logo
news image

যেখানে ভিসি নোবেল প্রাপ্ত আর শিক্ষার্থীরা অলিম্পিক-বিশ্বকাপে

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।  ।  
ওদের বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবনগুলোর বেশ দূরে দূুরে গাড়ি পার্কিং। বেশীরভাগ শিক্ষার্থীই নিজ উচ্চ শিক্ষার খরচ যোগানের জন্য ছুটির দিনে অথবা রাতের শিফটে অনেক দূুরে কোথাও পার্টটাইম জব করে থাকে। যাতায়াতের সুবিধার্থে ওদেরকে ব্যক্তিগত গাড়ি নিজেই চালাতে হয়। সাধারণত: ওদের দেশে বাবা মা, অভিভাবকগণ তাদের ম্যাচিওরড সন্তানদের শুধু হাইস্কুল বা কেউ বড়জোর আন্ডারগ্রেড লেভেলে পড়ার খরচ দিয়ে ক্ষান্ত দিয়ে থাকেন। কেউ আরো বেশি উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে চাইলে নিজের যোগ্যতায় ভর্তি হয়ে পড়ার খরচ নিজেরাই যোগাড় করতে হয। কেউবা আন্ডারগ্র্যাড শেষ করে চাকুরীতে যোগ দিয়ে ক’বছর ধরে টিউশন ফি-এর টাকা জমিয়ে ফেলে। এরপর সুধিামত কর্মস্থল থেকে স্টাডি লিভ নিয়ে উচ্চশিক্ষা সমাপ্ত করে পুনরায় সেই চাকুরীতে যোগদান করে প্রমোশন নিয়ে উচ্চতর বেতন স্কেল লাভ করে থাকে। আমাদের দেশে পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা কেউ কেউ টিউশনি করালেও ছাত্রাবস্থায় স্থায়ী চাকুরীর সাথে জড়িত থাকার সুযোগ পায় না। তাই আমি ওদের এই বিষয়গুলো মোটেও জানতাম না।
ওদের দেশে আন্ডারগ্র্যাড শেষে কর্মসংস্থান সম্ভব। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে মাস্টার্স শ্রেণিতে গবেষণাকে বেশী প্রধান্য দেয়া হয়। তাই সবাই মাস্টার্স অথবা এম.ফিল, পি.এইচ.ডি করে না। করার দরকারও হয় না। সেজন্য বিভিন্ন দেশের মেধাবী ও সিনিয়র শিক্ষার্থীদেরকে গবেষণা কাজের এসিস্টান্টশীপ অথবা স্কলারশীপ দিয়ে আমন্ত্রণ জানানো হয়ে থাকে।
প্রায়শই: লক্ষ্য করতাম আমার এক সহপাঠি বন্ধু ক্লাসে দেরী করে আসতো এবং পিছনে বসে ঝিমাতো। মাঝে মধ্যে বেঞ্চে মাথা ঠেকিয়ে ঘুমিয়ে পড়তো। শিক্ষক ওকে কিছুই বলতেন না। প্রথমদিকে ওর জন্য আমার খারাপ লাগতো। একদিন লাঞ্চের সময় ওর পাশে বসে ওর বিষয়ে জানতে গিয়ে যা শুনলাম তা অবাক করার মত। সে জানালো তার বাবা মা দু’জনই বড় বেতনে চাকুরী করেন কিন্তু নিজ উচ্চশিক্ষার খরচের জন্য তাদের উপর নির্ভর করতে সে লজ্জা পায়। সে জিজ্ঞাসা করলো আমাকে পড়ার খরচ কে দেয়?  আমি জানালাম-কেন তোমাদের সরকার আমাকে স্কলারশীপ দেয়। আমার উত্তর শুনে সে কিছুটা অবাক ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকলো।
আসলে সে প্রতি সপ্তাহ চারদিন প্রায় একশত কি.মি. দূরে কোথাও পার্টটাইম জব করে। সেটা রাতের বেলায়। কাজ শেষে ফেরার পথে কনভিনিয়েন্ট স্টোর থেকে কিছু কিনে খেতে খেতে দ্রুত গাড়ি চালিয়ে সরাসরি ক্লাসে যোগদান করে।
আর আমাদের দেশের ধনীর দুলালরা? তাদের বাবা-মায়েরা উদয়ান্ত তাদের আদরের ম্যাচিওরড সন্তানদের জন্য কত টাকা ও সময় ব্যয় করেন আর কী যে টেনশন করেন তা বলাই বাহুল্য। আমাদের সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা এই অবস্থাকে আরো বেশী নাজুক করে রেখেছে।
