logo
news image

নাজমুন নাহার বিশ্বজয়ী নারী পরিব্রাজক

প্রাপ্তি প্রসঙ্গ ডেস্ক।  ।  
পৃথিবীর ইতিহাসে পতাকা হাতে বিশ্বভ্রমণকারী নারী হিসেবে বাংলাদেশী নাজমুনই প্রথম। তার হাত ধরে পৃথিবীর পথে পথে লাল সবুজের পতাকা উড়ছে। তিনি বাংলাদেশের পতাকাবাহী প্রথম বিশ্বজয়ী নারী হিসেবে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তার বিশ্ব ভ্রমণ যাত্রার মাধ্যমে তিনি সৃষ্টি করেছেন এক বিরল ইতিহাস। বাংলাদেশের পতাকা হাতে যে মেয়েটি গত সতেরো বছর ধরে পৃথিবীর পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছেন সেই মেয়েটি গত পহেলা জুন তার দেশ ভ্রমণের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার সম্মানকে নিয়ে গেছেন সর্বোচ্চ উচ্চতায়। ইতিহাসে কালজয়ী পর্তুগীজ পর্যটক ভাস্কো দা গা মা, ইবনে বতুতা, কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের কথা কে না জানে, তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে আমাদের বাংলাদেশের এই সাহসী নারী পরিব্রাজক বাংলাদেশের পতাকা হাতে চষে বেড়াচ্ছেন পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে।
শততমের দেশ ভ্রমণের সীমানা ছাড়িয়ে তার ভ্রমণকৃত দেশের সংখ্যা এখন ১১০। সম্প্রতি তিনি ঘুরে এসেছেন আর্মেনিয়া, কাজাখস্তান, কিরগিস্তান, আজারবাইজান, ইরান। সেন্ট্রাল এশিয়া ভ্রমন শেষ করেই তিনি নামিবিয়া হয়ে আফ্রিকার বাকি দেশে গুলোতে তার যাত্রা অব্যাহত রাখবেন।
ছোটবেলা থেকে যে মেয়েটি তার তিল তিল করে বেড়ে উঠা স্বপ্নকে বাস্তবে রূপান্তরিত করে যাচ্ছেন পৃথিবীর সব দুর্গম পথ মাড়িয়ে, মৃত্যুকে অতিক্রম করে, কখনো না খেয়ে, কখনো না ঘুমিয়ে, হাজার হাজার মাইল বাই রোডে জার্নি করে, তাঁবুর মধ্যে থেকে, বন্য প্রাণীর আক্রমনের স্বীকার হয়ে- আজ আমরা কথা বলবো বাংলাদেশের পতাকাবাহী সেই শক্তিশালী পরিব্রাজক বঙ্গকন্যার সাথে।
বিশ্ব ভ্রমণের রেকর্ড
বাংলাদেশের পতাকা হাতে তিনি  বিশ্ব শান্তির এক অনন্য দূত হিসাবেও কাজ করে যাচ্ছেন সারা বিশ্বে।  ২০০০ সালে ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল এডভেঞ্চার প্রোগ্রামে অংশ গ্রহণের মাধ্যমে তার প্রথম বিশ্বভ্রমণ শুরু হয়। সে সময় তিনি ভারতের ভুপালের পাঁচমারিতে যান। এটিই তাঁর জীবনের প্রথম বিদেশ ভ্রমন। বিশ্বের আশিটি দেশের ছেলেমেয়ের সামনে তখন তিনি প্রথম বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। সেই থেকে বাংলাদেশের পতাকা হাতে তার বিশ্ব যাত্রার  শুরু।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালে ৯৩তম দেশ হিসেবে ভ্রমণ করেছেন নিউজিল্যান্ড। এই দুর্দান্ত সাহসী নারী একে একে বাংলাদেশের পতাকাকে পৌঁছান সর্বোচ উচ্চতায়।
২০১৮ সালের ১লা জুন নাজমুন একশ দেশ ভ্রমণের মাইলফলক সৃষ্টি করেন পূর্ব আফ্রিকার দেশ জিম্বাবুয়েতে।তিনি বাংলাদেশের পতাকা হাতে জাম্বিয়ার সীমান্তবর্তী লিভিংস্টোন শহরে অবস্থিত পৃথিবীর বিখ্যাত ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাতের ব্রিজের উপর দিয়ে পায়ে হেঁটে জিম্বাবুয়েতে পৌঁছান! ইতিহাসে তার শততম দেশ ভ্রমণের সাক্ষী হয়ে রয়েছে এই ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত। যে জলপ্রপাতটির অর্ধেক বহমান জাম্বিয়ায়, বাকি অর্ধেক বহমান রয়েছে জিম্বাবুয়েতে।
পৃথিবীর ইতিহাসে নাজমুনের মতো এমন নারী বিরল যিনি এক দেশ থেকে আরেক দেশে হাজার হাজার মাইল বাই রোডে একা একা ভ্রমণ করছেন নিজ দেশের পতাকা হাতে। দিনে রাতের অন্ধকারকে একাকার করে পর্বতে, সমুদ্রের তলদেশে, দুর্গম জঙ্গলে, বন্যপ্রাণীর পাহাড়ে, অজানা আদিবাসীদের এলাকায় কোথাও যেতে ভয় পায়নি এই নারী।
ফ্ল্যাগ র্গাল উপাধি
বুকে তার লাল সবুজের শিহরণ, দুচোখে তার বিশ্ব, সে আমাদের লাল সবুজের পতাকা কন্যা নাজমুন নাহার।একজন নারী হিসেবে একাই শতাধিক স্বাধীন দেশ ঘুরে বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন নাজমুন নাহার। তার এই মাইলফলককে সম্মাননা দিয়েছেন জাম্বিয়া সরকারের গভর্নর হ্যারিয়েট কায়েনা। জাম্বিয়া সরকারের গভর্নরের কাছ থেকে পেয়েছেন ফ্ল্যাগ র্গাল উপাধি।
