logo
news image

অর্জুনপাড়া ইতিহাস পর্যালোচনা

সাদ আহমেদ।  ।  
নাটোর জেলার চৌহদ্দিতে লালপুর উপজেলার একটা ছোট গ্রামের নাম অর্জুনপাড়া। জমি-জমার পুরাতন রেকর্ডপত্রে মৌজার নাম আছে অর্জুনপাড়া। গ্রামটি ছোট হলেও মৌজা হিসেবে অর্জুনপাড়া অনেকটাই বড়। অন্যান্য গ্রামের নামের মতোই অর্জুনপাড়া নামটি হিন্দু নামানুসারে একটি প্রাচীন গ্রাম। তাই অর্জুনপাড়া নামের উৎস রহস্যে ঘেরা।বাংলাদেশে বহু গ্রাম বা স্থান ব্যক্তি বিশেষের নামে যেমন হয়েছে, তেমনি অনেক নামের বুৎপত্তিগত অর্থ, কারণ বা সঠিক ইতিহাসও খুঁজে পাওয়া যায় না। কোন ‘ব্যক্তি অর্জুন’ হতে (যেমন অর্জুন দা) অর্জুনপাড়ার নামকরণ হয়ে থাকলে, সেই ব্যক্তি সম্পর্কে কিছু কাহিনী, মিথ বা লোক কথা ইত্যাদি এলাকায় প্রচলিত থাকত। অন্যদিকে, ঈশ্বর, স্রষ্টা, প্রভু প্রভৃতি অর্থে কিংবা বিশেষ কোন ধর্মীয় পবিত্র বা পূজ্য স্থান হিসেবে এর নামকরণ হয়ে থাকলে, তার কোন না কোন নিদর্শনাদি যেমন, পুরনো মন্দির, ধর্মস্থান ইত্যাদি থাকে।কেননা, মানুষ অন্য কিছু ত্যাগ করলেও, ধর্মীয় কোন স্থান, নিদর্শন বা চিহ্নাদি ত্যাগ তো করেই না, বরং তা সযত্নে সংরক্ষণ করে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের অবহেলার কারণে এখানকার কোন ইতিহাস সংরক্ষণ না থাকলেও এখানে যে জমিদার বা এই জাতীয় ডিহি, থানা বা মহল বা পরগণাদারের রাজবাড়ি বা মহলবাড়ি যে ছিল এবং সেখানে ব্যাপক আকারে পুজা-পার্বণ যে হতো এ বিষয়ে সন্ধেহ নাই। কারণ স্থানীয় পুরাতন মানুষদের সাক্ষ্য অনুযায়ী সেখানে পুকুরের ধারে তারা মন্দির এবং সেখানে পুজা-পার্বণ হতে দেখেছেন। বর্তমানের সেখানকার প্রাচীন আমলের পুকুর বা পুস্করিনীগুলিও তার জীবন্ত সাক্ষী। তাছাড়া পুঠিয়ার পাঁচ আনি জমিদারের একজন বড় জোতদার প্রজা ব্রিটিশ কোম্পানীর নীলচাষ বিরোধী আন্দোলনের স্বক্রীয় সদস্য, তৎকালীন আরবার কাচারীর অধীন বিলশলিয়া গ্রামের ফয়েজ উদ্দিন মোল্লা (১৮৬১-১৯৬৬) বাল্যকালে অর্থাৎ উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে অর্জুনপাড়া মৌজার সান পুকুর,  ‘মহল পুকুর’ ও ‘খিড়কী দোয়ার পুকুর’ সংলগ্ন প্রাচীন স্থাপনার ধ্বংশাবশেষ এবং হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদি প্রত্যক্ষ করেছেন। সে সময় ইট দুর্লভ  থাকায় তা ব্যাপক হারে অপব্যবহার ও চুরি হয়ে যায়। এ তথ্য তাঁর দুই সন্তান মরহুম জাফর উদ্দিন মোল্লা (১৯১৪ -১৯৮৬) ও আব্দুল জলিল মোল্লা (১৯১৬-২০১১) সাহেবদ্বয় ছাড়াও সমকালীন প্রাচীন লোকদের কাছ থেকে পাওয়া। বর্তমানে জীবিত মরহুম জাফর উদ্দিন মোল্লার সহধর্মিনী ফাতেমা খাতুন (৯৬) এবং অর্জুনপাড়া গ্রামের মরহুম মহরর খাঁ’র সন্তান মকছেদ আলী খাঁ (৯৫) অনুরুপ বর্ণনা দিয়েছেন।