যাহোক্, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সব গাড়ি চালককে দুরের পার্কিংয়ে গাড়ি রেখে সাত-দশ মিনিট হেঁটে ভবনগুলোতে ঢুকতে হতো। বাসের রাস্তা আরো দূরে। কিন্তু ভেতর দিয়ে বাইসাইকেলে এলে প্রতিটি ভবনের গা ঘেঁসে গ্যারেজ পাওয়া যেত আর দ্রুত হল থেকে ক্লাশরুমে পৌছানো যেত। তাই তুষারপাতের দিনগুলোতে বাইসাইকেলে যাতায়াতে একদিকে যেমন শরীর গরম করা যেত অন্যদিকে পা পিছলানোর ভয় থাকতো না। তাই অন্য সবার মত আমিও সময় বাচানোর জন্য বাইসাইকেলে আসতাম। পথে অনেকগুলো খেলার মাঠ ও জিম। সবসময় হ্যান্ডবল, বাস্কেটবল ইত্যাদির দুমদাম শব্দ শুনতাম। সাঁতার,ওয়াটার পোলো, রাগবী, ফুটবল ইত্যাদির প্রশিক্ষণ যেন শব্দ ও হৈহুল্লোর দিয়ে পুরে ক্যাম্পাসাকে মাতিয়ে রাখতো। মাঝে মাঝে ভাবতাম পড়া বাদ দিয়ে এত খেলাধুলা করে সময় নষ্ট করার প্রয়োজন কী?
একদিন ভুল ভাঙলো। আমার এক ল্যাবমেটের কাছে জানলাম আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ষোলজন এবার অলিম্পকে পদক পেতে যাচ্ছে! গতবার সাঁতার, ভারত্তোলন, জুডো ও হ্যান্ডবলে চারটি গোল্ডসহ তেরজন পদক পেয়েছিল। ফুটবল বিশ্বকাপে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়েরই দু’জন প্লেয়ার আছে। আমি এত তাজা খবর জেনে খুব অবাক হলাম। স্বভাবতই: সেই সোনার প্লেয়ারদেরকে দেখার জন্য ও তাদের সাথে কথা বলার জন্য প্রবল ইচ্ছে জাগলো। এরপর থেকে ডরমে ফেরার সময় ওদের প্রাক্টিস দেখতাম।
আমার ভর্তি হবার ছয়মাস গত হয়ে গেছে। তার আগে জানতাম না আমি যেখানে পড়াশুনা করছি সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি (ওরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধানকে প্রেসিডেন্ট বলে) একজন নোবেল লরিয়েট! তিনি ছিলেন প্রফেসর লিও এসাকি। একজন বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী। তিনি ১৯৭৩ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তিনি ১৯৯৭ সালে সুকুবা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট হিসেবে যোগদান করেন। এরপর এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর হিদেকি শিরাকাওয়া ২০০০ সালে রসায়নে নোবেল পরস্কার লাভ করেন। আমি ছাত্রবস্থায় দু’জন নোবেল লরিয়েটকে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছি! পরবর্ত্তীতে জেনেছি ১৯৪৯ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত জাপানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ১৮ জন শিক্ষক বিভন্ন ক্ষেত্রে নোবেল পুরস্কার লাভ করেছেন।
তখন ১৯৯৮ সালের ‘হানামী’ ছুটি চলছে। জাপানীদের ‘হানামী’ উৎসব হলো-চেরীফুল ফোটা উপলক্ষ্যে ফুলগাছের তলায় রান্না করে খাওয়া-দাওয়া করা, বসে-শুয়ে বিশেষ পানীয় ‘সাকে’ পান করা ও সংগে আনন্দফুর্তি করা। বিদেশী শিক্ষার্থীগণ নিজ নিজ দেশের খাদ্য রান্না করে খাবারের মধ্যে বৈচিত্র্য আনেন। এর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবগুলোর বিশেষ বাজেট বরাদ্দ দেয়া হয়। প্রফেসরগণ সব শিক্ষার্থীসহ অংশগ্রহণ করে থাকেন। আমার মনে হলো- এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট আজ কোথাও না কোথাও ‘হানামী’ উৎসবে অংশ নেবেন। তাঁর সাথে কথা বলার সুযোগ পেলে কেমন হয়!
