logo
news image

জাল সনদে চাকরি অতঃপর অবসরের প্রাক্কালে ধরা খেল ডিসিসি কর্মকর্তা

প্রাপ্তি প্রসঙ্গ ডেস্ক।।

জাল শিক্ষা সনদ দিয়ে ৩১ বছর আগে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসাবে ঢাকা সিটি করপোরেশনে চাকরি নিয়েছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান। এই ৩১ বছরে তিনি চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী থেকে হয়েছেন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা। কিছুদিন পরই তিনি অবসরে যাবেন। ঠিক এ সময়েই ধরা পড়ল তার সনদ জালিয়াতির বিষয়টি। এখন তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)।

বর্তমানে তিনি ডিএসসিসির অঞ্চল-৫-এ (সায়েদাবাদ এলাকা) উপ-কর কর্মকর্তা। ঘনিষ্ঠদের বলেছিলেন, আগামী মার্চ মাসেই তিনি অবসরকালীন ছুটিতে যাবেন। যারা বিষয়টি জানেন তারা যেন একটু ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখেন। কিন্তু কেউ একজন বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন। তখনই বাধে বিপত্তি। অবশ্য তিনি দাবি করেন ষড়যন্ত্রের শিকার। তার সনদপত্র ঠিকই আছে। 

মোস্তাফিজের বিভাগীয় প্রধান ডিএসসিসির ভারপ্রাপ্ত প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা সাইদুর রহমান। তিনি বলেন, মোস্তাফিজের সনদ জালিয়াতির বিষয় সংবলিত একটি চিঠি তার কাছেও এসেছে। কিন্তু প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ছুটিতে থাকায় এ ব্যাপারে তিনি কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেননি। তিনি কয়েকদিনের মধ্যেই কর্মস্থলে যোগ দেবেন। তখন তাকে বিষয়টি অবহিত করবেন।

ডিএসসিসির সহকারী সচিব (সংস্থাপন) মো. আরশাদ এ ব্যাপারে বিস্তারিত বলতে অস্বীকৃতি জানান। তবে এটুকু বলেন, মোস্তাফিজের সম্পর্কে এ ধরনের আলোচনা চলছে। সনদ জালিয়াতির শাস্তি কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ধরনের অপরাধের শাস্তি হলো প্রথমেই অভিযুক্তের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের। প্রমাণিত হলে পরবর্তী সময়ে চাকরিচ্যুত করে ফৌজদারি মামলা দায়ের। পাশাপাশি বেতন-ভাতা বাবদ এতদিনে যে পরিমাণ অর্থ তিনি করপোরেশন থেকে গ্রহণ করেছেন সেটা ফেরত নেওয়া। 

জানা গেছে, বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জের অম্বিকাপুর গ্রামের আবদুর রহমানের ছেলে মোস্তাফিজ ১৯৮৭ সালের ১০ আগস্ট অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনে রিভ্যালুয়েশন ক্লার্ক (চতুর্থ শ্রেণির পদ) হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। ১৯৯১ সালে তিনি পদোন্নতি পেয়ে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী পদে হিসাব সহকারীর (লোয়ার ডিভিশন ক্লার্ক) দায়িত্ব পান। পরে ২০০৬ সালে তিনি দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে উচ্চমান সহকারী কাম হিসাবরক্ষক পদে চলতি দায়িত্ব পান। কিন্তু ওই পদে তাকে স্থায়ী করা হয়নি। তা সত্ত্বেও গত ৩০ সেপ্টেম্বর তাকে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে উপ-কর কর্মকর্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

ডিএসসিসির সাচিবিক দায়িত্ব পালনকারীরা জানান, মোস্তাফিজকে উচ্চমান সহকারী কাম হিসাবরক্ষকের পদে স্থায়ী না করেই তাকে উপ-কর কর্মকর্তার দায়িত্ব দেওয়াটা সিটি করপোরেশনের চাকরিবিধির লঙ্ঘন। নিয়ম অনুযায়ী কোনো পদে স্থায়ী না হলে কেউ উচ্চতর পদে যেতে পারেন না। এমনকি উচ্চতর পদের অতিরিক্ত বা চলতি দায়িত্বও পেতে পারেন না। কিন্তু আগের পদে স্থায়ী না করেই তাকে উচ্চতর পদে বসানো হয়েছে। 

