logo
news image

ইলিশ নামচা

প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম।।
গত সাত দিন যাবৎ পত্রিকার পাতা উল্টাতেই বড় বড় ইলিশের ছবি দেখে ইলিশ রসনা পূজারীদের চোখ সেগুলোতে আটকে গিয়ে চকচক করে উঠছে। যাদের ইলিশে অ্যালার্জি, অর্থাৎ ইলিশ মাছের নাম শুনলেই শরীর চুলকায়, খেলে চামড়ায় ফুসকুড়ি উঠে, চোখ লাল হয়ে মাথাভারী হয়ে কাজে মন বসাতে পারেন না তাদেরও কাউকে দেখেছি পত্রিকার পাতার ইলিশের ছবিগুলো দেখে সংবাদটি মনোযোগ সহকারে পাঠ করছেন। এভাবে কোনো মাছ যদি মানুষের মন কাড়তে পারে তবেই তো সেটা জাতীয় মাছ!
ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ। এখন সে জিআইএস পজিশন লাভ করে বিশ্ব দরবারে বিশেষ ব্রান্ডিং মর্যাদা পেয়েছে। আমাদের খাদ্য-কৃষ্টির বিশেষ পরিচিতিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে রুপালী ইলিশ। প্রতিবছর বর্ষাকালের শেষে শুরু হয় ইলিশের মৌসুম। ভাদ্রমাসের এ সময়টাতে নদ-নদী, শাখানদীর পানিতে ভাটির টানে স্রোতের তীব্রতা থাকে। ইলিশ মাছের প্রাকৃতিক খাবারের প্রাচুর্য থাকায় তারা ঝাঁকে ঝাঁকে বিচরণ করতে আসে এবং জেলেদের জালে ধরা পড়ে। দশ বছর আগে এ সময় মাত্র ২১টি উপজেলার নদ-নদীতে ইলিশেরা বিচরণ করত। এখন ১২৫ টি উপজেলার নদ-নদীতে ইলিশেরা বিচরণ করা শুরু করেছে।
কারণ, বর্তমানে ইলিশের অনেকগুলো অভয়াশ্রম গড়ে উঠেছে। এছাড়া আশ্বিনের বড় পূর্ণিমার দিনসহ আগের ১৭ দিন ও পরের চারদিনসহ মোট ২২ দিন ইলিশ ধরা, বিক্রয়, পরিবহন, মজুত ও বিনিময় নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। মা ইলিশের প্রজননে সহায়তা, জাটকা রক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলে উৎপাদন আরও ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে শুরু করবে। সাগর-নদীতে ইলিশ ধরা ও পাচারের ওপর নজরদারী বাড়ায় এর উৎপাদন বেড়েছে বলে অনেকে মনে করেন। তবে নির্দিষ্ট সময় অন্তর ইলিশ ধরা হলে ওরা বড় হবার সময় পাবে ও উৎপাদনের পরিমাণ বেড়ে যাবে বলে ইলিশ বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন। এ বছর বাজারে বড় আকারের ইলিশের দেখা মিলছে। রুপালী ইলিশে বাজার সয়লাব হয়ে ফেরী করে পাড়া-মহল্লায় বড় বড় ইলিশ বিক্রি করতে দেখা যাচ্ছে।
কিন্তু দাম সাধারণের নাগালের মধ্যে নেই। বাজারে কোনো পণ্যের প্রাচুর্য দেখা দিলে তার দাম কমে যায়। কিন্তু মৌসুম শুরুর বেশ কিছুদিন গত হলেও এবং ইলিশে বাজার সয়লাব হয়ে গেলেও বিক্রেতারা মোটেও দাম কমাচ্ছেন না। এর কারণ শাক-সবজির মতো ইলিশেরও বহু হাত বদল হয়ে বাজারে আসা। এভাবে হাত বদল ও পরিবহন, চাঁদাবাজি শেষে শহুরে মানুষের নাগাল আসতে আসতে ইলিশের মূল্য না কমে বরং আরও বেড়ে যাচ্ছে।
বড় ইলিশ সচরাচর দেখা যায় না। বছরের এ সময়টাতে এর আবির্ভাব ঘটে। তাই অনেক ইলিশ প্রিয় মানুষ ব্যক্তিগতভাবে এই পছন্দের খাদ্যটিকে বড় ডিপ ফ্রিজ কিনে সংরক্ষণ করছেন। অনেক হোটেল-রেস্টুরেন্ট মালিক তাদের ব্যবসায়িক প্রয়োজনে বড় বড়টি কিনে ডিপ ফ্রিজে ভরিয়ে বেশি দামে বিক্রি করেন। এজন্যেও সরবরাহ বাড়লেও ইলিশের দাম চড়া। এছাড়া পার্শ্ববর্তী দেশে জামাই ষষ্ঠী ও সামাজিক অনুষ্ঠানে ইলিশের ব্যাপক ব্যবহার করা হয়। সেখানে নিজেদের ইলিশের উৎপাদন কম, আমদানিও কম কিন্তু ব্যাপক চাহিদা আছে। সুতরাং নদী-সমুদ্র ও স্থল সীমান্তে ইলিশের চোরাচালানি হয়ে অবৈধভাবে বেশি আয় করার হাতছানি থাকায় অসাধু লোকেরা ইলিশ পাচারের কাজে লিপ্ত হয়ে পড়েন। এজন্যেও বেশি ধরা পড়লেও বা সরবরাহ বাড়লেও আমাদের স্থানীয় বাজারে ইলিশের ভরা মৌসুমেও দাম বেশ চড়া।
