logo
news image

হবিগঞ্জের সাতছড়ি উদ্যানের আকর্ষণ কাশবন

নিজস্ব প্রতিবেদক, হবিগঞ্জ।  ।  
হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমিতে নতুন আকর্ষণ সৃষ্টি করেছে কাশবন। উদ্যানের একটি ছড়ার মাঝে বিশাল এলাকাজুড়ে শ্বেত-শুভ্র এই বনে গিয়ে ছবি উঠাতে ভিড় জমে যায় পর্যটকদের। নাগরিক কোলাহল আর যাপিত জীবনের নানা ব্যস্ততার মাঝে তারা এখানে এসে সাদা মেঘের ভেলায় এবং কাশফুলের শুভ্রতায় অনেকেই কিছু সময়ের জন্য আনন্দে বিমোহিত হয়ে পড়েন।
সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটিরি সহ-সভাপতি আবুল কালাম বলেন, সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের বন্য প্রাণী আর গাছগাছালি এবং পাখির জন্য বিখ্যাত। প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসেন পর্যটকরা। সম্প্রতি সেখানে যুক্ত করা হয়েছে ট্রি অ্যাডভেঞ্চার। এটিও পর্যটকদের আকর্ষণ করেছে। তবে এবার একটি ছড়ার মাঝে বিশাল এলাকা জুড়ে কাশফুলের বন সৃষ্টি হওয়ায় পর্যটকরা সেদিকে বেশী করে ঝুকছেন।
তিনি বলেন, ঋতুর রাণী শরতের সবচেয়ে বড় অনুষঙ্গ কাশফুল। আকাশে ধবধবে সাদা মেঘের শতদল আর মাটিতে মৃদু বাতাসে দোল খাওয়া কাশফুল যে চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্য ছড়ায় তাতে থাকে শুধুই মুগ্ধতা। তাই পর্যটকরা এখানে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন। নাগরিক কোলাহল পেরিয়ে শুভ্রতার ক্যানভাসে ছোটেন নিজেকে রাঙাতে।
উদ্যানে আসা বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বাপা কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল বলেন, কাশবনের কারণে উদ্যানের সৌন্দর্য অনেক বেড়েছে। প্রাকৃতিকভাবে গড়ে উঠা এই বনকে সংরক্ষণ করারও দাবী জানান তিনি।
তার সাথে আসা বাপার আজীবন সদস্য শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জহিরুল হক শাকিল বলেন, কাশবনের সৌন্দর্য মুখে বলে বোঝানো যাবে না। এটি উপভোগের ব্যাপার। এই কাশবন সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি করেছে। কিন্তু লোকজন এখনও কাশবনের খবর তেমনভাবে জানছে না। এই বনকে সংরক্ষণ করে পর্যটকদের উপভোগ করার সুযোগ করে দিতে হবে।
হবিগঞ্জ বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক আব্দুল্লা আল মামুন জানান, সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের দক্ষিণ প্রান্তে একটি ছড়ার পাশে কাশবন গড়ে উঠেছে। সেখানে একটি সেতু নির্মাণের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সেতুটির কাজ শেষ হলে পর্যটকরা আরও বেশী সেখানে যেতে পারবেন। তবে কেউ যাতে ফুল বিনষ্ট না করে তার জন্য অনুরোধ জানান তিনি।
সরকারী বৃন্দাবন কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. সুভাষ চন্দ্র দেব জানান, কাশফুল মূলত ছন গোত্রীয় এক ধরনের ঘাস। নদীর ধার, জলাভূমি, চরাঞ্চল, শুকনো রুক্ষ এলাকা, পাহাড় কিংবা গ্রামের কোনো উঁচু জায়গায় কাশের ঝাড় বেড়ে ওঠে। তবে নদীর তীরেই এদের বেশি জন্মাতে দেখা যায়। এর কারণ হল নদীর তীরে পলিমাটির আস্তর থাকে এবং এই মাটিতে কাশের মূল সহজে সম্প্রসারিত হতে পারে। শরত ঋতুতে সাদা ধবধবে কাশফুল ফোঁটে। বাংলাদেশের সব অঞ্চলেই কাশফুল দেখতে পাওয়া যায়। কাশফুল পালকের মতো নরম এবং রঙ ধবধবে সাদা। গাছটির চিরল পাতার দুই পাশ খুবই ধারালো। কাশফুলের বেশ কিছু ঔষধি গুণ রয়েছে। যেমন- পিত্তথলিতে পাথর হলে নিয়মিত গাছের মূলসহ অন্যান্য উপাদান দিয়ে ওষুধ তৈরি করে পান করলে পিত্তথলির পাথর দূর হয়। কাশমূল বেটে চন্দনের মতো নিয়মিত গায়ে মাখলে গায়ের দুর্গন্ধ দূর হয়। এছাড়াও শরীরে ব্যথানাশক ফোঁড়ার চিকিৎসায় কাশের মূল ব্যবহৃত হয়।
তিনি আরও জানান, সাহিত্যে কাশফুলের কথা এসেছে নানাভাবে। রবীন্দ্র নাথের প্রাচীন গ্রন্থ ‘কুশজাতক’ কাহিনী অবলম্বন করে ‘শাপমোচন’ নৃত্যনাট্য রচনা করেছেন। সেখানে কাশফুলেব কথা বলা হয়েছে। কাশফুল মনের কালিমা দূর করে। শুভ্রতা অর্থে ভয় দূর করে শান্তির বার্তা বয়ে আনে। শুভ কাজে কাশফুলের পাতা বা ফুল ব্যবহার করা হয়। মহাকবি কালিদাস শরৎ বন্দনায় বলেছিলেন ‘প্রিয়তম আমার, ওই চেয়ে দেখ, নব বধূর ন্যায় সুসজ্জিত শরৎ কাল সমাগত।’
তিনি জানান, এক সময় হবিগঞ্জের বন জঙ্গলে প্রচুর পরিমাণ কাশফুল ছিল। নির্বিচারে জঙ্গল পরিস্কার ও পাহাড় কাটার ফলে এখন কমে গেছে। সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট কাশবনটিকে আরও সম্প্রসারণের সুযোগ দিতে হবে এবং এটিকে সংরক্ষণ করতে হবে।

কমেন্ট করুন

...

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top