তারপর ফ্ল্যাগ গার্ল  খ্যাত নাজমুন নাহারকে নিয়ে  বিখ্যাত আন্তর্জাতিক মিডিয়া  ‘জাম্বিয়া ডেইলি মেইল’ এর বিশেষ ক্রোড়পত্রে ৩ জুন ২০১৮ প্রকাশিত হয় একটি ফিচার স্টোরি। খ্যাতনামা সাংবাদিক মার্গারেট সামুলেলা তার লেখনীর মাধ্যমে তুলে ধরেন নাজমুনের জীবনদর্শন, বাংলাদেশের পতাকার সম্মান, ভ্রমন মাইলফলকের কাহিনী ও তার মোটিভেশনাল কার্যক্রমের কথা। নাজমুন বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের সুনাম অক্ষুন্ন রেখে এভাবেই গৌরবের সাথে বাংলাদেশকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন বিশ্ববাসীর কাছে। তাঁর ভ্রমণের ঝুড়ি এখন শতক ছাড়িয়ে চলছে একের পর এক। স্বপ্ন তার পুরো বিশ্বভ্রমণ করার।
শততম দেশ ভ্রমনের অনুভূতি
নাজমুন বলেছেন, শততম দেশ ভ্রমনের অনুভূতি সে এক চমৎকার অনুভূতি।
“সেদিন বাংলাদেশের পতাকা হাতে যেন আমি একা হাঁটিনি সেই দিন হেঁটেছিলো বাংলাদেশের ষোলকোটি মানুষ আমার সাথে, মুক্তি যুদ্ধে প্রাণ হারানো সমস্ত শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। সেদিন শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করেছি আমাদের মহান নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করেছি যাদের ত্যাগের বিনিময়ে আমরা একটি স্বাধীন পতাকা তলে বেড়ে উঠছি সেইসব যোদ্ধাদের। আর তাদের জন্যই আমরা পেয়েছি একটি লাল সবুজের পতাকা।”
নাজমুনের হাত ধরে  আজ যে পতাকা ছুঁয়েছে পৃথিবীর একশোটিরও বেশি দেশের সীমানা, যে পতাকা ছুঁয়েছে পৃথিবীর বহু পর্বতশৃঙ্গ, নগর, বন্দর, সমুদ্র হতে সমুদ্র, যে পতাকা ছুঁয়েছে পৃথিবীর হাজারো মানুষের হৃদয়, তিনি স্বপ্ন দেখছেন-  সে পতাকা যাবে বিশ্বময়।  তাইতো ইতিহাসের এই মাইলফলককে বর্তমান ও পরবর্তী প্রজন্মের একটি স্বপ্নের প্রতিফলনের বাস্তব চিহ্ন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান নাজমুন।
হৃদয়ে যার বাংলাদেশ, দু’চোখে বিশ্ব
হৃদয়ে যার বাংলাদেশ তাকে আমরা শুধু নারী জাগরণের অনুপ্রেরণা বলবো না, তিনি আমাদের দেশাত্ববোধের প্রতীক। যে দেশে তার জন্ম, সেই দেশকে নিয়ে তার এমন এগিয়ে যাওয়ার ভাবনা সত্যি আমাদের শিরকে উন্নত করে। ষোলো কোটি মানুষের মনে জাগিয়ে তোলে এক শিহরণ জাগানো চেতনা। বিদেশের মাটিতে যখনি নাজমুন বাংলাদেশের লাল সবুজের পতাকাটি উড়িয়ে দেন তখন আমাদের মন উদ্বেলিত হয়ে ওঠে, আনন্দের অশ্রুধারা বইতে থাকে। মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ হারানো লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া পতাকার সম্মানকে তিনি সর্বোচ্চ উচ্চতায় তুলে ধরছেন একে একে। এ যাবৎ তিনি ১১০ টি দেশে বাংলাদেশের পতাকাকে নিয়ে যাওয়ার মতো একটি দৃষ্টান্তমূলক কাজ করেছেন।
নাজমুন বলেছেন, ”যে দেশের মানুষ তার কাজের মাঝে, আবিষ্কারের মাঝে দেশের কথা ভেবে কাজ করবে, সে দেশ অনেক এগিয়ে যাবে; তাই আমাদের সবাইকে দেশের কথা ভেবেই নিজের কাজের মাঝে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। আমি বিশ্ব দেখছি বাংলাদেশের লাল সবুজের পতাকা হাতে নিয়ে, এটা আমার দেশাত্ববোধ থেকে করছি, কারণ পতাকা ভাবনা আমার কাছে দেশ প্রেমের একটি চিহ্ন।”
পতাকা হাতে জাগ্রত দেশাত্ববোধ
নাজমুন মন্তব্য, ”পতাকা ভাবনা আমার কাছে একটি দেশ প্রেমের চিহ্ন। লাল সবুজের এই পতাকা ভাবনা আমার কাছে একটি শিহরণ, একটি উচ্ছাস, একটি আবেগ। এই পতাকাকে অর্জনের জন্য প্রাণ হারিয়েছে লক্ষ লক্ষ মানুষ। হারানো প্রাণ আর রক্তে অর্জিত এই পতাকার সম্মান যেন সমুন্নত থাকে পৃথিবীর প্রতিটি দেশে তাই আমি এই পতাকা নিয়ে হাটছি পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে।”
তিনি বলেন, “যে পতাকা ছুঁয়েছে পৃথিবীর বহু পর্বতশৃঙ্গ, নগর, বন্দর, সমুদ্র হতে সমুদ্র, যে পতাকা ছুঁয়েছে পৃথিবীর হাজারো মানুষের হৃদয়, সে পতাকা যাবে বিশ্বময়। আমি স্বাধীনতা অর্জনের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম দেখিনি। আমি একটি স্বাধীন দেশের পতাকা তলে বেড়ে উঠেছি!”
বাংলাদেশের নারী জাগরণের এক বিস্ময়কর উত্থান– নাজমুন
পৃথিবীব্যাপী নারীদের যোগ্যতা প্রমাণের বাধাগুলো নাজমুনের মতো নারীদের দেখেই ধীরে ধীরে দূর হচ্ছে। বাংলাদেশের নারীরা আজ নিজেদেরকে অসহায়, অযোগ্য ভাবার দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে। নাজমুনকে দেখে এ দেশের লক্ষ কোটি মেয়ে সন্তান একবার হলেও আজ ভাবতে শিখবে তারা কত দূর যেতে পারবে। তিনি নারী এবং তরুণ সাফল্যের এক উজ্বল স্বাক্ষর। ”নাজমুন বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের মানুষের জন্য এক শক্তির বহি:প্রকাশ। শুধু তাই নয়, এ দেশের পিছিয়ে পড়া যেসব মানুষ নিজেদেরকে স্বপ্নহীন, কর্মহীন করে অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে, তারা একবার হলে নিজের জন্য একটি স্বপ্ন তৈরী করতে শিখবে এই মানুষটিকে দেখে। নারী কোনো কিছু পারবে না ভেবে নারীদের যারা দমিয়ে রাখছে তাদের জন্য নাজমুনের মতো একজন আলোকিত নারীর সাফল্য এবং এগিয়ে চলা এক বিশাল সুখবর। নাজমুন বিশ্ব জয় করতে যাচ্ছে, একদিন এ দেশের নারীরা পৃথিবী ছাড়িয়ে মহাকাশে চাঁদ ও মঙ্গল গ্রহে যাবে।