এখন বিরানভূমি হলেও বর্তমান ভূইয়াপাড়া মাঠে ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দ অবধি সেখানে হিন্দু বসতি ছিল। ১৯৪৩ সালে কলেরা রোগের ব্যাপক প্রাদূর্ভাব হওয়ায় প্রাণভয়ে মানুষ বসতি পরিবর্তন করে পার্শ্ববর্তী অন্যত্র অঞ্চলে চলে গেলে এলাকাটি জনমানবহীন মাঠে পরিনত হয়। কাজেই অর্জুনপাড়ায় অতি প্রাচীন ঐতিহাসিক স্থাপনা ছিল এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। যদি এটি মোঘল আমলে বা বারোও ভুঁইয়া যুগে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে, তাহলে মুঘল আমলে প্রতিষ্ঠিত অন্যান্য স্থাপনার মতো এটিও এতো অল্প সময়ে ধ্বংশ হয়ে যাবে তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। কাজেই এখানকার  স্থাপনা মোঘলপূর্ব  প্রাচীন যুগের। সঠিক তথ্যে ও উপাত্তের অভাবে যুক্তিগ্রাহ্য ইতিহাস নির্ণয় করতে আমাদের অত্র অঞ্চলের ইতিহাসের অনেক বিষয়ই আলোচনার দাবী রাখে।            
সাধারণত কোনো গ্রাম বা স্থানের নামের সাথে পুর, নগর, গঞ্জ, পাড়া, হাট  ইত্যাদি দেখা যায়। ‘পুর অর্থে  গ্রাম বা ঘন বসতিপুর্ণ অধিক সংখ্যক মানুষের বসবাসের স্থান বুঝায়। পুর’র অন্য অর্থ গৃহ; অন্তঃপুর বা গৃহাভ্যন্তর। লালপুরে এ ধরনের অনেকগুলি গ্রাম আছে।যেমন, রামকৃষ্ণপুর, গোপালপুর, বৈদ্যনাথপুর, কেশবপুর, রায়পুর, গোসাইপুর, মহেশপুর, শিবপুর, বিজয়পুর, বিষ্ণুপুর, রঘুনাথপুর, রামনাথপুর ইত্যাদি। কবি কঙ্কন’র চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে দেখা যায়- আইসে চড়িয়া তাজী, সৈয়দ মোঘল কাজী, খররাতে বীর দিল বাড়ী। পুরের পশ্চিম পাট, বলায় হাসন হাটি, একত্র সবার ঘর-বাড়ী।।’গঞ্জ’ শব্দটি ফারসি ‘গেন্জ’ ভাষা হতে আগত; যার অর্থ ‘শস্যাদি বেচাকেনার স্থান’ অর্থাৎ গোলা, হাট বা বড় বাজার।এই গঞ্জ ছোট বাজার বন্দর হতে পারে আবার বৃহত্তর বাজার হতে পারে। যেমন, মীরগঞ্জ, হোসেনীগঞ্জ, কাদিরগঞ্জ, শিবগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ ইত্যাদি।      
আর প্রাচীনকালে সম্ভবত ‘গ্রাম’ কথাটির ধারণা আজকের মত ছিল না। তখন গ্রাম বুঝাতে ‘পাড়া’ বোঝাতো। আর সে পাড়া পাল আমলে গ্রামের অর্ধেক অংশকে ‘পাটক' বলা হত। পাল পরবর্তী যুগেও আমরা 'গ্রাম'কে ‘পাটক’ বা 'পাড়ায়' বিভক্ত হতে দেখি। পাটক অর্থ পাড়া। যেমন, তলপাটক অর্থ তলপাড়া, ভট্টপাটক হল ভাটপাড়া এবং মধ্যপাটক অর্থ মধ্যপাড়া ইত্যাদি। সম্ভবত আধুনিক পাড়ার উৎপত্তি ‘পাটক' থেকে হবে।আবার ‘পাড়া গাঁ’ বলতে পল্লী গ্রাম বুঝায়। প্রাচীনকালের মানুষ পেশাগত কারণেই পারিবারিকভাবে একটি মহল্লাতে বসবাস করতে অভ্যস্ত যা পাড়া নামে এই অর্থে অর্জুনপাড়া অর্থ অর্জুনের গ্রাম, ঈশ্বরপাড়া অর্থ ঈশ্বরের গ্রাম, ভাটপাড়া অর্থ ভট্টদের গ্রাম ইত্যাদি। অর্থাৎ ব্যক্তির নামের সাথে পাড়া বা গ্রামের নামকরণ হত। যেমন, ঈশ্বরপাড়া, সাঁঈপাড়া, মিল্কীপাড়া, দাসপাড়া, মুচিপাড়া, ধোপাপাড়া, ঘোষপাড়া, ধনঞ্জয়পাড়া, মিশ্রিপাড়া ইত্যাদি। আবার, হিন্দু নাম থাকার পরেও মুসলমানদের আগমনে সেখানকার অঞ্চলগুলির নাম মুসলিম নাম ধারন করেছে। উদাহরণস্বরুপ-দরবেশ শাহ মখদুম এর সময়ে তার আস্তানা প্রতিষ্ঠা ও পরে সমাধিস্থ হবার পর সে স্থানের নামকরণ হয় দরগাপাড়া। অন্যত্র মখদুম নগর, সুলতানপুর ইত্যাদি মুসলিম নামে গ্রামের নামকরণ হয়। অস্টাদশ শতকে ১৭৪২ খ্রিষ্টাব্দে নবাব মুর্শিদকুলী খানের আমলে বর্গী বা মারাঠা আক্রমনের কারণে অনেক মুসলমান তৎকালীন রাজধানী মুর্শিদাবাদ ছেড়ে রাজশাহীতে এসে বসতি স্থাপন করে।