logo
news image

শিশুদের হজ পালন ও শিশুবান্ধব হজ অবকাঠামো

প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম।  ।  
প্রতিবছর কিছু পিতামাতা পবিত্র হজ্জ্ পালনে শিশুদেরকে সাথে নিয়ে মক্কা-মদীনায় যান। অল্প বয়সে হজ্জের গুরুত্ত্ব অনুধাবন ও ঐশী প্রতিদানের আশায় এটাকে তাঁরা ইসলামী শিক্ষা ও অনুশীলনের অংশ মনে করে থাকেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ধর্মমন্ত্রনালয়ের গ্রান্ড মুফতি ড. আলী কোবাইয়াশী মনে করেন- শিশুদের হজ্জপালন নিষিদ্ধ নয় তবে অত্যাবশ্যকীয়ও নয়। এটা একান্তই পিতা-মাতার ওপর নির্ভর করে।
প্রতিবছর সারা বিশ্ব থেকে ২ মিলিয়ন বা বিশ লক্ষ হাজী হজ্জ করতে যান। সবচেয়ে বেশী যান ইন্দোনেশিয়া থেকে। ২০১৭ সালে ইন্দোনেশিয়া থেকে ১ লক্ষ ৬৮ হাজার, পাকিস্তান থেকে ১ লক্ষ ৪৩ হাজার, ভারত থেকে ১ লক্ষ ৩৬ হাজার ও চতুর্থতম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ থেকে ১ লক্ষ ২৬ হাজার ৭৯৮ জন হজ্জে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এক হিসেবে জানা যায়- হাজীদের তিন থেকে চার ভাগ শিশু। বাংলাদেশের হজ্জ ম্যানেজমেন্ট পোর্টাল থেকে জানা যায়, ২০১৭ সালে মোট হাজীগণের ৩ ভাগের বয়স ১৮ বছরের নিচে ছিল। সে হিসেবে বাংলাদেশ থেকে ৩,৮০৩ জন শিশু হজ্জ করেছিল।
পবিত্র হজ্জ্ পালনে সারা বিশ্ব থেকে যেসব শিশুরা যায় তাদের প্রায় তিন ভাগের বয়স ৬ বছরের নিচে। ভারত থেকে গত বছর ১৪৪ জন শিশু পবিত্র হজ্জ্ পালন করেছিল, তাদের মধ্যে ৫২ জন ছিল নবজাতক (ইনফ্যান্ট)। (আরব নিউজ, জুলাই ২৫, ২০১৮)। এরা পিতামাতার কোলে-ঘাড়ে বসেই পবিত্র হজ্জে অংশ নেয়। অর্থাৎ, প্রতিবছর ৬ বছরের নিচে ৫ থেকে ৭ হাজার নাবালক শিশু পবিত্র হজ্জ্ পালনে অংশ নেয়। এর নানা কারণ রয়েছে। বড় কারণ হলো- মহান আল্লাহতা’য়ালার নৈকট্য লাভ, পিতা-মাতা বা অভিভাবকের একান্ত ইচ্ছা, আর্থিক সামর্থ্য, রোগমুক্তিলাভ, বহুপ্রত্যাশিত শিশু জন্মনিলেই পবিত্র কাবা শরীফ দর্শন, হজ্জপালনসহ বিভিন্ন প্রকারের মানত পরিপূরণ করা, ইত্যাদি।
শিশুরা পুত-পবিত্র। তারা নিষ্পাপ। কেউ কেউ শিশুদেরকে ফেরেশতার সংগে তুলনা করে থাকেন। শিশুরা যখন শুভ্র-ফেনিল পোষাক পরে ইবাদাতে মশগুল হয় তখন একটি স্বর্গীয় পরিবেশ ও অনুপম অনুভুতি তৈরী হয়। হজ্জের সময় বিভিন্ন দেশের, বিভিন্ন দেহায়ববের ও বর্ণের শিশুরা সাদা এহরাম পরিহিত অবস্থায় যখন একই কাতারে দাড়িয়ে ইবাদত করে তখন তাদেরকে একদল ফেরেশতা মনে হয়।