এগিয়ে যাওয়ার একাকী সাধনা
মানুষের সব সাফল্যের পেছনেই অনেক বাধা, দুঃখ, কষ্ট, বেদনা থাকে। যে মানুষ এসব কিছুকে অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যেতে পারবে, সেইতো বিশ্ব জয়ের মতো জয়কে হাতের মুঠোয় নিয়ে এসে ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারবে। এশিয়া মহাদেশে জন্ম নেয়া এক নারী, যেখানে এখনো অনেক নারীদের শিক্ষিত হওয়া সত্বেও নিজেদের যোগ্যতা প্রমানের জন্য অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয়, যেখানে এখনো অনেক মেয়েকে পুরুষের উপর নির্ভর করে চলতে হয়, সেই সমাজ থেকে বেরিয়ে আসা একজন নারী নাজমুনের এতদূর এগিয়ে আসার পথ মসৃন ছিল না।  ছোটবেলা থেকে তার পারিবারিক কোনো বাধা না থাকলেও, সামাজিক বহু প্রতিবন্ধকতা তাকে পার হতে হয়ে হয়েছে।
নাজমুন বলেছেন, ‘ছোটবেলা থেকেই বাবা আমাকে লড়াকু হতে শিখিয়েছেন, তাই আমি বিস্তৃত ভাবনা নিয়ে বড় হয়েছি, বড় করে নিজেকে ভাবতে শিখেছি, বড় বড় স্বপ্ন দেখতে শিখেছি, স্বপ্নকে বাস্তব করার জন্য যত কষ্ট, যত বাঁধা এসেছে সব কিছুকে অতিক্রম করেছি। সমাজের ভ্রূকুটিকে উপেক্ষা করে সামনে এগিয়ে গিয়েছি। অনেক মৃত্যুকে জয় করে পর্বত চূড়ায় আরোহন করেছি। একা একাই পৃথিবীর মানচিত্রের এক দেশ থেকে আরেক দেশে ভ্রমণ করেছি’’।
তিনি বলেন, ” আমি একাই সব কাজ করতে পছন্দ করি, একা পথ চলতে যেয়ে পড়ে গেলে আবার একাই উঠে দাঁড়াই, তাতে আমার সাহস এবং আত্ববিশ্বাস বেড়ে যায়। তাই আমি একাই নির্ভয়ে বিশ্বের পথে পথে হাঁটছি”।
এই আত্মবিশ্বাস আছে বলেইতো সব বাধা পেরিয়ে নাজমুন আজ স্বমহিমায় উজ্জ্বল। এখনো আমাদের দেশে অনেক মেয়ে একাকী চলতে পারবে না ভেবে নিজের মেধাকে বিকাশ করার সুযোগ পায় না। বড় বড় আবিষ্কারে নিজেকে নিয়োজিত করতে পারে না। কাজেই দেশের প্রতিটি পরিবারকে সচেতন হতে হবে। নিজের মেয়েটিকে উপযুক্ত ভাবে গড়ে তুলতে হবে। তাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করতে হবে।
বিশ্বজোড়া শান্তি মিশন
বিশ্ব জুড়ে নাজমুনের দীপ্ত পদচারণার শব্দে উদ্দীপিত অনেক তরুণ তরুণী। পৃথিবী জুড়ে তিনি শিশু ও তরুণ তরুণীদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন শান্তির বার্তা, আর তাদেরকে জাগিয়ে তুলছেন স্বপ্ন দেখার শিহরণে। সম্প্রতি তিনি ইরানের তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীদের কাছে বিশ্ব শান্তির বার্তা পৌঁছান। তিনি উগান্ডা, রুয়ান্ডা, ইথিওপিয়া, লেসোথো, সোয়াজিল্যান্ড, কলম্বিয়া, ডোমিনিকান রিপাবলিক, বেলিজ ও কিউবাসহ পৃথিবীর অনেক দেশের ছাত্র ছাত্রীদের মাঝে ‘এক পৃথিবী, এক পরিবার’ স্লোগানে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায়  কাজ করে যাচ্ছেন।
নাজমুন বলেন, ”আমার সবাই একই পৃথিবীর মানুষ একই সূত্রে গাঁথা। একই শেকড় থেকে আমাদের জন্ম। একই সূর্যের আলো পাই, একই আকাশের নিচে বসবাস করি। আমরা একই পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। তাই আমামদেরকে ধর্ম, বর্ণ, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ সব কিছু ভুলে যেয়ে পৃথিবীতে শান্তি বিরাজের কথা ভাবতে হবে” ।
এই বার্তা গুলো পৌঁছে দিতেই নাজমুন নেমে পড়েছেন পৃথিবীর পথে পথে। তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের মানুষ, আর্মি ক্যাম্প, আদিবাসীসহ সর্বস্তরের মানুষের কাছে যেয়ে বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও মানুষের জীবন যাপনের কথা তুলে ধরে বিশ্ব মানবতাবোধকে জাগিয়ে তুলছেন। বাংলাদেশের পতাকা হাতে তিনি  বিশ্ব শান্তির এক অনন্য দূত হিসাবেও কাজ করে যাচ্ছেন সারা বিশ্বে।
প্রতিকূলতার মাঝেও নির্ভয়ে পৃথিবী জয়ের কিছুকথা
