logo
news image

বন্ধুত্বের মর্যাদা

সালাহ্ উদ্দিন খোকন, প্যারিস, ফ্রান্স থেকে।  ।  
বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরেছি। দশম শ্রেণিতে পড়–য়া বোনটি সামনে এসে বলল, “ভাইয়া, তোমার বন্ধু আরহাম আজ বিকেলে আমাকে একটি চিঠি দিয়েছে। এখনো খুলিনি, একটু পড়ে দেখো তো।” দেখি, চিঠিতে সে আমার বোনকে যতটা প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছে, তার চেয়ে বেশিবার লিখেছে আমি যেন বিষয়টা না জানি।
একান্নবর্তী পরিবারে আমার জন্ম। এগারো ভাই-বোনের মধ্যে আমি সবার বড়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি। এখন বন্ধুর অভাব নেই। ছুটিতে বাড়িতে এলেই তারা চলে আসত আড্ডা দিতে।
আট বোনের নানা রকম ভবিষ্যৎ চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। পরদিন বিকেলের আড্ডায় বন্ধুদের জানিয়ে দিলাম, আজ থেকে আমরা কেউ কারো বন্ধু নই। আমার সাথে বন্ধুত্বের আড়ালে যদি আমার বোনের সাথে প্রেম করার ইচ্ছা থাকে, তাহলে সেই বন্ধুত্বের ইতি এখানেই। দেখলাম, চারজন ইতোমধ্যে মাথা নিচু করে ফেলেছে। এর মধ্যে একজনের মাথা একটু বেশি নিচু। বুঝলাম, বাকি তিনজনও টাইমলাইনে আছে।
আরেকবার ছুটিতে এসেছি। একদিন দেখি দুই বোনের একদল বান্ধবী বেড়াতে এসেছে। দুজন আমার জন্য গল্পের বইও এনেছে। তাদের বিদায়ের পর বই খুলতেই দেখি প্রেমপত্র। বোনগুলোকে নিয়ে বসলাম। চিঠি দুটি তাদের পড়তে দিয়ে বললাম, তোদের জন্য আমি বন্ধু ত্যাগ করেছি। এবার তোরা কী করবি বল? সেদিন থেকে তারাও বান্ধবীহীন।
পরবর্তী জীবনে আরো যারা বন্ধু হওয়ার জন্য এসেছে, তাদের মধ্যেও খুঁজে পেয়েছি একধরনের চাতুরি, ছলনা, কৌশল কিংবা স্বার্থ। তাই তো প্রবাদে আছে ‘বন্ধু বেইমান’। রুশ সাহিত্যের এক ছোটগল্পে পড়েছিলাম দুই বন্ধুর কথা। তারা ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু। একে অপরকে যেমন বিশ্বাস করত, তেমনই ভালোবাসত। একে অপরের জন্য জীবন দিতেও প্রস্তুত ছিল। যাকে বলে বন্ধু অন্তপ্রাণ।
ওই দুই বন্ধুর একজন ছিল রাশিয়ান সের্গেই, আরেকজন মার্কিনি রবার্ট। দুজন একবার সিদ্ধান্ত নিল বিশ্ব ভ্রমণে বেরুবে। তারা মিলিত হলো লন্ডনে। সারা দিন হেঁটে হেঁটে তারা শহর থেকে বহু দূরে গিয়ে পৌঁছল। সন্ধ্যায় রাজপ্রাসাদসম এক বাড়ির সামনে গিয়ে দরজায় কড়া নাড়ল। দারোয়ান এসে তাদের ভেতরে নিয়ে গেল। অভ্যর্থনা কক্ষে পঁচিশোর্ধ্ব এক সুন্দরী এসে বলল, “দেখুন, আপনারা এখানে রাত্রিযাপনের কথা বলছেন। কিন্তু এ বাড়িতে দু-তিনজন কাজের লোক আর আমি ছাড়া কেউ নেই। মা-বাবা মারা গেছেন বহু আগে। আমি তাদের একমাত্র সন্তান। ঠিক আছে থাকুন। খাওয়াদাওয়া করুন। আমি পাশের রুমেই থাকি। কোনো সমস্যা হলে আমাকে নক করবেন।” বলেই সে তার ঘরে চলে গেল।
দুই বন্ধু ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। সের্গেই বলল, “এই শোন, তোর তো স্বভাব-চরিত্র ভালো না। ভুল করেও তুই রাতে ওই মেয়ের ঘরে যাবি না।” রবার্ট বলল, “আরে না। আমি তো তোকে নিয়ে ভাবছি।”
পরদিন সকালে যথারীতি বিদায় নিয়ে দুজন বেরিয়ে পড়ল। এভাবে ছয় মাস বেড়ানোর পর নিজ নিজ দেশে ফিরে গেল। দুই বছর পর সের্গেই রবার্টকে ফোন করে বলল, “তুই শালা একটা বেইমান। দুই বছর আগে তুই লন্ডনের ওই সুন্দরীর ঘরে রাতে গিয়েছিলি। সারা রাত তার সাথে ছিলি। অপরাধ শুধু এটাই না, মেয়েটির কাছে তুই তোর নাম-পরিচয়ের জায়গায় আমার ঠিকানা কেন দিয়েছিলি? একেই কি বলে বন্ধুত্ব?” রবার্ট বলল, “দোস্ত, মাইন্ড করিস না। ওই দিন ভোরে মেয়েটি আমাকে বলেছিল, ‘তুমি আমার জীবনের প্রথম এবং একমাত্র পুরুষ। আজকের এই রাতের কথা আমৃত্যু মনে থাকবে।’ খাতা-কলম দিয়ে আরো বলেছিল, ‘তোমার নাম-ঠিকানা লিখে দিয়ে যাও।’ আমি তখন ভয় পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, ব্রিটিশরা তো আসলেই ব্রিটিশ। ভবিষ্যতে কোন না কোন বিপদে ফেলে। তাই বিপদ এড়াতে আমার ঠিকানা গোপন করে তোর নাম-ঠিকানা লিখে দিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু এতদিন পর তুই সেটা কীভাবে জানতে পারলি?”
সের্গেই বলল, “আমার নামে লন্ডন থেকে উকিল নোটিশ এসেছে। মেয়েটি ব্লাড ক্যান্সারে কিছুদিন আগে মারা যাওয়ার আগে লিখে রেখে গেছে, ‘সুখময় এক রাতের বদৌলতে আমার ২৫ হাজার কোটি পাউন্ডের সমস্ত সম্পত্তি সের্গেইয়ের নামে উইল করে গেলাম।’ সেগুলো এখন বুঝে নিতে হবে।”
* সালাহ্ উদ্দিন খোকন: সম্পাদক, প্যারিস টাইমস, প্যারিস, ফ্রান্স। 

কমেন্ট করুন

...

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top