পাঠানপাড়া, শেখপাড়া, হোসেনীগঞ্জ, সেপাইপাড়া, হাতেম খাঁ, কাদিরগঞ্জ ইত্যাদি পাড়াতে যে পাঠান, সেপাই, শেখ প্রভৃতি পদ-পদবীতে  লোক বাস করতো তা এতে প্রকাশ পায়।তেমনি হোসেনিগঞ্জে যে শিয়াদের বাস ছিল তা নামেই ধারণা করা যায়। কিন্তু অর্জুনপাড়াতে মুসলিম প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হলে গ্রামগুলির হিন্দুয়ানী নামকরণ নিশ্চিতভাবেই পরিবর্তীত হয়ে কোন না কোন ভাবে নামকরণে মুসলিম সংশ্লিষ্টতা আসতো।             
আবার ‘হাট’ শব্দটি গঞ্জের সমার্থক শব্দ; যার অর্থ বাজার। সুতরাং ‘হাটি’ শব্দের অর্থও বাজার। সেই অর্থে কামারহাটী অর্থ কামারের বাজার বা কামারদের বাজার।  ‘মণ্ডি’ ‘গঞ্জ’-এর একটা প্রতিশব্দ; সেই অর্থে ধানমণ্ডির অর্থ ধানের হাট। ‘নগ’ কথাটির আবিধানিক অর্থ ‘পাহাড়’। নগ বা পাহাড় সদৃশ বড় বড় স্থাপনা যে এলাকায় পরিদৃশ্যমান তাকে ‘নগর’ বলা হত। যেমন, মখদুমনগর, জয়নগর, গোলাপনগর, ফিলিপনগর ইত্যাদি। এইভাবেই কোনো কোনো সমৃদ্ধ  গ্রামকেও নগর  বলা হত। আজকাল নগর অর্থ (Town); পুর্বে নগরে বাস করা ব্যক্তিকে ‘নাগর’ (Townee) পরবর্তীকালে নাগর শব্দটির ভাবার্থ পরিবর্তিত হয়ে ‘লাম্পট্য পুরুষ’ অর্থ রুপলাভ করেছে। তখন থেকে নগরে বা নগর রাষ্ট্রে বা কোনো সার্বভৌম দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসকারীকে ‘নাগরিক’ বলা হয়।
তবে নাটোরের ইতিহাস রচয়িতা সমর পাল তাঁর বরেন্দ্রভূমির ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেন যে, ‘ ষোড়শ শতকে রচিত সংস্কৃত গ্রন্থ ‘ভবিষ্যপূরাণ’ অনুযায়ী বরেন্দ্রভূমির প্রধান নগর হিসেবে পুট্টিলা, নটারো, চপলা ইত্যাদির নাম পাওয়া যায়। নীহাররঞ্জন রায় একাদশ-দ্বাদশ শতকের বিভিন্ন প্রাচীন সূত্রের উল্লেখে ‘নাটারি’ নামের কথা বলেছেন এবং একে নাটোর বলে চিহ্নিত করেছেন। একই ভাবে পুট্টিলাকে পুঠিয়া এবং চপলাকে চাপিলা বলে আমরা অনুমান করতে পারি।সেনরাজ বল্লাল সেন (১১৬০-১১৭৯) এর গুরু অনিরুদ্ধ ভট্ট যিনি চম্পাহট্টীয় মহামহোপাধ্যায় নামে খ্যাত এবং ‘পিতৃ দহিতা’ ও ‘হারলাতা’ নামে দু’টি বিখ্যাত স্মৃতিগ্রন্থের রচয়িতা, তাঁর নিবাস ছিল বরেন্দ্রভূমির চম্পাহট্টি (চম্পাহিটি, চম্পাটি বা চামটা) গ্রামে। তিনি বাস করতেন বিহার পাটকে (বিহারপাড়া বা বিরোপাড়া?) যা বর্তমান লালপুর উপজেলা অফিস সংলগ্ন বিরোপাড়া গ্রাম।  এ থেকে এখানে এও অনুমান করা যায় যে, প্রাচীনকালে ‘চম্পাহিটি’ বা ‘চামটা’ গ্রামের একটি ‘পাড়া’ বা ‘পাটক’র নাম ছিল বিহার পাটক বা  বিরোপাড়া। চম্পাহিটি’,  ‘চামটা’বা  ‘চম্পাটি’  বর্তমান নাটোর জেলার লালপুর উপজেলার চামটা বা চামটিয়া গ্রাম। বড়াইগ্রাম উপজেলার জোনাইল ইউনিয়নেও এক চামটা গ্রাম আছে। আমাদের মনে হয় বল্লাল গুরু অনিরুদ্ধ ভট্টের নিবাস চামটা গ্রামটি লালপুর অথবা বড়াইগ্রাম উপজেলাতেই।)
