logo
news image

শিল্পী মোহাম্মদ হাশেম গুরুতর অসুস্থ

নিজস্ব প্রতিবেদক।।
আঙ্গো বাড়ি নোয়াখালী রয়াল ডিস্টিকসহ অজস্র- জনপ্রিয় গানের গীতিকার  সুরকার ও নোয়াখালীর আঞ্চলিক গানের সম্রাট, কিংবদন্তীশিল্পী অধ্যাপক মোহাম্মদ  হাশেম গুরুতর অসুস্থ। তিনি ঢাকায় চিকিৎসাধীন আছেন।
বুধবার রাত ১১টায় তাঁকে কলাবাগানে আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছে। সম্প্রতি তিনি স্ট্রোক করেছেন। বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) সংশ্লিষ্ট ডাক্তার জানিয়েছেন, তার অবস্থা ক্রিটিক্যাল, তবে গতরাতের চেয়ে কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
গীতিকার, সুরকার, সংগীত শিল্পী ও অধ্যাপক মোহাম্মদ হাশেম ৪০ বছর ধরে নোয়াখালীর আঞ্চলিক গান নিয়ে গবেষণা করছেন। লিখেছেন অন্তত পনেরোশ’ গান। নিজেই গেয়েছেন বেতার-টেলিভিশনে। নোয়াখালীসহ দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষাকে সংগীতে রূপান্তর করে একে দিয়েছেন ব্যাপক পরিচিত। শুধু নোয়াখালীর আঞ্চলিক গানই নয়, তিনি এরইমধ্যে পাঁচ শতাধিক পল্লীগীতি‌ও লিখেছেন। লোকমুখে তিনি এখন নোয়াখালীর আঞ্চলিক গানের সম্রাট, জনক, কিংবদন্তী। ১০ জানুয়ারি এই শিল্পীর জন্মদিন উদযাপন করছে তারই গড়া শাওন সংগীত নিকেতনের সদস্যরা।
মোহাম্মদ হাশেম ১৯৪৭ সালের ১০ জানুয়ারি নোয়াখালী সদর থানার চরমটুয়া ইউনিয়নের শ্রীকৃষ্ণপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। নিজ গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নিয়াজ মোহাম্মদ হাইস্কুলে মাধ্যমিক পাশ করে তৎকালীন জগন্নাথ কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সনদপ্রাপ্ত হন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই তার সঙ্গীত প্রতিভার ঊন্মেষ ঘটে। সংগীতেও তার উচ্চতর ডিগ্রি রয়েছে। লোকসঙ্গীত সম্রাট শিল্পী আবদুল আলীম তার সংগীত গুরু। ঢাকা মিউজিক কলেজে সংগীতে ডিগ্রী নেয়ার পর তিনি সেখানেই বাংলা বিভাগ ও সঙ্গীতের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।
১৯৭৩-১৯৭৪ সালের দিকে মোহাম্মদ হাশেম নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় গান লিখতে শুরু করেন। এর আগে নোয়াখালী অঞ্চলের কোনো গান ছিল না। তার হাত ধরেই এ অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষা, আনন্দ-বেদনা, মেঘনা পাড়ের মানুষের সংগ্রামী জীবনাচার সংগীতে রূপ নেয়। তার অধিকাংশ গান সব শ্রেণী-পেশার মানুষের কাছে তুমুল জনপ্রিয়তা পায়।
নোয়াখালীর প্রধান সংগীত খ্যাত ‘আঙ্গো বাড়ি নোয়াখালী রয়াল ডিস্ট্রিক ভাই/ হেনী মাইজদী চৌমুহনীর নাম কে হুনে নাই’-গানটি তাকে এনে দিয়েছিলো জগতজোড়া খ্যাতি। এ গান আজও মানুষের মুখে মুখে। তার জনপ্রিয় অন্যান্য গানের মধ্যে রয়েছে, ‘আল্লায় দিসে বাইল্লার বাসা নোয়াখাইল্লা মাডি’, ‘নোয়াখালীর দক্ষিণে দি উইটসে নোয়া চর’, ‘রিকশাঅলা কুসকাই চালা ইস্টিশন যাইয়াম’, আহারে ও কুলসুম কতুন আইলো ডুবাইআলা কইল্লো এ জুলুম’।
সঙ্গীতের পাশাপাশি তিনি অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৭০ সালে রেডিও পাকিস্তানের 'অনুষ্ঠান সংগঠক' হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু। পর্যায়ক্রমে ঢাকা সংগীত কলেজ, কবিরহাট সরকারি কলেজ, লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজসহ দেশের বিভিন্ন কলেজে শিক্ষকতার পর তিনি ২০০৫ সালে এ অঞ্চলের অন্যতম নোয়াখালী সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তার সঙ্গীতের প্রথম গুরু বাংলা লোকজ সঙ্গীতের দিকপাল শিল্পী আব্দুল আলীম। তিনি আবদুল আলীম ছাড়াও ওস্তাদ বারীন মজুমদারের কাছে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত, ওস্তাদ আবিদ হোসেন খানের কাছে তত্বীয় সঙ্গীত, ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খানের কাছে তবলায় দীক্ষা নেন। অবশেষে তিনি নিজ বাসভূমে গিয়ে শুরু করেন শিক্ষকতা ও সংগীত সাধনা।
২০০৫ সলে একুশে বইমেলায় বের হয় এই সাধক পুরুষের গানের প্রথম সংকলন ‘নোয়াখালীর আঞ্চলিক গান’। ২০১৫ সালে তার রচিত বাছাই করা আড়াইশ’ গান নিয়ে উৎস প্রকাশন বের করে নির্বাচিত নোয়াখালীর আঞ্চলিক গান। মোহাম্মদ হাশেম ও নোয়াখালীর আঞ্চলিক গান এখন যেন সমার্থক। তিনি এখনো লিখে চলেছেন আঞ্চলিক ও পল্লীগান; আর গেয়ে চলেছেন বেতার ও টেলিভিশনে, যা শুরু করেছিলেন ১৯৬৬ সালে।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top