যে নারী মৃত্যু ভয়ে পিছিয়ে যাননি, বাংলাদেশের পতাকা হাতে  জয় করে চলছেন এক এক করে প্রতিটি যাত্রা তিনি আমাদেরই মেয়ে নাজমুন, আমাদের বঙ্গকন্যা। তিনি বন্য প্রাণী ভরা জঙ্গলে রাত কাটিয়েছেন, গরুর কাঁচা মাংস খেয়ে ক্ষুধা নিবারন করেছেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দুর্গম আদিবাসীদের এলাকায় অভিযাত্রা করেছেন, ভ্রমন কালে কত বার না খেয়ে অতিক্রম করেছেন সময়। মৃত্যুকে হাতে নিয়ে বহু উচ্চ পর্বতশৃঙ্গ জয় করেছেন আমাদের এই মেয়ে, ঘুরে বেড়িয়েছেন সামুদ্রিক দ্বীপ পূঞ্জের দেশে। পৃথিবীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য দেখার জন্য বহু প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে তিনি এগিয়ে চলছেন দুর্বার গতিতে। যাত্রা পথে তার হৃদয়ে এবং মুখে প্রতিটি মুহূর্তে উচ্চারিত হয়েছে বাংলাদেশের কথা। তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস, আমাদের  সংস্কৃতি ও প্রকৃতির কথা, পরিচয় করে দিয়েছেন বাংলাদেশের পতাকা ও মানচিত্রকে।
এমন এডভেঞ্চারের কিছু অভিজ্ঞতার সূত্র ধরে নাজমুন বলেন, ”আমরাতো বিজয়ী জাতি। আমাদের ভয় পেলে চলবে না। ভয় পাওয়া মানে পিছিয়ে পড়া”।
তিনি বলেন, “আমার মনে পড়ে সেই সব দিনের কথা। দক্ষিণ ইথিওপিয়ার প্রচন্ড দাবদাহে ফোস্কা পড়েছিল আমার হাতে, তবুও আমার হাতে উঁচু করে ধরা ছিল বাংলাদেশের পতাকা। ওই ফোস্কা পড়া হাতের ব্যাথা আমাকে বহন করতে হয়েছিল আফ্রিকার পথে পথে। কনসো থেকে কেফার যাওয়ার পথে রাতে পাহাড়ী সব জংগলের বন্য প্রাণীর ভয়ানক আক্রমণ থেকে রক্ষা করে গাড়ি ড্রাইভ করার কথা ভাবলে এখনো বুকে শিহরণ জেগে উঠে।”
নাজমুন জানান তিনি মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন বহুবার। বলেন, “আজ পর্যন্ত  বেঁচে আছি, নিশ্বাস ফেলছি তা যেন এক আশীর্বাদ। মনে পড়ে সেই মৃত্যুমুখী মুহুর্ত গুলোর কথা। অনেক পাহাড়ি অঞ্চলে না খেয়ে থাকার কথা, ক্ষুধা পেটে গাছ থেকে ভেঙে কাঁচা মেজ আর কাঁচা বাদাম খাবার কথা। মনে পড়ে ইথিওপিয়াতে কাঁচা মাংস খাওয়ার কথা। আফ্রিকার এমন কিছু দুর্গম এরিয়াতে গিয়েছি, যেখানে কোনো পানি নেই, পানির জন্য হাহাকার। নদী ফেটে শুকিয়ে গেছে, সেই শুকনো নদীর কোনো জায়গা দিয়ে হয়তো একটু পানি পড়ছে, সেই পানি ছেঁকে ছেঁকে তুলে আনছে মানুষ, একটু পানির তৃষ্ণা মেটানোর জন্য।”
এডভেঞ্চারের স্মৃতিচারণ করে নাজমুন বলেন, “ভযঙ্কর সেই উগান্ডার বৃষ্টীভরা রাতের কথা ভুলবো না। জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষনে পড়তে হয়েছিল আমাকে। রাতের বাসে করে তখন উগান্ডার কাম্পালা থেকে রুয়ান্ডা যাচ্ছি। তখন মধ্যরাত, এতো বৃষ্টি হচ্ছিলো যে বাসের গ্লাস ভেদ করে পানি ভেতরে চলে আসছে। বৃষ্টি ভেজা রাস্তায় ড্রাইভার দুবার কন্ট্রোল হারানোর পর তৃতীয়বার গাড়ি ধাক্কা খেয়ে পড়লো গাছের সাথে, গাড়ির সামনের দিকের কিছু অংশ বাঁকা হয়ে গেলেও, সব মানুষ অক্ষত ভাবে বেঁচেছিল। বুক কেঁপে উঠেছিল কিছুক্ষনের জন্য। সেই মধ্যে রাতে আমাদেরকে বৃষ্টির মধ্যে ১ ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল গাড়ি ঠিক করা পর্যন্ত। প্লাস্টিক মুড়িয়ে বুকের মধ্যে করে ল্যাপটপ আর মোবাইল গুলোকে রক্ষা করেছিলাম উগান্ডার সেই জংলী গাছের নিচে দাঁড়িয়ে।পানি ভরা সেই উগান্ডা থেকে রুয়ান্ডার বর্ডার পায়ে হেঁটে অতিক্রম করার স্মৃতি ভুলতে পারিনা। মনে পড়ে কেনিয়ার নাইরোবি শহরে ভোর রাতের সেই গাড়ি দুঘর্টনার হাত থেকে বেঁচে যাওয়ার স্মৃতি।”
১৪২০০ ফুট উচ্চতায় পেরুর রেইনবো মাউন্টেনে অভিযাত্রার সময় আল্টিটিউড প্রব্লেমের কারণে মৃত্যুর কাছাকাছি যেয়েও বেঁচে যাওয়া, অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রীফের সেই সমুদ্রে স্নোর্কেলিংয়ের সময় মুখ থেকে পাইপ ছুটে সমুদ্রের লবনাক্ত পানি পেটে যাওয়ার তিক্ততা, কিউবাতে আখের রস খেয়ে বেঁচে থাকা, আমেরিকার ইয়েলো স্টোনের জঙ্গলে প্রচন্ড শীতে দুটো সুয়েটার, দুটো জ্যাকেট পরে তাঁবুতে  ঘুমানো, আইসল্যান্ডের ল্যান্ডমান্নালুগারের উঁচু পাথরের ভ্যালিতে হারিয়ে যাওয়া, বলিভিয়ার দ্বীপে অন্ধকার রাতে পথ খুঁজে নেয়ার সেই স্মৃতি, মধ্যে রাতে ইন্দোনেশীয় ইজেন কার্টারের সেই ভয়ঙ্কর ভলকানিক এডভেঞ্চার  সবই এখন নাজমুনের কাছে নির্ভয়ে পৃথিবী জয়ের এক একটি কাহিনী। অনেক প্রতিকূলতা থাকলেও তিনি এখনো থেমে যাননি। তিনি  ছুটে চলছেন পৃথিবীর এক পথ থেকে আরেক পথে।
যাত্রাপথের কিছু ভাল লাগার স্থান
