logo
news image

জাপানে ইন্টারন্যাশনাল ইয়াং ইনোভেটরস সামিট ২০১৮

মাহামুদুল হাসান ও রিদওয়ানুল আরেফিন।  ।  
জাপানে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল ইয়াং ইনোভেটরস সামিট ২০১৮-তে ৫০টি প্রকল্পের মধ্যে সেরা হয়েছে বাংলাদেশের তিন তরুণের গড়া দল ‘গিকি হেড’। জিতে নিয়েছে ‘বেস্ট আইডিয়া ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ড’। দলের সদস্য ছিলেন ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের ছাত্র মাহামুদুল হাসান, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের রিদওয়ানুল আরেফিন এবং ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির সাদমান সাকিব।  
ভাবনার শুরু
বাংলাদেশ ইনোভেশন ফোরামের একটা ব্যবসায়িক ভাবনা প্রতিযোগিতার খবর পেয়ে আমরা ঠিক করেছিলাম, সেখানে অংশ নেব। ভাবতে শুরু করলাম, কী নিয়ে কাজ করা যায়। এমন সময় কিছুদিন আগের একটা ঘটনা মনে পড়ল। আমাদের দলের আরেক সদস্য, বন্ধু সাকিব একবার হোঁচট খেয়ে পায়ে ব্যথা পেয়েছিল। ব্যথাটাকে সাকিব তেমন গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু পরে ওই ছোট্ট ব্যথা থেকেই বড় সংক্রমণ হয়ে গিয়েছিল।
এ ঘটনা থেকেই আইডিয়াটা মাথায় এল। আমাদের দেশে অনেক সময় আমরা ডাক্তারের কাছে যাই না, যেতে চাই না, গুরুত্ব দিই না। পরে এর কারণে বড় সমস্যা দেখা দেয়। চিকিৎসাসেবা নেওয়ার ক্ষেত্রে কী কী প্রতিবন্ধকতা আছে, সেগুলো নিয়ে খোঁজখবর নেওয়া শুরু করলাম। দেখলাম, আমরা যা ভেবেছিলাম, সমস্যাটা তার চেয়েও প্রকট।
সমস্যা ও সমাধান
আশপাশের মানুষ, চিকিৎসক, রোগী, নানাজনের সঙ্গে কথা বললাম। পড়াশোনা করলাম, তথ্য সংগ্রহ করলাম। দেখলাম, শহরের অনেক মানুষ যানজট বা সময়ের অভাবের কারণে ডাক্তারের কাছে যেতে চায় না। গ্রামের মানুষ অনেকে সঠিক স্বাস্থ্যসেবা পায় না, কেউ আবার ঢাকায় এসে চিকিৎসা নেওয়ার ঝক্কি পোহাতে রাজি নয়। বড় সমস্যা হয় নারীদের। চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার মতো কেউ নেই, ভাই-বাবা বা স্বামী সময় দিতে পারছেন না বলে অনেক নারীর স্বাস্থ্যসেবা নেওয়া হয় না। এই সমস্যা সমাধানের জন্য আমরা একটা অ্যাপের (মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন) ভাবনা সাজালাম। অ্যাপটার নাম দিলাম ‘কিওর’।
কিওর-এ কী আছে?
আমাদের অ্যাপে চিকিৎসক ও রোগীর জন্য একটা ‘চ্যাটিং অপশন’ থাকবে। রোগী তাঁর সমস্যাগুলো বলতে পারবেন, চিকিৎসক সে অনুযায়ী পরামর্শ দেবেন। প্রয়োজনে তিনি তাঁর চেম্বারে দেখা করতে বলবেন। অনলাইনের মাধ্যমেই পেমেন্ট করতে হবে। চ্যাটের সঙ্গে ছবি ও ভিডিও পাঠানোর ব্যবস্থা থাকছে।
