logo
news image

গুগলে কীভাবে গেলেন শাবির সাবির

নিজস্ব প্রতিবেদক, শাবি।  ।  
গুগলে সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং একই বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী সাবির ইসমাইল। গুগল, ফেসবুক, অ্যামাজনের মতো বিশ্বসেরা প্রযুক্তি কোম্পানিতে চাকরি করতে ইচ্ছুকদের জন্য সাবির ইসমাইল ক্যালিফোর্নিয়া থেকে নিজের প্রস্তুতি এবং চাকরি পাওয়ার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন।
গুগলের চাকরি হবে বা চাকরি করব এটা ছয় মাস আগেও আমার মনে হয়নি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে আমি কম্পিউটার বিজ্ঞানে মাস্টার্সের শেষ সেমিস্টারে ছিলাম। তখন আমার কাছে মনে হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে চাকরি খোঁজার জন্য ছয় মাসের মতো সময় আমার হাতে আছে। তখন গুগলের মতো বড় কোম্পানিতে চাকরিরত বড় ভাই ও বন্ধুদের উৎসাহে প্রস্তুতি গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেই। তবে এই প্রস্তুতি মানে এমন নয় যে, চাকরি হতেই হবে। মাথায় ছিল চেষ্টা করা। হয়ে গেলে ভালো, না হলেও হারানোর কিছু নেই। গুগলে চাকরির পথের শুরুটা এভাবে।
কথাগুলো বলছিলেন সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক বহুজাতিক প্রযুক্তি কোম্পানি গুগলে সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করা শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং একই বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী সাবির ইসমাইল। সিলেটে জন্মগ্রহণকারী সাবির বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থান করছেন। গুগলে চাকরি পাওয়ার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে তিনি বলেন, চাকরির জন্য ছয় মাস আগে থেকে প্রস্তুতি নিলেও মূল অংশ আসলে শুরু হয়েছে শাবির সিএসই বিভাগে অনার্স পড়ার সময় প্রথম তিন বছরের প্রোগ্রামিং, ডাটা স্ট্রাকচার ও অ্যালগরিদম কোর্সের মাধ্যমেই হয়েছে। আর এখনকার ছয় মাসের প্রস্তুতিতে আগের করা বিষয়গুলো আবার ভালো করে ঝালাই দিতে হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, দেশের বাইরে এটাই আমার প্রথম চাকরি। এর আগে নিউইয়র্কের স্টোনি ব্রোক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞানে মাস্টার্স সম্পন্ন করেছি। এখানে আমেরিকান তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানিগুলোতে ভারতীয় ও চাইনিজদের সংখ্যা অনেক বেশি। যদিও জনসংখ্যার অনুপাতে ওদের বেশি হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ওসব দেশ থেকে ১০ জন থাকলে আমাদের একজন থাকার কথা। এখানে এসে আমার কাছে মনে হয়েছে, আনুপাতিক হারে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। আমাদের দেশেও যদি ভারতের মতো বড় বড় তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানির শাখা থাকত অথবা টেনসেন্ট, বাইদু বা আলীবাবার মতো কোম্পানি থাকত, তাহলে বড় বড় তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানিগুলোতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি কাজ করার সুযোগ পেত। নতুনদের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, নতুন প্রজন্ম যারা গুগল, অ্যামাজন, ফেসবুকসহ পৃথিবীর বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানগুলোতে চাকরি করার স্বপ্ন দেখেন তাদের সম্পর্কে বললে আমি বলব, আমি আমার প্রস্তুতি নিয়ে আসলে বড় একটা ব্লগ লিখেছি যা অনলাইনে https://github.com/sabir4063/my_preparation ঠিকানায় পাওয়া যাবে। এ ছাড়া ছোট করে বললে, প্রথম কাজ হচ্ছে প্রোগ্রামিং করা, ডাটা স্ট্রাকচার ও অ্যালগরিদম কোর্স ভালো করে করা। বিভিন্ন প্রোগ্রামিং সাইটে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিভিন্ন প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা। বিভিন্ন প্রজেক্ট করলে ওইগুলো GitHub রাখা।
এ নিজের প্রোফাইল আপডেট রাখা এবং তাতে প্রোগ্রামিংয়ের অর্জন, বিভিন্ন প্রোজেক্টের বর্ণনা দিয়ে কোডের লিংক গিটহাবে দেওয়া।