তবে শিশুদের জন্য হজ্জ কর্তৃপক্ষের বিশেষ ব্যবস্থা না থাকায় কিছু পিতামাতা নানা বিড়ম্বনা ও বিপদের সম্মুখীন হয়ে থাকেন। হজ্জের নবম দিনে নয় মাইল (১৪.৪ কি.মি.) পথ পাড়ি দিতে হয়। কারণ, মক্কা থেকে মিনার তাঁবুতে পৌছে অবস্থান শেষে যেতে হয় আরাফাহ ময়দানের সুবৃহৎ তাঁবু-শিবিরে। আরাফায় সব হাজীকেই যেতে হয় ও পরে মুযদালিফার দিকে যাত্রা করতে হয়- যেখানে গরমের মৌসুমে স্বাভাবিক তাপমাত্রা ১২২ ডিগ্রী ফারেনহাইট বা ৫০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড! সূর্যাস্ত পর্যন্ত হাজীদের আরাফায় অবস্থান করা ফরজ। এরপর ৫.৫ মাইল বা ৯ কি.মি.পাড়ি দিয়ে পুনরায় মুযদালিফায় আসতে হয়। এজন্য লক্ষ লক্ষ হাজীদের ভীড় ঠেলে নির্দিষ্ট বাসে উঠতে হয়। এসময় অনেক হাজীকে তাঁদের এজেন্ট বা গাইড খুঁজে না পেয়ে হতাশ হয়ে কান্নাকাটিও করতে দেখা যায়। এসময় যাদের সংগে বয়স্ক পিতামাতা অথবা নারী ও শিশু থাকেন তারা বেশী অসহায় বোধ করেন। মুযদালিফায় খোলা মাঠে ধুলোবালি ও উঁচু-নিচু পাহাড়ের মধ্যে রাত্রিযাপন করতে হয়। অনেক শিশু এত জনতার ভীড় দেখে ভড়কে যায়, আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে কান্নাকাটি করতে থাকে। অনেক সময় শিশুর কান্না থামানো দায় হয়ে যায়। শিশুর কান্না থামাতে গিয়ে পিতামাতা বা অভিবাবকদের ইবাদতে বিঘœ ঘটে। অনেক প্রাণবন্ত ও চঞ্চল শিশুরা হজ্জে গিয়ে প্রথম দু’চারদিন পর বৈরী আবহাওয়া সহ্য না হওয়া ও ভিন্ন স্বাদের খাবার গ্রহণ করতে না পেরে দুর্বল হয়ে যায়। এছাড়া সবসময় পাথর ও টাইলসের ওপর দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে পা ফেটে বা গোড়ালীতে ব্যাথা পেয়ে অনেক শিশু মায়ের কোল ছেড়ে আর নিচে নামতে চায় না। খাবারের ভিন্নতা থাকায় ও ঘুম না হওয়ায় অনেক শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ে। গরম, পাথর কণা মিশ্রিত ধুলোবালি ও ভোর রাতে মরুভুমির ঠান্ডা অনেকসময় বড়দেরই সহ্য হয় না। মুযদালিফায় সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো টয়লেটে দীর্ঘ লাইন ও ভীড় যা অবুঝ শিশু ও তাদের অভিভাবকদের জন্য ভয়ংকর কষ্টদায়ক একটি ব্যাপার- যা শুধু ভুক্তভোগীরাই জানেন।
এরপর জামারায় গিয়ে শয়তানকে পাথর ছুঁড়তে হয়। জামারায় যাবার পথ কোথাও উঁচু কোথাও ঢালু ও জনবহুল। ঘুমন্ত বাচ্চাকে পিঠে নিয়ে শয়তানকে পাথর ছুঁড়তে গিয়ে বিপদ ঘটতে পারে। এছাড়া কিছু শিশু হাজী নিজেও পাথর ছুঁড়ে থাকে। এখানে ভীড়ের চাপে পড়ে গিয়ে পদদলনের ঘটনায় অনেক সময় মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
এরপরও অনেক পিতা-মাতা শিশুদের সাথে নিয়ে পবিত্র হজ্জ পালন করতে আগ্রহী। এজন্য শিশুদেরকে প্রয়োজনীয় টিকা দিয়ে নিতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ধরনের রোগের জন্মস্থান এবং সেগুলোর প্রকোপও আলাদা। তাই সৌদি আরবে হজ্জের মৌসুমে ৪১টি রোগের টিকা ও প্রতিশোধকের ব্যাপারে কড়াকড়ি আরোপ করা আছে। বাংলাদেশ থেকে শিশুকে সাথে নিলে সরকারী ২/৩টি টিকা ছাড়াও ডাক্তারের সংগে বিশেষ পরামর্শ করে আরো বেশী প্রতিশোধক নিয়ে নিতে হবে।
