logo
news image

বিনে পয়সার ট্রাফিক নবাবগঞ্জের মুজা পাগলা

প্রাপ্তি প্রসঙ্গ ডেস্ক।  ।  
মো. মোফাজ্জর মুজা। স্থানীয়দের কাছে পরিচিত মুজা পাগলা নামে। ৩০ বছর ধরে পুলিশের পুরনো পোশাক পড়ে ঢাকা-বান্দুরা আন্তঃ মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে বিনে পয়সায় দিয়ে যাচ্ছেন ট্রাফিক সেবা। দেখলে পুলিশ সদস্য মনে হতে পারে কিন্ত মুজা পাগলা কেবলই একজন স্বেচ্ছাসেবী ট্রাফিক। শুনুন তাঁর কষ্টগাঁথা জীবনের পেছনের গল্প।  
পরনে পুলিশের পুরনো একটি পোশাক, মাথায় ধর্মীয় টুপি, পায়ে ছেঁড়া একটি স্যান্ডেল, মুখে বাঁশি আর হাতে একটি বেঁতের লাঠি। সকাল থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত বিরামহীনভাবে রাস্তায় যানজট নিরসনে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। লিকলিকে শরীরের ৫০ বছরের এই ব্যক্তিটির নাম মো. মোফাজ্জর মুজা। ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার বাহ্রা ইউনিয়নের উত্তর চৌকিঘাটা গ্রামের মৃত হায়াত আলীর ছেলে। স্থানীয়রা তাকে মুজা পাগলা নামেই চেনে।
৩০ বছর ধরে পুলিশের পুরনো রংচটা পোশাক পড়ে ঢাকা-বান্দুরা আন্তঃমহাসড়কের কোমরগঞ্জ, আগলা, টিকরপুর  বেনুখালীর  চৌরাস্তার  মোড়ে ট্রাফিক সেবা দিচ্ছেন তিনি। জানা যায়, মুজার পরিবারের সদস্য সংখ্যা ছয়জন। মা হাওয়া বেগম, স্ত্রী আয়েশা বেগম, ছেলে স¤্রাট (২০) ও দুই মেয়ে নওশিন (১৭) এবং মিথিলা (৭)। কষ্টের গল্প হচ্ছে, ছয় সদস্যের পরিবারে মুজাসহ চারজনই প্রতিবন্ধি। ছেলে স¤্রাট ও নওশিন বাক ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধি। স্ত্রী আয়েশা দৃষ্টি প্রতিবন্ধি। অর্থের অভাবে চিকিৎসাও করাতেও পারছেন না তারা। সুচিকিৎসার অভাবে এরই মধ্যে শরীরে দানা বেঁধেছে নানা রোগ। অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারটির কপালে জুটেছে মাত্র একটি বয়স্ক ভাতা। পরিবারে চারজন প্রতিবন্ধি ব্যক্তি থাকলেও প্রতিবন্ধি ভাতা জোটেনি এখনো। প্রতিবেশিরা জানান, জন্মের পর থেকেই মুজার শারীরিক সমস্যা রয়েছে। বুদ্ধি ও বাক প্রতিবন্ধি মুজাকে সবাই এলাকায় মুজা পাগলা নামেই চিনে। ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত সৎ ও ধার্মিক স্বভাবের মানুষটি পরপোকারীও।
মুজার ভবিষ্যত কি, কিভাবে জীবিকা নির্বাহ করবে? পরিবার যখন এমন দুঃচিন্তায় মগ্ন তখন তাদের পাশে এসে দাঁড়ান স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল বাতেন মিয়া। এটাও প্রায় ৩০ বছর আগের কথা। আওয়ামী লীগের জাতীয় কমিটির সদস্য বাতেন মিয়া মুজাকে কোমরগঞ্জ স্ট্যান্ডে যানজট নিরসনে কাজে লাগিয়ে দেন। মুজাও মহাআনন্দে কাজ করতে থাকে। গাড়ির মালিক ও চালকরা খুশি হয়ে তাকে যে বকশিস দিত সেই টাকাই চলে তার সংসার। এখনও সে বকশিস পায় তবে তা বর্তমান বাজার তুলনায় খুবই নগণ্য। কিন্তু দায়িত্ব আরও বেশি নিয়েছে মুজা পাগলা। এখন সে নবাবগঞ্জ সড়কের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্পষ্টে দায়িত্ব পালন করে। তারা জানা রয়েছে কোন স্পটে যানজট কখন বেশি। দায়িত্ব নিয়ে সময়মতো ঠিকই চলে যায় সেখানে।
