logo
news image

পরজন্মে সৃষ্টিকর্তাকে বলব আমাকে গোলাপগঞ্জের অধিবাসী করেন

সালাহ উদ্দিন খোকন।।
সময়টা ছিল ২০১৮ সালের ৯ অক্টোবর। প্রায় দুপুর। লন্ডনের বুশ হাউসের ওয়েটিং রুম। গিয়েছি বিবিসি বাংলা বিভাগ পরিদর্শনে। ২৫ বছর যাবৎ বিবিসি শোনার অভ্যাস। তাই লন্ডনে বেড়াতে গিয়ে বিবিসিতে যাব না, সেটা তো হয় না।
বাংলাদেশে তখন বেশ গরম পড়ছিল। অথচ লন্ডনে এসে ভেজা কাকের মতো কুঁকড়ে যাচ্ছিলাম প্রচন্ড ঠান্ডায়। খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে ট্রেনে চেপে বেরিয়ে পড়লাম বিবিসির উদ্দেশে। নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছলাম সেখানে। ওয়েটিং রুমে বিবিসি বাংলা বিভাগের প্রধান সাবির মুস্তাফা ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করছি। সাথে আছেন সব্যসাচী লেখক, গবেষক ও বন্ধু আনোয়ার শাহজাহান।
দীর্ঘ ২৫ বছরের ভালো লাগা ও ভালোবাসার বিবিসিতে যাচ্ছি, এ কারণে মানসিকভাবে ভীষণ উত্তেজনা বিরাজ করছে। রাতে ঠিকমতো ঘুমও হয়নি ওই একই কারণে। অথচ বাসা থেকে বের হয়ে বিবিসিতে পৌঁছানো পর্যন্ত আনোয়ার ভাই আমাকে কোনো কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে তাঁর একটি বিষয় অনবরত বলে চলেছেন। তিনি যে পরিমাণ আগ্রহ নিয়ে বলছেন, ঠিক সেই পরিমাণ মনোযোগ দিয়ে শুনছি না। কোনো সময় যখন জিজ্ঞেস করছেন ‘বিষয়টি বুঝেছেন’? তখন না বুঝেই সম্মতিসূচক মাথা ঝাঁকিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেছি যে হ্যাঁ বুঝেছি। অথচ আমি কিন্তু কিছুই বুঝতে পারিনি, কেননা আমি তো তাঁর কথা মনোযোগসহকারে শুনছি না।
বিবিসিতে ঢুকলাম। সাবির ভাই ভেতরটা ঘুরে দেখালেন। একসময় বাংলা বিভাগের সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। সবাইকে চিনি কিন্তু কখনো দেখিনি। আজ বাংলা বিভাগের সবাইকে দেখে আমি ভীষণ আনন্দিত। দীর্ঘ আলাপের পর ভেতরের কফি হাউসে আমরা তিনজন কপি খেতে খেতে আরো অনেক আলোচনা করলাম।
বিবিসি বেড়ানো শেষ। এবার যাচ্ছি ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে। যেই না বিবিসি থেকে বের হয়েছি, অমনি শুরু হলো আনোয়ার ভাইয়ের সেই আলাপন। তখন আমার মনে হলো, আমি কাজটি ঠিক করিনি। একজন মানুষ, একজন গবেষক, একজন লেখক, আবার তিনি আমার বন্ধু। অথচ সকাল থেকে তাঁর এত আলাপন কিছুই শুনলাম না! কাজটা মোটেও ঠিক করিনি। কিন্তু তিনি যদি বিষয়টা বুঝতে পারেন, তাহলে ভীষণ কষ্ট পাবেন। তাই তাঁর কথার ফাঁকে ফাঁকে শুধু হু হা করার সময় ভাসা ভাসা যেটুকু মনে আছে, সেটুকুর ওপর ডিজিটাল চোরের মতো প্রশ্ন করা শুরু করলাম। এবার দেখি, বিষয়টি জানতে চাওয়ায় তিনি তাঁর বলার আগ্রহ দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিলেন। আমি তখন হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। যাক সারা দিনে আমি যে কিছুই শুনিনি, তা তিনি মোটেও বুঝতে পারেননি। মানির মান আল্লাই রেখেছে।