তিনি জানান, আমার প্রস্ততির সময় ছিল ছয় মাস। এই ছয় মাসকে আমার প্রয়োজন মতো আমি প্রস্তুতির জন্য ভাগ করে নেই। যেহেতু আমি অনেক দিন কোনো প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় অংশ নেইনি এজন্য অন্তত ভালো মানের ৭০০ প্রোগ্রামিং সমস্যা সমাধানে মনোনিবেশ করি। ডাটা স্ট্রাকচার এবং অ্যালগরিদমে ভালো থাকায় কোনো বই না পড়েই খববঃপড়ফব-এ সরাসরি অনুশীলন শুরু করি। তবে ডাটা স্ট্রাকচার এবং অ্যালগরিদমে দুর্বলতা থাকলে বই পড়ে কিংবা অন্য কোনো উপায়ে ঠিকঠাক আত্মস্থ করতে হবে।
জীবনবৃত্তান্ত হোক এক পাতার
গুগল, ফেসবুক কিংবা অ্যামাজনে চাকরি পেতে প্রথমেই প্রয়োজন ভালো মানের একটি জীবনবৃত্তান্ত। সাবির বলেন, 'নিজেকে তুলে ধরতে এক পাতার বেশি বড় জীবনবৃত্তান্ত (সিভি) প্রয়োজন নেই। আমি গুগল ও অ্যামাজনের মতো প্রতিষ্ঠানে এক পাতার সিভি দিয়ে ডাক পেয়েছি। জীবনবৃত্তান্তে প্রোগ্রামিং দক্ষতা রেটি আকারে না দিয়ে এক্সপার্ট, ফেমিলিয়ার, অ্যাডভান্সড এভাবে উল্লেখ করা ভালো। অতিরিক্ত শব্দ খরচ না করে জীবনবৃত্তান্তে বিভিন্ন প্রজেক্টের সঙ্গে গিটহাব লিঙ্ক জুড়ে দিতে পারেন। মধ্যমসারির সফটওয়্যার কোম্পানির জন্য এটা খুব কাজে দেয়। মনে রাখতে হবে, নিয়োগকারী আপনার সিভির পেছনে সর্বোচ্চ ৬ সেকেন্ড সময় ব্যয় করে থাকেন। সিভিতে এমন কিছু থাকতে হবে যাতে এই ৬ সেকেন্ডেই আপনার সম্পর্কে নিয়োগকারী আগ্রহী হয়ে ওঠে কাজেই এতে জন্ম তারিখ, ছবি, রেফারেন্স এসব না দেওয়া ভালো। সাবির  https://app.zety.com/user/cv ঠিকানা থেকে সিভি টেম্পলেট ব্যবহার করেছেন। আপনিও টেম্পলেটটি ব্যবহার করতে পারেন।
সাক্ষাৎকার নিজের সেরাটা উপস্থাপন
গুগল, ফেসবুক, অ্যামাজনের মতো কোম্পানিতে চাকরির জন্য লিঙ্কডিনে সরাসরি সাক্ষাকার দিতে আবেদন করা যায়। এক্ষেত্রে লিঙ্কডিনের প্রিমিয়ার অ্যাকাউন্ট একটি ভালো উপায়। সংশ্নিষ্ট কোম্পানির নিয়োগকারী তথা হায়ারিং ম্যানেজার/রিক্রুয়েটারকে সরাসরি মেইল করা যায়। তবে এক্ষেত্রে রেফারেল থাকলে ভালো। আপনার সিভি দেখে পছন্দ হলে সাধারণত নিয়োগকারী আপনাকে ফোন দেবে। তারা সাক্ষাৎকার গ্রহণ থেকে শুরু করে বেতন থেকে শরু করে সবকিছুই তারা আলাপ-আলোচনা করবে। সাক্ষাৎকারে প্রশ্ন কেমন হতে পারে, কি কি বিষয়ে প্রস্তুতি প্রয়োজন সবই তারা আগেই আপনাকে বলে দেবে। কোনো বিষয়ে প্রশ্ন থাকলে নির্দি্বধায় জেনে নিতে পারেন। আবার অনেক কোম্পানি সিভি বাছাই করে অনলাইনে একটা পরীক্ষা নেয়। এছাড়া গুগল, ফেসবুকের মতো প্রতিষ্ঠানে দুই থেকে তিনটা ফোন স্ট্ক্রিন সাক্ষাৎকার হয়। এটি ৪৫ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা পর্যন্ত হতে পারে। প্রথমে প্রাথমিক পরিচয় পর্ব। এরপর প্রদত্ত সমস্যাগুলো আপনি কীবাবে সমাধান করবেন সেটি জানাতে হয়। বাকি সময়ে দুইটা মতো সমস্যা সমাধান করতে হয়। ফোন স্ট্ক্রিনে উতরে গেলে অনসাইট সাক্ষাৎকার পর্ব। অনসাইটে চার থেকে পাঁচটা রাউন্ড থাকে। প্রত্যেকটাই ৪৫ মিিনট থেকে টানা এক ঘণ্টা পর্যন্ত হয়ে থাকে। এ পর্বে ফোন স্ট্ক্রিনের মতো প্রশ্ন থাকে। কোড করতে হয় হোয়াইটবোর্ডে যদিও ইদানিং গুগলে ক্রোমবুক দেওয়া হয়। ফোন স্ট্ক্রিন এবং অনসাইট সাক্ষাৎকারে ডাটা স্ট্রাকচার এবং অ্যালগরিদম ভিত্তিক সমস্যা থাকে। পাশাপাশি সিস্টেম ডিজাইন ও কালচারাল ফিট বিষযটি জানা থাকা দরকার। প্রশ্নগুলো সাধারণত ছোট ছোট হয় ১০/১৫ লাইনেই কোডিং সম্পন্ন করা যায়। সমস্যা জানার পরে তার সমাধান সম্পর্কে চমৎকার ধারণা দিতে হবে। প্রশ্ন করে সমস্যা সম্পর্কে পরিস্কার হতে হবে। এরপর পরীক্ষক চাইলে কোডিং শুরু করতে হবে। সাক্ষাৎকার পর্বটি বেশ জটিল মনে হতে পারে। এজন্য পরীক্ষামূলক সাক্ষাৎকার বেশি বেশি প্রাকটিস করতে হবে। সাক্ষাৎকার পর্ব শেষ হলে ফোন স্ট্ক্রিনের ক্ষেত্রে একদিন পরেই সাধারণত ফলাফল জানানো হয়। আর অনসাইটের ফল পাওয়া যায় সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যে।

কমেন্ট করুন

...

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top