logo
news image

নদীর স্রোত কারও কারও জন্য বইতে পারে না

ড. মো. ফখরুল ইসলাম।  ।  
স্কুলে বাংলা পড়াতেন শ্রদ্ধেয় অনিল স্যার। তিনি ভাবসম্প্রসারণ লিখতে দিতেন ‘সময় ও নদীর স্রোত কাহারো জন্যে অপেক্ষা করে না’। সেই বাল্যকাল থেকে বিশ্বাস করা বিষয়টি তিস্তা নদীর স্রোতের বেলায় এতদিন পরে অসত্য মনে হচ্ছে। আজকাল নদীর স্রোত কারও কারও জন্য স্বাভাবিক গতিতে বইতে পারে না।
দেশে দেশে নদীর ওপর বাঁধ দেয়া হয়েছে। স্থানীয় নদী তো বটেই, আন্তর্জাতিক নদীগুলোর ওপর চেপে বসেছে পাষাণে বাঁধানো বড় বড় ড্যাম, বাঁধ ইত্যাদি।
আন্তর্জাতিক নদী আইনকে অমান্য করে পানি প্রবাহের টুঁটি চেপে ধরে প্রতিবেশী বা অপরের মৌলিক অধিকার নষ্ট করে স্বার্থপরতা যেন উথলে উঠেছে কারও কারও মধ্যে।
যদিও গুটিকয়েক উন্নত দেশ তাদের দ্বিপাক্ষিক নদ-নদীর পানি ব্যবহারের সমস্যাগুলো মিটিয়ে ফেলেছে; তথাপি অনেক ক্ষেত্রে এখনও নানা সমস্যা বহাল রয়েছে।
বর্ষাকালে আমাদের তিস্তা নদীর স্রোত উপরের কারও বাধা মানে না। তখন তিস্তার জেদ বঙ্গোপসাগরে তার পেটে জমা অগাধ পানিকে নামতে দিতেই হবে। তা না হলে উপরওয়ালাদের মুখে বমি হয়ে যাবে। বর্ষাকালে অগাধ জলরাশি নিয়ে ওপরে বিপদই হয় বৈকি?
এ বছর অতি বর্ষণে ফারাক্কা, তিস্তা সব বাঁধের ওপরই বিপদ সামলাতে হিমশিম খেতে হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশে অকাল বন্যা এসে হাজির হয়ে আরেক বিপদ তৈরি করেছে।
বেশ কিছুদিন আগে ‘তিস্তায় তো পানি নেই- চুক্তি হবে কীভাবে’? -মমতা ব্যানার্জি এ ধরনের কথা শুনিয়েছিলেন। আমরা বাংলাদেশের মানুষ প্রবল তৃষ্ণার্ত ও উৎকণ্ঠিত। এমন সময় মমতার মমত্বহীন কণ্ঠ কষ্ট দিয়েছিল; যা অদ্যাবধি আমাদের হতাশ করছে।
তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যার এজেন্ডা নিয়ে মোট কতবার মিটিং-বৈঠক হয়েছে মনে আছে কি?
বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে সভা করার হিসাব অনুযায়ী ছিয়ানব্বইবার বসা পূরণ হয়েছিল কয়েক বছর আগেই! সেই ১৯৯৮ সালে ডালিয়ার ‘অবসর’, ঢাকার সচিবালয়, নানা জায়গায় বহুবার অতীতের বহু প্রেসিডেন্ট-মন্ত্রী-সচিব কমিটি, টেকনিক্যাল কমিটি, সংসদীয় কমিটির প্রচেষ্টা ভণ্ডুল করে ২০১৭ সালে দিল্লির রাজপ্রাসাদের ঝলমলে আলোয় বন্ধুত্বের উষ্ণতার মধ্যে আলোচনার ফলাফলে অনেক ইতিবাচক আশা ছিল।
আমাদের আশার ওপর ‘বাড়া ভাতে ছাই’ দেয়ার কাজটি করেছিলেন মমতা ব্যানার্জি। তখন ৩৬টি চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষরিত হলেও তিস্তাকে সুকৌশলে বাদ রাখা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেছেন মমতার কথা, আর মমতা বলেছেন ভিন্ন কথা- যেখানে বাংলাদেশের মানুষের অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে।