মানির মান রাখার কথা বলতেই একটি গল্প মনে পড়ে গেল। না বলে থাকতে পারছি না। জনৈক ব্যক্তি বিভিন্ন জনের কাছে হাওলাত করে চলতেন। সব সময় তিনি নিজের এলাকার বাইরে হাওলাত করতেন। পাওনাদারের ভয়ে খুব একটা বাইরে বেরোতেন না। সেদিন ছিল বাদলের দিন। ভাবলেন, বাইরে বেরোনোর জন্য দিনটি নিরাপদ। তাঁর বড় ছেলেকে সাথে নিয়ে পাশের গঞ্জে হাটে গেলেন কিছু কেনাকাটা করতে। কিছুক্ষণ পর ছেলে দৌড়ে হাফাতে হাফাতে বাড়ি এসে হাজির। মা ছুটে এসে ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন, “হ্যাঁরে খোকা, বাপ-বেটা গেলি বাজার করতে। কিন্তু এভাবে দৌড়ে বাড়ি ফিরলি কেন?”
ছেলে মাকে বলল, “গঞ্জের একজন পাওনাদার আমাকে আর বাবাকে ধরে পিটুনি দেয়ার জন্য তাড়া করে। আমাকে ধরতে পারেনি। বাবাকে ধরে কী পিটুনিটাই দিল। আমি এক দৌড়ে বাড়িতে চলে এসেছি। মানির মান আল্লাই রাখে।” এখানে দেখা যাচ্ছে বাঁশের চেয়ে কঞ্চিই বড়।
ফিরে আসি আনোয়ার ভাইয়ের কথায়। কৌশল করে তাঁর কাছ থেকে প্রশ্ন করে যখন পুরো বিষয়টি জানলাম, তখন হতবাক না হয়ে পারলাম না। কেননা, এটুকু জানি যে প্রবাসে যাঁরা থাকেন, তাঁরা সবাই নানা কাজে ভীষণ ব্যস্ত থাকেন। নিজের সংসার আর পরিজনের বাইরে কারো কথা ভাবার সময় তাঁদের খুব কমই থাকে। অথচ তাঁর কাছে শুনছি ভিন্ন সুর। তিনি নিজের চেয়ে তাঁর কমিউনিটির লোকজনের ভবিষ্যৎ চিন্তায় যারপরনাই নিবেদিতপ্রাণ। ভবিষ্যতে ব্রিটেনে গোলাপগঞ্জবাসীর কল্যাণে কী করা উচিত, সিলেটের গোলাপগঞ্জের মানুষের কল্যাণে কী করা উচিত, কীভাবে গোলাপগঞ্জকে সারা বিশ্বের মাঝে আরো পরিচিত করে তোলা যায়, এলাকার শিক্ষার হার বাড়াতে আরো কী করা যায়, সারা দিন শুধু সেই সব আলোচনা।
ব্রিটেনে বেড়াতে এসে ১১ দিন আনোয়ার শাহাজাহান ভাইয়ের বাসায় ছিলাম। এই সময়ে তাঁর সাথে আমার যত কথা হয়েছে, তার প্রায় সবই ছিল গোলাপগঞ্জকে নিয়ে। আর এসব কিছু বাস্তবায়ন করতে তিনি যে সংগঠনের কথা বলছিলেন, সেটার নাম গোলাপগঞ্জ উপজেলা সোশ্যাল ট্রাস্ট (ইউকে)। প্রবাসে মানবকল্যাণে যে এ রকম একটি সংগঠন হতে পারে, সেটা লন্ডনে না গেলে জানতাম না। উচ্চমাধ্যমিক ক্লাসে ‘লাঞ্চন’ গল্পে পড়ার পর ভীষণ ইচ্ছে ছিল শ্যামন মাছ খাওয়ার। আনোয়ার ভাইয়ের বাসায় ভাবির হাতের অসাধারণ সুস্বাদু রান্না শ্যামন মাছ খেতে খেতে ভাইকে জানালাম, আমি তাঁর সংগঠনের সদস্য হতে চাই। তিনি আমাকে জানালেন যে গোলাপগঞ্জের অধিবাসী হওয়া ছাড়া সদস্য হওয়ার সুযোগ নেই; এবং সেটা সংগঠনের সংবিধানে উল্লেখ আছে। আমি জন্মান্তরবাদে বিশ্বাস না করলেও তাঁকে বলে ফেললাম, আবার যদি আমার পুনর্জন্ম হয়, তাহলে সৃষ্টিকর্তাকে বলব তিনি যেন আমাকে গোলাপগঞ্জের অধিবাসী করেন।
এখানে বলা প্রয়োজন, ব্রিটেনে বেড়াতে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন লেখক-গবেষক ফারুক আহমদ ও আনোয়ার শাহজাহান। এই দুজনের প্রতি কৃতজ্ঞতা আমার আজীবনের।
