logo
news image

স্মরণ: রাজীব কুমার বসাক ও মোশারফ হোসেন শামীম

সায়েদ আব্দুল্লাহ যীশু।।
শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার বন্ধু রাজীব কুমার বসাক (Razib Kumar Basak) কে প্রায় ভুলেই গেছি। ফেসবুকে হঠাৎ করেই ওর প্রোফাইলটা সামনে এসে মনে করিয়ে দিল, ক্যাম্পাসে কত স্মৃতি আমাদের! কেউ একজন জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছে রাজীবকে, সেজন্যেই বোধ হয় প্রোফাইলটা সামনে এল। সাথে সাথে ওকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাই। অপেক্ষা করি এক্সেপ্টের, ভার্চুয়াল জগতে নতুন করে বন্ধু হবার। কিন্তু কয়েক বছর পেরিয়ে গেলেও রিকোয়েস্ট একসেপ্ট হয় না। বেশ রাগ হলো আমার! রাগ ঝারতেই রাজীবের খুব ঘনিষ্ট বন্ধু অরূপকে ফোন দেই। Arup Bandhu Dam অরূপ বন্ধু দাম পার্থ বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সহপাঠী, বর্তমানে আনন্দমোহন কলেজে সমাজবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক। অরূপ যা জানাল, তার জন্য কোন ভাবেই প্রস্তুত ছিলাম না। রাজীব অনেক আগেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছে, অরূপ জানিয়েছে। আর আমি ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছি তার বিদায়ের অনেক পরে! পৃথিবীর সাথে সব ধরণের রিকোয়েস্টের মায়াও ত্যাগ করেছে রাজীব। সেজন্যই বোধ হয়, এখনো ঝুলে আছে আমার পাঠানো ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট! আচ্ছা যদি এমন হতো, পরপারে থেকেও রাজীব আমাদের রিকোয়েস্ট এক্সেপ্ট করতে পারতো! দিতে পারতো সব কমেন্টের জবাব! ঈশ্বর যদি বিলাসবহুল স্বর্গের পাশাপাশি এসবেরও ব্যবস্থা করে দিতে পারতেন! নাকি তথ্য প্রযুক্তির কোন খোঁজই রাখেন না ঈশ্বর!
ফরেস্ট্রির রাজীব কুমার বসাক এবং বিবিএ’র মোশারফ হোসেন শামীমকে ভুলে যাওয়া খুব কঠিন! আলাদা বিভাগের হলেও ওরা দু’জনেই ছিল আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, ব্যাচমেট, তৃতীয় বর্ষ প্রথম সেমিস্টার। আমি তখন শাহপরাণ হলে থাকি। সময়টা ১২ মে ২০০৬, সন্ধ্যা। কর্মব্যস্ততা শেষ করে হলে ফিরেছি, সম্ভবত বই নিয়ে বসার প্রস্তুতি নিচ্ছি। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকরা খুব একটা ক্লাশ নেন না, তারা নানান ধান্ধায় ব্যস্ত থাকে। শিক্ষার্থিদের নিজে নিজেই শিখতে হয় বেশি। সেজন্যই বই নিয়ে বসার প্রস্তুতি। এই সময় হলের সামনে পিছনে খুব ডাকাডাকি শুরু হয়ে গেল। কান পেতে শুনতে পেলাম, রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজের হবু ডাক্তারদের সাথে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থিদের মারামারি হয়েছে, আমাদের কয়েকজনকে আটকেও রেখেছে। যে কোন মূল্যে আটকদের উদ্ধার করতে হবে, সেটা বুঝাতে গিয়েই শোরগোল হচ্ছে বেশি। হল থেকে বেরিয়ে রাস্তায় এসে দেখি, হলের ছাত্ররা দলে দলে মেডিকেল কলেজের দিকে যাচ্ছে। সবাই উত্তেজনায় টগবগ করছে। মনের ভিতরে ইজম এবং জোশ চেগিয়ে উঠছে সবার।
আমি তখন পেটের দায়ে দৈনিক জনকণ্ঠে রিপোর্টার হিসাবে কাজ করি। আমার দায়িত্ব দাড়াল দু’টো। জোশ মিটানো এবং খবর সংগ্রহ করা। রথ দেখা এবং কলা বেচা। এগুতে শুরু করলাম৷ শাহপরাণ হল এবং নতুন হলের মাঝামাঝি রাস্তায় নামতেই পিছন থেকে রাজীবের চিৎকার কানে এলো, যীশু দাড়া, ল এক লগে যাই। হাটার গতি কমিয়ে রাজীবের সাথে মিলিত হলাম। হাটা নয়, আমরা প্রায় দৌড়াতে শুরু করলাম। আমাদের সামনে ও পিছনে অনেকেই যাচ্ছে। চরম উত্তেজনার কারণেই মেডিকেল কলেজের প্রবেশ পথে পৌঁছাতে দেরী হলো না। আমাদের আগে অনেকেই স্পটে পৌঁছে গেছে। রাজীবও আমার অনেকটা সামনে। মেডিকেলের গেটের একেবারেই কাছে, প্রবেশ পথে পৌঁছা মাত্রই মনে হলো, শিলা বৃষ্টি হচ্ছে, কিংবা তার চেয়েও ভয়ঙ্কর কিছু। আশে-পাশে যেসব গাছপালা আছে তার পাতা-লতা সব ছিড়ে ফেলছে কেউ। কেউ একজন চেঁচিয়ে সাবধান করলো, ছড়া গুলি হচ্ছে, সবাই পালাও! তাৎক্ষণিক আমি একটি পিলারের আড়ালে চলে যাই। আমি কখনো ছড়া গুলি দেখিনি, শব্দও শুনিনি। কিছু বুঝে উঠার আগেই সব থেমে গেল, নিমিষেই, ছড়িয়ে পড়লো আতঙ্ক! গুলি বন্ধ হওয়া মাত্রই দু'জনকে লুটিয়ে পড়তে দেখলাম৷ আহত অনেক। একেবারে প্রবেশ পথে পড়েছিল শামীম৷ তার কাছাকাছি আমার থেকে কয়েক গজ দূরে লুটিয়ে পড়ে রাজীব৷