মোঘল সুবাদার ইসলাম খাঁর (১৬০৮-১৬১৩খ্রিঃ) সেনাপতি আলাউদ্দিন ইস্পাহানি ওরফে মির্জা নাথান (সিতাব খাঁ) রচিতি বাহারীস্থান-ই-গায়বী (১৬৩২ খ্রিঃ) গ্রন্থে মোঘল অভিযান ও সেনা ছাউনির যেসব বিবরণ দিয়েছেন , তাতে সোনাবাজু , নাজিরপুর, আমরুল, আত্রাই নদী ইত্যাদি নামের সাথে নাটোর জেলার সম্পর্ক বিদ্যমান। মোঘল আমলে যেসব পরগণা বা তার অংশ বর্তমান নাটোর জেলার সাথে যুক্ত, তা হলো আমরুল ( অংশ ডিহি শেরকোল) বড়বরিয়া, চৌগাঁও, চাপিলা, বিয়াস, দীঘা, গোবিন্দপুর, লস্করপুর, নাজিরপুর, মালঞ্চি, সোনাবাজু, তেগাছি ইত্যাদি। (বরেন্দ্রভূমির ইতিহাস-৭৪-৭৫) ওঞ্চল হিসেবে পরগণা, মহল, চাকলা বা সরকার ইত্যাদি বড় বড় কোন বিভাগেই অর্জুনপাড়ার সন্ধান মিলেনা।
গ্রামগুলোর  হিন্দু নামককরণ থেকে সহজেই বলা যায় এ অঞ্চলটি হিন্দু অধুষিত ছিল।সুতরাং সমাজের মানুষের আচার-আচরণ ও প্রথাও হিন্দুয়ানী ছিল। কারণ সে সময় সারা দেশে মুসলমান তেমন ছিল না বললেই চলে। শামস উদ্দিন ইলিয়াস শাহের (১৩৪২-১৩৫৮) আমলে বাংলা ও বিহারের মুসলমানদের সংখ্যা ছিল খুব কম, মাত্র ৩০/৩৫ হাজারের মতো।কাজেই বলা চলে কেন্দ্রে যাই থকনা কেন, তখন অর্জুনপাড়াতে প্রকৃতপক্ষে শাসন ছিল হিন্দু শামন্ত জমিদার বা ভূঁইয়াদের উপর।ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দোপাধ্যায়ের মতে, রাজা গনেশের সমর নাটোর ভাতুরিয়া পরগণার অন্তর্গত ছিল।এই গণেশ ভাতুরিয়ার দুর্ধর্ষ ভূঁইয়া, (তখন হিন্দু জমিদারদের ভুঁইয়া বলা হতো তাঁর কামরায় প্রবেশের দরজা এমন সংকীর্ণ ও খর্ব ছিল যে, প্রবেশকারীকে উপুড় হয়ে প্রবেশ করতে হয়।যার নাম ছিল খিড়কি দুয়ার। অর্জুনপাড়ার একটি পুকুরের নামও খিড়কি দুয়ার। এ থেকে অনেকেই অনুমান করেন অর্জুনপাড়ার রাজ প্রাসাদ হিন্দু সামন্ত রাজা গণেশের অমলেও হতে পারে।তবে কিন্তু তার কোন সুত্র খুঁজে পাওয়া কঠিন।
বাংলায় মুঘল অভিযানের সময় পর্যন্ত শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের সময় উদ্ভব সাঁতোল ও ভাতুরিয়া সামন্ত রাজবংশ দুটি অক্ষুন্ন ছিল।পরবর্তীকালে ভাতুরিয়া রাজবংশ অত্যন্ত সংকুচিত হয়ে পড়ে।তাহিরপুরের রাজা কংস নারায়ণ এবং ‘সরকার পিঞ্জিরা’র অন্তর্গত সাঁতুল পরগণা’র এই দুই বংশই রাজশাহী জেলার আদি ভুঁইয়া। এই দুই ভৌমিক বা ভুঁইয়া বঙ্গের বার ভুঁইয়াদের অন্তর্গত বলে কথিত হয়ে থাকে।মুঘলদের বাংলা অভিযানের সময় সম্রাট আকবরের সেনাবাহিনী ভাতুরিয়া জমিদারী বাজেয়াপ্ত করে সাঁতোল জমিদারিভুক্ত করা হয়। ফলে ভাতুরিয়া রাজার ক্ষমতা হ্রাস প্রাপ্ত হয় এবং সাঁতোল জমিদারির প্রতিপত্তি বাড়ে। তখন থেকে পাবনা জেলার অধিকাংশ এলাকা সাঁতোল জমিদারিভুক্ত হয়। গোটা অস্টাদশ শতক জুড়ে পাবনা জেলা্র বৃহত্তম অংশ ছিল নাটোর জমিদারির অংশ। নাটোর জমিদারির উত্থনের পূর্বে পাবনা জেলায় দুটি প্রাচীন জমিদারি (সামন্ত)  রাজবংশ ছিল। ১৭২১ খ্রিঃ সাঁতৈল নাটোর জমিদারির অন্তর্ভুক্ত হয়। সাঁতৈল ও ভাতুরিয়া জমিদারি রাজ বংশের সময়ও বর্তমান অর্জুনপাড়ার কোন শাসকের শাসনাধীন ছিল বা এখানকার স্থাপনা সম্পর্কে কিছুই উল্লেখ পাওয়া যায় না।