ক্যাম্পাসে হাজারো চেরীগাছে ফুল ফুটেছে। দূর-দূরান্ত থেকে অনেক সাধারণ মানুষ এসে তাঁবু গেঁড়েছেন। দুপুর থেকে বাইসাইকেল চালিয়ে শত শত হানামী ক্যাম্প ঘুরে ফিরে দেখছি। সংগে শ্রীলংকান বন্ধু সোমাসিরি ও জাপানীজ টিউটর আকিরা। আকিরা দেখিয়ে দিল উনি প্রফেসর লিও এসাকি। পাতলা গড়নের একজন খুব সাদাসিদে মানুষ। মুখে মনভুলানো হাসি। তাঁর পায়ে চামড়ার চটি, তিনি হেঁটে এসেছেন! তিনি সহাস্যে হাত বাড়িয়ে দিলেন ‘কোন নিচি ওয়া’ বিকেলের সালাম বলে। আমি আকাশ থেকে পড়লাম তার সহজ-সরল অভিব্যক্তি দেখে। তার সাথে কোন প্রটোকলও নেই, কেউ ঘিরে জটলাও করেনি। তিনি কিছুক্ষণ কুশল বিনিময়ের পর চলে গেলেন। এরপর একদিন আমার বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপ-উপাচার্যের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে উভয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে যৌথ শিক্ষা ও গবেষণা সহযোগিতার জন্য ‘মেমোরেন্ডম অব আন্ডার স্টান্ডিং (এম.ও.ইউ)’ চুক্তি স্বাক্ষর করার সময় প্রেসিডেন্টের অফিসে গিয়েছিলাম। সেখানেও আমাদের দেশের ভিসি অফিসের মত ভিজিটরের চাপ অথবা আসবাবের জৌলুষ চোখে পড়েনি। আসলে একজন একাডেমিশিয়ান ও উচ্চমার্গের গবেষক ভিসির কাছে সাধারণ মানুষ কিজন্য অহেতুক ভীড় করবে-সেটাই মূখ্য বিষয়। এখানেই আমাদের দেশের ভিসিদের সাথে উন্নত দেশের ভিসিদের পার্থক্য লক্ষ্যনীয়।
উপরের স্মৃতিগুলো আমার বিদেশের শিক্ষাজীবনের। আজ বাইশ বছর পেরিয়ে গেলেও সেদিন আমার বর্তমান কর্মস্থলে আন্ত:বিশ্ববিদ্যালয় এক্যুয়াটিক ও ওয়াটারপোলোর ফাইন্যাল প্রতিযোগিদের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্য দিতে দিয়ে বার বার মনে হচ্ছিল। সুইমিংপুলের পানিতে ওয়াটারপোলোর বল ছুঁড়ে ঝড় তুলছিল প্রতিযোগিরা। দেখতে চমৎকার ছিল সাতারের ইভেন্টগুলোও। শুধু অতিথি, কর্মকর্তা ও প্রতিযোগিরাই ছিলেন। এতবড় বিশ্ববিদ্যালয়, এত শিক্ষার্থী, এতবড় আয়োজন-কিন্তু দর্শক গ্যালারী ফাঁকা। বর্তমানে সার্টিফিকেট সর্বস্ব শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার সাথে শরীর-মনের তথা স্বাস্থ্যের উন্নয়ন ও বিকাশের দিকে শিক্ষার্থীরা দিন দিন আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। ছাত্র সংগঠনগুলোর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। ছাত্র-যুব নেতারা লাভজনক ব্যবসা ও আয়-উপার্জনে জড়িয়ে নানা কেলেঙ্কারীতে ছাত্রসমাজ তথা গোটা জাতিকে কলঙ্কিত করে ফেলছেন। অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পত্রিকার লাল শিরোনাম হচ্ছেন দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিরা। উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হিসেবে এসব শিরোনাম দেখে পথে-ঘাটে আমাদেরকে মাথা হেঁট করে চলাফেরা করতে হচ্ছে। তাঁদের অশিক্ষকসুলভ আচরণে শিক্ষার্থীরা দিনের পর দিন ক্লাস-পরীক্ষা ত্যাগ করে ক্ষুব্ধ হয়ে তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে পদত্যাগ দাবী করছে। এতে একজন শিক্ষক হিসেবে আমাদের কোন ইতবাচক ভাবমুর্তি কি আর বাকী আছে?
