logo
news image

১৪০ দেশ ভ্রমণকারী নাজমুনের কথা

নিজস্ব প্রতিবেদক।।
বাংলাদেশের পতাকাবাহী প্রথম বিশ্ব পর্যটক নাজমুন নাহার। সর্বাধিক রাষ্ট্র ভ্রমণকারী প্রথম বাংলাদেশি। নিজ দেশের পতাকা হাতে বিশ্বের এই প্রথম কোনো নারী অভিযাত্রা করেছেন ১৪০ দেশ। দুর্গম পাহাড়, তুষারে আচ্ছন্ন শহর, উত্তপ্ত মরুভূমি, বিশাল সমুদ্র, বিষাক্ত পোকামাকড় কিংবা প্রতিকূল পরিবেশ কোনোকিছুই তার বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। সব প্রতিবন্ধকতা জয় করে নাজমুন নাহার এরইমধ্যে ভ্রমণ করেছেন বিশ্বের ১৪০ দেশ। মুসলিম বিশ্বের নারীরা যেখানে অনেক ক্ষেত্রেই পুরুষতান্ত্রিকতার বেড়াজালে নিজেদেরকে মুক্ত করতে পারেননি পুরোপুরিভাবে, সেখানে নাজমুন নাহার বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি বিশ্ব শান্তি, নারীর সমতা ও ক্ষমতায়নসহ সব জাতি, ধর্ম, বর্ণের মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন পৃথিবীর প্রতিটি দেশে অভিযাত্রা করবেন বলে। যার প্রতিটি ভ্রমণ একা একা করেছেন তিনি এবং পরবর্তী দেশগুলো একাই ভ্রমণ করবেন। নাজমুন বাংলাদেশ ছাড়িয়ে পৃথিবীর অনেক দেশের নারীদের অগ্রযাত্রার আইকন হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন।
এ বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি ভ্রমণ করেছেন এশিয়ার ৫টি দেশ। ২৯ জানুয়ারি নাজমুন নাহার পৌঁছেছিলেন দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার রাষ্ট্র বোর্নিও দ্বীপের উত্তর উপকূলে অবস্থিত ব্রুনাইয়ের রাজধানী বন্দর সেরি বেগাওয়ান। নাজমুন নাহার ১৪০তম দেশ ভ্রমণের ঐতিহাসিক রেকর্ড অর্জন করেন ব্রুনাইতে।
আমাদের সমাজে অনেক নারীদের আজ পিছিয়ে দেওয়া হয় সামর্থের কথা বলে। কিন্তু শতাব্দির সেরা বাঁধার দেওয়ালকে অতিক্রম করে বাংলাদেশের বুকে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন নাজমুন নাহার। যিনি ১৪০ দেশে বাংলাদেশের পতাকাকে বহন করে নিয়ে গেছেন। তার লক্ষ্য পৃথিবীর প্রতিটি দেশে তিনি নিয়ে যাবেন লাল-সবুজের পতাকা। অনেক দুর্গম পথে অভিযাত্রা করেছেন। মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে ফিরেছেন অনেকবার। আঘাত পেতে পেতে উঠে দাঁড়িয়েছেন, রক্তাক্ত হয়েছেন অনেকবার, মরুভূমিতে প্রচণ্ড তাপমাত্রা পুড়তে হয়েছে। ঘাসের ওপর ঘুমিয়ে রাত পার করতে হয়েছে, পথে খাবার না পেয়ে ক্ষুধার জ্বালায় ভুগতে হয়েছে।
এত বাঁধা-বিপত্তিতেও থেমে জাননি নাজমুন। যতক্ষণ শরীরে শক্তি ছিল তিনি পৃথিবীর পথে পথে হেঁটেছেন। পৃথিবীর মানুষকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন, পৃথিবীর প্রকৃতিকে দেখেছেন, পৃথিবীর মাঝে বিচরণ করেছেন লাল-সবুজের পতাকা হাতে। এভাবেই ১৪০ দেশে বাংলাদেশের পতাকা পৌঁছে দেন।
মুসলিম বিশ্বের এক সাহসী মেয়ে নাজমুন নাহার। প্রতিটি দেশেই পা রেখে উড়িয়েছেন লাল-সবুজের পতাকা। দীর্ঘ পথচলায় নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হলেও থেমে যায়নি তার যাত্রাপথ। পৃথিবীব্যাপী তার বেশিরভাগ অভিযাত্রা হয়েছিল সড়কপথে একা।
এরইমধ্যে নাজমুন নাহার পর্বত, প্রলয়, সমুদ্রের বাঁধা, নগর-বন্দর-শহরের দীর্ঘপথ আর সীমান্তের বাঁধা, মানবসৃষ্ট অনেক বাঁধা সবকিছু অতিক্রম করে সকল দুর্গম কঠিন দুয়ার ভেঙে স্বদেশের পতাকা হাতে দেশে দেশে গত ২০ বছর ধরে ভ্রমণ করছেন। তার এই যাত্রা অব্যাহত থাকবে পৃথিবীর প্রতিটি দেশে বাংলাদেশের পতাকা পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত। এই প্রত্যয়ী নারীর নাম এখন পর্যন্ত সর্বাধিক রাষ্ট্র ভ্রমণকারী প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়েছে।