তারপর আমরা নতুন কথা, নতুন গান শুনেছি- তিস্তা নয়, তোরসা, জলঢাকা, মানসাই, ধানসাই ইত্যাদি নদীতে পানি আছে। সেগুলো থেকে বাংলাদেশের জন্য পানি দেয়া যাবে। তিনি বলেছিলেন- বাংলাদেশের তিস্তা চুক্তি নয়, দরকার তো জলের! এসব পাশ কাটানো, পিচ্ছিল কথাবার্তা!
এসব ক্ষীণ জলধারাকে বর্ষাকালে নদী মনে হলেও এগুলো সারা বছর প্রবহমান কোনো নদী নয়। এসব নদীর কোনো অস্তিত্ব বা প্রবাহ কি বাংলাদেশে আছে? এসব বলে তিনি তিস্তা পানিবণ্টনের কথা অন্য খাতে নিয়ে গিয়েছিলেন কেন তা আজও পরিষ্কার নয়। আমাদের কথা তিস্তা সমস্যার সমাধান তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি দিয়েই করতে হবে। বাংলাদেশের মানুষ এটাই চায়।
এছাড়া বাংলাদেশের মানুষ বর্ষাকালে তিস্তা নদীর বন্যার পানির হঠাৎ তোড়ের স্রোত দেখতে চায় না। অকাল বন্যাও আশা করে না। বরং এজন্য উজানের সঠিক তথ্য চায় যাতে পানির হঠাৎ তোড়ের প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায়।
কিন্তু বিষয়গুলো আজ সমাধান করা হবে- কাল সমাধান করা হবে করে দুই যুগ ধরে কালক্ষেপণ করে একটি বিব্রতকর অবস্থার দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ পানি চুক্তি নিয়ে টালবাহানার পরিপ্রেক্ষিতে কতটা বিব্রত ও ক্ষ্যাপা তা সাম্প্রতিক সময়ে বুয়েটের নিহত ছাত্র আবরারের আক্ষেপমূলক কবিতার লাইনের উদ্ধৃতিসহ ফেসবুক স্ট্যাটাস পড়লে বোঝা যায়।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত তথ্য থেকে জানা যায়- নিহত আবরার ফাহাদ বাংলাদেশ সরকারের সাম্প্রতিক ভারত সফরের চুক্তিগুলোর সমালোচনা করে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। তিনি ফেনী নদীর ১.৮২ কিউসেক (ঘনমিটার প্রতিসেকেন্ডে) পানি ত্রিপুরার সাবরুম শহরে কোনোরূপ বিনিময় ছাড়া ভারতকে দিয়ে দেয়ার চুক্তি স্বাক্ষরের প্রতিবাদ জানিয়ে বাংলাদেশের নতজানু নীতির বিরুদ্ধে ফেসবুকে সোচ্চার হয়েছিলেন।
আপাতত জানা গেছে, ভারতের সঙ্গে সাম্প্রতিক দেশবিরোধী চুক্তির সঙ্গে তিনি যে সহমত পোষণ করেননি পত্রিকাগুলো সে কথাই তুলে ধরেছে। এতে আবরার ফাহাদের দেশের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা ও দেশপ্রেমের অগাধ গভীরতা লক্ষণীয়।
কেউ বলেছেন, আমাদের স্বাধীনতার পর দেশবিরোধী ভারতীয় দালালদের হাত নির্মমভাবে নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে খাঁটি দেশপ্রেমের উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ, অতি মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদ। তবে আবরার হত্যার এটিই প্রধান কারণ কিনা তা সঠিক তদন্ত হলে পরে জানা যেতে পারে।
