logo
news image

শখের বশে পাখি দিচ্ছে বাড়তি আয়

নিকুঞ্জ বিহারী দেব।  ।  
চঞ্চল পোষা পাখির মধ্যে খুব সহজেই সবার দৃষ্টি কাড়ে বাজরিকা পাখি । আকার ও রঙের বৈচিত্র্যের কারণে সবার কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছে পাখিটি। অতিসহজে যেকোন পরিবেশে খাঁচার পাখি হিসাবে আমাদের দেশে বাজরিকা প্রশংসিত পাখি। তাছাড়াও এর লালন-পালনের ব্যয় খুব একটা বেশি নয়। প্রজনন ক্ষমতা বেশি হওয়ায় এরা অনেক বাচ্চা উৎপাদন করে যা থেকে যে কেউ চাইলেই বাড়তি আয় করতে পারে । জাত, বৈচিত্র্য, রঙ, গঠন ও আকৃতি অনুসারে বিভিন্ন প্রকারের হয়। পাখিপালন মূলত এভিয়ারি শিল্প হিসাবে পরিচিত।
বর্তমানে বাজরিকা পাখি, পালকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। শখের বশে শুরু করলেও বর্তমানে নাটোরেও এই পাখি পালন করে অনেকেই বাড়তি আয় করছেন।
ন্যাচারাল বাজরিকা সাধারণত ১৮ সে.মি. পর্যন্ত লম্বা ও ৮ থেকে ১০ বছর জীবিত থাকে। সাধারণত সবুজ, আকাশী, সাদা, হলুদ, গাঢ় লাল রঙের হয়ে থাকে। একজোড়া পাখি থেকে প্রায় ৬-৭ রঙের পাখি হয়। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মিউটেশন করে পাখি উৎপাদন করা হয়। এই পাখিকে বলা হয় ‘কেজবার্ড’। এই নামের কারণ হচ্ছে তাদের খাঁচায় জন্ম, খাঁচায় বসবাস আবার খাঁচাতেই মৃত্যু। এই পাখিপালন কেজবার্ড বা এভিআরি শিল্প নামেও পরিচিত। খাঁচার ভেতর খাদ্য ও উপযুক্ত পরিবেশ করে দিলে এরা খাঁচাতেই স্বাছন্দবোধ করে এবং প্রচুর পরিমাণে ব্রিফ করে ও বাচ্চা তোলে যা অন্য পাখির মধ্যে তেমন একটা দেখতে পাওয়া যায় না।
এরা মূলত মাটির ব্যাংকের ভেতর ডিম পাড়ে এবং বাচ্চা ফোটায়। বেশির ভাগ সময় ডিমে তা দেয় মহিলা পাখি, তবে পুরুষ পাখিও মাঝেমাঝে ডিমে তা দেয়। প্রথম অবস্থায় ডিম পাড়ে ৩-৪ টি, পর্যায়ক্রমে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৭-৯ টি। সব ডিম থেকে বাচ্চা ফোটে না। কোন কোন সময় সব ডিমে বাচ্চা ফোটে। একবার ডিম দেয়া শুরু করলে ডিম দেয়া ও বাচ্চা ফোটানো চলতেই থাকে। ২২-২৫ দিনের মধ্যে বাচ্চা ফোটে। তা দেয়ার পর বাচ্চা না ফুটলে মাটির ব্যাংকের ভেতর থেকে ডিম ফেলে দেয়। বাজরিকা পাখি ৬ মাসেই প্রাপ্তবয়স্ক হয়। কন্ঠস্বর অতি ঝাঁঝালো ও চঞ্চল, এরা সবসময় কিচিরমিচর কলরবে ব্যস্ত থাকে। চিনা কাউন, দুধ কাউন ও উনুনের পোড়া মাটি এদের প্রধান খাদ্য। এরা উনুনের পোড়া মাটিও খায় যেটা এদের শরীরে এন্টিবায়টিক হিসাবে কাজ করে।
বর্তমানে নাটোর শহরে এই পাখি পালন ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। অনেকেই শখের বশে এই পাখি পালন শুরু করছেন। তবে কেউ কেউ পাখি পালন থেকে আর্থিকভাবে লাভবানও হচ্ছেন।নাটোরের হাফ রাস্তায় রয়েছে পাখির বিপণন বিতান। নানা ধরনের পাখি সাজানো আছে দোকানে। অনেক ধরনের পাখি এখানে পাওয়া গেলেও বেশি বিক্রি হয় বাজরিকা পাখিটিই।
কথা হয় দোকানির সাথে। দোকানের মালিক আমিনুল ইসলাম সুমন জানান, শখের বশেই তার এই পেশায় আসা। ২০০৫ সালে তিনি এই দোকান প্রতিষ্ঠা করেন, তবে তা আরও আগে, মোটামুটি ১৯৯৯ সালের দিকে। তিনি জানান, ছোটবেলা থেকেই পাখি পালনের প্রতি একটা দুর্বলতা রয়েছে আমার। বাজারে পাখি দেখলেই কিনে নিয়ে বাড়িতে যেতাম। বাড়ি থেকে সেজন্য বকাবকিও করত। তারা বলত পাখি মুক্ত প্রাণি, ছেড়ে দাও। এই বলে ছেড়ে দিত। আমি পাখির জন্যে কাঁদতাম। বেশ মনে আছে ১৯৯৯ সালে আমি রাজশাহী গিয়েছিলাম। ওখানে বাসস্ট্যান্ড থেকে একটু এগিয়ে যেতেই দেখি কয়েকটি পাখির দোকান। আমার মনের ভেতর আনন্দে ভরে উঠে। আমি দোকানদারকে জিজ্ঞাসা করি, আপনারা কি পাখিগুলো বিক্রি করেন? এই পাখির নাম কি? দাম কত? তারা বললেন হ্যাঁ বিক্রি করি, এগুলো পাখির নাম বাজরিকা। একজোড়া পাখির দাম ৩৫০ টাকা। সুমন আরো জানান আমি একটি খাঁচা, একজোড়া পাখি, খাদ্য দেয়ার পাত্র, ডিম দিয়ে বাচ্চা ফোটাানোর জন্য একটি মাটির ব্যাংক কিনে নিয়ে এসেছিলাম, সেই থেকে শুরু।
