logo
news image

বঙ্গবন্ধুর হৈমন্তি উত্তরা গণভবনে সুবাস ছড়াচ্ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক।।
নাটোর জেলা প্রশাসনের তত্বাবধানে এখন সুবাস ছড়াচ্ছে মৃত প্রায় হৈমন্তি ফুল গাছটি। ১৯৭২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উত্তরা গণভবনে এই ফুলের একটি চারাটি নিজ হাতে লাগিয়েছিলেন। এরপর দীর্ঘদিন অযত্ন অবহেলার কারণে হৈমন্তি গাছটি মৃত প্রায় হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে পরিচর্যা করে বাঁচিয়ে তোলা হয় সেই হৈমন্তী গাছটি। বর্তমানে হৈমন্তি ফুল সুবাস ছড়াচ্ছে উত্তরা গণভবন এলাকায়।
জেলা প্রশাসন ও গণপূর্ত বিভাগ সুত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর উত্তরাঞ্চলের বাসভবন রক্ষণাবেক্ষনের দায়িত্ব ছিল গণপূর্ত বিভাগের ওপর। কিন্তু কোন টেন্ডার ছাড়াই গণভবনের কিছু প্রাচীন মূল্যবান গাছ অনিয়মতান্ত্রিকভাবে কেটে নেয় গণপূর্ত বিভাগের কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারী। দীর্ঘদিন থেকে এ গাছ কাটা চললেও ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে প্রথমে গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে লেখালেখি হলে কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে। এরপর গণভবন রক্ষণাবেক্ষনের দায়িত্ব নেয় জেলা প্রশাসন। গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি।
তৎকালীন নাটোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রাজ্জাকুল ইসলাম জানান, জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর থেকে গ্র্যান্ডমাদার হাউস জঙ্গলে ভরপুর ছিল। পরে বর্তমান জেলা প্রশাসক গণভবন দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার লক্ষ্যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করেন। পরিষ্কার করতে গিয়ে গাছটি বঙ্গবন্ধুর স্বহস্তে রোপণ করার বিষয়টি ধরা পড়ে। ১৯৭২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উত্তরা গণভবনে এক সফরকালে স্বহস্তে একটি হৈমন্তীগাছ রোপণ করেছিলেন। কিন্তু গাছটির চারদিকে ঝোপজঙ্গলে ভরা ছিল। পরে পরিষ্কার করে গোড়া বেঁধে দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে অযত্ন-অবহেলায় থাকার কারণে পোকার আক্রমণে গাছটি মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে। তাৎক্ষনিকভাবে গাছটি কিভাবে রক্ষা করা সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগে যোগাযোগ করা হয়। গাছটিকে বাঁচিয়ে তুলতে ২০১৮ সালেল ১৮ মার্চ পর্যবেক্ষণে আসেন এক দল বিশেষজ্ঞ।
প্রতিনিধিদলে ছিলেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শাহাদৎ হোসেন, ড. কবিতা আঞ্জুমান আরা, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হর্টিকালচার বিভাগের পরিচালক কুদরতি গণি, ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ এস এম মেজবা উদ্দিন, ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মাফরুহা আফরোজ, সেচ ভবনের মার্কেটিং এক্সপার্ট বজলুর রহমান, নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক রফিকুল ইসলাম, উদ্যান উন্নয়ন কর্মকর্তা উপপরিচালক মেফতাহুল বারীসহ অন্যরা।
প্রতিনিধিদলের প্রধান বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. নাজিরুল ইসলাম সে সময়ে বলেন , ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বহস্তে লাগানো গাছ অনেক ঐতিহ্য বহন করে। বর্তমানে গাছটির বয়স ৪৬ বছর। তা ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে অযত্ন-অবহেলায় থাকার কারণে পোকার আক্রমণে গাছটি নষ্ট হয়ে গেছে। কিভাবে গাছটিকে সজিব করে তোলা যায় সে বিষয়ে কিছু পরামর্শ দিয়েছি। এরপর উদ্ভিদ বিশেষজ্ঞ ও কৃষিবিদদের পরিশ্রমে গাছটি প্রাণশক্তি ফিরে পায়। ভরে ওঠে ফুলে ফুলে।