সম্প্রতি মোস্তাফিজের সনদ জালিয়াতির বিষয়ে ডিএসসিসিতে একটি অভিযোগ জমা পড়ে। এরই সূত্র ধরে কর্তৃপক্ষ তার ব্যক্তিগত ফাইল যাচাই-বাছাই করে। সেখানে দেখা যায়, তিনি যে সনদ জমা দিয়ে চাকরির আবেদন ও চাকরিতে যোগদান করেছিলেন সেখানে এসএসসির সনদে তার জন্ম তারিখ ১৯৬৩ সালের ৩০ মার্চ উল্লেখ রয়েছে। যে স্কুল থেকে তিনি এসএসসি পাস করেছিলেন সেই স্কুলের নামে তার জমা দেওয়া প্রশংসাপত্রে মোস্তাফিজুর রহমানের জন্মের তারিখ ১৯৬০ সালের ৩০ মার্চ উল্লেখ আছে। আর ওয়ান-ইলেভেনের সময় ঢাকা সিটি করপোরেশনে সেনা সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত মনিটরিং সেলে জমা দেওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীর জীবনবৃত্তান্তে মোস্তাফিজুর রহমান তার যেসব ব্যক্তিগত তথ্যাদি জমা দেন, সেখানে জন্ম তারিখ ১৯৬১ সালের ৩০ মার্চ উল্লেখ করেন তিনি। 

ব্যক্তিগত নথিতে তার জন্ম তারিখ তিনটি হওয়ার পর পরই সন্দেহের সৃষ্টি হয়। ডিএসসিসি বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জের লেংগুটিয়া হাইস্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে। স্কুল কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দেয়, মোস্তাফিজুর রহমান নামে ১৯৭৮ সালে কেউ ওই স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষা দেয়নি। কাজেই পাস করারও প্রশ্ন ওঠে না। এমনকি তার জমা দেওয়া সনদে যেসব রোল, নিবন্ধন ও ক্রমিক (রোল পাতারহাট নম্বর ১৯৯ ও ক্রমিক সংখ্যা ১৭৭১৭ এবং নিবন্ধন সংখ্যা ২৯১৩০/১৯৭৬-৭৭) উল্লেখ আছে, ওই সব নম্বরে একজন হিন্দু শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়েছিল। তার নাম মোস্তাফিজুর রহমান নয়।

পরবর্তী সময়ে মোস্তাফিজের এসএসসি সনদের সত্যতা সম্পর্কে যশোর শিক্ষা বোর্ডের কাছে জানতে চাওয়া হয়। যশোর শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ যাচাই-বাছাই করে দেখতে পায়, তার এসএসসির ওই সনদটি ভুয়া। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড যশোরের সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (ডকুমেন্ট) গাজী জুলফিকার আলী মোস্তাফিজের ওই সনদের ওপর লিখে দেন, 'আলোচ্য নামধারী সনদপত্রটিতে সকল তথ্য সঠিক নাই বিধায় সনদপত্রটি ভুয়া।'

তবে মোস্তাফিজ বলেন, নগর ভবনে শ্রমিক লীগের দুটি গ্রুপ আছে। তাদের কিছু লোকজন তার সঙ্গে টাল্টিবাল্টি করছেন। তারা এসব ষড়যন্ত্র করেছেন। তিনি তাদের শিকারে পরিণত হয়েছেন। তবে তার সবকিছু ঠিক আছে বলে তার দাবি। তিনি বলেন, তার জন্ম তারিখ ১৯৬০ সালের ৩০ মার্চ।

সূত্রঃ দৈনিক শিক্ষা ডটকম, এম ইসলাম

কমেন্ট করুন

...

সাম্প্রতিক মন্তব্য