এই দুর্দান্ত সাহসী নারী বেশিরভাগই করেছেন সড়কপথে কম খরচে। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে তিনি শুরু করেন ব্রুনাই অভিযাত্রা। নাজমুন নাহার এবারের অভিযাত্রায় ম্যাপ করেছেন এশিয়া মহাদেশের দেশ মিয়ানমার, জাপান, তাইওয়ান, ফিলিপাইনস হয়ে ব্রুনাই পর্যন্ত। প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তিতে ছুটে বেড়িয়েছেন দেশ হতে দেশান্তরে। তার ভ্রমণের তালিকায় রয়েছে পূর্ব আফ্রিকা, দক্ষিণ আফ্রিকা, পশ্চিম আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকার প্রতিটি দেশ। তিনি সড়কপথে ভ্রমণ করেছেন ইউরোপ ও এশিয়ার বেশিরভাগ দেশ। ২০১৬ ও ২০১৭ সালে টানা ঘুরেছেন ৩৫ দেশ। ২০১৮ সালে ভ্রমণ করেছেন ৩২ দেশ। আর ২০১৮ নভেম্বর থেকে ২০১৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ঘুরেছেন পশ্চিম আফ্রিকার ১৫ দেশ। ২০১৯ সালের এপ্রিল থেকে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঘুরেছেন ১৫ দেশ।
এবারের অভিযাত্রায় নাজমুন মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনসহ অন্যান্য শহর ভ্রমণ করেন। তারপর জাপানের হিরোশিমা থেকে শুরু করে তিনি দক্ষিণ জাপানের বিভিন্ন শহর ওতাকে, ইয়ামাগুচি, হফু, শিমনোসেকি, কোগা হয়ে ফুকুওকা পর্যন্ত ভ্রমণ করেন। বর্তমানে পৃথিবী যখন করোনা ভাইরাসে আতঙ্কিত, ঠিক এই মুহূর্তে এই দুঃসাহসী অভিযাত্রী তার বিরামহীন অভিযাত্রায় এশিয়া মহাদেশের এই দেশগুলো মুখে মাস্ক পরেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চালিয়ে গেছেন তার অভিযাত্রা।
তারপর জাপান থেকে তিনি তাইওয়ানের রাজধানী তাইপে যান। সেখানে ৫০০ সিঁড়ি পার হয়ে তিনি তাইপের বিখ্যাত এলিফ্যান্ট মাউন্টেনে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। এছাড়া তিনি চাইনিজ নিউইয়ার সেলিব্রেট করেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আসা সকল পর্যটকদের সঙ্গে তাইপে শহরের নাইট মার্কেট ও তাইপে শহরের বিভিন্ন দর্শনীয় ও ঐতিহাসিক স্থানগুলো ঘুরে দেখেন।
তাইওয়ান থেকে তিনি কিছুদিন ফিলিপাইনে অবস্থান করেন। তারপর বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে তিনি ব্রুনাই দারুসসালামের রাজধানী বন্দর সেরি বেগাওয়ানে অবস্থান করেন।
এশিয়ার এই ৫টি দেশের ভ্রমণের পূর্বে তিনি ২০১৯ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বর ভ্রমণ করেন সেন্ট্রাল আমেরিকার দেশ গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস, এল সালভাদর, নিকারাগুয়া এবং কোস্টারিকা। নাজমুন বলেন, ‘পৃথিবীর পথে পথে আমার অভিযাত্রায় বেঁচে থাকার সংগ্রাম ছিল শ্বাসরুদ্ধকর।’
নাজমুন নাহার পরবর্তী অভিযাত্রার ম্যাপ করেছেন আফগানিস্তান, পাকিস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান ও কিরগিজস্তান পর্যন্ত। খুব দ্রুতই তিনি সৃষ্টি করবেন ১৫০তম দেশ ভ্রমণের মাইলফলক। সবশেষে নাজমুন বলেন, ‘পৃথিবীর দুঃসময়ে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। মানবজাতির ধর্ম, বর্ণের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে এসে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’
ভয়াল দুটি অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন নাজমুন নাহার

নদীর সঙ্গে বেঁচে থাকার যুদ্ধ
