logo
news image

ফিরে দেখা বর্ণিল দীর্ঘ ২৭ বৎসরের দিনলিপি

কামাল হোসেন।।
[১৯৯৩ থেকে ২০২০'' রজত জয়ন্তী ]
সম্মানিত সূধী ঃ আচ্ছালামুয়ালাইকুম। কেমন আছেন? নিশ্চয়ই এই পবিত্র মাহে রমজানের পবিত্র ছায়ায়, প্রচম্ড গরম ও তীব্র দাবদাহকে ছাপিয়ে,করোনা ভাইরাসের ভীতিকে সামনে নিয়ে,চরম আতংক ও উৎকন্ঠায় দিন কাটছে! সামাজিক জীব হিসাবে আপনাদের মত আমার এবং সবার জীবণেই এর তীব্র প্রভাব লক্ষ্যণীয়! দোয়া করি,এই মহান মাসে,মহান করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর দয়ায়, সব ভয়কে জয় করে,আবারো সবার হৃদয়ে প্রশান্তির ☺ হাসি ফুটে উঠবে ; সেই সোনালী ভোরের প্রত্যাশায়, আজকের লিখা শুরু করছি!
সূধীঃ সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীতে একটি নতুন দিনের সূত্রপাত হয়। আবার সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গেই দিনটি শেষ হয়ে যায়। একটি দিন শেয হওয়ার সাথে- জীবণের সব কোলাহল ও ঘটনাগুলি ইতিহাসের পাতায়, অতীতের খাতায় নাম লিখে যায়,কিন্তু এর রেশ হিসাবে কিছু স্মৃতি, কিছু ঘটনা প্রতিদিনই আমাদের ডায়েরিতে জমা হয়! আর এভাবেই পার হয়,দিন,মাস, বৎসরের পর বৎসর। যা একসময় মহাকাল হ'য়ে, স্মৃতির মনিকোঠায় অমলিন প্রীতি হয়ে ঝলমল করতে থাকে! আর সেইসব দিনরাত্রির দীর্ঘ ২৭ বৎসরের দিনলিপি, [১৯৯৩ থেকে,২০২০] রজতজয়ন্তী উৎযাপন ও """স্মৃতির বাঁধনে বাধিব আবার! '' প্রত্যয়ে, বিশ্ববিদ্যালয় জীবণের সহপাঠী থেকে শিক্ষকমন্ডলী ও পরম পূজনীয় গুরুজনের ভালবাসার অকৃত্রিম বহিঃপ্রকাশই আজকের পোস্টের মূল উপজীব্য!
## শ্রদ্ধেয় সূধীঃ রজতজয়ন্তী একটি উৎসব, যা ২৫ বৎসর পূর্তিতে সাধারনতঃ আয়োজিত হয়। আর জয়ন্তী হচ্ছে, কোন কিছুর জয় বা সীমাহীন আনন্দকে উপভোগ করতে,জীবণের ফেলে আসা স্মৃতিময় অতীতকে ফিরে দেখা। এ যে প্রাণের মেলা,হাসি, খেলা আর জীবণের ভেলায় ভেসে ওঠে; সাইরেনসহ এক মহা মিলনমেলার। ২৫ বৎসর পূর্বের সহপাঠী, শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক- শিক্ষিকা, হৃদয়-হরণকারী বন্ধুদের সাথে দেখা,সাথে বোনাস হিসাবে,বন্ধুপত্নী ও তাঁদের সন্তানদের সাথে কথাও বলা যায়,ভাব- বিনিময় হয়! একের সঙ্গে অন্যের হৃদয়ের সংযোগ ঘটে। এর ফলে,দীর্ঘদিনের অতৃপ্ত ভালোবাসা, স্পিশিয়াল ভালবাসা হয়ে,তৃপ্তিময় হয়ে উঠে! আর এর পরশে, সবাই অতীতকে পিছনে ফেলে, বর্তমানকেই সামনে নিয়ে আসে।
## সূধীঃ একটু ২৭ বৎসর পিছনে ফিরে তাকালেই, স্মৃতির পাতায় বিস্মৃত অনেক ঘটনা,রটনা আর আনন্দ, বেদনার অনেক কাহিনীই, আয়নার সামনে জ্বলজ্বল করতে থাকে। তারই ধারাবাহিকতায় ২ পর্বে দীর্ঘ ২৭ বৎসরের দিনলিপির ঘটনা প্রবাহের ধারাবাহিক বর্ণনা করার দুঃসাহসিক অভিপ্রায়ে; আপনাদের দোয়া কামনা করছি।
@ ঐইতো সাল ১৯৯৩; যথারিতি সিলেট সরকারি কলেজ থেকে কুমিল্লা বোর্ডের অধীনে, উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় ১ম বিভাগ ও সম্মিলিত মেধা তালিকায়,নাম লিখিয়ে,উচ্চ শিক্ষার পথ মসৃণ হয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি,সেতো রীতিমত যুদ্ধ। কিন্তু সেই যুদ্ধজয়ের প্রাণান্ত চেস্টায়,সিলেট এম, সি, বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে, প্রথমে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হই। কিন্তু আমার অকৃত্রিম বন্ধু আবুল কালাম আজাদ, [ যে আর আমাদের মধ্যে বেঁচে নেই! হে আল্লাহ! আপনি, আমার বন্ধুকে বেহেশতের উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত করুন! ] এর পরামর্শে অর্থনীতিবিদ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন মনে করছি যে, তখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সব অনার্স কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আগেই সব ভর্তি পরীক্ষা ও ভর্তি কার্যক্রম শেষ হয়ে যেত। তাই,বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবল প্রতিযোগিতায় রিক্স না নিয়ে,এম, সি কলেজেই অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হয়ে,নিয়মিত ক্লাস করতে থাকি!