অনেক সময় হাজী ক্যাম্পের হাসপাতালে শিশুদের প্রয়োজনীয় ওষুধ থাকে না। আবার দেশ থেকে নেয়া ওষুধ ওখানে ভালো কাজ করে না। তাই সেখানে কোন পরিচিত ডাক্তার বা আত্মীয়-স্বজন থাকলে পূর্বেই যোগাযোগ করে বিষয়টি অবগত করে রাখা ভালো। মক্কা-মদীনার তাপমাত্রার কথা মনে রেখে সুতি ও হাল্কা ঢিলেঢালা পোষাক কয়েক সেট সংগে নিতে হবে। শিশুরা বাড়িতে যেসব স্বাভাবিক শুকনো খাবারে রুচি বোধ করে সেসব খাবার সাথে নিলে ভাল হয়।
আরেকটি দৃষ্টিকটু বিষয় হলো- শিশু কোলে নিয়ে কিছু মহিলা ভিক্ষা যাচেন। তারা কোন দেশের তা বলা মুষ্কিল। তবে চেহারা ও পোষাক দেখে এবং ভাষা শুনে ভিনদেশী মনে হয়। এদের সংখ্যাও অনেক। মক্কা ও জামারায় ঢোকার পথগুলোতে এরা শিশুকে ব্যবহার করে ভিক্ষা যাচেন। পুলিশী নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও এরা নাছোড়বান্দার মত হাজীদের কাছে টাকা আদায় করেন। সৌদি আরবে ভিক্ষাবৃত্তি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু কে শোনে কার কথা! হজ্জ মৌসুমে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে অনেকে শিশু সাথে নিয়ে সেদেশে ঢুকে পড়ে। ধনী দেশ বলা হলেও সৌদি আরবের দরিদ্র এলকাগুলোতে প্রচুর মানুষ এখনো ভিক্ষাবৃত্তিতে অভ্যস্ত। কড়া রৌদ্রতাপে কোলের শিশুকে কষ্ট দিয়ে এরা ভিক্ষাবৃত্তিকে মৌসুমী পেশা হিসেবে গ্রহণ করে। এরা হজ্জ মৌসুমে মক্কা-মদীনায় ভিড় জমায়!
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পিতা-মাতারা হয়তো ইহজীবন ও পারলৌকিক শান্তিপ্রাপ্তির কথা ভেবে শিশুদেরকে সাথে নিয়ে হজ্জ পালন করে থাকেন। আপাত:দৃষ্টিতে এ কাজে পুণ্যলাভই হাজীগণের মুখ্য উদ্দেশ্য। কিন্তু বিষয়টির গভীরে তাকালে জয়ের চেয়ে কষ্ট ও ভয় বেশী আছে বলে মনে হয়। তাই শিশুদের কল্যাণে প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থাসহ একটি শিশুবান্ধব হজ্জ অবকাঠামো গড়ে তুলে তারপর শিশুহজ্জ পালনের অনুমতিদান করাই শ্রেয়। এজন্য মুসলিম বিশ্বকে দেশে দেশে সোচ্চার হয়ে দাবী তুলতে হবে এবং আয়োজক দেশকে সে দাবী মানতে আগ্রহী হতে হবে।
*প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান এবং  সামাজিক বিজ্ঞান, পরিবেশ বিজ্ঞান, শিক্ষা ও গবেষণা অনুষদ এবং ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ (আইবিএস)-এর একজন গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক।

কমেন্ট করুন

...

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top