উত্তরা গণভবনের দুর্লভ বৃক্ষরাজির পরিচর্যায় বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত ড. ভবসিন্ধু রায় বলেন, ‘হৈমন্তী গাছটির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়ার পর গাছের গোড়া থেকে শাখা-প্রশাখা পর্যন্ত উইপোকার প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। এমন পরিস্থিতিতে গোবর, ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপিসহ কয়েক প্রকার কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়। পরিচর্যার এক পর্যায়ে প্রাণ ফিরে পায় বঙ্গবন্ধুর হাতের পরশ পাওয়া হৈমন্তী।’
তিনি বলেন, ‘হৈমন্তী এক প্রকার বিরল বুনো জাতীয় ফুল গাছ। শীতকালে প্রচুর ফুল ফোটে। অন্য সময়ে কম। তবে শীতকালে হৈমন্তী ফুটলে গাছে পাতা থাকে না। বিশেষ করে ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে। এ সময় গভীর রাত ও ভোরে তীব্র সুগন্ধ ছড়ায় ফুলটি। ভোরে শিশির ভেজা ঘাসের ওপর শিউলি ফুলের মতো ছড়িয়ে থাকা হৈমন্তী ফুল নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের সৃষ্টি করে।’
এখন গাছটি দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করছে। পর্যটকদের অনেকেই বিরল এ গাছটি দেখতে ও এর সম্পর্কে জানতে আসেন।
নাটোরের জেলা প্রশাসক মোঃ শহরিয়াজ বলেন , উত্তরা গণভন খ্যাত দিঘাপতিয়া রাজপরিবারের ইতিহাস, তাদের ব্যবহৃত তৈজসপত্র ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে স্থাপন করা সংগ্রহশালার প্রতি পর্যটকদের আগ্রহ বেড়েছে। এ ছাড়া পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়াতে নতুন নতুন পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসক জানান, প্রায় ৩০০ বছরের ঐতিহাসিক এই রাজপ্রাসাদটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ায় প্রতিদিন শত শত মানুষ এখানে ভিড় করছেন।
নাটোরের তৎকালীন জেলা প্রশাসক শাহিনা খাতুন বলেন, জেলা প্রশাসন এই ভবনের দায়িত্ব নেওয়ার পর উদ্ধার করা হয় এই রাজপরিবারের সদস্য রাজকুমারী ইন্দুপ্রভা দেবীর অপ্রকাশিত সাহিত্যকর্ম। রাজকুমারীর আত্মজীবনী ও ব্যক্তিগত ডায়েরি থেকে বেরিয়ে এসেছে রাজপরিবার ও অন্দরমহলের অনেক অজানা কাহিনী। রাজকুমারীর লেখা ২৮৫টি প্রেমের চিঠি বেশ আলোড়ন তোলে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে নাটোর ট্রেজারি থেকে পাওয়া যায় একটি রূপার ফ্রেমে রাজসিক ঢংয়ে বাঁধাই করা ইন্দুপ্রভার আলোকচিত্র। এক সময় খোঁজ মেলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিজের হাতে লাগানো হৈমন্তী গাছের।হৈমন্তি গাছটি রক্ষা করা সহ জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে রাজকুমারী ইন্দ্রপ্রভা দেবীর চিঠি পত্র ও ডায়েরির ওপর ভিত্তি করে রাজকুমারী ইন্দ্রপ্রভার আত্মজীবনী নামে একটি বই প্রকাশ করা হয়। একারণে দিঘাপতিয়া রাজবাড়ির বিলুপ্ত ইতিহাস সংরক্ষণ, একটি সংগ্রহশালা স্থাপন, দুর্লভ প্রজাতির বৃক্ষরাজির জার্মপ্লাজম সংরক্ষণ করে চারাগাছ তৈরি, শত প্রজাতির গাছের বৈশিষ্ট্য সম্বলিত নামফলক স্থাপনসহ বিভিন্ন ধরনের পর্যটন সুবিধা সৃষ্টি করার জন্য জন প্রশাসন পদক পায় নাটোর জেলা প্রশাসন।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top