এখন আমি প্যারিসের অধিবাসী। ১৯৯৮ সাল থেকে চাকরির পাশাপাশি আমি বাংলা ভাষায় যেকোনো লেখা সম্পাদনা ও প্রুফ দেখার কাজ করি। কয়েক দিন আগে আনোয়ার ভাই আমাকে অনুরোধ করলেন তাঁদের গোলাপগঞ্জ সোশ্যাল ট্রাস্ট স্মারকগ্রন্থ প্রুফ দেখার জন্য। যদিও পুরোপুরি সম্মানি পাব, তবুও তাঁর অনুরোধ কি আমি না করতে পারি? অনুরোধ রক্ষা করার বিষয়ে আরেকটি গল্প মনে পড়ে গেল। সেটি বলেই আমার লেখা শেষ করব।
ফারুক খান নামের এক যুবক বিয়ের মাস তিনেক পরই চাকরির উদ্দেশ্যে দুবাই চলে যায়। বিয়ের পরপরই নতুন বউ রেখে বিদেশে থাকা কী যে কষ্টের তা প্রবাসীরাই ভালো বলতে পারবে। যা হোক, মোবাইলেই চলছিল বউয়ের সাথে প্রেমালাপ। দুজন দুজনকে ছাড়া এক মুহূর্তও থাকতে পারে না। দুই প্রান্তে দুজনের কানে হেডফোন সব সময় লাগানোই থাকে।
হঠাৎ করেই এক প্রতিবেশী ভাবি একদিন মেসেঞ্জারে ফোন করে ফারুক খানকে জানিয়ে দেয় যে তার বউ পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েছে; এমনকি সেটা তার ভাশুরের সাথে। ফারুক কোনো মতেই বিশ্বাস করতে চাইনি তার বউ তার আপন বড় ভাইয়ের সাথে পরকীয়ায় জড়াতে পারে। ওই দিন বউকে ফোন করে কোনো ভনিতা না করে সরাসরি জানতে চায় ঘটনাটি সঠিক কি না। তার বউ কাঁদতে কাঁদতে স্বীকার করে যে সে যা যা শুনেছে তার সবই সঠিক। ক্ষোভে-দুঃখে ফারুক তার বউয়ের সাথে ফোনালাপ বন্ধ করে দেয়। সিদ্ধান্ত নেয়, দ্রুত সে বাড়ি যাবে এবং এর একটা হেস্তনেস্ত করেই সে তার বউকে তালাক দেবে।
দুই মাস পর ছুটি নিয়ে ফারুক বাড়িতে ফেরে। গ্রামের মুরব্বিদের কাছে বিচার দাবি করে তার বউ ও বড় ভাইয়ের অবৈধ কার্যকলাপের। যথারীতি শালিস বসে। ভরা মজলিসে গ্রামের মাতব্বর জিজ্ঞেস করেন, “বউমা, তোমাকে বিয়ে করেই তোমার স্বামী বিদেশে চলে যায় টাকা ইনকামের জন্য, যাতে তোমাকে নিয়ে ভবিষ্যতে সুখে ঘর করতে পারে। আর সে বিদেশে যেতে না যেতেই তুমি তোমার পিতৃতুল্য ভাশুরের সাথে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়লে। তুমি তো জানো এ কারণে তোমার স্বামী তোমাকে তালাক দেবে। তার পরও তুমি এ রকম কাজ কেন করলে?”
লাজুক লাজুক ভঙ্গিতে ফারুকের বউ মাতব্বরকে উদ্দেশ করে বলল, “চাচা মিয়া, বিয়ের আগেই আমার শ্বশুর মারা গেছে। বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই আমার স্বামী আমাকে রেখে বিদেশে চলে যায়। এ বাড়িতে শ্বশুর বলেন, বাবা বলেন, অভিভাবক বলেন সবই আমার ভাশুর। তাকে আমি যেমনি শ্রদ্ধা করি, তেমনি মান্য করি। তিনি একদিন রাতে আমাকে ওই প্রস্তার দেন। আমি কি তার কথা কখনো অমান্য করতে পারি? তার কথা অমান্য করলে আমার যে পাপ হবে!
* সালাহ্ উদ্দিন খোকন: এডিটর, প্যারিস টাইমস, ফ্রান্স।

কমেন্ট করুন

...

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top