বৃহস্পতিবার (১৮ অক্টোবর) আগলা স্ট্যান্ডে গিয়ে দেখা যায়, পুলিশের রংচটা একটি পোশাক পরে যানজট নিরসনে কাজ করছে মুজা পাগলা। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে মুজা পাগলা হুইসেল বাজিয়ে যানবাহন নির্বিঘেœ চলাচল করার জন্য সহযোগিতা করছেন। বাস বা বড় কোন গাড়ি আসলেই গাড়ির সামনে দৌড়ে যেতে দেখা যায় তাকে। গাড়ির সামনে থেকে সকল যানবাহন  সরিয়ে দিচ্ছে  যাতে অন্য কোন গাড়িকে যানজটে পরতে না হয়। প্রাইভেটকার দেখলেই তিনি যানজট ছাড়িয়ে সালাম দিয়ে সামনে দাঁড়ান কিছু বকশিসের জন্য। কেউ ৫/১০ টাকা দিচ্ছে আবার কেউ না দিয়েই চলে যাচ্ছে। এতে আফসোস নেই তার, আবারও যানজট নিরসনে কাজে লেগে পড়েন। বৃষ্টি ঝড় মথায় নিয়ে পুরোদস্তÍর ট্রাফিকের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন এই ব্যক্তিটি। সামান্য এ আয় দিয়েই কোনরকম সংসার চালাচ্ছেন তিনি। অনেকে আবার ভালবেসে চলতি পথে বিস্কিট, চিপসসহ বিভিন্ন খাবার দিয়ে যায় তাকে।
মুজার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছেন মুজার স্ত্রী আয়েশা বেগম। মাকে রান্নার কাজে সাহায্য করছেন ছেলে স¤্রাট। আর মেয়ে নওশিন বাড়ির উঠান পরিষ্কার করতে ব্যস্ত। দেখে বুঝার উপায় নেই ওরা বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। প্রতিবেদককে দেখে লজ্জায় কাজ বন্ধ করে দেন ওরা।  
কথা হয় মুজার স্ত্রী আয়েশার বেগমের সাথে। তিনি প্রতিবেদকের সাথে কথা বলার শুরুতেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। অশ্রু ভেজা চোখে বলেন, ‘আমাদের প্রতিবন্ধী পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তিই আমার স্বামী। খুব ভাল মানুষ। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ফজরের নামাজ পরে তার মা হাওয়া বেগমকে সালাম করে কাজে বের হন তিনি। সারাদিন রাস্তায় থেকে কোনদিন ৮০ টাকা, ১০০ টাকা বা ১৫০ টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরেন। যেদিন বেশি টাকা আয় করেন সেদিন মায়ের জন্য পান-সুপারীসহ নানা খাবার কিনে আনেন। তবে মাকে সালাম না করে কখনো ঘর থেকে বের হন না তিনি।’
বাড়িতে সাংবাদিক আসার খবর পেয়ে কথা বলার একপর্যায়ে বাড়িতে আসেন মুজা পাগলা। প্রথমে প্রতিবেদকের কাছে কষ্টের কথা বলতে রাজি না হলেও একপর্যায়ে প্রতিবেদকের সখ্যতা গড়ে ওঠে তাঁর সাথে। নিজের র্দুদশার কথা বলে সরকারের কাছে সাহায্যের আবেদন করেন। তার কথাগুলো ছিল অস্পষ্ট। তবে তার আবেদনগুলো ছিল মানবিক। কথা বলার ফাঁকেই যোহরের নামায পড়তে যান মুজা। কখনো নামাজ বাদ দেন না তিনি।
আয়েশা বেগম আরো বলেন, বাতেন ভাই আমাদের পরিবার ও তার অবস্থা দেখে প্রথমে তাকে কোমরগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে ট্রাফিকের কাজ ধরিয়ে দেন এবং গাড়ি চালকদের  সাহায্য  করার  কথা  বলে  দেন।    তবে সেখানে আয় ভাল না হওয়ায় পরিবারের ভরণপোষন করার তাগিদে কোমরগঞ্জ ছাড়াও আগলা, টিকরপুর বেনুখালীর চৌরাস্তার মোড়ে ট্রাফিক সেবা দিতে চলে যায় সে। টাকার অভাবে লোকটাকে চিকিৎসাও করাতে পারছি না। সন্তান দুটো জসন্মগতভাবে  প্রতিবন্ধী। ওদেরকেও কখনো উন্নত চিকিৎসা করাতে পারি না। আমার ছেলেটাও মানুষের বিভিন্ন কাজে সাহায্য করে। কেউ কখনো ১০/২০ টাকা দেয় আবার কখনো টাকা পয়সা দেয় না। অনেক কষ্টে চলে আমাদের সংসার। মেয়েটা সবসময় বিয়ের কথা বলে। আমি তো মা ওর কথা শুনে কষ্ট হয়। একা একা কান্না করি, আমার সন্তাদেরকে কেন আল্লাহ এভাবে শাস্তি দিল ?