** কিন্তু মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হওয়ায়,অর্থনীতির এত চাপ,চাহিদা ও যোগান রেখা,আমার কাছে সবসময়ই উর্ধ্বমুখী মনে হত। বন্ধু আবুল কালাম আজাদের পরামর্শে,আবারো শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করি। উল্লেখ্য, তখন সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে আলাদা আলাদা বিযয়ে, আলাদা আলাদা প্রশ্নে পরীক্ষা হত। আমি সমাজতত্ব,অর্থনীতি ও সমাজকর্ম বিষয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করি। কিন্তু ১ম ও ২য় বিষয়ের পরীক্ষা সন্তোষজনক না হওয়ায় শেষ পরীক্ষার উত্তরপত্রে পারি আর না পারি, সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করি। মনে- মনে ভাবি,'' যা আছে কপালে! '' কিন্তু পরীক্ষা শেষে, কিছুটা আনন্দের রেষে,হলের বাহিরে এসে,মানুষের ভীড় দেখে,মন চুপসে যায়। হায় আল্লাহ! এত ছাত্র - ছাত্রীর মাথায়, আমার স্হান কোথায়? আমাকে এত ভীড়ে, কে তীরে ভিড়াবে? চিন্তা ও ভিষন্নতায় অসহায়ের মত, বিশ্ববিদ্যালয়ের উচু -উঁচু দালানের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলি! আর মনে- মনে বলি,এবার যদি না হয়,যতবার সূযোগ পাব,ততবারই ভর্তির চেষ্টা চালিয়ে যাব।
## কিন্তু হঠাৎ কাঁদে কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে চমকে উঠি। আমার অসহায়ত্বের দীর্ঘশ্বাস দেখে,আমার ফুফাতো শ্রদ্ধাভাজন বড় ভাই,জনাব মোঃ সিরাজুল হক, সাহস দিয়ে বলেন; আরে কামাল! আমি বলছি,তুর চান্স হবে। তিনি বলেন,ঐ যে এত মাথা, আসল কথা হল,,ওরা সবাই পরীক্ষার্থী নয়; সারাদেশ থেকে আগত ১জন পরীক্ষার্থীর সঙ্গে ৪জন সঙ্গী! উদ্দেশ্য, রথ দেখা কলা বেচার মত। ছেলে কিংবা মেয়ের পরীক্ষায় সঙ্গে, নানা অনুষঙ্গ, যেমন মাজার জিয়ারত, জাফলং,শ্রীপুর,মাধবকুণ্ড, লাউয়াছড়া, আর হাওরের তাজা মাছের স্বাদে মনের খেদ নিবারণ করা! এখানে সব বিষয়ে পরীক্ষার্থী বড় জোড় ৪ -৫ হাজার হবে। এর মধ্যে তুর রেজাল্ট, আমি বলছি,অবশ্যই ভাল হবে। কিন্ত আমিতো জানি,সব কমন পড়েনি কিন্তু কোন প্রশ্নের উত্তর বাকী রাখিনি! মনে কিছুটা সাহস এল। শ্রদ্ধাভাজন বড় ভাই, জনাব মোঃ সিরাজুল হককে নিয়ে,ভীড় ঠেলে,শহরে এলাম।
## এখন ফলাফলের জন্য অপেক্ষা! এম,সি কলেজে,ক্লাসে মন বসেনা। ক্লাসের খাতায়,বইয়ের পাতায়,নিজের নাম লিখে, পাশে মনের অজান্তেই লিখে রাখতাম; বি,এস,এস (সম্মান),সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়! সবাইকে বলতাম,আমি ঐ বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্র। আবার অজানা আশংকায়, চমকে উঠতাম,যদি চান্স না পাই তবেতো জারিজুরি সব ফাশ হয়ে যাবে,,মানুষ আমাকে