আমরা দেখেছি ওদের দেশে ভিসিরা তথা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধানব্যক্তিরা অনেকে গবেষণায় নোবেল প্রাপ্ত ও শিক্ষার্থীরা বিশ্বকাপে সোনা অর্জন করে। আর আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরকে দুর্নীতিবাজ ভিসিদের বিরুদ্ধে পদত্যাগের দাবী তুলে রাস্তায় নেমে পুলিশের গুতো খেয়ে জেলে যেতে হয়! ওদের দেশে গবেষণা ও একাডেমিক যোগ্যতা দিয়ে ভিসি হয় আর আমাদের দেশে চাটুকারী দলকানা রাজনীতির বিচারে লবিং করে। ধিক্কার জানাই এই প্রহসনের উচ্চ শিক্ষাব্যস্থার অনিয়মগুলোকে।
তাই ভিসি নিয়োগে শুধু জ্বি-হুজুর মার্কা চরিত্রযুক্ত প্রার্থী নিয়োগ বন্ধ করুন। অতিদলপ্রীতি ও সন্দেহজনক অপার আনুগত্য না দেখে উচ্চমার্গের একাডেমিক পারফর্মেন্স আছে কি-না তা যাচাই করে প্রচলিত অধ্যাদেশ বা আ্ইান মেনে গণতান্ত্রিক নিয়োগদান ব্যবস্থায় ফিরে আসা উচিত। বর্তমান সময়ের বাস্তবতায় এই নাজুক প্রেক্ষাপটে পাবলিক-প্রাইভেট সকল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বাঁচাতে হলে দল-মত হিসেব না করে হীন রাজনীতির উর্দ্ধে উঠতে হবে। এক্ষেত্রে দেশী-বিদেশী ভাল একাডেমিক ফলাফলসহ উচ্চতর ডিগ্রী, গবেষণাডিগ্রী, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃৃত, বিখ্যাত পিয়ার রিভিউ করা স্কুপাস জার্নালে গবেষণাধর্মী প্রকাশিত পেপার সংখ্যা, নিজ নিজ বিষয়ে প্রকাশিত মানসম্মত বইয়ের সংখ্যা, আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে উপস্থাপিত গবেষণা পেপারের ওপর বক্তৃতা দানের অভিজ্ঞতা, এম.ফিল-পিএইচডি ডিগ্রী তত্ত্বাবধানের সংখ্যা, সর্বশেষে ইনস্টিটিউট পরিচালক, বিভাগীয় চেয়ারম্যান, ডীন, ইত্যাদি একাডেমিক পদে প্রশাসনিক কাজের অভিজ্ঞতা, সর্বপোরি সামাজিক কল্যাণমূলক সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ততা ও উন্নত নৈতিক ও চারিত্রিক গুনাবলী সম্পন্ন প্রশংসনীয় ব্যক্তিত্ব-ইত্যাদির ওপর ওপেন বায়োডাটা আহব্বান করে একটি সার্চ কমিটির মাধ্যমে সেগুলোর উপর ওপেন ক্রেডিট পয়েন্ট দিয়ে প্রোভিসি ও ভিসি নিয়োগ করা উচিত।  
* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

কমেন্ট করুন

...

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top