অ্যাপের মাধ্যমেই আশপাশের ফার্মেসি ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যোগাযোগ করা যাবে। রোগী ঘরে বসেই ওষুধ পেয়ে যাবেন। ডায়াগনস্টিক সেন্টারের রিপোর্ট আনতে যেতে হবে না, রিপোর্ট সরাসরি অ্যাপের মাধ্যমে আপলোড হয়ে যাবে। রোগী ও ডাক্তার, দুজনই রিপোর্ট দেখতে পাবেন। ঢাকাকে কয়েকটা জোনে ভাগ করে এই সুবিধা দেওয়া হবে। এ ছাড়া রোগীর সমস্যা, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা—সবকিছুর তথ্য সংরক্ষিত থাকবে অ্যাপে। ডাক্তার একনজর দেখলেই রোগীর ‘মেডিকেল হিস্ট্রি’ জেনে নিতে পারবেন।
প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার
এ বছর আগস্টের কথা। প্রথমে অনলাইনে আমাদের আইডিয়ার সারমর্ম লিখে ইন্টারন্যাশনাল ইয়াং ইনোভেটরস সামিট-২০১৮ তে জমা দিলাম। যত দূর জানি, সারা বিশ্ব থেকে হাজারখানেক প্রকল্প জমা পড়েছিল। প্রাথমিকভাবে যখন আমাদের ভাবনাটা নির্বাচিত হলো, উদ্যম আরও বাড়ল। পরের ধাপে আমাদের ভাবনাটা বিস্তারিতভাবে লিখে রচনা আকারে পাঠাতে হলো। সেপ্টেম্বর মাসে আমাদের কাছে ই–মেইল এল। জানলাম, সেরা ৫০টি প্রকল্পকে তারা নির্বাচিত করেছে। এর মধ্যে আমাদের প্রকল্পটাও আছে।
অবশেষে আমরা জাপানে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম। আমাদের দলের আরেক সদস্য সাদমান যেতে পারেনি, অতএব আমরা দুজনই গিকি হেডের প্রতিনিধি হয়ে হাজির হলাম টোকিও ইন্টারন্যাশনাল এক্সচেঞ্জ সেন্টারে। ৬ অক্টোবর আমরা পৌঁছেছি, কিন্তু আমাদের মূল অনুষ্ঠান শুরু হয় ৮ অক্টোবর। ৯ অক্টোবর আমাদের প্রকল্প উপস্থাপন করলাম। সেদিন রাতেই নৈশভোজের এক বিরাট আয়োজন ছিল। সেখানেই জানলাম, আমরা ‘বেস্ট আইডিয়া ইনোভেশন’ বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। এখন আমরা আমাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করছি। একজন বিনিয়োগকারী খুঁজছি। অর্থায়নের ব্যবস্থা হয়ে গেলেই কাজ শুরু করে দেব।
ট্যাক্সি ভাড়া ৫ হাজার টাকা!
প্রতিযোগিতায় গিয়ে একটা মজার ঘটনা ঘটেছে। আমাদের মূল প্রেজেন্টেশন ছিল ৯ অক্টোবর। আগের রাতে অনেক রাত জেগে কাজ করেছি, ছোটখাটো ভুলত্রুটি শুধরে নিয়েছি। ঘুমাতে ঘুমাতে রাত হয়ে গেছে।
পরদিন আটটা থেকে আমাদের প্রেজেন্টেশন শুরু হওয়ার কথা। আমরা যেই ডর্মে ছিলাম, আমাদের সঙ্গে আরও প্রায় ১৪-১৫ জন প্রতিযোগী ছিল। যেহেতু এটা একটা প্রতিযোগিতামূলক জায়গা, কেউ আমাদের ঘুম থেকে ডাকেনি। আমরা অ্যালার্ম দিয়ে ঘুমিয়েছিলাম, কিন্তু কখন অ্যালার্ম বেজেছে, টেরও পাইনি। যাহোক, ঘুম থেকে উঠে দেখি, ১২টা বাজে!
ফোন করে খোঁজ নিলাম। বলা হলো, আমাদের প্রেজেন্টেশন শুরু হবে বেলা দেড়টায়। বাস বা সাবওয়েতে গেলে দেরি হয়ে যাবে। আমরা দ্রুত তৈরি হয়ে একটা ট্যাক্সি নিয়ে নিলাম। ২০ মিনিটের পথ। জায়গামতো পৌঁছে দেখি, বিল এসেছে বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৫ হাজার! টোকিও ব্যয়বহুল শহর জানতাম, কিন্তু এতটা, ভাবিনি।
প্রতিযোগিতা শেষে আয়োজকেরা বলছিলেন, ‘দেরি করে এলেও তোমরাই তো বাজিমাত করে দিলে!’ সূত্র: প্রথম আলো

কমেন্ট করুন

...

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top