এ কথার সঙ্গে সংবাদে আরও জানা গেছে- ‘এমনিতেই আন্তর্জাতিক নদী আইন অমান্য করে বাংলাদেশের কোনো অনুমতি না নিয়েই ফেনী নদী থেকে পানি নিয়ে যাচ্ছিল ভারত। সীমান্তের জিরো লাইনে পাম্প বসিয়ে নদী থেকে পানি উত্তোলন করছিল দেশটি’।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি ৫ অক্টোবর বলেছেন, দ্রুততম সময়ে তিস্তা চুক্তি করা হবে। ইন্টারনেটের এ যুগে দ্রুততম সময় বলতে চোখের পলক বোঝানো হয়। প্রধানমন্ত্রী মোদি কি এ বিষয়ে মমতার সঙ্গে পরামর্শ করে বলেছেন? কারণ ২০১৭ সালে আমরা দেখেছি কেন্দ্রকে মমতা ব্যানার্জি তোয়াক্কা করেন না।
এবার বাংলাদেশের মানুষ আশ্বিনে বন্যায় ভুগছে ওদের অপার আশীর্বাদে। এ সময়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রী সাতটি চুক্তি করে এসেছেন। তিস্তার পানির সুরাহা করতে না পারলেও ফেনী নদীর পানি উল্টো ত্রিপুরাকে দিয়ে এসেছেন।
ইলিশ দিয়ে পেঁয়াজের ঝাঁজের মধ্যে পড়েছেন। তিনি হয়তো নিজেও জানেন, বড়রা শুধু ছোটদের কাছ থেকে নিতেই জানে।
২০১৭ সালে দিল্লির আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে অত্যন্ত আন্তরিক মনে হলেও মমতা ব্যানার্জির ভাব (যারা টিভিতে দেখেছেন আমার সঙ্গে একমত হবেন) আমাদের আহত করেছিল। এবারে তো মমতা ব্যানার্জি ছিলেন না। তবে কেন তিস্তা ইস্যুকে অগ্রাধিকার দেয়া হল না?
সামনে এক মাস পার হলেই বাংলাদেশের নদীগুলো শুকাতে শুরু করবে। তাই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বক্তব্য অনুযায়ী আর কালক্ষেপণ না করে ‘সবচেয়ে দ্রুততম সময়ে’ আমরা তিস্তাসহ অন্যান্য সব আন্তর্জাতিক নদীর পানি প্রবাহের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার চুক্তি স্বাক্ষর বাস্তবে দেখতে চাই।
যতদিন তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়িত হবে না ততদিন জনগণ এটাকে বন্ধুত্বের নামে বাংলাদেশের জনগণের প্রতি ধাপ্পাবাজি-ধোঁকা ও বর্তমান সরকারের ব্যর্থতা মনে করবে এবং সরকার পতনের এক নম্বর চাপের এজেন্ডা হিসেবে বিবেচিত হতে থাকবে।
তাই বাংলাদেশ সরকারকেও এ বিষয়ে আরও কৌশলী হয়ে প্রতিবেশীকে বোঝাতে তৎপর হয়ে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের তিস্তা নদীতে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ নিশ্চিত করে দীর্ঘদিনের জিইয়ে থাকা এ জটিল সমস্যার দ্রুত সমাধান করতে হবে। এটি এখন গোটা বাংলাদেশের মানুষের প্রাণের দাবি।
আমরা সবাই জানি, ‘সময় ও নদীর স্রোত কাহারো জন্য অপেক্ষা করে না’।
তিস্তা প্রবাহ কি তবে অন্য কারও জন্যে অপেক্ষায়? আমাদের পলিসি মেকারদের কাছে এসব বিষয় নিয়ে চিন্তা করার সময় বহু আগেই এসেছে। কালক্ষেপণ করতে করতে ভাবসম্প্রসারণ করার এ চিরায়ত প্রবাদটি যেন একবারে অসত্য হয়ে বই থেকে মুছে না যায় সেটি রক্ষা করার দায়িত্ব নিশ্চয়ই দাদা-ভাইদের ওপর বর্তায়।
* ড. মো. ফখরুল ইসলাম : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।   fakrul@ru.ac.bd

কমেন্ট করুন

...

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top