logo
news image

শতবর্ষে শায়েস্তাগঞ্জ হাই স্কুল

তৌহিদ চৌধুরী।  ।  
১৯৮৫-১৯৯০ স্মৃতিময় পাঁচটি বছর। প্রাণের শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়। স্কুল ও শিক্ষকরা আগেরই পরিচিত বাবার কারণে। বাবা আবদুন নূর চৌধুরী দীর্ঘদিন থেকেই স্কুলে প্রধান শিক্ষক। ভর্তি হলাম ক্লাস সিক্সে। নতুন বন্ধু-বান্ধব পেলাম। শুরু হলো নতুন অধ্যায়ের। প্রথম থেকেই অনেকটা চাপ। অন্য ভাইয়েরা ভালো রেজাল্ট করেছে। আমাকেও ভালো করতে হবে। তবে সমস্যাটা অন্য জায়গায়। কড়া শাসনের বাবার অধীনে সবাই ছাত্র। বন্ধুরা কখন আবদুন নূর চৌধুরীর কড়া শাসনের বেত্রাঘাতগ্রস্ত হয়। বেশিদিন যায়নি, আশঙ্কা সত্যি হলো। নাম মনে পড়ছে না- কোনো এক বন্ধু নূর চৌধুরীর বেতের শাসনে কান্নাগ্রস্ত। মার খেত অন্যজন, আর ভয় হতো আমার। কিভাবে ওই বন্ধুকে সান্ত¦না দেব। আরেকটি ভয় সবসময় কাজ করত। দুষ্টুমির বয়স- দুষ্টুমি তো করতেই পারি। কিন্তু দুষ্টুমিও করা যাবে না। কারণ কোনো শিক্ষক যদি দেখে ফেলেন- তাহলে কি করে মুখ দেখাবো আর সেটা যদি আব্বার কানে যায়। সেজন্য সব সময় সতর্ক থাকতে হতো। ওই সময়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক কাজী খালেক স্যার ছাড়া প্রায় শিক্ষকই আব্বার ছাত্র ছিলেন।
ওই সময়ের শিক্ষকদের মধ্যে ছাত্রদের প্রতি যে মমত্ববোধ আর শিক্ষদের প্রতি ছাত্রদের শ্রদ্ধা ছিল- সেটাই ছিল শিক্ষার প্রতিফলন। মনে পড়ে ওমর আলী স্যার, নৃপেন্দ্র স্যার, তাহের আলী স্যার, রহিম আলী স্যার, বিপদবরণ স্যার, মহেশ্বর স্যার, মওলানা তাহের আলী স্যার, খালেক সার, জলিল স্যার, পণ্ডিত স্যার, শিশির বাবু স্যার, তোফাজ্জল স্যার, কুতুব আলী স্যার, এখলাছুর রহমান স্যার, ফরিদ স্যার ও নবীন শিক্ষক ফজলুল হক স্যারের কথা। এদের মধ্যে জলিল স্যার, মওলানা তাহের আলী স্যার ও বিপদবরণ স্যার ছাড়া ছাত্ররা অন্যদের তেমন ভয় পেত না। জলিল স্যার স্কাউট শিক্ষক থাকার কারণে সবসময়ই আমার কাছে পুলিশের মতো মনে হতো।
সব শিক্ষকের আলাদা একটা পড়ানোর ধরন ছিল। ওমর আলী স্যার সবসময়ই হ্যাসরস দিয়ে পড়ানোর চেষ্টা করতেন। আমরা স্যারের পড়ানোর জন্য হাস্যরসাত্মক অংশটুকুই উপভোগ করতাম। নৃপেন্দ্র স্যার বাংলা পড়াতেন এবং কখনো কারো প্রতি রাগ করতে দেখিনি। এমন মানুষ আসলেই দুর্লভ। তাহের আলী স্যার বাংলা পড়াতেন এবং তাকেও কখনো রাগতে দেখিনি। খালেক স্যারের ইংরেজি পড়ানোর কথা এখন মনে পড়ে। কিছু নির্দিষ্ট বাক্য ব্যবহার করতেন যা আমাদের সবার মুখস্থ হয়ে যেত। বিপদবরণ স্যারের অংক ক্লাসের সময় আসলেই আতঙ্কে থাকতাম তবে অংক পারলে খুব স্নেহ করতেন। মওলানা আবু তাহের স্যারের ক্লাসে আমাকে একটি বাড়তি কাজ করতে হতো সেটা হলো- যারা নামাজে যায়নি, তাদের নাম জমা দিতে হতো। কি যে বিপদ! বন্ধুদের শত্রু হতে হতো, খারাপই লাগত, স্যার যখন বেত দিয়ে মারতেন। এখলাছ উদ্দিন স্যার নতুন এসেছেন। বায়োলজি পড়াতেন। একদিন ক্লাসে বললেন, আইক্কা (এঁকে) দিলে বুঝবায়। পিছন থেকে কে যেন বলে উঠলো আইসা দিলে বুঝবায়। আর যায় কোথায়, সে যে কি পিঠুনি আজও ভুলতে পারিনি।
সে সময় সব স্যারের কাছেই ভালো ছাত্রদের কদর ছিল। ভালো ও ভদ্রলোক ছাত্র স্যারদের মার খেয়েছে বলে মনে নেই। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক অত্যন্ত মধুর ছিল। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে আমরা ছিলাম অগ্রগামী। আর এর সবই সম্ভব ছিল শিক্ষকদের প্রতি ছাত্রদের শ্রদ্ধা ও বাবা-মায়েদের আস্থা।
তবে একটি ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য দরকার অভিজ্ঞ ও দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষকমণ্ডলী ও তা পরিচালনার জন্য সঠিক নেতৃত্ব তথা একজন সুযোগ্য প্রধান শিক্ষক।
আমাদের সময় তথা দীর্ঘকাল শায়েস্তাগঞ্জ হাই স্কুল সুনামের সাথে পরিচালিত হচ্ছিল আবদুন নূর চৌধুরীর নেতৃত্বে। তবে এর অবদান শুধু তার একার নয়। তার অধীন সুযোগ্য শিক্ষকণ্ডলী কৃতিত্বের অংশীদার। প্রধান শিক্ষককে যেমন জ্ঞানসম্পন্ন ও সুযোগ্য হতে হয়, সেই সাথে তাকে তার নিজের মতো কাজ করতে দিতে হয় একটি স্কুলকে ভালো অবস্থানে নিয়ে যেতে। আর সেটি সম্ভব যখন রাজনৈতিক ও অন্যান্য প্রভাবমুক্ত হয়ে প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষকণ্ডলী কাজ করতে পারবেন। প্রধান শিক্ষক এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করবেন, যার ফলে অভিভাবকদের আস্থা অর্জন করতে পারবেন।
শতবর্ষে পদার্পণ করেছে আমাদের ঐতিহ্যবাহী স্কুল। আমরা যে উৎসাহ নিয়ে শতবর্ষ উদযাপন করতে যাচ্ছি- আসুন সবাই মিলে সে উৎসাহ ধরে রেখে স্কুলের পুরনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে ব্রত হই। স্কুলের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত যারা স্কুলের জন্য বিভিন্নভাবে কাজ করেছেন- সবার প্রতি রইল কৃতজ্ঞতা।
* তৌহিদ চৌধুরী: প্রাক্তন ছাত্র, লন্ডন, ইংল্যান্ড (১৯৮৫-১৯৯০)

কমেন্ট করুন

...

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top