মোফাজ্জরের প্রতিবেশি নিশাদ আক্তার জানান, ‘মুজা কাকা অত্যন্ত সৎ একজন মানুষ। সন্তানদের পাশাপশি আমাদেরও সৎ থাকার পরামর্শ দেন। সারাদিন পরিশ্রম করে তবুও কখনো অসৎ পন্থা অবলম্বন করেন না। অনেক সময় টাকার অভাবে না খেয়ে থাকে। পাশের বাড়ি লোকজন তাদের খাবার দিয়ে গেলে তারা খায়। দু’মুঠো খাবারের জন্য মুজা কাকার স্ত্রীও অন্যের বাড়িতে কাজ করে। এভাবে কোনমতে চলে তাদের সংসার। তিনি আরও বলেন, মেয়েটা কারও বিয়ে দেখলেই পাগল হয়ে যায়। কান্নাজড়িত কন্ঠে তাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য বলে।’
মুজা পাগলার ছেলে সম্রাট ও নওশিনও হাউমাউ করে হাত নেড়ে কথা বলার চেষ্টা করেণ এই প্রতিবেদকের সাথে। বলতে চায় নিজেদের দুঃখের কথা। কিন্ত কথা স্পষ্ট না হওয়ায় মা আয়েশার বেগমের মধ্যস্থতায় বুঝতে হয় তাদের কষ্টের কথা।
মুজার ছোট ভাইয়ের বউ ময়না বেগম বলেন, মুজা ভাইয়ের পরিবারের একটি মেয়ে বাদে সবাই প্রতিবন্ধী। মুজা ভাই শুধু একটা বয়স্ক ভাতা পায়। এছাড়া আর কোন ভাতাই পায় না পরিবারটি।  আমরাও গরিব। তাই সব সময় তাদের সাহায্য করতে পারি না। মেয়েটা সবসময় বিয়ের কথা বলে তখন খুব কষ্ট হয়। কিন্ত কি করব বলেন, একে তো সামর্থ্য নেই, তার উপর মেয়েটার মানসিক সমস্যা।
নবাবগঞ্জের ইজিবাইক চালক শাহীন মোল্লা বলেন, আগলা মোড়ে সব সময় যানজট লেগেই থাকে। মুজা চাচা সারাদিনই যানজট নিরসনে কাজ করে। খুশি হয়ে কেউ ৫/১০ টাকা দেয় আবার বেশিরভাগই দেয় না। ওনি না থাকলে এখানে প্রতিনিয়ত যানজট লেগেই থাকতো। আমরা চাই ওনাকে সরকারিভাবে সহযোগিতা করা হোক।
স্থানীয় ব্যবসায়ী সৌরভ বলেন, আগলায় সবসময় যানজট থাকে। মুজা ভাই যদি না থাকতো তাহলে আমাদের ব্যবসা করতেই কষ্ট হত। কিন্ত আমরা তার জন্য কিছুই করতে পারি না। লোকটা অত্যন্ত সৎ।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. সিকিম আলী বলেন, মুজাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি। অত্যন্ত সৎ একজন মানুষ। দরিদ্র পরিবারটি খুব কষ্টে দিনাতিপাত করে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আগলা মোড় সহ বিভিন্ন স্থানে স্বেচ্ছায় ট্রাফিকের কাজ করে। আমি সবসময় তাকে সাহায্য করার চেষ্টা করি। প্রতিবন্ধী ভাতার তালিকায় তাদের নাম দেওয়া হয়েছে। কিন্ত কি কারণে পাচ্ছে না আমি নিজেও অবগত নই। আমি চেষ্টা করব তারা যেন দ্রুত প্রতিবন্ধী কার্ড পায়।
নবাবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তোফাজ্জল হোসেন বলেন, আমিও লোকটাকে দেখেছি যানজটে নিরসনে কাজ করে যাচ্ছে। কেউ খুশি হয়ে বকশিস দিলে সেই টাকা দিয়েই চলে ওনার সংসার। আসলে সেভাবে ভাবিনি কখনো। আপনার বলাতে বিষয়টা মাথায় কাজ করছে। মানুষটার জন্য কিছু করা দরকার। সে যাতে সহযোগিতা পায় আমি সেই ব্যবস্থাই করব।
ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শাহ মিজান শাফিউর রহমান বলেন, আপনার কাছ থেকেই আমি প্রথম লোকটার সম্পর্কে অবগত হলাম। খোঁজখবর নিয়ে তাকে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে এবং খুব দ্রুত।

কমেন্ট করুন

...

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top