এখন তার কাছে বিভিন্ন রকমের পাখি আছে। বেশ কয়েক ধরনের বাজরিকা পাওয়া যায় তার দোকানে। প্রকার ভেদে এসব পাখির দামেও রয়েছে ভিন্নতা। লোকাল, ইংরেজি, কেসটেজ, স্পাইড, স্পেন্ডেল, ডেনসি, সিল্কিসহ নানা ধরনের বাজরিকা পাওয়া যায়। এদের মধ্যে লোকাল বাজরিকার সবচেয়ে দাম কম হওয়ায় এর চাহিদা একটু বেশি। সাধ ও সাধ্যের মধ্যে হওয়ায় আমরা লোকাল বাজরিকা বেশি উৎপাদন ও সরবরাহ করি।
খাঁচার পাখি হওয়ায় এদেরকে মুক্ত আকাশে ছেড়ে দিলে মারা পড়তে পারে কারণ এরা নিজরা খাদ্য সংগ্রহ করতে পারে না। তাছাড়া অন্য পাখি দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে, মেরেও ফেলতে পারে। আবার মাটিতে পড়লে বেড়াল, কুকুর, বেজির আক্রমণের শিকার হতে পারে। নাটোরের অনেকেই এই পাখি পালনকে অতিরিক্ত আয়ের উৎস হিসোবে বেছে নিয়েছে। এরকমই একজন মেঘনাথ মিঠু। সদর উপজেলার ৩নং দিঘাপতিয়া ইউনিয়নের মেঘনাথ মিঠুর বাড়িতে প্রায় ৫৫ জোড়া বাজরিকা পাখি আছে। মিঠু জানান, সুমন ভাইয়ের দোকান থেকে চার বছর আগে দুই জোড়া পাখি এনেছিলাম, এখন প্রতি তিন মাসে সুমন ভাইয়ের কাছে ৪৫ থেকে ৫০ পিচ পাখি বিক্রি করি। তাতে খাদ্যের দাম বাদে মাসে প্রায় তিন হাজার টাকার মত লাভ থাকে। তিনি আরও বলেন পাখি পালন করলে মন আনন্দে ভরে যায়। ছোট ছোট বাচ্চারা স্কুলে যাওয়া-আসার সময় পাখি দেখে আনন্দ পায় এবং তারা আমাকে অনেক প্রশ্ন করে। তারা পাখিদের সাথে কথাও বলে। এটা আমার বেশ ভালো লাগে।
শহরের লালবাজার মহল্লার প্রহলাদ কর্মকারও এই পাখি পালন শুরু করেছেন। তিনি জানান প্রায় দুই বছর ধরে পাখি পালন করছি। লাভের মুখ সেইভাবে দেখা হয়নি, তবে লোকসানও হয়নি। বর্তমানে আমার ১৩ জোড়া পাখি যেটা মাত্র ২ জোড়া পাখি থেকে হয়েছে। যে পরিমাণ পাখি বিক্রি করেছি তা দিয়ে খাদ্য ও ঔষধ কিনেছি। তবে আমার মনে হয় খুব শিঘ্রই লাভের মুখ দেখব। তবে সবচেয়ে বেশি ভাল লাগে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা পাখি দেখার জন্যে ভিড় করে। তাদের আনন্দ দেখে আমারও ভাল লাগে।
সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকতা ডা: মো. সেলিম উদ্দীন জানান, বিগত দিনের চেয়ে বর্তমানে বাজরিকা পাখি পালন অনেকাংশে বেড়েছে। উচ্চবিত্ত পরিবারে থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে অনেকেই শখের বশে এই পাখি পালন করে লাভবান হচ্ছে। বাজরিকা পাখির চিকিৎসা-সেবা ও পরামর্শ নিতে আমাদের কাছে অনেকেই আসে। সাধারণত এই পাখি চুনা পায়খানা হলে এবং ঠান্ডাজনিত রোগে মারা যায়। চিকিৎসা সেবা পেলে সুস্থ্য হয়ে যেতে পারে। তবে হাঁস-মুরগির যেমন রোগ প্রতিরোধের টিকা প্রদান করা হয় এই পাখির রোগ প্রতিরোধের তেমন টিকা পাওয়া যায় না।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা: মো. বেলাল হোসেন জানান, যে কেউ এই পাখি শখের বশে পালন শুরু করতে পারে। এতে যেমন করে মানসিক আনন্দ পাওয়া যেতে পারে তেমনি আর্থিকভাবেও লাভবান হওয়া সম্ভব। শুধু শখেই না, যদি খামারিরা বাণিজ্যিকভাবে বাজরিকা পাখি পালন করে তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও এর প্রভাব বেশ ভাল পড়বে এবং দেশ সমৃদ্ধশালী হবে।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top