নাজমুনের ভালোলাগা অপরিসীম। অসংখ্য স্মৃতির ঝুড়ি। দেখেছেন বহু কিছু, পরিচত হয়েছেন বহু মানুষের সাথে। তারই স্মৃতিচারণ করে নাজমুন বলছেন, “আমার দেখা সেরা সৌন্দর্যের দেশ আইসল্যান্ড, তবে পৃথিবীর সব দেশেই কোনো না কোন সৌন্দয্য লুকিয়ে আছে। বিধাতার এই সৃষ্টির ভান্ডার অতুলনীয়। এই পৃথিবীকে দেখলে অনেক বাস্তব জ্ঞান অর্জন করা যায়। আমার ভালোলাগার ঝুড়িতে আরো অনেক দেশের উল্লেখযোগ্য বিভিন্ন স্থান রয়েছে। যেমন, জাম্বিয়া এবং জিম্বাবুয়ের ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত, সোয়াজিল্যান্ডের কালচারাল ভিলেজ, লেসোথোর মাউন্ট নাইট, দক্ষিণ ইথিওপিয়ার কনসো, আরবামিঞ্চ,  উগান্ডার সোর্স অব নাইল রিভার, কেনিয়ার লেক নাকুরু, রুয়ান্ডার কিগালি শহর, বতসোয়ানার কাসানে আর চবে রিভার, দক্ষিণ আফ্রিকার ওয়াইল্ড নেচার। এছাড়াও দক্ষিণ আমেরিকা ও ক্যারিবীয় দ্বীপুঞ্জের অনেক দেশই ভালো লেগেছে।”
তিনি বলেন, “কিউবার হাবানা শহরের দেয়ালে দেয়ালে চমৎকার আর্ট, শহরের কোনে কোনে সেই মিউজিক কালচার, জ্যামাইকাতে বব মার্লির ট্ৰেন্স টাউন, ডোমিনিকান রিপাব্লিকের সাওনা দ্বীপ, আর্জেন্টিনার আন্দেস্ মাউন্টেন, উরুগুয়ের পুন্টা ডেল এস্তা, ব্রাজিলের ফোজ ডু ইগুয়াচু জলপ্রপাত, পেরুর মাচু পিসু, রেইনবো মাউন্টেন, চিলির মুন ভ্যালি, আমেরিকার ওল্ড এন্ড ফেইথফুল ভলকানিক গেইসার বেসিন, সুইজারল্যান্ডের আল্প্স পর্বতমালা, অস্ট্রেলিয়ার হোয়াইট হ্যাভেন বীচ, নিউজিল্যান্ডের মাউন্ট কুক, গ্রীসের সান্তোরিনি আইল্যান্ড, স্পেনের পালমা থেকে ভ্যালেন্সিয়া যাত্রা, ইতালির রোম শহরের সৌন্দর্য্য, জডার্নের পেট্রা, আবুধাবির শেখ জায়েদ মস্কসহ আরো অনেক কিছু আমার ভালো লেগেছিলো”।
পৃথিবীর সৌন্দর্য দেখার পাশাপাশি নাজমুন মানুষের হৃদয়ের স্বর্গের সৌন্দর্য্য ও দেখেছেন। যখনি কোনো বিপদের সম্মুখীন হয়েছেন তখনি পেছন থেকে কোনো এক এঞ্জেল এসে বলেছেন ‘ক্যান আই হেল্প ইউ’ ! বহু মানুষ পৃথিবীর পথে পথে সহযোগিতা করেছেন। সেই সব মানুষগুলো তার ভ্রমন স্মৃতির সাথে জড়িয়ে আছেন। তিনি দেখেছেন একজন আগন্তুকের প্রতি তাদের অপরিসীম যত্ন আর ভালোবাসা। তিনি বাংলাদেশের সমস্ত মানুষকে বিদেশী পরিব্রাজকদের প্রতি সহনশীল হওয়ার ও সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “বাংলাদেশের দর্শনীয় স্থানগুলো যদি পরিচ্ছন্ন থাকে আর নিরাপত্তা থাকে তাহলেই অনেক পরিব্রাজক আমাদের বাংলাদেশ ভ্রমণে আগ্রহী হবে। এ বিষয়ে সরকারের পাশাপাশি জনগণকেও সচেতন হতে হবে”।
তরুণ প্রজন্ম নিয়ে ভাবনা
পৃথিবী এডভেঞ্চারের দারুন সব ইন্সপেরেশনাল গল্পের মাধ্যমে নাজমুন বাংলাদেশের তরুণ সমাজকে জাগিয়ে তুলতে চান। ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, কলেজ ও সামাজিক ও মানবাধিকার সংগঠনে তার মোটিভেশনাল স্পীচের মাধ্যমে ব্যাপক সাড়া জমিয়েছেন তিনি। জনপ্রিয়তা ছুঁয়ে যাচ্ছে তার এই পৃথিবী ভ্রমনের গল্প।
এযাবৎ তিনি পেয়েছেন বহু অ্যাওয়ার্ড। ‘ইন্সপেরেশন গ্লোবাল ফাউন্ডেশনের’ মাধ্যমে তিনি তার এই উদ্যোগকে বাংলাদেশে শিশু কিশোর ও তরুণ-তরুণীদের তাদের স্বপ্নের যাত্রা পথে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য কাজ করে যাবেন বলে জানান।  তিনি মনে করেন, আমাদের শিশু ও তরুণরা অনেক সম্ভাবনাময়ী, তারা চাইলে অনেক কিছু নতুন নতুন আবিষ্কার করতে পারবে। মহাকাশে যাত্রা করতে পারবে, বিশ্বজয় করতে পারবে, আরও অনেক কিছু করতে পারবে। তার মতে তার জন্য প্রয়জন সঠিক গাইড লাইন, ছোটবেলা থেকেই নিজেকে মানুষ হিসেবে ভাবতে শেখা,  শিক্ষা, সচেতনতা, পরিশ্রম, আত্মনির্ভরশীলতা, বিনয় আর দেশাত্মবোধের চেতনা একজন মানুষকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। নাজমুন মনে করেন, অপরিসীম বিশাল ভাবনা একজন মানুষকে অনেক দূর নিয়ে যেতে পারে। তরুণদের নিয়ে নাজমুনের এই অগ্রযাত্রার ভাবনা আলোকিত করবে আমাদের অনেক মানুষকেই!
পরবর্তী যাত্রার পদক্ষেপ
নাজমুন জানান, তাঁর পরবর্তী সফর আফ্রিকার বাকি দেশগুলো ভ্রমণ ও বাই রোডে সেন্ট্রাল এশিয়ার সিল্ক রোড, পামির মালভুমি, কারাকোরাম পর্বতমালা পাড়ি দিয়ে তিব্বতের দিকে যাত্রা। এছাড়া ভ্রমনের বই লেখার কাজ দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তিনি বলেন, “জগতের সব অজানাকে কিভাবে জানার জন্য ছুটছি, কিভাবে বিশ্বালয়ে সব পাথর ভাঙা পর্বত শৃঙ্গ পাড়ি দিচ্ছি, একা চলেছি, ভয়কে জয় করে চলছি- তারই অনেক কথা থাকবে আমার লেখা বইয়ে।“