গুয়ান ক্যাসেল প্রদেশে সন্ধ্যার আবছা অন্ধকার নেমে আসছিল। আমি তখন ব্রাসিলিতো নদীর স্রোতের সঙ্গে যুদ্ধ করছি নিজেকে বাঁচানোর জন্য। ছোট্ট নদীটির ঠিক মাঝামাঝি অবস্থায় আমি আটকে আছি সেই মুহূর্তে। পাথরের সঙ্গে জোর করে আমি একটা পায়ের পাতার আঙুল গুটিয়ে নদীর সে পাথরকে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করলাম, আমি বুঝতে পারছিলাম পাথরের খোঁচায় আমার পায়ের এক সাইড দিয়ে কিছুটা কেটে যাচ্ছিল। আমার সেদিকে খেয়াল নেই, আমার এখন বাঁচতে হবে, নতুবা নদীর স্রোতের সঙ্গে আমার শরীর ভেসে যাবে সাউথ প্যাসিফিক সমুদ্রের দিকে। আমি স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কেটে ও যেতে পারছি না, আবার স্রোতের সঙ্গে ভাসলে আমার শরীর প্রচণ্ড পানির উত্তাল ঢেউয়ে চলে যেতে পারে সমুদ্রে, কিন্তু সেদিনও আমি বেঁচে রইলাম কোনো অজানা আশীর্বাদে। হঠাৎ করে নদীর অপর পাড়ে সমুদ্রের কাছে দেখতে পাচ্ছিলাম আবছা অন্ধকারের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে কোনো এক মানব। গলা পর্যন্ত ডুবে যাওয়া শরীরের সব শক্তি দিয়ে তাকে ডাকলাম, সেই মানবটি দৌড়ে এসে জোয়ার আসা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আমাকে বাঁচালেন। সাউথ প্যাসিফিকের পাশ ঘেঁষেই ছিল কোস্টারিকার অপূর্ব সুন্দর কনচাল সমুদ্র সৈকত। দিনের বেলায় নদীতে যখন ভাটা ছিল আমরা ৩ জন টুরিস্ট বন্ধু একসঙ্গে গিয়েছিলাম এই ব্রাসিলিতো নদী পার হয়ে। দুর্গম সে সৈকত অভিযানে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলাম একেক জন একেক জায়গায়। ফেরার সময় নদীতে অনেক জোয়ার এসেছিল, এই অবস্থায় নদীতে আরও প্রবল জোয়ার আসবে ভেবে আমাকে একাই নদী পার হতে হয়েছিল শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থার মধ্য দিয়ে।

পথের সেই অনিশ্চিত সন্ধ্যা
নিকারাগুয়া বর্ডার ক্রস করেই প্রায় ১৭ ঘণ্টা বাসটি এসে আমাকে নামিয়ে দিলো কোস্টারিকার লাইবেরিয়া শহরের মেইন রাস্তার পাশে কোনো একটা ঝোপের কোনায়। রাত তখন ১১টা। চারদিকে অন্ধকার। আমি ব্যাকপ্যাক নিয়ে যখনই নেমে পড়লাম। আমার হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল, বুঝতে পারছি গুয়াতেমালায় আমার জখম হওয়া পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা। মনের শক্তি দিয়ে আস্তে আস্তে পা ফেলতে থাকলাম। কিন্তু এই অচেনা জায়গায় কষ্ট হলেও তো আমাকে হোটেলের ঠিকানায় পৌঁছাতে হবে কোনোভাবে। গাড়ি যেখানে আমাকে নামালো সেখান থেকে হোটেলটি ৫ কিলোমিটার দূরে। মোবাইলে নেট নেই, তাই উবার ডাকার চান্স ছিল না। প্রায় ১০ মিনিট হাঁটার পরে দেখতে পেলাম একটা কার রাস্তার পাশ ঘেঁষে দাঁড়াল। তাদেরকে দেখে আমি দৌড়ে কারটির পাশে গেলাম, ড্রাইভিং সিটে দেখতে পেলাম একটি মেয়ে, তার পাশের সিটে একটি ছেলে। দু’জনের হাতেই দুটি প্যাকেটের ভেতরে কোনো খাবার, আমাকে দেখেই জানালার গ্লাস খুলে মুখ বের করে দিলো মেয়েটি। আমি তার কাছে পথ নির্দেশনা জানতে চাইলাম হোটেলের।
মেয়েটি তার স্পানিশ ভাষায় আমাকে বললো, আমি ইশারায় বুঝলেও খুব বেশি একটা বুঝে উঠতে পারিনি। আমি যখনই কয়েক স্টেপ হাঁটা দিলাম সামনের দিকে, গাড়িটি এসে আমার পাশে দাঁড়ালো। ইশারা দিয়ে বললো তাদের পেছনের সিটে বসার জন্য, ওরা আমাকে পৌঁছে দিলো হোটেল পর্যন্ত। আমি কৃতজ্ঞ হলাম তাদের কাছে। সেই মুহূর্তে ওই রাইডটা আমার খুবই দরকার ছিল। হয়তো কোনোদিন আর দেখা হবে না এই মানুষগুলোর সঙ্গে। কিন্তু তারা আমার এই জীবন জার্নির ইতিহাসে স্মৃতি হয়ে থাকবে।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top