মিথ্যাবাদী বলে বাঁশ দিবে! মিথ্যা দিয়ে,কি নিয়ে,আবার সবার কাছে মুখ দেখাব? এমনি আশংকার ঠিক ১৪ দিন পর,ফলাফল প্রকাশিত হল! তখন দৈনিক পত্রিকার পাতায় ফলাফল প্রকাশ করা হতো। সকাল ০৭ ঘটিকায়,ঘুম থেকে জেগেই শুনি,, হকারের চিৎকার,গরম খবর,গরম খবর! বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ। মন আতংকে কেঁপে ওঠে, দৌড়ে বের হলাম;হকারকে বললাম, একখানা """দৈনিক সিলেটের ডাক '' পত্রিকা দাও। একটু অপেক্ষা কর,যদি আমার চান্স হয়,তোমাকে পেপারের ০৪ গুন টাকা দিব! রেজাল্ট খুলেই,০১,০৩ ০৬ এমনি করে,ঠিক ১৬ নাম্বার সিরিয়ালে আমার কাঙ্ক্ষিত ৫৭৭৭৮ রোল নাম্বারটি সমাজকর্ম বিষয়ে দেখতে পাই। মনের আবেগে চিৎকার দেই! আমি মিথ্যুক নই; আমি খাতায় যা লিখেছি, সবাইকে যা বলেছি,আমি ঠিক বলেছি! হ্যা আমি পেরেছি! আনন্দ আর চিৎকারে, সারা ছাত্রাবাসের ৬ রুমের ১৮ জনকে আলিঙ্গন করলাম। এদিকে আমার আনন্দ দেখে,হকার বোকা বনে গেল! কারণ তাঁর টাকা দেওয়া হয়নি! এখন সে আর টাকাও নিবেনা,কারণ সে-ও খুব খুশী হয়েছে! জোর করে,০৩ টাকা পেপারের মূল্য ২০ টাকা দিলাম।
@@ প্রিয় সূধীঃ করোনা ভাইরাসের এ দূঃসময়ও,,আপনারা হয়তো ভাবতে পারেন,""" ধান ভানতে শিবের গীত কেন? ''' আসলে গত ০৫ ও ০৬ মার্চ ২০২০ ইংরেজি,, দীর্ঘ ২৭ বৎসর পর, আবারো আমরা সমাজকর্মী বন্ধুরা,শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক - শিক্ষিকাবৃন্দ,কর্মকর্তা, কর্মচারীবৃন্দসহ সকলের পরিবার,সন্তান- সন্ততিসহ ২ দিন ব্যাপী এক মহা- মিলনমেলায় মিলিত হয়েছিলাম। এ উৎসবের রেষে,মনের জোসে, যে আবেগ জন্ম নেয়, আজকের লিখা,তারই এক ক্ষুদ্র বহিঃপ্রকাশ মাত্র। আজকের এই দিনলিপির বর্ণনা দিন গণনা করে,২৭ বৎসরের জমাকৃত আবেগের, হৃদয়ের বাঁধনে বাঁধিবার সামান্য অপচেষ্টা মাত্র।
## এখানে গল্প নয়,বাস্তবতার আলোকে,ফলাফল পরবর্তী ভর্তি বিরম্বনা, দয়াময় আল্লাহ তায়ালার অপার কৃপায়,সমস্যার উত্তোরণ,বর্ণিল শিক্ষাজীবণ,ছাত্র -শিক্ষকের আত্মীক সম্পর্ক, আর স্মৃতির মনিকোঠায় ২৭ বৎসর পরেও স্যারের মুখে নিজের নাম,সুনাম,আন্তরিক সঙ্গদান, ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ, তার নাতিদীর্ঘ আলোকপাত করার দৃঢ় আশা নিয়ে, আজকের পর্ব এখানেই শেষ করছি। আচ্ছালামুয়ালাইকুম ! চলবে ➤➤➤➤
## ''সোনার খাঁচায় দিন গুলি মোর রইলনা, রইলনা,, সেই যে আমার নানান রঙ্গের দিনগুলি!! '''
আগামী পর্ব ঃ স্মৃতির মনিকোঠায় অমলিন,"" স্মৃতির বাঁধনে বাধিব আবার! """

* কামাল হোসেন: সহকারী অধ্যাপক, শহীদ স্মৃতি সরকারি কলেজ, ব্রাক্ষণবাড়িয়া ও সমাজকর্ম প্রথম ব্যাচ (১৯৯৩-১৯৯৪), সাস্ট, সিলেট।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top