রাজীব আমার নাম ধরে কাতর স্বরে ডাকছিল৷ ডাকার কারণও ছিল৷ আমরা দু'জন যে এক সাথেই স্পটে পৌঁছাই! আমি তাৎক্ষণিক পিলারের আড়ালে চলে যেতে পারলেও সে পারেনি৷ আমি নিজেকে রক্ষা করতে পারলেও, সে পারেনি। আমি যখন ওর পিঠে হাত রেখে তুলতে গেলাম, তখন সেই হাতটি পিঠের ভিতরে ঢুকে গেল৷ হাতে নরম মাংস ও গরম রক্তের স্রোত টের পেলাম৷ আমি খুব ভয় পেয়ে যাই৷ পেটের দিকে তাকিয়ে দেখি মাংশ বের হয়ে দলা পাকিয়ে আছে! গুলি ওর শরীরকে এফোড়-ওফোড় করে দিয়েছে৷ এতক্ষণ জিইয়ে রাখা উত্তেজনা কোথায় উবে গেছে কে জানে! তার বদলে ভর করেছে ভয়, আতঙ্ক। ভয়ে আমি চিৎকার করে ওঠি৷ এই সময় দৈনিক ইত্তেফাকের রিপোর্টার নুরুল আমিন ভাই (বর্তমানে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তা) কোত্থেকে দৌড়ে এলেন৷ আশেপাশে কোন যানবাহন- এমনকি রিক্সা পযন্ত ছিলনা৷ কাছেই দাড়িয়ে ছিল RAB এর একটা প্যাট্রোল গাড়ি। দু'জনে মিলে জোর করে রাজীবকে নিয়ে তাতেই উঠে পড়ি৷ নিয়ে যাই এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে৷ অন্য কয়েকজন মিলে শামীমকেও একই হাসপাতালে নিয়ে যায়।
প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ওই রাতেই রাজীব এবং শামীমকে এয়ার এম্বুলেন্সে ঢাকার সামরিক হাসপাতালে পাঠানো হয়৷ চিকিৎসাধীন অবস্থায় দু‘দিন পর শামীম মারা যায়। রাজীবের একটি কিডনি কেটে ফেলা হয়৷ বাকি একটি কিডনি নিয়ে সে আরও কয়েক বছর বেঁচে ছিল৷ শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করেছিল৷ সিলেটের পাট চুকিয়ে, জীবনটাকে আরও গুছিয়ে নিতে, ক্যারিয়ারে আরও সাফল্য আনতে, ঢাকায় গিয়ে এমবিএ করেছিল। ভারতে গিয়ে ভাল হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। শেষ কিডনিটা যখন ওকে আর সাপোর্ট দিচ্ছিলনা, তখনই সে সকল দামি সার্টিফিকেট এবং ক্যারিয়ারের উচ্চাকাঙ্খা ত্যাগ করে পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়! একই ঘটনায় আমরা প্রথমে, ১৪ মে ২০০৬, মোশারফ হোসেন শামীমকে এবং কয়েক বছর পরে, ০৯ অক্টোবর ২০১৩, রাজীব কুমার বসাককে হারাই৷ শামীমকে শোকাহত হৃদয়ে মনে রাখলেও রাজীবকে প্রায় ভুলেই গেছি!
আমি ওই যাত্রায় বেঁচে গেছি, একটি বোনাস জীবন পেয়েছি, সেটা কোন ভাবেই ভোলার নয়।
ঘটনার সূত্রপাত শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক আদু ভাইকে দিয়ে। আদু ভাইয়ের চোখ সব সময় টকটকে লাল হয়ে থাকে। হাসিমুখে মস্করা জাতীয় কিছু বললেও যে কারো মনে হবে গালি দিচ্ছে। আদু ভাই সেদিন তার সাঙ্গ-পাঙ্গ নিয়ে আড্ডা দিতে যান রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজের ক্যান্টিনে। চা-বিড়ি টানতে টানতে এক হবু ডাক্তার সুন্দরী মেয়েকে দেখে তার আবেগ উথলে উঠে। গেয়ে উঠেন, বধুয়া ওই পথে যেয়োনাকো তুমি! সে সুর মেয়ের সাথে থাকা প্রেমিকের কানেও যায়। শুরু হয়, কথা কাটাকাটি, হাতাহাতি। ফলাফল বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’জন মেধাবি ছাত্রের জীবনের ইতি।
কারা গুলি করেছে, পুলিশ নাকি রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজের কেউ? সে বিতর্ক শুরু থেকেই আছে। দু’জন ছাত্র মারা গেলেও হত্যাকারীদের কোন বিচার হয়নি। বিচার করতে গেলে, আদু ভাইদের নামও সামনে চলে আসবে, বিচার না হওয়ার এটাও হয়তো একটা বড় কারণ। আমার ধারণা, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সাধারণত বিচার হয় না। অবশ্য আত্মীয়-স্বজন কেউ ক্ষমতাধর থাকলে ভিন্ন কথা। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ড সংঘটিতে হয়েছে, বিচার হয়নি কোনটিরই!
* সায়েদ আব্দুল্লাহ যীশু: ব্যাংকার, সাবেক সভাপতি, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাব।

সাম্প্রতিক মন্তব্য