সুলতানি আমল বা মুসলিম আমলে শাসনকার্যের সুবিধার জন্য প্রদেশকে শিক, মহল এবং গ্রামে ভাগ করা হয়। মহলগুলি বর্তমানের থানা বা উপজেলা প্রশাসনের মত ছিল এবং শিক ছিল বর্তমানের থানা জেলা প্রশাসনের মত। কোনো কোন ঐতিহাসিকের মতানুসারে, শের শাহের আমলে সে সময় এই ১৯টি সরকার ৫৫৮টি মহলে বিভক্ত ছিল। আইন-ই-আকবরী গ্রন্থে টোডরমলের বন্দোবস্তে বাংলার রাজস্ব ব্যবস্থার বিবরণে দেখা যায় যে, সমগ্র বাংলা কয়েকটি সরকার এবং প্রতিটি সরকার আবার অনেকগুলি পরগণা বা মহলে বিভক্ত ছিল।সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে বাংলা ১৩৫০ মহল বা পরগণা বিশিষ্ট ৩৪টি সরকারে বিভক্ত হয়। ১৭২২ খ্রীস্টাব্দে মুরশীদ কুলী খান প্রণীত 'জমা-ই-কামিল-তুমা'র অনুযায়ী বাংলাকে ১৬৬০ মহাল বা পরগণায় বিভক্ত ছিল। কিন্তু মহল ছিল শুধুমাত্র একটি একক প্রশাসনিক রাজস্ব ইউনিট।সুতরাং মুঘল যুগে উক্ত কোন নামেই অর্জুনপাড়াকে পাওয়া যায় না।
বর্তমান গুরুদাসপুর উপজেলার দক্ষিণের অংশে চাপিলা ইউনিয়নের অন্তর্গত চাপিলা গ্রামে মোগল শাসনামলে মোগল কাচারি প্রতিষ্ঠিত ছিল। রাজশাহী জেলার পূর্বাংশ ‘তরফে চাপিলা’র রাজধানী চাপিলা কাচারির অধীন ছিল। এখানে অপরাধীদের শাস্তি দেয়ার জন্য অন্ধকূপ, জেল, ফাঁস, শূল প্রভৃতির ব্যবস্থা ছিল। এখানকার কেল্লায় মোগল সৈন্যদের ঘাঁটি ছিল। চাপিলা পশ্চিম পাড়ায় মোগল আমলের একটি সুপ্রাচীন মসজিদ এখনো বর্তমান। এ গ্রামে তিন শতাধিক পুকুর ও অসংখ্য দালানকোঠার প্রাচীন ইট দেখে বোঝা যায়, এটি এককালে সমৃদ্ধ নগর ছিল। মোগল শাসনামলে কিছুকাল চাপিলা, রাজশাহী জেলা সদর ও চাপিলা পরগনার কেন্দ্রস্থল ছিল। অর্জুনপাড়ায় মুঘল আমলে স্থাপিত কোনো থানা বা মহল বা পরগণা  কিংবা স্থাপনা থাকলে এখানকার স্থাপনার অস্তিত্ব কোন না কোন ইতিহাসে থাকতো এবং শের শাহ ও সম্রাট আকবর থেকে শুরু করে আওরঙ্গজেব পর্যন্ত শাসকদের তালিকায় এই শিখ, মহল বা পরগণা কিংবা চাকলা’র অন্তর্ভুক্তি দেখা যেত। কিন্তু রাজস্ব বা প্রশাসনিক কোন তালিকায় এর অন্তর্ভুক্তি না থাকায় এখানকার এই স্থাপনা মুঘলপুর্ব সুলতানি যুগের বলে সহজেই অনুমান করা যায়।
অর্জুনপাড়ার গ্রামের স্থাপনা ও খননকৃত ১০১টি পুস্কুরণি বা তৎসংলগ্ন মাঠের নামের বিচ্যুতি, বিকৃতি, বিলুপ্তি বা কখনও কখনও অপভ্রংশ হয়ে এখনও প্রাচীন নাম টিকে আছে। বর্তমানে গ্রামের দক্ষিণে আছে ভুঁইপাড়া মাঠ। ভূঁইয়া পদবীটি এসেছে খোদ ভূমির মালিকানা অর্থ থেকে। মুঘলপুর্ব যুগে বাঙালি হিন্দু প্রাচীন বড় জমিদার বা সামন্ত রাজার উপাধিও ছিল ভূঁইয়া।ভুঁইয়াপাড়া নাম থেকেই কেউ কেউ অর্জুনপাড়া অঞ্চলটি বারো ভুঁইয়াদের অধীন বা সে যুগের মনে করেন। কিন্তু ভুঁইয়াপাড়া থেকে বারোভুঁইয়া সম্পৃক্তকরণ অনুমান মাত্র। কারণ মুঘল যুগের তাহেরপুর পরগণা, লস্করপুর পরগণা, পুঠিয়া জমিদারীর উদ্ভবকালে এবং নাটোর জমিদারীর শাসনের যুগে অর্জুনপাড়ার ইতিহাসের অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায় না। লস্করপুর ছিল উত্তরবঙ্গের অন্তর্গত একটী বিভাগ। এই সময়ে পুটিয়া ভূম্পত্তি  লস্করপুর  পরগণার অধীন ছিল। মুর্শিকুলী খাঁর সময়ে ১৫টা পরগণা লইয়া এই বিভাগ গঠিত হয়।এই সময়ের কোল ইতিহাসেই অর্জুনপাড়া সম্পৃক্ততা খুঁজে পাওয়া যায় না। সুতরাং ইলিয়াস শাহী আমল থেকে পুঠিয়া ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলির জমিদারী পর্যন্ত উক্ত শাসনকাল সময়গুলিতে অর্জুনপাড়ার জমিদারি ও স্থাপনা সম্পর্কে কোন সূত্র না থাকায় আমাদের পাঠানপুর্বে যুগের পিছনের হিন্দু যুগের শাসনামলের সন্ধান করতে হবে। সে ক্ষেত্রে  আমাদের মুঘলপুর্ব যুগের নাটোর বা এ অঞ্চলের ইতিহাস পর্যালোনা করলে হয়তো কিছুটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