তবে সুখবর হলো- বড় ইলিশ নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। এখনো কোরবানির বড় মোটা তাজা গরুর মত ইলিশকে কৃত্রিম উপায়ে মোটা-তাজা করার সংবাদ পাওয়া যায়নি। যদিও সমুদ্রের বড় ইলিশের স্বাদ নদীর ছোট ইলিশের মতো নয়।
এ বছর কোরবানির সময় বাজারে বড় গরুর চাহিদাহীনতা নিয়ে দুরবস্থার সংবাদগুলো খুব ব্যথিত করেছিল। কারণ বর্তমানে ভেজাল ও নকল খাদ্য ও পণ্যসামগ্রীর ভিড়ে আমাদের খাদ্য পছন্দের তালিকায় এখনও দেশি মুরগি, ছোট মাছ, আসল বা খাঁটি দুধ ইত্যাদি ভোক্তা মনে জায়গা দখল করে আছে। দেশিটাই সবার পছন্দ। কারণ, দেশীতে স্বাদ বেশি। তাই ক্রেতাগণ ইনজেকশন দেয়া কৃত্রিমভাবে মোটা তাজা করা গরু না কিনে ছোট ও মাঝারি সাইজের গরুর দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন। তাই বড় গরুর ব্যবসায়ীরা দাম না পেয়ে হতাশ হয়ে কেউ কেউ হাটে বসেই কান্নাকাটি করেছেন। ঈদের শেষ হাটের দিনে খামারিরা বড় গরু কম দামে বিক্রি করে লোকসান গুণে বাড়ি ফিরে গেছেন।
কিছুদিন পূর্বে ইলিশের ঘাটতি মোকাবেলায় বিদেশ থেকে চন্দনা, সার্ডিন ইত্যাদি ইলিশ সদৃশ সামুদ্রিক মাছ আমদানি করা হয়েছিল। কিন্তু সেগুলো শক্ত ও ভিন্ন স্বাদের হওয়ায় একবার কিনে প্রতারিত হয়ে মানুষ আর দ্বিতীয়বার কিনতে আগ্রহ দেখায়নি।
আধুনিক হাইব্রিড, জিএম ও ইএম খাদ্যের যুগে আমাদের দেশে কোরবানির বাজারে এ বছর দাম কমানোর পরেও বড় গরুর চাহিদা নিম্নমুখী ছিল। অথচ ইলিশের এবার ভরা মৌসুমে বাজারে ব্যাপক সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও বড় ইলিশ মাছের দাম মোটেও কমেনি। কারণ, ইলিশকে কৃত্রিম উপায়ে স্বাদ-গন্ধ অটুট রেখে বড় করার প্রযুক্তি এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। ইলিশ মাছকে যেহেতু এখনও প্রযুক্তি দিয়ে পরিবর্তন করানো সম্ভব হয়নি সেহেতু বড় আকারের ইলিশ দেখলে সবাই আগ্রহ প্রকাশ করেন। এ কারণে এর দামও বেড়ে যায়। দেশে বিদেশে যেখানেই বাঙালী বসবাস করুন না কেন সেখানেই ইলিশের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তাই প্রাকৃতিক জলাশয়ে জন্ম নেয়া ইলিশের স্বাদ-গন্ধ এখনও অটুট রয়েছে। আমরা প্রকৃতির মূল্যবান দান এই রুপালী ইলিশ সম্পদকে প্রকৃতিতে নিজ স্বাদ-গন্ধ অটুট রেখে বড় হতে দিতে চাই। কথায় বলে- 'নদীর জল ঘোলা ভালো, জাতের মেয়ে কালো ভালো'। অর্থাৎ নদ-নদীতে উৎপাদিত স্বাদের দেশি ইলিশ ছোটই ভালো। হাজার কেজি ওজনের বড় গরুর মতো ল্যাবরেটরিতে ১০-২০ কেজি ওজনের বড় ইলিশ বানালে প্রজাতি ধ্বংস হয়ে জীববৈচিত্র্য নষ্ট হবে, স্বাদে মরবে, দামেও নড়াচড়া করবে।
বর্তমানে বাজার ও পাড়া-মহল্লায় সয়লাব হয়ে যাওয়া ইলিশের দাম যদি বছরের অন্য সময়ের মত পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণের অভাবে চড়াদামের আগুনে পুড়ে যায় তাহলে স্বল্প আয়ের মানুষের আর ইলিশের স্বাদ গ্রহণ করা সম্ভব হবে না। ওষুধ দিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে গরু বড়, মোটা-তাজা করে বিক্রি করতে না পেরে খামারিরা যেমন হাটে বসে কেঁদেছে- খাঁচা ভর্তি বড় বড় চকচক ইলিশ দেখে চড়া দাম শুনে সাধারণ মানুষ যেন ফুলিশ বা বোকা হয়ে কষ্ট না পান সেদিকে বাজার দর নিয়ন্ত্রকদেরকে আশু নজর দিতে হবে বৈকি?
* প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

কমেন্ট করুন

...

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top