাড়ি যাবে ঈদ করতে। ধনীরা সব ধরনের সুযোগ পাচ্ছে, আরো পাবে। তারা আরো বিত্তশালী হবে। নিত্যনতুন মডেলের গাড়ি কিনবে, পাবলিক পরিবহণ বন্ধ আছে, থাকবে। এই সুযোগে তাদের হাল-ফ্যাশনের গাড়িগুলো রাজপথে উর্দ্ধশ্বাসে চলার সুযোগ পাবে। গরীব মানুষ যেখানে আছে সেখানেই থাকবে। তবে বিশ্বের ধনী দেশের ধনী মানুষগুলোকেও করোনা কোন উদারতা দেখায়নি, হয়তো আর দেখাবেও না। করোনা নিজেই বোনেদী জাতের, অতি মহামারী। করোনার কাছে কে ব্যক্তিগত গাড়িওয়ালা আর কে রেলগাড়ির তৃতীয় শ্রেণিতে চড়ে সেটা কোন মূখ্য বিষয় নয়।
তবুও ওর ইচ্ছে আছে, কাল গাড়ি কিনে ঈদ করতে এবার বাড়ি যাবে।

* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top