রাজস্ব বা প্রশাসনিক অঞ্চল হিসেবে অর্জুনপাড়া কোন শাসকের অধীন ছিল তা বলা কঠিন। আর প্রশাসক যদি হিন্দু হন তাহলে মুঘলপুর্ব যুগে তার জমিদারীর উপাধি ছিল ভুঁইয়া।তাদের বিশাল কর্মযজ্ঞের জন্য বহু কর্মচারী, দাস-দাসী ও নিম্নপেশার মানুষের প্রয়োজন হতো। মধ্যযুগে কোনো শহরের পার্শ্ববর্তী এলাকার বিভিন্ন পেশাজীবী শ্রেণির মানুষের আলাদা আলাদা বসবাস কেন্দ্র বা গ্রাম গড়ে উঠেছিল। এরা শহরের আশে পাশে থাকতো এই কারণে যাতে শাসকদের প্রয়োজনের সময় বা জনগণের প্রয়োজনে এদের সহজেই পাওয়া যায়।এইভাবে দেখা যায়, প্রাচীন ও মধ্য যুগে জাতি, ধর্ম ও পেশার মানুষদের আলাদা পাড়া বা গ্রাম গড়ে উঠেছিল। নির্দিষ্ট পেশাজীবী, যারা সংগবদ্ধভাবে একই পাড়ায় বাস করতেন। যেমন, উচ্চ বংশের মানুষ ঠাকুরদের বাস করতো ঠাকুরপাড়ায়।তেমনি ঘোষদের বাস ছিল ঘোষপাড়ায়, কামারদের বাস ছিল কামারপাড়ায়, কুমোরদের বাস কুমোরপাড়ায় ইত্যাদি। সেন যুগের হিন্দুদের চরম বর্ণ বিভাজন ও বৈষম্যের কারণে এক পেশাজীবী মানুষদের অন্য পেশার লোকদের মাঝে এক সাথে ঘর করে বসবাসের কোনোই সুযোগ ছিল না।শুধু শাসন কার্যের সাথে জড়িত কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা মূল শহরের মধ্যে বসবাস করতো। তাছাড়া হিন্দু সমাজে বর্ণপ্রথা প্রচলিত থাকায় তাদের সামাজিক অবস্থা, রীতিনীতি, আচার-আচরণ ও চলাচল এবং বসবাস ছিল আলাদা।
চরম বর্ণপ্রথার কারণে এক পেশার মানুষ পেশাগত ও বর্ণগত কারণে এক ‘থালা’তে খেতেন না। এক কাপড় অন্যজন ব্যবহার করতেন না এমনকি এক পেশার মানুষ অন্য গোত্রের বাড়িতে বা পুকুরে গোসল পর্যন্ত করতো না। রান্না-বান্না ও পান করার জন্য আলাদা পুকুর ব্যবহার করতো। এই কারণে বহু উচ্চ-নিম্ন শ্রেণির জন্য অনেক পুকুরের প্রয়োজন হওয়ায় এই পুকুরগুই খনন করা হয়ে থাকতে পারে। রাজা-বা শাসকরা নিজেদের এবং তাদের কর্মচারী ও সংশ্লিস্ট পেশাভিত্তিক মানুষদের জন্য আলাদা আলাদা পুকুর খনন করেছিলেন।এতগুলি পুকুর খনন কাজে শাসকের পক্ষে যে এত ব্যায় এবং শ্রমিক নির্বাহ করা সহজ সাধ্য নয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এত পুকুর খননে  কাজে যে ঐ সময়ের নিম্ন পেশা মানুষ ও ক্রিতদাসরা অংশ নিয়েছিল তা সহজেই অনুমেয়। পুকুরগুলোর নাম শুনলে মনে হয় এখানে মহলের আশেপাশে যারা বাস করতেন তাদের ব্যবহারের জন্য আলাদা আলাদা পুকুর খনন করা হয়েছিল।