নাজমুন বলেন, “আফ্রিকার ভাস্কো দা গা মা  রুট ‘কেপ টূ কায়রো’ অর্থাৎ দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউন থেকে মিশরের কায়রো পর্যন্ত আফ্রিকার বাকি দেশ গুলো ভ্রমন করবো।” তিনি জানান, কেপটাউন থেকে নামিবিয়া হয়ে তিনি যাত্রা করবেন। যাত্রা পথে আফ্রিকার শান্তি মিশনে বাংলাদেশের যে সব আর্মি দুর্গম এলাকায় আছেন, তাদের সার্বিক অবস্থান পর্যবেক্ষণের জন্য তিনি তাদের সাথে দেখা করার ইচ্ছে রয়েছে তাঁর। নাজমুন বলেন, “আমাদের বাংলাদেশী আর্মিরা পৃথিবীর শান্তি রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছেন দিনের পর দিন। পৃথিবীর বিভিন্ন মিশনে বাংলাদেশিদের এই অবদানকে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন। পৃথিবী ও মানুষের প্রতি আমাদের এই শ্রদ্ধাবোধকে সবার কাছে পৌঁছে দিতে হবে”।
এইভাবেই এক এক করে নাজমুন বাংলাদেশের পতাকা হাতে ঘুরবেন বিশ্বের বাকি সব দেশে এবং বাংলাদেশকে আরো নানা ভাবে পরিচয় করিয়ে দিবেন পৃথিবীর মানুষের কাছে।
জন্ম ও শিক্ষা জীবন
নাজমুনের জন্ম লক্ষিপুরে। বাবা মোহাম্মদ আমিন একজন ব্যাবসায়ী ছিলেন। মা তাহেরা আমিন ছিলেন বাবার অতন্দ্র সহযোগী। এক আদর্শ শিক্ষিত পরিবারের ছোট সন্তান হিসেবে তার বেড়ে উঠা। দাদা আলহ্বাজ ফকীহ আহমদ উল্লাহ ১৯২৬ থেকে ১৯৩১ সাল পর্যন্ত আরবের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেন ঘোড়ায় চড়ে, পায়ে হেঁটে, জাহাজে করে। বাবা শোনাতেন পৃথিবীর বিভিন্ন গল্প, উৎসাহ দিতেন সব কাজে। ভালো ভালো সব বই কিনে দিতেন নাজমুনকে। পরিবারের ভাইবোনদের কাছ থেকেও তিনি অনেক সহযোগিতা পেতেন। শুধু তাই নয়, পড়াশুনায় ভালো ছিলেন বলে শিক্ষকরাও তাকে খুব ভালো বাসতেন। নাজমুন বলেন, সব কিছুর মাঝেই তার ভীষণ উৎসাহ কাজ করতো। পড়াশুনার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন, বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতেন। ছোট্ট জীবনের সেই পাঠশালা থেকে শিক্ষা নেয়া সেই নাজমুন আজ বিশ্বজয়ী হতে চলেছেন।
নাজমুন স্কুল কলেজ শিক্ষার পাঠ লক্ষীপুরেই শেষ করেছেন। তারপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নতকোত্তর করেন। ২০০৬ সালে শিক্ষা বৃত্তি নিয়ে তিনি সুইডেনের লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে যান এবং এশিয়ান স্টাডিজ বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন। এছাড়াও দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি তে ‘হিউমান রাইটস এন্ড এশিয়া’ বিষয়ে স্কলারশিপ পেয়ে আরেকটি ডিগ্রি অর্জন করেন নাজমুন। নাজমুন নাহারের জীবন, শিক্ষা আর এই বিশ্ব ভ্রমণ যাত্রার উদ্দীপনার পাশাপাশি দেশাত্ববোধের চেতনা এই দেশের প্রতিটি তরুণকে জাগিয়ে তুলবে। তারই হাত ধরে বাংলাদেশের পতাকা যাবে বিশ্বময়। ইতিহাসজয়ী এই পরিব্রাজক নারীকে মনে রাখবে বাংলাদেশের সমগ্র মানুষ।
নাজমুন নাহারের জীবন ও দুর্দান্ত ভ্রমণ জার্নিকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়- এই নারী কালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহসী নারী। দেশাত্ববোধে জাগ্রত প্রেরণাময়ী নারী তিনি। বাধা, বিঘ্ন, কষ্ট, মৃত্যু সব কিছুকে উপেক্ষা করে যিনি ছুটছেন লাল সবুজের পতাকা হাতে পৃথিবীর পথে পথে। অনেকেই ভ্রমণ করেন, কিন্তূ নাজমুনের ভ্রমণ এডভেঞ্চার নিঃসন্দেহে চ্যালেঞ্জিং। তিনি হাজার হাজার মাইল বাই রোডে জার্নি করেছেন পৃথিবীর এক দেশ থেকে আরেক দেশে। তিনি সেইলিং বোটে করে পার হয়েছেন সমুদ্র থেকে সমুদ্র। ভ্রমণ করেছেন অনেক দ্বীপ দেশ। সমুদ্রের গভীরে গিয়েছেন বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে। আজ তিনি হয়ে উঠেছেন তরুণ জাগরণের পথিকৃৎ। যাকে দেখে আমাদের এ প্রজন্ম এগিয়ে যাবে অনেক দূর।
জীবন দর্শন
এখন পর্যন্ত বিশ্বের ১১o টি দেশে বাংলাদেশের পতাকা বহনের মাধ্যমে বিশ্ব শান্তি ও মানবতার কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছেন নাজমুন। বিশ্বের বাকি দেশের মানুষের কাছাকাছি পৌঁছবেন খুবই শীঘ্রই। বাংলাদেশের পাশাপাশি বিশ্ববাসী গর্ব করবে তার বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার অভিযাত্রাকে। পৃথিবীর মানুষে মানুষে ভাতৃত্বের বন্ধন সৃষ্টির জন্য ‘এক পৃথিবী এক পরিবার’ স্লোগানে তিনি ছুটছেন  বিশ্বব্যাপী।
