logo
news image

চাটমোহরের ঐতিহ্য হান্ডিয়াল

আবদুল মান্নান পলাশ।  ।  
পাবনার চাটমোহর উপজেলার শেষ সীমানার ইউনিয়নটির নাম হান্ডিয়াল। তাড়াশ উপজেলার নওগাঁহাট লাগোয়া এই জনপদটির স্থাননাম একদা ছিলো হাঁড়িয়াল। সে গল্প ইষ্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানী আমলের। তখন চাটমোহর নয়, এই হাঁড়িয়ালই ছিলো থানাকেন্দ্র। ১৮৪৫ খৃষ্টাব্দে ইষ্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানীর থানা ছিলো এটা। তখনো চাটমোহর থানা ছিলো না। ১৯৬৫ সালে এখানে একটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন করা হয়। হান্ডিয়ালে এখনো আছে শেঠের বাংলো। জগন্নাথ মন্দিরসহ নানা দর্শনীয় প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন। পাঠান রাজত্বকালে করতোয়া নদী তীরের হিন্দু বর্ধিষ্ণু জনপদটি এতোইটাই উন্নত ছিলো যে, হান্ডিয়াল বাজারের এক দালানের ছাদে উঠে সব দালানে ঘোরা যেতো।
কোম্পানী আমলে হান্ডিয়াল ছিলো প্রাচীন ও উন্নত বন্দর। আর শাহান শাহে সম্রাট আকবর এর রাজত্বকালে এখানে একজন সুবাদার ও একজন কাজী নিযুক্ত ছিলেন। শাহী সুবেদারের অধীনে ছিলো ৫০০০ হাজার মুঘল সেনা। তারা খানমরিচ, মরিচপুরান, সুবুদ্ধিমরিচ, কমলমরিচ কেল্লায় পাহারায় নিয়োজিত ছিলো। এ সময়ই হান্ডিয়াল ব্যবসাকেন্দ্র হিসাবে গড়ে ওঠে। পরে কোম্পানী আমলে সেটার আরও শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। রেশম ও সুতী কাপড় কেনাবেচার জন্য এখানে কোম্পানীর একটি কুঠি ছিলো। সমগ্র পাক-ভারতে যত রেশম উৎপন্ন হতো তার পাঁচ ভাগের চারভাগ মিলত এই হান্ডিয়াল বন্দরে।
এই হান্ডিয়াল হতেই ইংল্যান্ডসহ অন্যান্য দেশে প্রচুর তুলা ও রেশমী বস্ত্র রপ্তানি হতো। পাবনার জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট মিঃ ডান্লপ্ একবার হান্ডিয়াল শিকারে এসে বলেন, হান্ডিয়ালের নাম ইংল্যান্ডের ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর রোজনামচায় লেখা আছে। সে সময়েই হান্ডিয়ালের বিঘা প্রতি জমির খাজনা ছিলো ৬০ টাকা। তখন এখানে ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের আধিক্য এতোটাই ছিলো। জনপদটিতে নানা সম্প্রদায়ের মানুষের সম্মিলন ঘটেছিলো সেই সময়টাতে। তন্তুবায়, গোপবনিক, গোয়ালা, নাপিত, তিলি, বৈশ্যসহ আরও অনেক সম্প্রদায়। হাজার ঘর তাঁতি আর সাত শতাধিক গোয়ালা(ঘোষ)বাস করতো এই হান্ডিয়ালে। তাদের ছিলো দুধ দইয়ের কারবার। আরও ছিলো একহাজার বলদা ঘোষের বাস। তারা বলদের সাহার্যে বোঝাবহন করতেন।
আর এখানকার হিন্দু সম্প্রদায় ছিলেন ধনিক শ্রেণীর। তাদের সময়েরই জগন্নাথ মন্দির টি এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। হান্ডিয়ালে আছে হরেক রকম নামের পাড়া। যেমন- পাইকপাড়া, কাজীপাড়া, চৌধুরীপাড়া, মিঞাপাড়, ঘোষপাড়া, তাঁতিপাড়া, বাজারপাড়া, নিকারীপাড়া, গনিমিয়ারচক, কন্নিপাড়া, কোনাইপাড়া, বাকালিপাড়া, হাজরাপাড়া, পোদ্দারপাড়া, মুচিপাড়া, সুতারপাড়া। এখানে ৫০ টি পুস্করনী ও জলচ্ছত্র রয়েছে। এলাকাটির যে কোন স্থান খঁড়লে এখনো বড়বড় এটর টুকরো পাওয়া যায়। রয়েছে অতীতের বহু হিন্দুর্ধমীয় স্থাপনা। যেমন-ঘোষপাড়ায় গোপীনাথের মন্দির, পোদ্দারপাড়ায় গোপীনাথের বিগ্রহ মন্দির, সাহাপাড়ায় দোলমঞ্চ, শেঠের বাংলা প্রভৃতি। ১২৯৪ বঙ্গাব্দের এক প্রলংকরী ভূমিকম্পে এই প্রষিদ্ধ জনপদটির অধিকাংশ স্থাপনা নিঃচিহৃন হয়ে যায়। যার কিছু এখনো সে সময়ের সাক্ষ্য বহন করছে।
এই হান্ডিয়াল পরগনার সীমানা ছিলো- উত্তরে বাঘলবাড়ী, দক্ষিনে নিমাইচড়া, পূর্বে খানমরিচ ও পশ্চিমে ছাইকোলা পর্যন্ত। এছাড়া চাটমোহরে তাড়াশ এলাকার আরও মহাল হান্ডিয়াল জমিদারীর অন্তভূক্ত ছিলো। হান্ডিয়ালের ভক্তরাম সরকার, শিতলাইয়ের মৈত্র, পাটুলির তলাপাত্র, গুনাইগাছার মজুমদার, কাশিমপুরের রায় বাহাদুর, পাশ্বডাঙ্গার শাহ চৌধুরী ও বাবু শম্ভুনাথ, মেদিনীপুরের ইংরেজ কোম্পানী হান্ডিয়াল পরগণার জমিদার ছিলেন। হান্ডিয়ালের পাইকপাড়ার বুড়াপীরের মাজার, শেঠের বাংলা, জগন্নাথ মন্দির দেখতে এখনো অনেক মানুষ আসেন। চাটমোহর উপজেলা সদর থেকে ১৫ কিমি উত্তরে, তাড়াশ থেকে ১২ কিমি দক্ষিনে ও বড়ালব্রীজ ষ্টেশন থেকে ১২ কিমি দূরে বাংলার ঐতিহ্যবাহী হান্ডিয়াল এলাকাটির এখন যোগাযোগ অনেক উন্নত হয়েছে। বিশেষ করে বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়ক নির্মানের পরে এখন সেখান মানুষ চাটমোহর সদরের মানুষদের আগেই ঢাকা যেতে পারছে।
তথ্যসূত্র: রাধরমন সাহার জিলা পাবনার ইতিহাস, প্রমথনাথ বিশীর চলনবিলের ইতিহাস, অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ এর চলনবিলের ইতিকথা ।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top