কিন্তু এখানে প্রাচীন আমলে খননকৃত ১০১টি পুকুরের অস্তিত্ব এখনও রয়েছে এবং এ পুকুরগুলো প্রাচীন যুগের।স্থানীয় বিশ্বাস ও জনশ্রুতি অনুযায়ী কতিপয় পুকুরের  বর্ণনা করা হলো। যেমন, ১) মহল পুকু্রঃ মহলের অভ্যন্তরীন অন্তপুরবাসিনীদের জন্য ২) দাসী পুকুরঃ মহলের বাইরে বসবাসকারী দাস-দাসীদের জন্য ৩) ধোপা পুকুরঃ রাজবাড়ি এবং তৎসংশ্লিস্ট ব্যক্তিবর্গের পোশাক পরিচ্ছন্ন কর্মী ধোপাদের ব্যবহারের জন্য ৪) ঠাকুর পুকুরঃ মহলের হিন্দু পুরোহিত যারা পূজা অর্চণা করতেন তাদের জন্য  ৫) বাজি পুকুর বা বাইজী পুকুরঃ  রাজমলের মানুষদের চিত্ত বিনোদনের জন্য নাঁচ-গানের জন্য কর্মরত নর্তকি বা বাঈজি দের জন্য নির্দিষ্ট করে খনন করা হয়েছিল বলে ধারণা করা যায়।এসব নামই বলে দেয় এই পুকুরের আলাদা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর  অনেক পুকুরে মাটি ভরাট করে আবাদযোগ্য করা হয়েছে। বিনষ্ট করা হয়েছে প্রাচীন ঐতিহ্য। অনেক পুকুর ও পুকুরের নাম কালের গর্ভে মিশে গেছে। গবেষকদের প্রয়োজনে বর্তমান অস্তিত্ব বিদ্যমান  অন্যান্য পুকুরের স্থানীয় বিশ্বাস ও জনশ্রুতি অনুযায়ী নাম উল্লেখ করা হলো। যথা-সানের পুকুর, বৌ পুকুর/বৌ মারা, ভুত খানা, চাল ধুয়া, ডাল পুকুর, খাঁড়া দোয়া, খিড়কি দোয়ার, বাহির বাড়ি, ললগুনা, কালীতলা, ঠাইন, ঘোড়া পুকুর, বেলতলা, মণিহারী, কদমতলী, ট্যাকা তোলা, আমবাড়ি, মানা গাছা, ছোট পুকুর, বড় পুকুর, গবর গাড়ি, কুমির গাড়ি, বহ্নিগাড়ী, নিমবর,  ছুঁচিগাড়ী, চুনিপাত্রী, হিন্নির পুকুর, বামুনতলা, তারাবুনা, মটর গাড়ি, হলুদ কুটা, বর্গীপাড়া, কুলপাড়া, হিজলতলা, বামন্নী পুকুর, গাড়িনামা, ঘোড়ামারা, দীঘিরপুকুর, কদমতলী, বেগমতলা, জোড়াপুকুর, নারিকেলবুনা, তুরকুনী পুকুর। এছাড়া অনেক পুকুর নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল প্রতিষ্ঠিত হবার পর মিলের প্রয়োজনে মাটি ভরাট করে আবাদযোগ্য করা হয়েছে।এসব নামই বলে দেয় এই পুকুরের আলাদা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। অনেক পুকুর ও পুকুরের নাম কালের গর্ভে মুছে  গেছে।তবে পুকুরগুলোর বর্তমান এসব নাম প্রকৃত নামের অপভ্রংশ হতে পারে। এখনও প্রায়ই কৃষকের লাঙ্গলে প্রাচীন ইটের ভগ্নাশেষ উঠে আসে। সরকারি উদ্যগে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার জন্য খনন করলে ইতিহাসের অনেক তথ্য, উপাত্ত ও উপাদান উদ্ঘাটিত হতে পারে এ বিষয়টি নিশ্চিত করেই বলা যায়।      
তবে ইতিহাসে ‘অর্জুনপাড়া’ শাসক কিংবা তাদের নির্মিত রাজপ্রাসাদের কোন সুত্র পাওয়া না পাওয়ার কারণ হল এখানে সরাসরি বড় কোন সামন্ত রাজার শাসন ছিল না। এটি ছিল মূলত বৃহৎ ‘ডিহি’ বা মৌজা কিংবা সমমানের শাসকের শাসনে। ফারসি ডি (দি)হ; হিন্দী ডিহ অর্থ কয়েকটি গ্রাম বা মৌজার সমষ্টি। এই ডিহির অধিকর্তা বা শাসনকর্তা ছিলেন ‘ডিহিদার’। মধ্যযুগের ডিহি বা গ্রাম আজকের থানার মত ছিল।সুবা বা প্রদেশের অধীনে সরকার, সরকারের অধীনে চাকলা, চাকলার অধিনে পরগণা, পরগণার অধিনে তরফ এবং তরফের অধীনে ডিহি। আর ডিহির নিচে মৌজা। মোঘল যুগে সরকারগুলি সুবা’র অধীনে ছিল। মোঘল যুগের ‘সরকার’ ইংরেজ আমলে জেলায় রুপান্তরিত হয় এবং পরগণা মহকুমায় রুপান্তরিত হয় এবং তখনকার ডিহি আজকের থানার মত ছিল। এই ভাবে সুবা, সরকার, চাকলা, পরগণা তরফ,  ডিহি, মৌজা  প্রভৃতি পর্যায়ক্রমে শাসনকর্তা ছিল। রাজস্ব আদায়ের জন্য জমির যত সংস্কার করা দরকার করা হত। আর সেই রাজস্ব আদায়ের জন্য ছিল শাসনকর্তার কাচারী।  কবি কঙ্কণ চণ্ডী’র ‘বঙ্গবাসী’ কবিতায় দেখা যায়-  