নাজমুন বিশ্বাস করেন, আমরা সবাই একই পৃথিবীর মানুষ একই সূত্রে গাঁথা। একই শেকড় থেকে আমাদের জন্ম, একই সূর্যের আলো পাই, একই আকাশের নিচে বসবাস করি। আমরা একই পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। তাই আমামদেরকে ধর্ম, বর্ণ, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ সব কিছু ভুলে যেয়ে বিশ্ব শান্তি ও মানবতার জন্য কাজ করতে হবে। এই চিন্তা মানুষ যখন নিজেদের ধারণ করবে, তখন বিশ্বে আর অশান্তি বিরাজ করবে না।
তিনি বলেন, “আমি যখন ভাবি মহাকাশের অন্য গ্রহ থেকে পৃথিবীর দিকে তাকালে পৃথিবীকে মনে হয় একটা ব্লু ডট। এই ব্লু ডট মহাশূন্যের মধ্যে ভাসমান একটি গ্রহ, যার নাম পৃথিবী, যেখানে আমরা বসবাস করি, বিভাজন করি মানুষে মানুষে, অল্প সময়ের জন্য আসা এই পৃথিবীতে ভেদাভেদে মেতে উঠি। আমাদেরকে সকল বৈষম্য ভুলে যেয়ে এই পৃথিবীর মানুষের সাথে মানুষের বন্ধন সৃষ্টি করতে হবে। যখনই আমরা সৃষ্টির এসব রহস্যকে গভীরভাবে অনুভব করতে পারবো তখনই আমাদের চিন্তার মাঝে মনুষত্যের মুক্তি মিলবে, পৃথিবীতে শান্তি মিলবে”।
নাজমুন বলেন, -”যখনি ভাবি এই মানব জন্ম আর পাবো না, এই পৃথিবীতে আর কখনো আসতে পারবো না, এই সুন্দর পৃথিবী আর দেখতে পাবো না-তখনি মনে হয় পৃথিবীর সব বিভাজন ভুলে যেয়ে সব মানুষকে ‘একই পৃথিবীর একই ঘরের মানুষ’ ভাবতে হবে। আমি পৃথিবীতে আসার সময় কোনো জাত নিয়ে আসিনি, আবার পৃথিবী থেকে যাওয়ার সময় কোনো জাতের সিল নিয়ে যাবো না। এই পৃথিবীর যত বর্ণের মানুষ আছে সবাই আমরা একই। যত ধর্মের মানুষ আছে সবাই আমরা এক। মানুষ ধর্মই আমাদের সবচেয়ে বড় ধর্ম”।
আর এই বার্তা গুলো পৌঁছে দিতেই নাজমুন নেমে পড়েছেন পৃথিবীর পথে পথে। তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের মানুষ, আর্মি ক্যাম্প, আদিবাসীসহ সর্বস্তরের মানুষের কাছে যেয়ে বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও মানুষের জীবন যাপনের কথা তুলে ধরে বিশ্ব মানবতাবোধকে জাগিয়ে তুলছেন। ২০০০ সালে তার  বিশ্ব ভ্রমনের প্রথম যাত্রায় ইন্ডিয়ার পাচামরিতে ‘ইন্টারন্যাশনাল এডভেঞ্চার প্রোগ্রামে অংশ গ্রহণের মাধ্যমে তিনি বিশ্বের আশিটি দেশ থেকে আসা ছেলে মেয়েদের সামনে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের মাধমে বিশ্ব শান্তি ও একত্বতার কথা তুলে ধরেন! তারপর পর থেকে এখন পর্যন্ত তিনি চলছেন পৃথীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে।  Congratulations  নাজমুন।
নাজমুন তার মাকে নিয়েও ঘুরেছেন ১৪ টি দেশ। তার জীবনযাত্রা নিয়ে বিভিন্ন দেশি-বিদেশী পত্রিকায় দুইশোটির বেশি ফিচার স্টোরি হয়েছে। অনেক টিভি চ্যানেলে তার জীবন নিয়ে অনেক ডকুমেন্টারী হয়েছে, লাইভ শো করেছেন, বিভিন্ন প্রোগ্রামে অনেক মোটিভেশনাল স্পিচ দিয়েছেন। পৃথিবী জুড়ে শিশু ও তরুণ তরুণীদের নানা ভাবে উৎসাহিত করছেন।
নাজমুনের জন্মই যেন ভ্রমনের মাধ্যমে  বিশ্ব মানবতার কাছাকাছি পৌঁছানো, তাদের জন্য কাজ করে যাওয়া। তিনি আজ বিশ্ব তরুণ জাগরণের পথিকৃৎ। ছোটবেলা থেকেই পড়াশুনার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে সবসময় অবহেলিত মানুষদের জন্য কাজ করতেন। তিনি বাংলাদেশ গার্লস গাইড এসোসিয়েশন, ইয়ুথ এন্ডিং হাঙ্গার, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরসহ বিভিন্ন সংগঠনের এক্টিভ লিডারশীপের মাধ্যমে বহু বছর মানুষের জন্য কাজ করেছেন। তার সেই মানবতাবোধের চেতনা এখন ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বব্যাপী।
এক সময় আমরা কবিতায়, গানে, গল্পের মাঝে পড়তাম নারীরা বিশ্ব জয় করবে, আজ তার বাস্তব প্রমান নাজমুন নাহার। তিনি নারী জাগরণের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়ার প্রকৃত অনুসারী। তিনি  আমাদের গর্ব। তাকে দেখে অনুপ্রাণিত হোক এদেশের লক্ষ কোটি মানুষ।  তিনি ছোটবেলা থেকে যেভাবে নিজেকে বড় করে ভাবতে শিখেছেন, তার ভাবনার মতো করে ভাবিত হোক  বাংলাদেশের প্রতিটি নারী।
বাংলাদেশের পতাকাবাহী প্রথম বিশ্বজয়ী নারী পরিব্রাজক নাজমুন নাহারের জীবন, শিক্ষা আর এই বিশ্ব ভ্রমণ যাত্রার উদ্দীপনার পাশাপাশি দেশাত্ববোধের চেতনা এই দেশের প্রতিটি তরুণকে জাগিয়ে তুলুক, ইতিহাসজয়ী এই পরিব্রাজক নারীর প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা, অভিনন্দন। বাংলাদেশের সমগ্র মানুষ তাঁকে মনে রাখবে অনন্তকাল।

কমেন্ট করুন

...

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Blog single photo
June 7, 2019

Frandup

Cheapest Cialis 5 Mg Achat Viagra Soft levitra coupon free trial Viagra Alternativen Viapro Name Brand Cialis Online Filitra 20

(0) Reply
Blog single photo
July 25, 2019

Frandup

Buy Real Viagra No Prescription Be Tab Prednisone 5 Mg Methylprednisolone Black Market cialis tablets for sale Venta Cialis En Farmacias Finax And Propecia Buy Antibiotics Online Legal

(0) Reply
Blog single photo
June 15, 2019

Frandup

Cialis E Desiderio Cheap Kamagra Bangkok Buy Diflucan Online viagra Buying free shipping isotretinoin isotrex best website Buy Zyvox Online

(0) Reply
Blog single photo
May 31, 2019

Frandup

Amoxil Dose For Dogs Baclofene Geneve buy viagra Cialis 5 Mg Lilly Kamagra Singapore Where To Purchase Generic Stendra Erectile Dysfunction Tablets

(0) Reply
Blog single photo
June 22, 2019

Frandup

Viagra Toronto Store Cialis Pas Cher cialis 40 mg Price Of Lasix

(0) Reply
Blog single photo
July 1, 2019

Frandup

Buy Now Doxycycline Claravis Bentyl Coligon Where To Purchase Ups comprar kamagra internet Hay Viagra Generico Propecia Naturelle

(0) Reply
Blog single photo
July 17, 2019

Frandup

Aceclofenac generic cialis overnight delivery Medicament Ou Amoxil Kamagra Australian Customs Cialis Funziona Forum

(0) Reply
Blog single photo
July 9, 2019

Frandup

Real Dutasteride Medication Internet Buy Cialas In Canada Cialis Niedriger Blutdruck viagra Cephalexin For Urinary Tract Infection

(0) Reply
Top