‘নাঞি দিহ বাউড়ি  রয়্যা বস্যা দিহ কড়ি
ডিহিদার নাহি দেব দেশে।
সেলামী বাঁস গাড়ি নানা বাবে জত কড়ি
নাহি দিব গুজরাট দেশে।‘
কিন্তু মোঘল যুগের অর্জুনপাড়া মৌজার কোন তথ্যই যেহেতু পাওয়া যায় না, সেহেতু এখানকার ইতিহাস আরও প্রাচীন যা সর্বশেষ উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ধংশ প্রাপ্ত হয়। পরবর্তীকালে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা ও সংরক্ষণের অভাবে এই ইতিহাস কালের আবর্তে তলিয়ে গেছে। লালপুরের একজন প্রবীণ শিক্ষক আলতাব হোসেন এক কথায় লিখেছেন যে, অর্জুনপাড়ার স্থাপনার ইতিহাস ছিল বারো ভুঁইয়ার আমলের।কিন্তু বারো ভুঁইয়া যুগের পার্শবর্তী সকল ইতিহাসের মধ্যে এখানকার কোন তথ্যই পাওয়া না। এমনকি কোন মুসলিম যুগে বা সুলতানি আমলেও পাওয়া যায়না। কাজেই আমাদের অনুমান যে, এখানকার ইতিহাস হচ্ছে বর্ণ প্রথা যুগের ইতিহাস। আর সে ইতিহাসের সুত্র হচ্ছে বল্লাল সেনের (১১৬০-১১৭৯) অথবা রাজা লক্ষন সেনের কৌলিণ্য প্রথা প্রতিষ্ঠার সমসাময়িক কাল। কাজেই অর্জুনপাড়ার বিভিন্ন তথ্য থেকে অনুমান করা যায় যে, এখানকার স্থাপনা সেন আমলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।  প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা ও ব্যাপক খনন করলে এর প্রকৃত ইতিহাস উদঘাটন করা সম্ভব। সেন আমলের লিপিফলকে শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে যে বিবরণ রয়েছে তা পাল আমলের বিবরণের অনেকটা অনুরূপ।সেন যুগের বিভিন্ন প্রশাসনিক  দপ্তর থেকে রাজ কর্মচারীদের যে তালিকা যা পাওয়া যায়, তা থেকে স্পষ্ট যে বাংলায় একটি সুনিয়ন্ত্রিত ও পরিকল্পিত শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। সেন যুগের রাজ্যশাসন বিষয়ের অপর এক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ব্রাহ্মণ পুরোহিতের প্রাধান্যের সরকারি স্বীকৃতি। সেন রাজাদের রাজত্বকালে উচ্চ রাজকর্মচারীর মর্যাদাসহ পুরোহিতের প্রাধান্যের স্বীকৃতি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। মুঘল যুগের উল্লেখিত ডিহির ন্যায় সেন আমলে অর্জুনপাড়া কোনো পুরোহিতের নিয়ন্ত্রণাধীন বা  কোন ছোট সামন্ত রাজার শাসনাধীন ছিল এমন অনুমান করা যেতে পারে। এ ব্যাপারে বিস্তর গবেষনায় সঠিক ঐতিহাসিক তথ্য নির্ণয় করা যেতে পারে।
সহায়ক গ্রন্থসমূহঃ ১। বরেন্দ্র অঞ্চলের ইতিহাস- বরেন্দ্র অঞ্চলের ইতিহাস গ্রন্থ প্রনয়ণ কমিটি, বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়, রাজশাহী  ২। রাজশাহীর ইতিহাস-কাজী মোহাম্মদ মিছের ৩। রাজশাহীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস এবং রাজশাহী পরিচিতি- শ্রী কালীনাথ চৌধ্যরী ৪। বরেন্দ্রভূমির ইতিহাস-সমর পাল।
* সাদ আহমেদ: সম্পাদক ও প্রকাশক, সাপ্তাহিক শহীদ সাগর, গবেষক ও কলাম লেখক এবং প্রভাষক, পাকশী রেলওয়ে কলেজ।  

কমেন্ট করুন

...

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top